https://www.prothomalony.com/

10811

foundation

ফাউন্ডেশন 

শিক্ষার্থীদের কারা উস্কে দিচ্ছে?

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৪:৪৫

একটি শিশুর প্রথম স্কুল তার পরিবার। একটি শিশু আপনাকে অনুকরণ করে। আপনি যা করবেন, সে তা-ই গ্রহণ করবে। আপনি যেভাবে বিশ্বকে তার সামনে উপস্থাপন করবেন, সে সেভাবে বিশ্ব সম্পর্কে জানবে। শিক্ষকদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। আপনি যদি শিক্ষায়, নৈতিকতায়, মানবিকতায় আদর্শবান হন, তবে আপনার ছাত্ররা আপনাকে অনুসরণ করে ভালো কিছু শিখবে। কিন্তু যদি আপনি দলদাস হয়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক এবং অমানবিক আচরণ করেন, তাহলে আপনি ছাত্রদের কাছ থেকে কী আশা করতে পারেন?

অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি বখাটে, গুণ্ডাপান্ডা; কিন্তু শিক্ষককে দেখলে সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে মাথা নত করে দাঁড়ায়। কেন দাঁড়ায়? একজন শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রশ্ন করুন। আপনার সম্মান কীভাবে অর্জিত হয়েছে?
আজকাল শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেই অশ্রদ্ধা দেখা যাচ্ছে, তা শুধুমাত্র তাদের দোষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভদ্রভাবে শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করেছেন, কিন্তু এখন গ্রামে বা শহরের স্কুলগুলোতে সপ্তম কিংবা নবম শ্রেণীর ছাত্ররা শিক্ষকদের গালাগালি করছে, গায়ে হাত তুলছে। বাচ্চারা এত সাহস কোথা থেকে পাচ্ছে?
এটা নিছক শিক্ষার্থীদের অসদাচরণ নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়েছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের উস্কে দিয়ে এ কাজগুলি করাচ্ছে তিনটি গ্রুপ—একটি হল এলাকার সরকার বিরোধী লোকজন, একটি হল লীগবাহিনী, এবং আরেকটি হল শিক্ষকদের একটি দল। শিক্ষকদের মধ্যে কে কার উপরে যাবে, এই রেষারেষিও বেশ প্রবল। যখন হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন, তখন একদল শিক্ষক বেশ দাপটের সাথে শাসন করতেন। আজ যখন সেই সুযোগ এসেছে, তখন সেই শোষিত শিক্ষকরাও ছোট বাচ্চাদের উস্কে দিচ্ছেন সরকারপক্ষীয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। আর শিক্ষার্থীরা ভাবছে, 'যে শিক্ষকরা এতদিন আমাদের উপর অন্যায় করেছে, তাদেরকে এখন শাস্তি দেওয়া উচিত।' বাচ্চারা এমন ভাবছে কারণ তাদের পাশে আছেন একদল শিক্ষক যারা তাদের সমর্থন দিচ্ছেন। আর এই শিক্ষকদের সমর্থন করছেন এলাকার সরকার বিরোধী লোকজন। আর লীগবাহিনী তো সর্বদাই তৎপর কোনো না কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করে সরকারের বদনাম করতে। যেমন সংখ্যালঘু নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাদের কিছু সদস্যই উস্কানিমূলক কাজ করেছে—মন্দিরে বোমা ফাটিয়েছে, বা ছোট অপরাধীদের টাকা দিয়ে ডাকাতি করিয়েছে। এখন যখন বন্যায় সব স্বাভাবিক হচ্ছিল, তখন শুরু হয়েছে শিক্ষক নির্যাতন ইস্যু।স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের পক্ষে এসব রাজনীতি বোঝা সম্ভব কি?
এক মাস হয়নি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হয়েছে। লীগ এবং ভারতের ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিকভাবে চাপ—এসব মোকাবেলা করতেই সরকার হিমশিম খাচ্ছে। এলাকায় এলাকায় কী হচ্ছে, সব সমস্যা কীভাবে মোকাবেলা করবে! তার মধ্যে ভারতের বাঁধ খুলে দেওয়ায় বন্যায় লক্ষ লক্ষ মানুষের বিপদ, কোটি কোটি টাকার ক্ষতি—কতদিকে নজর দিবে সরকার! হাসিনার সিস্টেমকে বুঝে উল্টে দিকের চাকা ঘুরাতে হলেও ছয় মাস সময় দরকার। দুর্নীতির মাধ্যমে সরকার যে অর্থনৈতিক ধস করে গেছে, তার আধা পূরণ করতেও ৫-৬ বছর লাগবে। এখনো নিহত শিক্ষার্থীদের রক্তের দাগ শুকায়নি। তাদের পরিবারকে সমর্থন করতে হচ্ছে। এখনো হাজার হাজার শিক্ষার্থী হাসপাতালে, কেউ পঙ্গু, কেউ অন্ধ। তাদের চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। তারপর না আসবে সংস্কার আর জনগণের দাবির বিষয়গুলো। বর্তমান সমাজের বাস্তবতায় শিক্ষক, অভিভাবক এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে, তারপর শিক্ষাঙ্গন যেখানে তাদের মানসিক ও নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। যদি পরিবার এবং শিক্ষকেরা নিজেরা আদর্শ হয়ে উঠতে না পারেন, তবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে সঠিক আচরণের প্রত্যাশা করাই বৃথা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আজকের সমাজে শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে শিক্ষকদের নিজেদেরও আত্মসমীক্ষা করা প্রয়োজন। একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞানদানকারী নন, তিনি একজন পথপ্রদর্শকও। যদি শিক্ষক নিজে নৈতিক আদর্শ এবং সঠিক মূল্যবোধের প্রতিফলন না ঘটান, তাহলে ছাত্ররা কীভাবে তা শিখবে?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা একটি গভীর ষড়যন্ত্রের ফলাফল। সমাজের একটি বিশাল অংশকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার জন্য, ছাত্রদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। শিক্ষার্থীরা যদি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে এবং দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিবে।  এখানে দায়িত্বশীলদের—শিক্ষক, অভিভাবক, এবং সমাজের সব স্তরের মানুষদের—দায়িত্ব হলো পরিস্থিতি শান্ত করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঠিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ বপন করা। আমাদের বুঝতে হবে, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতা। তারা যদি এখনই ভুল পথে পরিচালিত হয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের মুখে দাঁড়াবে। শিক্ষার্থীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি, শিক্ষকদের নিজেদেরও উন্নত করতে হবে। তাদের উচিত হবে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাধ্যমে শিক্ষকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। শিক্ষকদের উচিত নিজেদের চরিত্র এবং কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে আদর্শ হয়ে ওঠা, যাতে তারা সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে। আমাদের এখন প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। সরকারকে সমর্থন করে ভালো কিছু করার জন্য পাশে দাঁড়াতে হবে। সময় দিতে হবে। এদিকে সরকারকেও আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি, শিক্ষাঙ্গনে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা উচিত। অন্যথায়, আমরা যেসব সমস্যা আজ দেখছি, তা আরও বড় আকারে ফিরে আসবে।

 

 

 

ফাউন্ডেশন  থেকে আরো পড়ুন