https://www.prothomalony.com/

11447

foundation

ফাউন্ডেশন 

টক অফ দ্য উইক - অনুপ্রাণিত হয়েই চ্যালেঞ্জের সাথে রিয়েলটর হিসাবে কাজ করছি-শেলিনা উদ্দিন

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৪ ০১:১২

"২০০২ সাল থেকে আমি রিয়েলস্টেটে কাজ শুরু করেছি। এর পূর্বে কোথাও কাজের অভিজ্ঞতা ছিলনা। আমার স্বামী একজন রিয়েল্টর ছিলেন, সুতরাং বিষয়টা আমার অজানা ছিল না। ২০০০ সালে উনি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে আমি নিজেই রিয়েলস্টেটের সাথে জড়িত হই। তখনকার সময়ে বাঙ্গালি মেয়েরা তেমনভাবে রিয়েলস্টেটে কাজ করতো না। রিয়েলস্টেটে কাজ করার জন্যে কিছু ক্লাশ করতে হয়েছিল, পাশ করে লাইসেন্স পেলাম। সেঞ্চুরি ২১ কোম্পানির ফিউচার হোমে প্রথম কাজ শুরু করেছিলাম। এক বছরে মিলিয়ন ডলার প্রডিউসার এওয়ার্ড পেয়েছিলাম। ২০০৩ সালে অফিসে দেড়শ'র মতো এজেন্টের ভিতরে আমার নাম ছিল সবার উপরে, যা আমার কাছে অনেক গর্বের বিষয় ছিল। পরের বছর আমি এক্সিকিউটিভ ক্লাবে ঢুকে যাই। বাঙালি সমাজের অনেকে আড় চোখে দেখলেও আমি সেগুলো মাথায় নেই নাই"- নিজ পেশাগত জীবন সম্পর্কে এভাবেই তুলে ধরেন সেলিনা উদ্দিন। 

গত ৩০ অক্টোবর, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সম্প্রচার 'টক অব দ্যা উইক' এ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। সেলিনা উদ্দিন, একজন লেখক ও রিয়েলস্টেট সেলস কনসালটেন্ট, সেঞ্চুরি টুয়ানি ওয়ান, এশিয়া প্যাসিফিকের ফরেইন বায়ার রিপ্রেজেনটেটিভ। অনুষ্ঠানে তিনি রিয়েলস্টেট, বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন।  

অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন ফরিদা ইয়াসমীন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, 'বর্তমানে বাড়ি কেনায় নিউইয়র্ক, নিউজার্সি এবং বাফেলোর ইন্টারেস্ট রেট কত? রেসিডেনশিয়াল হাউজ এবং ইনভেস্টমেন্ট হাউজের ইন্টারেস্ট রেট কী একই নাকি আলাদা? উত্তরে সেলিনা উদ্দিন বলেন, "যে কোন প্রোপার্টির জন্য প্রোপার্টি ইন্টারেস্ট সমান, তবে ডাউনপেমেন্ট আলাদা। যারা প্রথমে বাড়ি কেনেন তাদেরকে মিনিমাম তিন পারসেন্ট দিতে হয়। কিন্তু সেকেন্ড প্রোপার্টি কেনার সময় সেটা হয়ে যায় ইনভেস্টমেন্ট প্রোপার্টি। সেখানে তাদেরকে ২০% ডাউন পেমেন্ট দিতে হয়। তবে ইন্টারেস্ট রেট প্রত্যক স্টেটের জন্য আলাদা।" 

কেনার চাইতে বাড়ি বিক্রি করা কঠিন। বর্তমান মার্কেটে বাড়ি কেনা বেচায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা আছে, বিশেষত বিদেশি ক্রেতাদের জন্য-এ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'বাড়ি কেন-বেচার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা না থাকলে দুটোই কঠিন। কেউ বাড়ি বিক্রি করতে চাইলে সেল সাইন বসিয়ে দেন, বায়ারদের সম্পর্কে ভালোমত জানেন না। বায়াররা বাড়ি কেনার জন্যে কোয়ালিফায়েড কিনা সেটা জানেন না, ফলে সময় নষ্ট হয়। অথচ একজন রিয়েলটর নিয়োগের মাধ্যমে সেটা সহজ হয়। রিয়েল্টরের মাধ্যমে জানা যায় বায়ার কত মূল্যের বাড়ি কিনতে পারবে, মাসিক পেমেন্ট কত হবে, ইন্টারেস্ট রেট কত হবে। সেলারদেরকে আমরা পরামর্শ দেব এ ব‍্যাপারে একজন রিয়েল্টর নিয়োগের ব্যাপারে। তাছাড়া রিয়েলটরের মাধ্যমে বাড়ি কিনলে কমিশন পাওয়া যায়। জরিপে দেখা গেছে, সেল বাই দ্যা অওনারের ৫৮% অসফল হয়ে তারা রিয়েলস্টেটে ফিরে আসেন।'

বাড়ি কেনার পর রিফাইনান্স এর বিষয় সম্পর্কে সেলিনা উদ্দিন জানান, 'বাড়ি কেনার পর একটা সময়ের পর রিফাইন্যান্স করা যায়। ইন্টারেস্ট যদি কমে আসে তখন বায়ার রিফাইন্যান্স করতে পারবে। এছাড়া আর কোন সুবিধা নাই।'

রিয়েল্টর হিসাবে প্রথম আত্মপ্রকাশের পর থেকে আজ পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথের চ্যালেঞ্জ কিরকম ছিল তা জানতে চাইলে সেলিনা উদ্দিন বলেন, 'আমি যখন রিয়েলস্টেট শুরু করেছিলাম তখন ইন্টারেস্ট রেট ১০-১১% ছিল কিন্তু বাড়ির দাম কম ছিল। ব্রঙ্কস, ম্যানহাটান আর ওয়েসচেস্টার কাউন্টি নিয়ে কাজ করতাম। ওয়েসচেস্টার কাউন্টির প্রোপার্টি বরাবরই এক্সপেন্সিভ। এখন সবখানেই ইন্টারেস্ট রেট এবং দাম দুটোই বেড়েছে। প্রতি দশবছর অন্তর অন্তর রিয়েলস্টেট মার্কেট একবার ক্রাশ করে। ২০০৮ সালে একবার ক্র্যাশ হয়েছিল যা রিকভার করতে ২০১৪-১৫ পর্যন্ত লেগেছিল। তখন বাড়ির দাম ও ইন্টারেস্ট রেট অনেক কমে গিয়েছিল। বর্তমানে লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রোপার্টির ঘাটতি হয়েছে।'

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিশেষ করে সম্প্রতি ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নিয়ে তিনি মতামত তুলে ধরে বলেন, 'একাত্তরে এবং তার আগে ছাত্রলীগ একটা গৌরবোজ্জ্বল সংগঠন ছিল। তাকে আমাদের বাংলাদেশের উৎপত্তির মূল সংগঠন বলে মানতে হবে। কিন্তু বর্তমানের ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগ মানুষের উপরে অত্যাচার করেছে, মানুষ হত্যা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা সাধারণ ঘরের মেধাবী ছাত্রদেরকে জোরপূর্বক মিটিং-মিছিলে নিয়ে যাওয়া হয়। ছাত্রলীগের কথা না শুনলে হলে সিট দেয়া হয় না। বিরোধীদল সব দেশেই আছে, তারা সরকারের সমালোচনা করবে। কিন্তু আমাদের দেশের বিরোধী দলের কেউ যখন সরকারের কাজের প্রতিবাদ করতে গেছে তখন পুলিশের সাথে সবসময় ছাত্রলীগ-যুবলীগ ছিল, এটা সবাই জানে। এবারের গণহত্যায় তারা ছাত্রদের উপর অস্ত্র তুলেছে। ছাত্রলীগকে কারা এই দুর্বৃত্তায়নে নিয়ে গেছে সেটা দেখতে হবে। এই কারণে কিছু সংগঠনকে নিষিদ্ধ করাই উচিত।' 

২৪ এর গণঅভূত্থানে অল্প সময়ে স্বৈরশাসনের পতন ঘটেছে। স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া বাচ্চারা আন্দোলনে নেমেছিল। এই বাচ্চারা তাদের সহপাঠিদের রক্তাক্ত লাশগুলো দেখেছে, নিজে দাফন করেছে। সাহস নিয়ে পরক্ষণেই মাঠে নেমেছে। এখনো তারা দেশ সংস্কারে ঘোরের মধ‍্যে আছে অথচ তাদের ট্রমাতে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ নিয়ে সেলিনা উদ্দিন বলেন, 'অবশ্যই এই বাচ্চাগুলো ট্রমার মধ্যে আছে। তারা ট্রমা নিয়ে রাস্তায় নেমেছে, অনেকে শহীদ হয়েছে। যারা জীবিত আছে তারা এখনো সাফার করছে। তাদের বয়স বেশি না, মানসিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য মুশকিল। সরকার তাদের টিউশন ফি মাফ করে দিয়েছে, এটা ভালো কাজ। আমি মনে করি এ ছাড়াও তাদের আরো সাপোর্ট দরকার।' 

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ৫ নভেম্বর, আর্লি ভোটও শুরু হয়েছে। কে হতে যাচ্ছে আগামীর প্রেডিডেন্ট, এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'এখনো এটা বলা মুশকিল, তবে আমার কাছে দুজনই অপছন্দের প্রার্থী। ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকালীন সময়ে কামালা হ্যারিসের থেকে আমরা আশানুরূপ কিছু পাইনি। বর্তমানে দেশের ইনফ্ল্যামেশন হাই, প্রোপার্টি প্রাইস হাই, ইন্টারেস্ট রেট হাই, নিত্য প্রয়োজনীয়ের দাম বেড়েছে, মানুষের আয় বাড়েনি, বরং ট্যাক্স বেড়েছে। ফুড স্ট্যাম্প আর মেডিকেইড নিন্ম মধ্যবিত্তকে সাহায্য করলেও মধ্যবিত্তের জন্য কি ব্যবস্থা? রিয়েলএস্টেট ব্যবসাতেও ধ্বস নেমেছে, মানুষের তুলনায় প্রোপার্টি কম। ইনভেন্টরি কম, যে সব ইনভেন্টরি মার্কেটে আসে তার বেশির ভাগই ফরেন বায়াররা ক্যাশ পেমেন্টের মাধ্যমে কিনে নেয়। এটা নিয়ে আমরা ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অফ রিয়েল্টরের কাছে আবেদন করেছি, ফরেন বায়ারদেরকে কিছু ক্যাপ দেবার জন্যে। এদের জন্যেই লোকাল বায়ারদের কাছে রিয়েলস্টেট মার্কেট একটা ডিসাস্টার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের আবাসন বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোন পদক্ষেপ নেই। বর্তমানের প্রজন্ম চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে যাচ্ছে, অথচ এদেশের সরকার এসবে আলোকপাত না করে ইসরাইয়েল-ফিলিস্তিনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। ইউক্রেনেও অস্ত্র পাঠানো হচ্ছে। ওদেরকে কেন আমরা ৩.৮ বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য পাঠাবো? এগুলো সব খেটে খাওয়া মানুষের ট্যাক্স রিটার্নের টাকা, মানুষ হত্যার কারণে পাঠানো হচ্ছে। আমরা আমেরিকাবাসীর অবস্থা ভালো না, ট্রাম্পের ২০১৯-এর নির্বাচনের ফরেন পলিসি আমি সমর্থন করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন ওবামাকেয়ার, মেডিকেইড, ফুডস্ট্যাম্প, বন্ধ করে দেবে। তখন করোনা এসেছিল, উনি যদি তখন জয়ী হতেন তাহলে করোনাক্রান্ত এতো মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেত না। ট্রাম্পের ফরেন পলিসির কারণে আমি তখন তাকে ভোট দেই নাই। সম্প্রতি দেখলাম ট্রাম্প টুইট করেছে, বাংলাদেশে নাকি সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হচ্ছে, এজন্যে তিনি ভারতকে সাপোর্ট দেবেন। এটা জানার পর আমি আমার মতামত এবং সমর্থন বদলে ফেলেছি। আমরা সবাই ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিচ্ছি, কিন্তু এখন যদি ট্রাম্প জয়ী হয়ে ভারতকে সমর্থনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কোন ক্ষতি করেন, তাহলে আমাদের এই গণঅভ্যুত্থানের সাথে জড়িত সবাইকে শেষ করে ফেলবেন। একরোখা জেদি ট্রাম্প যা ইচ্ছা তাই ই করেন, নিয়মের বাইরে যেয়েও করবেন, তিনি কারো কথা শোনেন না।' 

আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে সেদিনের "টক অফ দ্য উইক" অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন ফরিদা ইয়াসমীন আর কারিগরি সহযোগিতায় ছিলেন এইচ বি রিতা। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার এই অনুষ্ঠানটি প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় ফেসবুক লাইভে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়ে থাকে।   
 

ফাউন্ডেশন  থেকে আরো পড়ুন