https://www.prothomalony.com/
10838
opinion
ধর্ষণ করে মা-বোনের উলঙ্গ লাশ রাস্তায় ফেলে রাখলে, আমার জাত যায় না। নিরীহ মানুষ থেকে সাংবাদিক পর্যন্ত হত্যা করে রেললাইনের ধারে ফেলে রাখলে, আমার জাত যায় না। গণহত্যায় লাশ পুড়িয়ে ফেললে, আমার জাত যায় না। গরম পানি ঢেলে ছাত্রদের ঝলসে দিতে শিল্পীদের পরামর্শে, আমার জাত যায় না। 'গুলি করি মরে একটা বাকিডি যায় না স্যার'—পুলিশের এমন কথা শুনেও আমার জাত যায় না। জনগণের কোটি কোটি টাকার সম্পদ হাসিনা এবং তার দলের নেতারা আত্মসাৎ করলে, আমার জাত যায় না। শিল্প-সংস্কৃতির নামে একে অন্যের বিছানা গরম করলে, আমার জাত যায় না। স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণরা চাকরি না পেয়ে হতাশায় মাদকাসক্ত হলে, আমার জাত যায় না। চাকরি পাওয়ার জন্য উচ্চপদস্থরা কোনো নারীর শরীর দাবি করলে, আমার জাত যায় না। বিনা চিকিৎসায় দেশের জনগণ মরলে, আমার জাত যায় না। ভুয়া সনদে মাস্টার নিযুক্ত হয়ে দেশের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করলে, আমার জাত যায় না। হাজার হাজার হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আসামীরা খালাস পেয়ে গেলে, আমার জাত যায় না।
কিন্তু, যখন কেউ জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবী তোলে, তখনই আমার জাতীয় স্বত্ত্বা হুমকির মুখে পড়ে যায়, যা কেবল একটা দাবী সরকার অনুমোদিত নয়।
আমি যা বিশ্বাস করি, সেটাই চরম সত্য—কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো যুক্তি নেই। আমার চিন্তাভাবনার শুরু ও শেষ আমার দলের মন্ত্রে, আমার ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানে। আমার চোখে সবকিছু সাদা বা কালো, মাঝের ধূসরতা আমি দেখি না। কারণ, ধূসরতা তো চিন্তার বিষয়, আর চিন্তা করা আমার জন্য নয়।
আমার দল যা বলে, আমি তাই মেনে নিই, ধর্ম যা নির্দেশ করে, আমি অন্ধের মতো পালন করি। কারণ, চিন্তা করতে গেলে মস্তিষ্কের ওপর চাপ পড়ে, আর আমি সেই ঝামেলায় যেতে চাই না। যুক্তি? সেটা তো শুধু বুদ্ধিজীবীদের জন্য। কারণ-প্রভাব? ওসব তো বিজ্ঞানীদের খেলা। আর মনস্তত্ত্ব? সেটা তো পাগলদের জন্য!
আমার আদর্শ খুব সরল। দল যা বলবে, ধর্ম যা বলবে, আমি সেটাই করব—বাকি সব জগতের ব্যাখ্যা আমার জন্য অপ্রয়োজনীয়। আমি অন্ধকারে ডুবতে ভালোবাসি, কারণ সেখানে আলোর ঝলকানির কোনো ভয় নেই।
আমি এমনই এক চেতন, যে খুঁজে ফেরে সব সময় অস্থিরতা তৈরি করা ইস্যু। শান্তি ও স্থিতিশীলতা আমার কাছে বিষাক্ত—মাথা ঘুরে যায়, মনে হয় পৃথিবী থেমে গেছে। তাই অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা, এবং বিতর্কই আমার অক্সিজেন।
আমি যেখানে যাই, সেখানেই ফিসফিসিয়ে সন্দেহ ছড়াই, ছোট একটা ঘটনা বিশাল করে তুলি। মানুষকে উত্তেজিত করার জন্য ছুড়ে দিই কিছু ইন্ধন, আর তারপর পেছন ফিরে দেখি, আগুনটা কতটা বড় হলো।
আমি এমন এক চেতন, যে সবসময় কারো না কারো শত্রু খুঁজে বেড়ায়। কারণ, শত্রু ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না। আমার অস্তিত্বের ভিত্তি হলো 'আমরা বনাম তারা'—কেউ না কেউ শত্রু না হলে আমি কার ওপর দোষ চাপাব?
সংলাপ, সহানুভূতি, আর বোঝাপড়া? ওগুলো তো দুর্বলতার লক্ষণ। আমি চাই প্রতিক্রিয়া—তা যত অযৌক্তিকই হোক। কারণ, যুক্তি আমার শক্তি নয়, অন্ধ আবেগই আমার তাস। তাই আমি চেতন, যে শান্তির শত্রু, সংলাপের শত্রু, আর সত্যের শত্রু।
আমি সেই চেতন, যে বৈপরীত্যের মাঝে নিজের স্বস্তি খুঁজে পাই। সত্যি বলুন তো, একটু তো মজা আছে মানুষকে অযথা উত্তেজিত করায়? আমি সেই ব্যক্তি, যে পেট্রোলের দাম বাড়লেও বিক্ষোভ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ি, আর দাম কমলেও সরকারকে খোঁচা দিতে ছাড়ি না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, আমার দায়িত্ব পৃথিবীকে বিশৃঙ্খল রেখে যাওয়া।
আমার ভাবনা বেশ সহজ—যদি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে আমি কোথায় যাব? তাই আমি সবসময় সমস্যার সন্ধানে থাকি, আর তা না পেলে তৈরি করে ফেলি। আমি এক 'ডিজাইনার অস্থিরতা'র কারিগর। কোথাও শান্তি দেখলে মনে হয়, এখানেই হয়তো সময়টা এসে গেছে নতুন কিছু গোলমাল বাধানোর।
আপনি যদি কখনো ভেবেও থাকেন যে 'সবকিছু ঠিকঠাক চলছে', ভুল ভাবছেন। কারণ, আমি আসব, কিছু না কিছু দুর্বল পয়েন্ট খুঁজে বের করব, আর তার পর থেকেই শুরু হবে আমার উৎসব! ছোট বিষয়কে পাহাড় বানাতে আমি সিদ্ধহস্ত। একটা ঘটনা ঘটলেই আমি সেখানে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি, এমনভাবে সেটা বিশাল ইস্যু বানাই, যেন পুরো দেশটাই এটার কারণে ধ্বংসের মুখে।
আমি সেই চেতন, যাকে শান্ত মানুষজন ভয় পায়। তারা জানে, আমি আসলেই তাদের শান্তিজনক পৃথিবীতে একটা তাণ্ডব ঘটিয়ে যাব। আমি এক নতুন রূপের জোকার—যে অশান্তি তৈরি করে, আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই নিজের আনন্দ খুঁজে পায়।
বালিতে মাথা গুঁজে থাকা উটপাখির গল্পটা কি শুনেছেন? আমি ঠিক উল্টো। আমি সবসময় শির উঁচু করে, লোকের জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি। সুখী পরিবার? না, সেই সুখ আমি দেখতে পারি না। দাম্পত্য জীবনে ছোট সমস্যা থাকলেই সেটাকে নিয়ে চায়ের টেবিলে আলোচনার রসদ বানাই। আর যদি কোনো সমস্যা না থাকে, তবে আমি নিশ্চিত করব যেন সেটা বানিয়ে তোলা যায়!
যুদ্ধ চাই, ধ্বংস চাই—কারণ আমি শান্তি থেকে অস্বস্তি পাই। যত বিতর্ক, তত আনন্দ। আমি নিজে শান্তিতে থাকতে চাই না, আর আপনাকেও শান্তিতে থাকতে দেব না। আমাকে যারা চিনে, তারা জানে—আমার উপস্থিতি মানেই অস্থিরতার সিগন্যাল। আপনি যদি কখনো নিজের শান্তি খুঁজতে চান, তবে সাবধান—আমি কাছে আসছি কি না।
আপনার প্রতিবেশী হাসিমুখে দিন কাটাচ্ছে? না, সেটা আমি সহ্য করতে পারি না। তাদের মধ্যে একটু ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে দিলেই হলো, বাকিটা তারা নিজেরাই করে নেবে। আমি এমনই, এক চেতন, যে নিজে সুখে থাকতে পারে না, আর অন্যকেও সুখে থাকতে দেয় না।
আমার মনে একটাই নীতি—'আমি আছি, তাই বিশৃঙ্খলা থাকবে'। শান্তিপ্রিয় মানুষ আমাকে দুঃস্বপ্নে দেখে, কারণ আমি জানি কীভাবে তাদের স্নায়ুতে আঘাত হানতে হয়। মানুষ যখন যুক্তির আলোতে কিছু বোঝার চেষ্টা করে, আমি সেখানে অন্ধ আবেগ ঢেলে দিই। কারণ যুক্তি তো দুর্বলতা, আর আবেগই শক্তি।
তাই, জেনে নিন আমি কে! আমি সেই চেতন, যে অন্ধকারকে আলোর চেয়ে বেশি ভালোবাসে। কারণ অন্ধকারে আপনি যুক্তি খুঁজবেন না, আপনাকে শুধু টেনে নিয়ে যাব আবেগের গভীর খাদে।
বুঝে নিন এবার আমি কে!
অভিমত থেকে আরো পড়ুন