https://www.prothomalony.com/
12425
literature
কবির আত্মকথন
তমিজ উদ্দীন লোদী
এখনো মনে হয় কেউ না কেউ আছে
কোথাও না কোথাও নিরিবিলি পড়ছে আমার কবিতা
শিল্প-খোঁজা, আনন্দ-উদ্বেল তরুণ কি তরুণী
বুঁদ হয়ে আছে, জগতের সকল নেতির মাঝে ব্যতিক্রম
ওরা আছে, প্রবল নাদ ও ঢাকঢোল পিটানোর মাঝে
তারা মজে আছে, যেন দূর থেকে হাসছেন ঠাকুর।
ভাগ হয়ে যাওয়া ব্রহ্মাণ্ডের বুকে ওরা গাইছে মানবিক গান
যেন রাশি রাশি পুষ্প ঝরে পড়ে আছে ধুলোর পৃথিবীতে
এখনো অমলিন চাঁদের পীযূষধারা 'বইছে ভুবনে'
এখনো কবিতা আছে, কোথাও না কোথাও পাঠ হচ্ছে
কবিতা , যে কবিতার শব্দাবলী একদার রক্ত দিয়ে কেনা।
কি করে আমার হয়ে যায়
আহমেদ ছহুল
রাষ্ট ভাষা বাংলা চাই রাষ্ট ভাষা বাংলা চাই
কম্পিত ঢাকার রাজপথ
দুর্বার ছাত্র জনতা মিছিলের পর মিছিল।
ওরা উদ্দাম নির্ভীক ওরা ভাঙে একশ চুয়াল্লিশ ধারা
অকুতোভয় সৈনিকের মতো সব নেমে যায় রাস্তায়
আবালবৃদ্ধবনিতা
দাবী শুধু একটা মায়ের ভাষা ফেরত চাই
প্রতিবাদী ছাত্র জনতার ক্ষুব্ধ আওয়াজ
মুহূর্ত ছড়িয়ে যায় মধুর ক্যান্টিন থেকে
আমতলা কলাবাগান গমগম করে চারপাশ
আমাদের দাবী আমাদের দাবী মানতে হবে।
কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় অলিগলি রাজপথ
কাঁদানে গ্যাস চোখের মণিতে তীব্র জ্বালা
লাঠির আঘাত মাথার উপর হুলিয়া গ্রেফতার
তবুও জনতার মিছিল এগিয়ে যায়
হঠাৎ গর্জে উঠে থ্রি নট থ্রি রাইফেল
পাখি শিকারি মতো গুলি করে ওরা
মানুষে মাথায় বুকে
রফিকের রক্তে ভিজে যায় জমি
বরকতের রক্তে ভিজে যায় জমি
সালামের রক্তে ভিজে যায় জমি
সফিউলের রক্তে ভিজে যায় জমি
জব্বারে রক্তে ভিজে যায় জমি
সব স্তব্ধতা ভেদ করে গর্জে ওঠে সারা বাংলা
বিদ্রোহের ঘটে বিস্ফোরণ এক দ্ব্যর্থহীন প্রত্যয়
মায়ের ভাষা! আমার ভাষা!
এক কথা এক দাবী।
মায়ের ভাষা! আমার ভাষা! আমার ভাষা!
অবাক বিস্ময়ে দেখে পৃথিবীর বিসৃত জনপদ
অগণন মানুষ
কি করে জীবন দিয়ে মুক্ত করে মায়ের জবান।
কেমন করে
চর্যাপদ থেকে নেমে আসা মায়ের বলা ধ্রুপদী
শহীদের রক্তে রক্তে পলাশ আর শিমুলের মতো
আমার বর্ণমালা অ আ ক খ আমার হয়ে যায়।
অ আ ক খ আমার হয়ে যায় আমার হয়ে যায়।
একুশের আকুলতা
দেওয়ান নাসের রাজা
একুশের পবিত্র চত্বরে-স্তূপাকৃত
রক্ত জবা। তুমি আমায় বললে
ডেকে, শহিদের ইতিকথা।
শহিদ মিনারে শিমুলের পাতা
কুয়াশায় ভিজা ছিলো
তোমার চোখের তারায় তারায়
তীব্র আকুলতা।
ফাল্গুনের হাওয়ায় হাওয়ায়
হৃদয়ে আনন্দ ধারা
স্বর আর ব্যঞ্জন বর্ণের মতোই
অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসা।
বায়ান্নর ভাষার মতোই
অবিরাম অবহেলা
রক্তের ধারার মতো-অবিশ্রান্ত
মায়ের ভাষায় অমল কবিতা।
রফিক জব্বার বরকত সালামের
আত্মদান। সবুজ প্রান্তরে কে গায়
মরমিয়া গান।
ঝরাপাতার গান
রাবাত রেজা নূর
ভুল ফুলে ভরে গেছে অতসীফুলের
ডাল―দূরচারী হাওয়াদের তালে
কাঁপে বুনো কালিম পাখির ছানা
শিঙে ঘাসের গন্ধ; ফেরে মহিষের পাল―
তীব্র নিনাদসুরে হাহাকার পাখি
রাত চিঁড়ে ছুটে চলে তারাদের ঝাঁক
চুমুর গন্ধ কোথায় লুকিয়ে রাখি–?
জানে যদি কেউ তবে সব জেনে যাক―
জলের শিয়রে বসে দূরগামী চিল
মদির হাওয়ায় ঢুলে রঙধনু সুর; কেউ
কি মেপেছে কখনো; তোমার বাড়ি
থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব কতদূর―
হুইসেল বেজে যায় জোনাকিট্রেনে
ডুবছি দারুণ লোনলিনেসের জ্বরে
কেউ কি জানে কেমন করে একটা
পাতা ঝরে যায় কত অনাদরে―
মাতৃভাষা
সাকিব জামাল
মা আমার, গাঁও গেরামের লোক
তবু তাঁর মুখের ভাষায়-
আমার পরিচয় হোক!
কথায় আমার আঞ্চলিকতার টান,
জন্মসূত্রে পাওয়া খোদার সেরা দান।
এসব নিয়ে ভর সমাজে, লোকে-
যা খুশি তাই বলুক!
ভাষা বৈচিত্র্যে- যাদের গাঁ জ্বলে,
মেরুদন্ড বিকিয়ে তারা
কেঁচো হয়ে চলুক!
ফেব্রুয়ারি
এস ডি সুব্রত
জাগ্রত চেতনার দীপ্ত শপথে
ভয় দ্বিধাহীন অভিযাত্রা
ক্রোধের অনলে জেগে উঠা বিস্ফোরণ
দাবিয়ে রাখা যায় না।
পৃথিবীর আলো দেখা প্রথম প্রহরে
মুখ ফুটে বেড়িয়ে আসা উচ্চারণ
কখনো মানে না কোনো
ভয় ভীতি গুলি আস্ফালন
মায়ের ভাষার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে
পিছপা হয়নি দামাল ছেলেরা
বিপদে এগিয়ে আসে মুক্তির কান্ডারি
অস্তিত্বের আঙিনায় অনিমেষ
ছায়া ফেলে রক্তে রঞ্জিত ফেব্রুয়ারি।
একুশ: কিছু অসমাপ্ত বাক্য
এইচ বি রিতা
ফেব্রুয়ারির কুয়াশা ভেঙে আসে কিছু নাম।
নামগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে গলা শুকিয়ে যায়
অথচ শহরের দেওয়ালে এখনো লেগে আছে তাদের
রক্তের দাগ।
একটা গুলি ছুটে যায় অন্ধকারের দিকে,
তারপর চুপচাপ লুটিয়ে পড়ে ভাষার শরীর
লোকজন তখনো বুঝে ওঠেনি
ভাষা কি সত্যিই মরে যায়?
কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে।
তারপর আরো কয়েকজন
তারপর শব্দেরা গর্জন হয়ে ওঠে
অক্ষরগুলো রাজপথে নামে, বইয়ের পাতায় নয়,
শহীদের বুকে লেখা হয় অভিধান।
একটা পাথর গড়িয়ে পড়ে শহীদ মিনারের সিঁড়িতে।
বাচ্চারা ফুল রেখে যায়,
ফুলের গন্ধে ভেসে আসে
'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...'
শহরটা ধীরে ধীরে আবার তার রুটিনে ফিরে যায়।
কিন্তু একটা ভাষা জেগে থাকে,
রাত জেগে, লণ্ঠন হাতে-পথের দিকে তাকিয়ে...
আ মরি বাংলাভাষা
রাশিদা কামাল
বাহান্ন সালের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গঠন করেছে 'সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদ। আর এই পরিষদ আহ্বান করেছে সাধারণ ধর্মঘট। কিন্তু কেন গঠিত হলো সংগ্রাম পরিষদ! আর কেনই বা এই পরিষদ ধর্মঘটের ডাক দিলো! কারণ তো একটা আছেই!
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এক ভাষণে বললেন ,
উর্দুই হবে এদেশের রাষ্ট্রভাষা।এ কথায় বাংলাভাষার মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হলো। পাশাপাশি বাঙালি জাতির সংস্কৃতিরও অমর্যাদা সূচিত হলো। এর ফলশ্রুতিতে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠলো। আন্দোলন নস্যাৎ করতে জারি করা হলো ১৪৪
ধারা। এ ধারা ভেঙে ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এলো। না! ভাষার অমর্যাদা কেউ সহ্য করবে না! সবার মুখে শ্লোগান, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।
আইন ভাঙার কারণে চলল গুলি। এ আঘাতে ওদের বুক হলো ঝাঁঝরা। ঢাকার রাজপথ ভিজে উঠলো তাজা তরুণদের রক্তে। মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন সালাম, বরকত , জব্বার, রফিক শফিকসহ আরও অনেকে। প্রাণ দিলেন কিন্তু ভাষার অমর্যাদা হতে দিলেন না! প্রাণ দিয়ে রক্ষা করলেন মাতৃসম মাতৃভাষাকে। আমরা আবারও অনুভব করলাম মাতৃভাষার গুরুত্ব।
আসলেই তো মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা কীভাবে আমাদের জড়িয়ে ধরে আছে! অথবা আমরা এসবকে জড়িয়ে ধরে আছি! আমাদের পরিচয় তো নির্ণিত হয় এ তিনটি যোগ্যতার কারণে! তা না হলে পরিচয় তো হয় অসম্পূর্ণ-খণ্ডিত।
খণ্ডিত পরিচয় নিয়ে কে বাঁচতে চায়!
এ ঘটনা আমার জন্মের আগের। একটু একটু করে বড়ো হয়েছি আর এসব কথার মর্ম উপলব্ধি করেছি। মনের ক্যানভাসে ধরে রেখেছি না দেখা সেই আত্মত্যাগী মানুষগুলিকে। যারা ভাষার জন্য অবলীলায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।
আমার মনে নেই কোন সালের কথা। আমি তখন থ্রি বা ফোরে পড়ি। একুশে ফেব্রুয়ারি সে সময় স্বীকৃতি পায় নি। নিয়মিত স্কুলে যেতে হতো। দিনটিকে পালন করার কোন সুযোগই ছিলো না। আমরা যথারীতি অ্যাসেমব্লিতে 'পাক সার জমিন সাদ বাদ ' গানটি গেয়ে ক্লাসে ঢুকতাম। ক্লাসও শুরু হতো নির্ধারিত সময়ে। কিন্তু তবুও ব্যতিক্রম ছিলো। একটা সূক্ষ্ম ছন্দপতন টের পেতাম ওই বয়সেও। স্যার ক্লাস নিতেন মন্থর গতিতে। কোন হোমওয়ার্ক দিতেন না। ক্লাসওয়ার্ক চলতো মুখে মুখে। ব্রজেনবাবু স্যার ছিলেন গণিতের শিক্ষক। অন্যদিন তিনি এসেই বোর্ডে অংক করাতেন। কিন্তু সেদিন তা করতেন না! শুধু সময়টা পার করতেন।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখতাম নাইন টেনের বড় আপুরা ক্লাসে ঢুকেছেন। এতক্ষণ ওঁরা মাঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। ক্লাসে ঢুকেই আমাদেরকে যে কোন একজন আপু বলতেন, 'আজ ক্লাস হবে না। জানো তো এটা কী মাস? আজ কত তারিখ?'
আমরা কোন উত্তর দিতাম না। কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। আপুই বলতেন, 'আজ একুশে ফেব্রুয়ারি! ভাষার
আন্দোলনের মাস। এ দিনে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন আমাদের ভাইয়েরা। ওঁদের সম্মানে আজ স্কুল বন্ধ। তোমরা চলে এসো।'
আমরা তখনই উঠতাম না। স্যারের দিকে তাকাতাম। কিন্তু মনে হতো স্যারও চাইছেন আমরা চলে যাই। শ্রদ্ধা জানাই শহিদ ভাইদের। উঠে পড়তাম এর পরে। লাইন করে বের হতাম ক্লাসরুম থেকে। স্যারকে দেখতাম খুশি মনে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমার এ দৃশ্যটা এখনও মনের মধ্যে গেঁথে আছে।
অবশ্য ভোররাতে প্রভাতফেরির সুরে ঘুম ভাঙতো। উঠতাম না লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে শুয়ে গান শুনতাম। মনের মধ্যে এক আবেশের সৃষ্টি হতো। বহুবার শোনা এই দেশাত্মবোধক গানগুলিকেই নতুন মনে হতো।
এভাবেই বড়ো হতে লাগলাম। একদিন শুনলাম এ দিনটি ছুটির দিন। পাকিস্তান সরকার দিনটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভয়ে ভয়ে নয়, মন্থর গতিতেও ক্লাস করা নয়! যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটিকে পালন করতে পারব। তখন থেকে মনে হতো ন্যায়ের কাছে অন্যায় একদিন না একদিন হেরে যাবেই। যেতে বাধ্য হবে।
এই তো আমার বাংলাদেশ! যাকে ভালোবেসেও মনে হয় ঠিকমতো ভালোবাসতে পারলাম না! কতকিছু করার আছে দেশের জন্য! অথচ কিছুই করতে পারি নি। করতে পারব কিনা তাও জানি না! তবুও বুকের ভেতরে বেজে চলে একটি সুর-
"মোদের গরব মোদের আশা
আ মরি বাংলাভাষা।"
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন