https://www.prothomalony.com/
12162
literature
দুর্বল
খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন
কাওরান বাজার থেকে রিকশা নিলাম। প্রথমে টিপটিপ বৃষ্টি। তারপর তেছরা ছুরির ফলার মতো। বাপস! প্লাস্টিকে মানে না।
-ও ভাই রিকশাঅলা। দেইখা চালাইও।
ডানে বায়ে মিনিবাস প্রাইভেটকার টেম্পুগুলো বেক্কলের মতো পানি ছিটিয়ে সা সা ক'রে চ'লে যাচ্ছে। হুডের ফাঁকফোকর দিয়ে পানির ফোটারা যে যেমন পারছে ইচ্ছেমত ভিতরে ঢুকে পড়ছে। ডানে বায়ে একটু ন'ড়ে চ'ড়ে বসার এতটুকু জো নেই। ভাগ্যিস রিকশাঅলার কাছে মাঝারি সাইজের পলিথিনটা ছিল। এমন বৃষ্টি অনেকদিন হয়নি। যা গরম পড়েছিলো বাবা! হার্টফেল করার মত অবস্থা! চটের ব্যাগের ভিতরে নুন আটা ডাল শাক-সব্জি যাবতীয় লেপটে আছে। ঠিক এমন প্রতিকূলতার মধ্যেই ভেতরের চঞ্চল মনটা দোলা দিয়ে ওঠে, 'এমন দিনে তারে বলা যায়...!' ভেতর থেকে সদ্য কেনা অসহায় মুরগীটা দুর্বল গলায় কোঁকিয়ে ওঠে। যাহ্ শা ...! দম আটকে না মরলেই হয়। বাজারে মুরগীর যা দাম! শুনলেই পিলে চমকে ওঠে। সেই কবে মুরগী দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম! মনেই নেই। শ্বশুরবাড়ি গেলেও এখন আর মুরগীর রান কপালে জোটে না। গিন্নী আবার পোয়াতি। তাঁকে না হয়, না ই খাওয়ালাম। কিন্তু মাসুম বাচ্চাদের তো লাগে। তাই মুরগী। ও মুরগী! আর একটু ধৈর্য্য ধর ভাই!
মুরগীটা মনে হয় খুবই দুর্বল। কিংবা চুনাপায়খানা ক'রে ক'রে অতিশয় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন চটের ব্যাগের ভিতরে ঘাপটি মেরে ঝিমুচ্ছে।
সামনে রিকশাঅলার শুষ্কং-কাষ্ঠং প্রবীণ দেহটি প্যাডেলের উপর ভর দিয়ে ওঠানামা করছে। ভিজে এখন জবজবে। সহজাত প্রবৃত্তির তাড়নায়, তাকে দেখে সাংঘাতিক মায়া হল!
-ও ভাই রিক্সাঅলা। বাড়ি কোথায়? বরিশাল?
-না সা'ব। ধামরাই। সাভারের ধামরাই।
-বউ পোলাপান?
-বউ নাই। পোলাপান আছে। চাইড্ডা।
খুবই ব্যক্তিগত আলাপ। বললাম, আমার দু'জন। বউ আছে। আবার পোয়াতি ...।
প্রচন্ড পানির ছোপ। সবদিক থেকেই। ভিজেই যাচ্ছি। রিকশাঅলার মুখে রা নেই।
-শুনেছেন?
-হোনতাছি। কইয়া যান।
-আমার বউ আছে। পোয়াতি। আবার বাচ্চা হইব। আচ্ছা আপনি মাথায় একটা গামছা পেঁচিয়েছেন খামোকাই। ওটাতো ভিজে ঢোল হয়ে আছে। ক্ষতি করবে তো। বুঝেছেন? ঠাণ্ডা লাগবে। জ্বর হবে।
দেখে মায়া হল। ইচ্ছে হল আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আলাপ করি।
বাসার কাছে এসে রিকশা থামল। চটের ব্যাগটা নামাতে বেশ কষ্ট অনুভব করলাম। বাপস! ওজন তো কম না!
-একটু হেল্প করেন তো ভাই।
রিকশাঅলা একটানে ব্যাগটা সিঁড়ির গোঁড়ায় নামিয়ে দিল। পকেট থেকে টাকা বের করলাম। সর্বসাকুল্যে নির্ধারিত ভাড়ার ভাংতি মিলে গেল। মনে মনে ভাবলাম, ভালোই হল। তা না হলে, রিকশাঅলা তো। মুখ বাঁকা করে অনুনয়ের সুরে বলবে, সা'ব ভাংতি নাই।
সে দাঁড়িয়ে। টস টস করে বৃষ্টির পানি মাথা থেকে চোখ, মুখ, বুক বেয়ে নিচের দিকে গড়াচ্ছে। মোটা গোঁফের আগায় বৃষ্টির ফোঁটা জ'মে চিকচিক করছে।
-সা'ব। আর দুইডা টেকা ধইরা দেন।
বিকৃত হাসি তার মুখজোড়া। করুণার চাহনি। দেখে তেমন ভালো লাগলো না। মায়া মায়া ভাবটা মন থেকে ততক্ষণে কোথায় উবে গেল আমার।
বজ্জাতের হাড়ি! একটু জমিয়ে আলাপ করলাম। আর সেই সুযোগে তারে আরও দুইডা টেকা দেন মেহেরবানি কইরা! শা...! বললাম, কই! রিকশা ভাড়া করার সময় তো বলনি যে, নামবার পরে দুইডা টেকা দইরা দিয়েন । যাও। ভাংতি নাই!
বাজারের ব্যাগটা হেচকা টানে তুলে সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালাম। উপরে চার তলায় উঠতে হবে। জিনিশটা বড্ড ভারি মনে হচ্ছে। পিছন দিকে তাকিয়ে দেখি, রিকশাঅলা কেটে পড়েছে ততক্ষণে। মনে হচ্ছে, সেই আমার চেয়ে খুব সহজে ব্যাগটা সিঁড়ির গোঁড়ায় নামিয়ে দিয়েছিল। আরও দুটো টাকা ধরিয়ে দিয়ে চারতলায় উঠিয়ে দাও বললেই হতো! সেও খুশি হয়ে কাজটা ক'রে দিতো!
আমি কি ওর চেয়ে বেশি দুর্বল নই? রিকশাঅলাকে দুটো টাকা বেশি ধরিয়ে দিতে পারলাম না। টাকাটা পেলে বেচারা একটা পলিথিন কিনতে সাহস করতো। অন্ততঃ নিজের মাথাটা বাঁচাবার জন্য। আমার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী আমার চে' বেশি দুর্বল এখন। ও আর একটি সন্তানের জন্ম দেবে। এখন ওর পুষ্টিকর খাবার অনেক দরকার। আরও মুরগী খাওয়ানো জরুরী। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে হলো, বাজারের ব্যাগটা ক্রমশঃ ভারি হয়ে আসছে। ব্যাগের মধ্যে গলা বের আছে মুরগিটার। দুর্বল মুরগিটা এতক্ষণে বেঁচে আছে তো?
তুষার ফুল
পলি শাহীনা
বাইরে প্রবল তুষার ঝড় বইছে। বাতাসের তীব্র শোঁ শোঁ শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। শীতটা এবার বেশ জেঁকে বসেছে। আপাদমস্তক ভারি কম্বলে মুড়িয়ে ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকি। ঘুম আর আসে না। মোল্লার দৌড় যেমন মসজিদ পর্যন্ত, তেমনি আমার মতো খোপবন্দী মানুষের দৌড় এই সময়টায় হাতের মোবাইল ফোন পর্যন্ত। আদতে, এই গৃহবন্দী জীবনে অন্য কোনো উপায়ও তো নেই। রাত প্রায় শেষের দিকে। কার্নিশে জোড়া চড়ুই খুনসুটি করছে। ওদের খুনসুটি দেখে পাশ হতে কবুতরও বাক বাকুম বাক, ডেকে উঠে। বোধ করি, পাখিদের আনন্দ আমার মস্তিষ্কে দোল খেয়ে অক্সিটোসিন উৎপন্ন করে। পদ্মানদীর মাঝি-র কপিলার মতো ওদের ডেকে বলি, আমারে নিবি তোদের লগে! কুবের যেমন ময়নাদ্বীপে কপিলাকে নেয় নি, ওরাও আমাকে নেয় না! থলথলে কম্বলের বুকের ওমে লেপ্টে থাকা জড়োসড়ো আমি মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকে দেখি নিউজফিড ডুবে আছে হলুদ-বাসন্তী রঙে। দিনপঞ্জিকা না দেখেও বুঝলাম আজ পহেলা ফাল্গুন, ঋতুরাজ বসন্ত এসে গেছে। নিউজফিড স্ক্রল করে বন্ধুদের একের পর এক ছবি দেখছি, ছবির গল্প পড়ছি, আর বুকের গহীনে একটা অদ্ভুত শূন্যতা বোধ করছি। এমন দিনে কীসের তরে যে এভাবে প্রাণ পুড়ছে, কী জানি।
বরফের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়লেও বাইরের পৃথিবী ততক্ষণে ফর্সা হয়ে গেছে। ভোরের অমল আলো জানালার শার্সি ঠেলে ঘরে আসে। 'বসন্ত এসে গেছে' লগ্নজিতার কন্ঠে প্রিয় গানটি বারবার শুনছি আর ভাবছি, এই ইট কাঠের শহরে বসন্ত আসবে কবে! এই গানটি যখন শুনি তখন আমার কোনো কাজ কিংবা অকাজ কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। ধোঁয়া ওড়া কফি হাতে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। বাতাসের শরীরজুড়ে কোনো এক চেনা ঘ্রাণ, চেনা দৃশ্য আমায় তাড়িত করছে। মায়ের হাতের তেলের পিঠার সুঘ্রাণ বাতাসের শরীর সাঁতরে এসে আমাকে জাপ্টে ধরেছে। স্বর্গীয় একটা সুখানুভব আমাকে ডেকে নিয়ে যায় দিগন্তের দিকে। অবিরত তুষার ফুল ঝরছে। জানালার বাইরে দু'হাত বাড়িয়ে নীরবে তুষার ফুলদের আদরে আদরে ছুঁয়ে দিই। তুষার ফুলও আমাকে ছুঁয়ে যায় সোহাগে। তুষার ফুল আর আমি, আমরা একে অন্যের দিকে অপলক চেয়ে থাকি। মুহূর্তেই থইহারা হয়ে পড়ি। আমার চোখে তখন কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ার আলো খেলছে। তুষারের রসালো স্পর্শে চিত্তচঞ্চল হয়ে ওঠে। অন্যরকম একটা ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে থাকি।
ঠান্ডা হাওয়া জোরেসোরে ঘাই মারতে বুকের ভেতর শিস দেয়া পাখিটার ডাক থেমে যায়। বরফাচ্ছাদিত এ শহরে কোকিল ডাকে নি, ফুল ফোটে নি, আমের মুকুলও আসে নি। তুষারের ফাঁদে আটকে পড়া এই শহরে বসন্তের তাল- ছন্দ, কিছুই নেই। মনের জানালা খুলে আনমনে তুষার ফুলে প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে মুগ্ধতায় ডুবে আমি বসন্ত উদযাপন করি। জীবন যখন যেমন, না পাওয়া সমস্ত হাহাকার ভুলে হন্যে হয়ে আমি আনন্দের উৎস খুঁজি। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে চোখ বুঁজে দক্ষিণা উদাস হাওয়ায় ভেসে ভেসে সর্ষে ক্ষেতের আইল ধরে আমি চলে যাই, ছোটবেলার খেলার সাথী সুবর্ণাদের আম বাগানে। উবু হয়ে আমের মুকুলের মৌ মৌ সৌরভ নিই দুই সখি প্রাণভরে। গলা ছেড়ে একসঙ্গে দুই সই গাইতে থাকি, '...ও মা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে...।'
নাটকের প্রাণপুরুষ নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন
জি.বি.এম রুবেল আহম্মেদ
২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন বাংলা নাটকের প্রাণপুরুষ ড. সেলিম আল দীন। রেখে যান তার যত অবিনশ্বর সৃষ্টিসম্ভার। ঔপনিবেশিক সাহিত্যধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলা নাটককে আবহমান বাংলার গতিধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। বাংলা নাটকে বিষয়, আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে গবেষণা করে নাটকে তার নিজস্ব প্রতিফলন তুলে ধরেন তিনি। স্বাধীনতাত্তর বাংলা নাটকের আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অন্যতম। তিনি সর্বদা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শিকড় সন্ধানে মগ্ন ছিলেন।
এই প্রাণপুরুষ ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট সীমান্তবর্তী ফেনী জেলার অন্তর্গত সমুদ্রবর্তী সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিলে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ও মাতা ফিরোজা খাতুন। বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান ছিলেন সেলিম আল দীন। তিনি ১৯৬৪ সালে এসএসসি ও ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যয়ন শুরু করেন। স্নাতক শেষ করে সেখান থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেন। ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর থেকে সৃজনশীল ভাবনায় শুরু করেন ভিন্নমাত্রিক রচনা সম্ভার। একইসাথে বাংলা নাটক নিয়ে একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির জন্য কাজ শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তার উদ্যোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ খোলা হয়।
ছোটবেলা থেকেই তার লেখালেখির হাতেখড়ি। বাল্যকালের স্বপ্ন ছিল কবি হওয়ার। বেশ কিছু কবিতা লেখার পর মুনির চৌধুরীর সান্নিধ্যে নাটক চর্চা ও নাট্যকারদের জীবন নিয়ে গবেষনা শুরু করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়ন সময়ে প্রথম নাটক লেখা শুরু করেন। সর্বপ্রথম তার লেখা দৈনিক পাকিস্তান (অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা) পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রথম প্রবন্ধ 'নিগ্রো সাহিত্য' প্রকাশিত হয়।
সেলিম আল দীনের লেখা নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— 'চাকা', 'জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন', 'মুনতাসির ফ্যান্টাসি', 'শকুন্তলা', 'কীত্তনখোলা', 'কেরামতমঙ্গল', 'মহুয়া', 'দেওয়ানা মদিনা', 'নিমজ্জন', 'পুত্র', 'হরগজ', 'বনপাংশুল', 'প্রাচ্য', 'ধাবমান', 'যৈবতী কন্যার মন', 'হরগজ', 'হাতহদাই'। ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে তার গবেষনাধর্মী নির্দেশনা দু'টি — 'মহুয়া' এ 'দেওয়ানা মদিনা'। তার রচিত জনপ্রিয় দু'টি নাটক— 'চাকা' ও 'কীত্তনখোলা' অবলম্বনে দেশ এবং বিদেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এছাড়াও 'রক্তের আঙুরলতা', 'অশ্রুত গান্ধার', 'গ্রন্থিকগণ কহে', 'ভাঙনের শব্দ শুনি', 'অনৃত রাত্রি', 'ছায়াশিকারী', 'রঙের মানুষ', 'নকশীপাড়ের মানুষেরা', 'প্রত্ননারী', 'হীরাফুল' প্রভৃতি অসংখ্য জনপ্রিয় টেলিভিশন নাটকের রচয়িতা সেলিম আল দীন। তার রচিত বহু নাটক দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে মঞ্চায়িত হয়ে থাকে।
বাঙালি জাতিসত্তার নাট্যচেতনার শেকড় অনুসন্ধান করতে গিয়েই নাট্যকার, নাট্যগবেষক এবং নাটকের অধ্যাপক সেলিম আল দীন আমৃত্যু বাংলা নাটকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করেন। মাত্র ঊনষাট বছরের জীবনেই তিনি বাংলা নাটকের নিজস্বতা আবিষ্কার করেন এবং তা ইউরোপীয় নাট্যাঙ্গিকের সঙ্গে মিশিয়ে অভিনব বাংলা নাট্যনিরীক্ষা করেন। মানবজীবনে নাট্য রচনা ও গবেষনা নিয়ে অর্জন করেছেন অনেক খ্যাতি ও পদক। তারমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য পদক হলো— ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ২০০৭ সালে একুশে পদক। তার বিখ্যাত নাটক 'চাকা'র চলচ্চিত্ররূপ আন্তর্জাতিকভাবে একাধিক পুরস্কার পেয়েছে। দেশের বাইরেও তার রচিত নাটক 'হরগজ' সুইডিশ ভাষায় অনূদিত এবং ভারতের নাট্যদল রঙ্গকর্মী কর্তৃক হিন্দি ভাষায় মঞ্চস্থ হয়েছে। বেঁচে থাকাকালীন তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্যও ছিলেন। তার রচিত নাটক ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যে জায়গা পেয়েছে।
আখ্যান বা বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিতে লেখা উপাখ্যানগুলোয় তিনি কাব্য, উপন্যাস, চিত্রকর্ম প্রভৃতি শিল্পধারা এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় তুলে ধরেছেন বাংলা সাহিত্যে। মধ্যযুগের বাংলা নাট্যরীতি নিয়ে গবেষনা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। আধুনিক বাংলা নাটককে তিনি এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। নতুন নাট্যধারায় নাট্যকর্মীদের একত্রিত করার জন্য তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, গ্রাম সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিচরণ করেছেন। বিভিন্ন পেশাজীবিদের নিয়ে থিয়েটার আন্দোলনের ডাক দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি এ দেশের নাট্যশিল্পকে বিশ্ব নাট্যধারার সঙ্গে তালমিলিয়ে ১৯৮১-৮২ সালে দেশব্যাপী গড়ে তোলেন 'বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার'। তার সহচর হিসেবে পাশে থাকেন একঝাঁক নাট্যযোদ্ধা। গ্রাম থিয়েটার গড়ে তোলার আগে তিনি ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত করেন। তার নাট্য জগতে চলার পথে বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে কাছে পান নাট্যনির্দেশক ও অভিনেতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুকে। একসাথে গড়ে তুলেছেন থিয়েটার আন্দেলন। মহান মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত হয়ে থিয়েটার ভাবনা প্রান্তিক অঞ্চলে পৌঁছে দেন। ধীরেধীরে বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় গড়ে উঠে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের বন্ধু সংগঠন বিভিন্ন থিয়েটার। তার লালিত স্বপ্ন ছিল দেশের এসব থিয়েটার ভাবনা। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক অ্যাথনিক থিয়েটারেরও তিনি উদ্ভাবন করেন। তিনি এক নবতর শিল্পরীতি প্রবর্তন করেন, যার নাম 'দ্বৈতাদ্বৈতরীতি শিল্পতত্ত্ব'। বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিতে লেখা তার নাটকগুলোতে নিচুতলার মানুষের সামাজিক নৃতাত্ত্বিক পটে তাদের বহুস্তরিক বাস্তবতা ও ভাবনাগুলো উঠে আসে।
রবীন্দ্রোত্তরকালের বাংলা নাটকের প্রাণপুরুষ সেলিম আল দীন বাঙালির কাছে এক অবিস্মৃত নামে পরিচিত হয়ে উঠেন। তার সৃষ্টিশীলতার কিরণচ্ছটা ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে পুরো ইউরোপ মহাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। শেক্সপিয়র, গ্যয়থে, ইবসেন, বার্নাড'শ, তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য প্রতিভার কাতারে সেলিম আল দীনও হয়ে উঠেন এক অভিযাত্রিক। শেকড় সন্ধানী বাংলা নাটক ও মঞ্চ নিয়ে নিয়ে তিনি আমৃত্যু নিজেকে বিলিয়ে গেছেন। তাইতো বাংলা নাটকের দর্শক ও পাঠককে তিনি সৃষ্টি করেছেন নতুন আঙ্গিকে।
যতদিন বাংলায় মঞ্চ থাকবে, ততদিন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনকে মানুষ স্মরণে রাখবে। তিনি বাংলা নাট্যজগতের গৌড়জন ও প্রবর্তক। নাটকজগৎ, থিয়েটারকর্মী ও দর্শকদের হৃদয়ে আজও জায়গা করে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন ড.সেলিম আল দীন।
কাওরান বাজার থেকে রিকশা নিলাম। প্রথমে টিপটিপ বৃষ্টি। তারপর তেছরা ছুরির ফলার মতো। বাপস! প্লাস্টিকে মানে না।
-ও ভাই রিকশাঅলা। দেইখা চালাইও।
ডানে বায়ে মিনিবাস প্রাইভেটকার টেম্পুগুলো বেক্কলের মতো পানি ছিটিয়ে সা সা ক'রে চ'লে যাচ্ছে। হুডের ফাঁকফোকর দিয়ে পানির ফোটারা যে যেমন পারছে ইচ্ছেমত ভিতরে ঢুকে পড়ছে। ডানে বায়ে একটু ন'ড়ে চ'ড়ে বসার এতটুকু জো নেই। ভাগ্যিস রিকশাঅলার কাছে মাঝারি সাইজের পলিথিনটা ছিল। এমন বৃষ্টি অনেকদিন হয়নি। যা গরম পড়েছিলো বাবা! হার্টফেল করার মত অবস্থা! চটের ব্যাগের ভিতরে নুন আটা ডাল শাক-সব্জি যাবতীয় লেপটে আছে। ঠিক এমন প্রতিকূলতার মধ্যেই ভেতরের চঞ্চল মনটা দোলা দিয়ে ওঠে, 'এমন দিনে তারে বলা যায়...!' ভেতর থেকে সদ্য কেনা অসহায় মুরগীটা দুর্বল গলায় কোঁকিয়ে ওঠে। যাহ্ শা ...! দম আটকে না মরলেই হয়। বাজারে মুরগীর যা দাম! শুনলেই পিলে চমকে ওঠে। সেই কবে মুরগী দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম! মনেই নেই। শ্বশুরবাড়ি গেলেও এখন আর মুরগীর রান কপালে জোটে না। গিন্নী আবার পোয়াতি। তাঁকে না হয়, না ই খাওয়ালাম। কিন্তু মাসুম বাচ্চাদের তো লাগে। তাই মুরগী। ও মুরগী! আর একটু ধৈর্য্য ধর ভাই!
মুরগীটা মনে হয় খুবই দুর্বল। কিংবা চুনাপায়খানা ক'রে ক'রে অতিশয় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন চটের ব্যাগের ভিতরে ঘাপটি মেরে ঝিমুচ্ছে।
সামনে রিকশাঅলার শুষ্কং-কাষ্ঠং প্রবীণ দেহটি প্যাডেলের উপর ভর দিয়ে ওঠানামা করছে। ভিজে এখন জবজবে। সহজাত প্রবৃত্তির তাড়নায়, তাকে দেখে সাংঘাতিক মায়া হল!
-ও ভাই রিক্সাঅলা। বাড়ি কোথায়? বরিশাল?
-না সা'ব। ধামরাই। সাভারের ধামরাই।
-বউ পোলাপান?
-বউ নাই। পোলাপান আছে। চাইড্ডা।
খুবই ব্যক্তিগত আলাপ। বললাম, আমার দু'জন। বউ আছে। আবার পোয়াতি ...।
প্রচন্ড পানির ছোপ। সবদিক থেকেই। ভিজেই যাচ্ছি। রিকশাঅলার মুখে রা নেই।
-শুনেছেন?
-হোনতাছি। কইয়া যান।
-আমার বউ আছে। পোয়াতি। আবার বাচ্চা হইব। আচ্ছা আপনি মাথায় একটা গামছা পেঁচিয়েছেন খামোকাই। ওটাতো ভিজে ঢোল হয়ে আছে। ক্ষতি করবে তো। বুঝেছেন? ঠাণ্ডা লাগবে। জ্বর হবে।
দেখে মায়া হল। ইচ্ছে হল আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আলাপ করি।
বাসার কাছে এসে রিকশা থামল। চটের ব্যাগটা নামাতে বেশ কষ্ট অনুভব করলাম। বাপস! ওজন তো কম না!
-একটু হেল্প করেন তো ভাই।
রিকশাঅলা একটানে ব্যাগটা সিঁড়ির গোঁড়ায় নামিয়ে দিল। পকেট থেকে টাকা বের করলাম। সর্বসাকুল্যে নির্ধারিত ভাড়ার ভাংতি মিলে গেল। মনে মনে ভাবলাম, ভালোই হল। তা না হলে, রিকশাঅলা তো। মুখ বাঁকা করে অনুনয়ের সুরে বলবে, সা'ব ভাংতি নাই।
সে দাঁড়িয়ে। টস টস করে বৃষ্টির পানি মাথা থেকে চোখ, মুখ, বুক বেয়ে নিচের দিকে গড়াচ্ছে। মোটা গোঁফের আগায় বৃষ্টির ফোঁটা জ'মে চিকচিক করছে।
-সা'ব। আর দুইডা টেকা ধইরা দেন।
বিকৃত হাসি তার মুখজোড়া। করুণার চাহনি। দেখে তেমন ভালো লাগলো না। মায়া মায়া ভাবটা মন থেকে ততক্ষণে কোথায় উবে গেল আমার।
বজ্জাতের হাড়ি! একটু জমিয়ে আলাপ করলাম। আর সেই সুযোগে তারে আরও দুইডা টেকা দেন মেহেরবানি কইরা! শা...! বললাম, কই! রিকশা ভাড়া করার সময় তো বলনি যে, নামবার পরে দুইডা টেকা দইরা দিয়েন । যাও। ভাংতি নাই!
বাজারের ব্যাগটা হেচকা টানে তুলে সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালাম। উপরে চার তলায় উঠতে হবে। জিনিশটা বড্ড ভারি মনে হচ্ছে। পিছন দিকে তাকিয়ে দেখি, রিকশাঅলা কেটে পড়েছে ততক্ষণে। মনে হচ্ছে, সেই আমার চেয়ে খুব সহজে ব্যাগটা সিঁড়ির গোঁড়ায় নামিয়ে দিয়েছিল। আরও দুটো টাকা ধরিয়ে দিয়ে চারতলায় উঠিয়ে দাও বললেই হতো! সেও খুশি হয়ে কাজটা ক'রে দিতো!
আমি কি ওর চেয়ে বেশি দুর্বল নই? রিকশাঅলাকে দুটো টাকা বেশি ধরিয়ে দিতে পারলাম না। টাকাটা পেলে বেচারা একটা পলিথিন কিনতে সাহস করতো। অন্ততঃ নিজের মাথাটা বাঁচাবার জন্য। আমার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী আমার চে' বেশি দুর্বল এখন। ও আর একটি সন্তানের জন্ম দেবে। এখন ওর পুষ্টিকর খাবার অনেক দরকার। আরও মুরগী খাওয়ানো জরুরী। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে হলো, বাজারের ব্যাগটা ক্রমশঃ ভারি হয়ে আসছে। ব্যাগের মধ্যে গলা বের আছে মুরগিটার। দুর্বল মুরগিটা এতক্ষণে বেঁচে আছে তো?
তুষার ফুল
পলি শাহীনা
বাইরে প্রবল তুষার ঝড় বইছে। বাতাসের তীব্র শোঁ শোঁ শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। শীতটা এবার বেশ জেঁকে বসেছে। আপাদমস্তক ভারি কম্বলে মুড়িয়ে ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকি। ঘুম আর আসে না। মোল্লার দৌড় যেমন মসজিদ পর্যন্ত, তেমনি আমার মতো খোপবন্দী মানুষের দৌড় এই সময়টায় হাতের মোবাইল ফোন পর্যন্ত। আদতে, এই গৃহবন্দী জীবনে অন্য কোনো উপায়ও তো নেই। রাত প্রায় শেষের দিকে। কার্নিশে জোড়া চড়ুই খুনসুটি করছে। ওদের খুনসুটি দেখে পাশ হতে কবুতরও বাক বাকুম বাক, ডেকে উঠে। বোধ করি, পাখিদের আনন্দ আমার মস্তিষ্কে দোল খেয়ে অক্সিটোসিন উৎপন্ন করে। পদ্মানদীর মাঝি-র কপিলার মতো ওদের ডেকে বলি, আমারে নিবি তোদের লগে! কুবের যেমন ময়নাদ্বীপে কপিলাকে নেয় নি, ওরাও আমাকে নেয় না! থলথলে কম্বলের বুকের ওমে লেপ্টে থাকা জড়োসড়ো আমি মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকে দেখি নিউজফিড ডুবে আছে হলুদ-বাসন্তী রঙে। দিনপঞ্জিকা না দেখেও বুঝলাম আজ পহেলা ফাল্গুন, ঋতুরাজ বসন্ত এসে গেছে। নিউজফিড স্ক্রল করে বন্ধুদের একের পর এক ছবি দেখছি, ছবির গল্প পড়ছি, আর বুকের গহীনে একটা অদ্ভুত শূন্যতা বোধ করছি। এমন দিনে কীসের তরে যে এভাবে প্রাণ পুড়ছে, কী জানি।
বরফের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়লেও বাইরের পৃথিবী ততক্ষণে ফর্সা হয়ে গেছে। ভোরের অমল আলো জানালার শার্সি ঠেলে ঘরে আসে। 'বসন্ত এসে গেছে' লগ্নজিতার কন্ঠে প্রিয় গানটি বারবার শুনছি আর ভাবছি, এই ইট কাঠের শহরে বসন্ত আসবে কবে! এই গানটি যখন শুনি তখন আমার কোনো কাজ কিংবা অকাজ কিছুই করতে ইচ্ছে করে না। ধোঁয়া ওড়া কফি হাতে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। বাতাসের শরীরজুড়ে কোনো এক চেনা ঘ্রাণ, চেনা দৃশ্য আমায় তাড়িত করছে। মায়ের হাতের তেলের পিঠার সুঘ্রাণ বাতাসের শরীর সাঁতরে এসে আমাকে জাপ্টে ধরেছে। স্বর্গীয় একটা সুখানুভব আমাকে ডেকে নিয়ে যায় দিগন্তের দিকে। অবিরত তুষার ফুল ঝরছে। জানালার বাইরে দু'হাত বাড়িয়ে নীরবে তুষার ফুলদের আদরে আদরে ছুঁয়ে দিই। তুষার ফুলও আমাকে ছুঁয়ে যায় সোহাগে। তুষার ফুল আর আমি, আমরা একে অন্যের দিকে অপলক চেয়ে থাকি। মুহূর্তেই থইহারা হয়ে পড়ি। আমার চোখে তখন কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ার আলো খেলছে। তুষারের রসালো স্পর্শে চিত্তচঞ্চল হয়ে ওঠে। অন্যরকম একটা ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে থাকি।
ঠান্ডা হাওয়া জোরেসোরে ঘাই মারতে বুকের ভেতর শিস দেয়া পাখিটার ডাক থেমে যায়। বরফাচ্ছাদিত এ শহরে কোকিল ডাকে নি, ফুল ফোটে নি, আমের মুকুলও আসে নি। তুষারের ফাঁদে আটকে পড়া এই শহরে বসন্তের তাল- ছন্দ, কিছুই নেই। মনের জানালা খুলে আনমনে তুষার ফুলে প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে মুগ্ধতায় ডুবে আমি বসন্ত উদযাপন করি। জীবন যখন যেমন, না পাওয়া সমস্ত হাহাকার ভুলে হন্যে হয়ে আমি আনন্দের উৎস খুঁজি। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে চোখ বুঁজে দক্ষিণা উদাস হাওয়ায় ভেসে ভেসে সর্ষে ক্ষেতের আইল ধরে আমি চলে যাই, ছোটবেলার খেলার সাথী সুবর্ণাদের আম বাগানে। উবু হয়ে আমের মুকুলের মৌ মৌ সৌরভ নিই দুই সখি প্রাণভরে। গলা ছেড়ে একসঙ্গে দুই সই গাইতে থাকি, '...ও মা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে...।'
নাটকের প্রাণপুরুষ নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন
জি.বি.এম রুবেল আহম্মেদ
২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন বাংলা নাটকের প্রাণপুরুষ ড. সেলিম আল দীন। রেখে যান তার যত অবিনশ্বর সৃষ্টিসম্ভার। ঔপনিবেশিক সাহিত্যধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলা নাটককে আবহমান বাংলার গতিধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। বাংলা নাটকে বিষয়, আঙ্গিক ও ভাষা নিয়ে গবেষণা করে নাটকে তার নিজস্ব প্রতিফলন তুলে ধরেন তিনি। স্বাধীনতাত্তর বাংলা নাটকের আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অন্যতম। তিনি সর্বদা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শিকড় সন্ধানে মগ্ন ছিলেন।
এই প্রাণপুরুষ ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট সীমান্তবর্তী ফেনী জেলার অন্তর্গত সমুদ্রবর্তী সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিলে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ও মাতা ফিরোজা খাতুন। বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান ছিলেন সেলিম আল দীন। তিনি ১৯৬৪ সালে এসএসসি ও ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যয়ন শুরু করেন। স্নাতক শেষ করে সেখান থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেন। ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর থেকে সৃজনশীল ভাবনায় শুরু করেন ভিন্নমাত্রিক রচনা সম্ভার। একইসাথে বাংলা নাটক নিয়ে একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির জন্য কাজ শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তার উদ্যোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ খোলা হয়।
ছোটবেলা থেকেই তার লেখালেখির হাতেখড়ি। বাল্যকালের স্বপ্ন ছিল কবি হওয়ার। বেশ কিছু কবিতা লেখার পর মুনির চৌধুরীর সান্নিধ্যে নাটক চর্চা ও নাট্যকারদের জীবন নিয়ে গবেষনা শুরু করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যয়ন সময়ে প্রথম নাটক লেখা শুরু করেন। সর্বপ্রথম তার লেখা দৈনিক পাকিস্তান (অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলা) পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীতে প্রথম প্রবন্ধ 'নিগ্রো সাহিত্য' প্রকাশিত হয়।
সেলিম আল দীনের লেখা নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— 'চাকা', 'জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন', 'মুনতাসির ফ্যান্টাসি', 'শকুন্তলা', 'কীত্তনখোলা', 'কেরামতমঙ্গল', 'মহুয়া', 'দেওয়ানা মদিনা', 'নিমজ্জন', 'পুত্র', 'হরগজ', 'বনপাংশুল', 'প্রাচ্য', 'ধাবমান', 'যৈবতী কন্যার মন', 'হরগজ', 'হাতহদাই'। ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে তার গবেষনাধর্মী নির্দেশনা দু'টি — 'মহুয়া' এ 'দেওয়ানা মদিনা'। তার রচিত জনপ্রিয় দু'টি নাটক— 'চাকা' ও 'কীত্তনখোলা' অবলম্বনে দেশ এবং বিদেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এছাড়াও 'রক্তের আঙুরলতা', 'অশ্রুত গান্ধার', 'গ্রন্থিকগণ কহে', 'ভাঙনের শব্দ শুনি', 'অনৃত রাত্রি', 'ছায়াশিকারী', 'রঙের মানুষ', 'নকশীপাড়ের মানুষেরা', 'প্রত্ননারী', 'হীরাফুল' প্রভৃতি অসংখ্য জনপ্রিয় টেলিভিশন নাটকের রচয়িতা সেলিম আল দীন। তার রচিত বহু নাটক দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে মঞ্চায়িত হয়ে থাকে।
বাঙালি জাতিসত্তার নাট্যচেতনার শেকড় অনুসন্ধান করতে গিয়েই নাট্যকার, নাট্যগবেষক এবং নাটকের অধ্যাপক সেলিম আল দীন আমৃত্যু বাংলা নাটকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করেন। মাত্র ঊনষাট বছরের জীবনেই তিনি বাংলা নাটকের নিজস্বতা আবিষ্কার করেন এবং তা ইউরোপীয় নাট্যাঙ্গিকের সঙ্গে মিশিয়ে অভিনব বাংলা নাট্যনিরীক্ষা করেন। মানবজীবনে নাট্য রচনা ও গবেষনা নিয়ে অর্জন করেছেন অনেক খ্যাতি ও পদক। তারমধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য পদক হলো— ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ২০০৭ সালে একুশে পদক। তার বিখ্যাত নাটক 'চাকা'র চলচ্চিত্ররূপ আন্তর্জাতিকভাবে একাধিক পুরস্কার পেয়েছে। দেশের বাইরেও তার রচিত নাটক 'হরগজ' সুইডিশ ভাষায় অনূদিত এবং ভারতের নাট্যদল রঙ্গকর্মী কর্তৃক হিন্দি ভাষায় মঞ্চস্থ হয়েছে। বেঁচে থাকাকালীন তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্যও ছিলেন। তার রচিত নাটক ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যে জায়গা পেয়েছে।
আখ্যান বা বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিতে লেখা উপাখ্যানগুলোয় তিনি কাব্য, উপন্যাস, চিত্রকর্ম প্রভৃতি শিল্পধারা এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় তুলে ধরেছেন বাংলা সাহিত্যে। মধ্যযুগের বাংলা নাট্যরীতি নিয়ে গবেষনা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। আধুনিক বাংলা নাটককে তিনি এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। নতুন নাট্যধারায় নাট্যকর্মীদের একত্রিত করার জন্য তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, গ্রাম সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিচরণ করেছেন। বিভিন্ন পেশাজীবিদের নিয়ে থিয়েটার আন্দোলনের ডাক দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি এ দেশের নাট্যশিল্পকে বিশ্ব নাট্যধারার সঙ্গে তালমিলিয়ে ১৯৮১-৮২ সালে দেশব্যাপী গড়ে তোলেন 'বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার'। তার সহচর হিসেবে পাশে থাকেন একঝাঁক নাট্যযোদ্ধা। গ্রাম থিয়েটার গড়ে তোলার আগে তিনি ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত করেন। তার নাট্য জগতে চলার পথে বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে কাছে পান নাট্যনির্দেশক ও অভিনেতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুকে। একসাথে গড়ে তুলেছেন থিয়েটার আন্দেলন। মহান মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত হয়ে থিয়েটার ভাবনা প্রান্তিক অঞ্চলে পৌঁছে দেন। ধীরেধীরে বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় গড়ে উঠে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের বন্ধু সংগঠন বিভিন্ন থিয়েটার। তার লালিত স্বপ্ন ছিল দেশের এসব থিয়েটার ভাবনা। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক অ্যাথনিক থিয়েটারেরও তিনি উদ্ভাবন করেন। তিনি এক নবতর শিল্পরীতি প্রবর্তন করেন, যার নাম 'দ্বৈতাদ্বৈতরীতি শিল্পতত্ত্ব'। বর্ণনাত্মক নাট্যরীতিতে লেখা তার নাটকগুলোতে নিচুতলার মানুষের সামাজিক নৃতাত্ত্বিক পটে তাদের বহুস্তরিক বাস্তবতা ও ভাবনাগুলো উঠে আসে।
রবীন্দ্রোত্তরকালের বাংলা নাটকের প্রাণপুরুষ সেলিম আল দীন বাঙালির কাছে এক অবিস্মৃত নামে পরিচিত হয়ে উঠেন। তার সৃষ্টিশীলতার কিরণচ্ছটা ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে পুরো ইউরোপ মহাদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। শেক্সপিয়র, গ্যয়থে, ইবসেন, বার্নাড'শ, তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য প্রতিভার কাতারে সেলিম আল দীনও হয়ে উঠেন এক অভিযাত্রিক। শেকড় সন্ধানী বাংলা নাটক ও মঞ্চ নিয়ে নিয়ে তিনি আমৃত্যু নিজেকে বিলিয়ে গেছেন। তাইতো বাংলা নাটকের দর্শক ও পাঠককে তিনি সৃষ্টি করেছেন নতুন আঙ্গিকে।
যতদিন বাংলায় মঞ্চ থাকবে, ততদিন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনকে মানুষ স্মরণে রাখবে। তিনি বাংলা নাট্যজগতের গৌড়জন ও প্রবর্তক। নাটকজগৎ, থিয়েটারকর্মী ও দর্শকদের হৃদয়ে আজও জায়গা করে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন ড.সেলিম আল দীন।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন