https://www.prothomalony.com/
12242
literature
কবি: সুবীর কাম্মীর পেরেরা
প্রকাশনা: স্বদেশ শৈলী
কবি সুবীর কাস্মীর পেরেরার কবিতা: সমকালের মানুষ ও জীবন যন্ত্রণাবোধের উপলব্ধি
কবিতা শব্দের যথার্থ বিন্যাসে অন্তর্দৃষ্টির সুশৃঙ্খল প্রকাশ। এটা মূলত সৌন্দর্যসৃষ্টির লক্ষ্যেই। আর কবি? তাঁকে দ্রষ্টা হওয়ার দাবি তুলেছিলেন প্রতীকবাদী কবি আর্ত্যুর র্যাঁবো। যে উদ্দেশ্যেই কবি ব্যাখ্যা করতে চান না কেন-কবিতার মৌল বক্তব্য অন্তরকে ছুঁয়েই ঋদ্ধ হতে চায়। মন্ময়-চেতনা এই ক্ষেত্রে একটু বেশিই অগ্রসর; অবশ্য তন্ময়তাকে বাদ দিয়ে নয়। আমরা জানি, কবি সত্যের উপাসনা করেন, প্রকাশ করেন চিত্রণে, চর্বণে;-অর্থাৎ কোনো ঘটনা কিংবা সত্যকে কবি কল্পনায় রূপায়িত করেন; যেহেতু কবিতার প্রকাশভঙ্গি দর্শনের কিংবা বিজ্ঞানের প্রকাশভঙ্গির মতো নিরাবরণ ও নিরলঙ্কার হলে পোষায় না।
প্রত্যেক কবির বোধ, প্রজ্ঞার ধরন এক নয়, হতেও পারে না। প্রত্যেক কবিই কবিতা সৃষ্টির পর তার পাঠক এবং উত্তরকালের উদ্দেশে নিবেদন করেন। কবিতার চূড়ান্ত গ্রহণ-বর্জন উত্তরকালের হাতেই থাকে। স্বীকার্য যে, আজকের প্রেক্ষাপটে কিছু-কিছু ক্ষেত্রে কবিতা হয়ে উঠছে প্রাণহীন এবং জটিল। এই প্রাণহীনতা কিংবা জটিলতার পিছনে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগত সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক টানাপড়েন;-যাকে আমরা সংক্ষেপে ‘জৈবনিক টানাপড়েন’ বলে উল্লেখ করতে পারি। জীবন এবং সময়ের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে মানুষ ক্রমশ জটিল হয়ে পড়ছে । কঠিন বাস্তবতাই মানুষ ও সমাজকে কঠিন সব পরিবর্তনের দিকে হাঁটতে বাধ্য করছে। সময় এবং জীবন-ব্যবস্থার ফাঁকেই বদলে যাচ্ছে মানুষ, বদলে যাচ্ছে মানুষের উপলব্ধি, চিন্তনসূত্র। ধরে নিচ্ছি, এই পরিস্থিতিতে কবির অভিজ্ঞতার আলোকে সময়ের ছায়াই পড়ছে কবি সুবীর কাস্মীর পেরেরার কবিতায়। অভিজ্ঞতা এবং জীবন যে একই সুতোয় গাঁথা।
‘জীবন নদীর আকেঁ-বাকেঁ ঢেউ ছিলো তার নন্দনা,
আকঁড়ে ধরে বয়ে চলা, ছন্দে তালে বন্দনা।
স্রোতের তালে গতি আসে, উল্টো রথে বাসনা
বাঁকে এসে থমকে দাঁড়ায়, নতুন দিনের নিশানা।’
(পাতা)
কবিতা হচ্ছে ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম। এই মাধ্যমে কবির সৃজনী-সামর্থ্যরে ভিত্তিতে অভিজ্ঞতা ভূমিকা রাখতে পারে বাস্তবে, চিন্তায়। গাছের ডালে বসে থাকা কিংবা আকাশে উড়ন্ত পাখিটিকেও নতুন অভিজ্ঞতার আলোকে দেখতে পারেন। প্রত্যেক কবি সৃষ্টির লক্ষ্যেই পথ হাঁটেন নিজের অনুভূতি, চিন্তনসূত্র কিংবা প্রজ্ঞার আলোকে। বাইরের বিষয়সমূহ, পরিবেশ পরিস্থিতি কবিকেও প্রভাবিত করে। কবিতার সমূহ অনুষঙ্গের সূতিকাগার কবি নিজেই।
‘ভিন্ন মতের ভিন্ন মানুষ
অন্য ঘরে বাস,
দৃষ্টি ভঙ্গির চিন্তা-ধারায়
জাগায় মনে ত্রাস।’
(শান্ত সৈনিক)
কবিতা লেখার জন্যে অনেক শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত হতেই হবে বা কবিতা লেখার নিয়ম-কানুন জেনে-বোঝে আসতে হবে তার কোনটিই বাধ্যতামুলক নয়। কবিতা লেখার জন্যে কাব্যের প্রতি লেখক কবির অসীম দরদই যথেষ্ট। তিনিই যথার্থ কবি; যিনি সুন্দর শৈলীর মাধ্যমে নিজের অনুভূতিকে দশের অনুভূতিতে রূপান্তর করতে পারেন। মোটকথা; লেখাটি যেন স্পর্শগ্রাহ্য হয়, বিষয়বস্তু ও বক্তব্যের ঐক্যতানে বাঙময় হয়, বেশিসংখ্যক পাঠকের বোধের আওতায় থাকে এবং সবশেষে লেখাটি পড়ে পাঠকের মনে যেন যুগপৎ আনন্দ বা বেদনা দোলা দেয় ও ভাবের উদয় হয় আর উপসংহারে একটা সারমর্ম নিয়ে তৃপ্ত হতে পারেন, ব্যস ওটুকুই যথেষ্ট। কবি সুবীর কাস্মীর পেরেরার কবিতা পাঠকের বোধের;যা যুগপৎ আনন্দ বা বেদনার দোলা দেয় অনায়াসে।
চেনা পথে চেনা রথে,
চেনা রাতে চলছি দূর,
মধ্য রাতে,চাঁদনী শীতে,
গানের সাথে হৃদয়পুর।
(অগ্নি পুরুষ)
মানব হৃদে ঘৃণার হ্রদে
বাতাস বেগে বাড়ছে ঢেউ,
ডুবে ডুবে ঘোলা জলে
ঘূর্ণি পাকে পড়বে কেউ!
(মানব হৃদে ঘৃণার হ্রদে)
কবি মাত্রই আবেগিক । কবির স্বপ্ন থেকে সমাজ সংসারের সৃষ্টি হয়। কবি অজানাকে জানায় আর অচেনাকে চেনায়। পৃথিবীর একই বিশাল মৃত্যুর মধ্যে কবি জীবনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। কবিতায় কোন লয় বা ক্ষয় নেই। জীবনানন্দ দাশও একে বলেছেন ‘মহাকালের ইশারা থেকে উৎসারিত সময় চেতনা’। রুশো বলতেন, ‘কবিতা মূলত কবির হৃদয়াবেগের বাহন’। একটা কবিতা ইস্পাতের চেয়েও শক্তিশালী আর বুলেটের চেয়েও গতিশীল। কবি সুবীর কাস্মীর পেরেরার কবিতাগুলো যেন এক আবেগিক হৃদয়ের ছোঁয়া I আবেগ ও ভাবনার নির্যাস বর্ণশোভিত করা আর জীবনের ধারণা নিয়েই হাত দিয়েছেন কবিতা রচনায়। লিখেছেন–
ভাগ্য রেখায় দুঃখ ছিল
কষ্টে ভরাট অন্তরে,
দলিল পত্রে স্বত্ব ছিল
ভুলটা ছিল প্রান্তরে!
(লড়ে যাব প্রত্যয়ে)
কবির মৃত্যু নেই; কবিতার ধ্বংস নেই । কবি সুবীর কাস্মীর পেরেরা তরতাজা একজন তারুণ্যের কবি। কবিতায় জাগিয়ে তুলতে চান প্রেম,দ্রোহ, জীবনের জয়গান আর বিপ্লবের চেতনা। কবি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন অস্ত্র, গোলাবারুদ আর কামানের গর্জন দিয়ে সাময়িকভাবে ক্ষমতার মালিক হলেও টিকে থাকা যায় না। তিনি ভালোবাসার পৃথিবী বানাতে চান, জয় করতে চান মানুষের মন। তাইতো তিনি দৃঢ়তার সাথে দীপ্ত কণ্ঠে স্পষ্ট উচ্চারণ করলেন-
নতুন দিনের নতুন আলোয়
মানবতার জন্ম হোক,
আনন্দলোকের জয়োগানে
নিপাত যাবে ভন্ডলোক।
(মঙ্গলশোভার আলোর পথে)
কবি সুবীর কাস্মীর পেরেরার কবিতায় প্রধান লক্ষণীয় বিষয় প্রাকৃত ও লোকজ শব্দের ব্যবহার। প্রান্তিক অঞ্চলের কাদাময় শব্দগুলো নান্দনিক আর শৈল্পিকতার মধ্য দিয়ে তিনি কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। কবিতায় স্থান পেয়েছে পাপ, দুঃখ, অমঙ্গলবোধ, নৈরাশ্য, আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তিমূলক ভঙ্গিমা, দেহাত্মবাদ, জীবনযাপনের তীব্রবোধ, দেশকালের নানা সংকটময় মুহূর্ত।
ধর্মান্ধদের গোপন আখড়ায়
ধর্ম নিয়ে বাড়ছে লড়াই,
পদ চুমে ভন্ড বাবার
জিকির তুলে করছে বড়াই!
(ধর্ম নিয়ে বাড়ছে লড়াই)
তেলের মাথায় তেল যে ঢালী
কৈয়ের তেলে কৈ,
সহজ শিক্ষা চাটা-চাটির
লিখব একটা বই।
(সত্য ভাষণ)
কবি সুবীর কাস্মীর পেরেরার কবিতায় প্রধান প্রবনা হচ্ছে ব্যক্তি আত্মময়তা, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি আর নিজেকে আবিস্কারের প্রাণান্তকর চেষ্টা, যার মধ্য দিয়ে সামাজিক বিরোধ, আপন অস্তিত্বের কথা উঠে এসেছে অবিরলভাবে। কবি আপাদমস্তক অস্তিত্বচেতনায় বলিয়ান হলেও সচেতনভাবেই চিনে নিয়েছেন নানা স্মৃতিময় বেদনার কবিতাও। কিছু কিছু কবিতায় বিপ্লবী, বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। সমকালের মানুষ, তার জীবন ও জীবিকার সঙ্গে তিনি অনুভব করেছেন যন্ত্রণা বোধের লবণাক্ত জল। মানবতার বিপর্যয় দেখে কোন কবিই সচেতনভাবে বসে থাকতে পারেন না।
পল্টনের ঐ সমাবেশে
গলা ফাটায় কারা?
যাদের হাতে ঠকছে মানুষ
মারছে পিষে তারা।
(নেতা)
সব গেছে খোয়া / যাবেনা তো ছোয়া
একি হলো সর্বনাশ!
সুখ নিশি পুরে / আলোকিত ঘরে
হতে হলো আজ লাশ।
(ভাগ্য)
কবি শুধু হতাশাগ্রস্থ নয়। স্বপ্নও দেখতে জানেন। দেখেছেনও অনেক স্বপ্ন। দেখে যেতে চান মানবতার জয় আর মনুষ্যত্বের বিজয়। এখন কবির গোপন মনে জন্ম নিচ্ছে দিকচক্রবাল ভালোবাসা। হতাশার জায়গা আজ বাস্তবতার চরাচরে ভীড় জমেছে। কবির চোখে আজ শুধু স্বপ্ন হাসির ঝিলিক। তিনি নতুন চোখে পৃথিবীকে দেখতে চান। সাজাতে চান পৃথিবীকে নতুন সাজে।
জয়ের রাজ্যে, জয়ী বেশে,
মুখে জয়ের নতুন গান,
পুন্য ভূমে, সবুজ শ্যামল,
ভরছে গোলায় শষ্য-ধান।
(অগ্নিপুরুষ)
হাল ধরেছে শক্ত হাতে / ঢেউয়ের সাথে গভীর রাতে
মাঝ নদীতে ঢেউ,
অভয় বাণী শোনায় যেতে / আশার বাণী বুকে পেতে
আছে সাথে কেউ।
(রক্তগঙ্গা)
অনেকেই মনে করি – অন্তমিলে দোলে দোলে পড়তে পারাটাই বুঝি ছন্দ। আসলে তা নয়; গদ্য কবিতা কিংবা পয়ার ছন্দের কবিতা যা-ই লিখি না কেন, সব ক্ষেত্রেই ছন্দ থাকলে কবিতাটি বেশি শ্রুতিমধুর ও চিত্তকর্ষক লাগে। বিধি-বিধানের ছন্দ যদি না-ও মানি কবিতার অন্তস্থিত তানটি যেন গানের তানের মতই একটা অভ্যন্তরীন সুরের মূর্ছনা জাগায় অন্ত-সলিলা স্রোতের মত। কবি সুবীর কাস্মীর পেরেরার কবিতা অন্তমিলে ছন্দময় ও শ্রুতিমধুর ।
কবিতার সমালোচক কবিতা এবং পাঠকের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে জানতে চান কবিতা-প্রসাধনী কতটা সার্থক; কিন্তু সকলের উপলব্ধি, বিচার-বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা সঠিক হয় না ; কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেউ কেউ ব্যর্থ হন। আমরাও বুঝি যে, কবিতা যার অন্তরে যেরূপে প্রতিফলিত হয়, সেইরূপ সৌন্দর্য বা প্রভাব ছড়ায়; তিনি সমালোচক কিংবা পাঠক যে-ই হোন। সকলের অনুভূতি এবং বিচার-বিশ্লেষণী একরকম না । কবি সুবীর কাস্মির পেরেরার কবিতা ও নির্মাণ শৈলী সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় । “কবি অপরাপর মানুষের চেয়ে অধিকতর সুন্দর বোধযুক্ত। বিশেষ একজন ব্যক্তি যার শক্তিশালী আবেগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাপিয়ে উঠে অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বাধ্য-” এ কথাগুলো কিন্তু আমার নয়। এ কথাগুলো ওয়ার্ডস ওয়ার্থের। কবিকে কোন গোণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখা যায় না। কবি অবিনশ্বর। কোন কিছু দিয়ে কবিকে ধ্বংস করা যায় না। কবিদের সীমা অসীম, কবি শৃঙ্খলমুক্ত, মুক্ত ডাহুক, রাতে জ্বলা জোনাকী; বেলেজোছনার রাত আবার রাতজাগা নিশাচর প্রাণী।
পৃথিবীতে বহু ভাষা আর তাদের বহু রূপ। কিন্তু বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বড় প্রকট। যে ভাষায় লেখা হয় দুই দেশের জাতীয় সংগীত, যে ভাষায় গাওয়া হয় বন্দেমাতরম - এর মত স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্র, সেই ভাষার অস্তিত্ব হরণ করে কার সাধ্য? সমস্ত বিপন্নতার মাঝখানেও আমরা কি পারিনা বাংলা সাহিত্য, কবিতা এবং ভাষার নির্যাসটুকু ধরে রাখতে? সব পাঠক কুলের উচিত বাংলা কবিতা পড়া এবং আপন চিন্তায় তা বিশ্লেষণ করা। বাংলা কবিতার অত্যাবশ্যক পট পরিবর্তন দেখতে হলে চোখ রাখতে হয় অন্তরের আয়নায়। সেখানে কেউ যেন প্রতিধ্বনি করে বলে, - বাংলা কবিতাকে আরো ভালোবাসো, যতটা পারো ভালোবাসো এবং ভালোবাসতে শেখাও। তবেই সব পাবে।
জয়তু বাংলা ভাষা।
জয়তু বাংলা কবিতা।
মৃদুল রহমান
কবি, সম্পাদক ও প্রকাশক
স্বদেশ শৈলী
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন