https://www.prothomalony.com/

10782

opinion

অভিমত

'জঙ্গী-জামাত শিবির' আখ্যা দেওয়া: সামাজিক বিভাজন ও প্রোপাগান্ডার বাস্তবতা

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৪ ০৭:০২


বিশ্বব্যাপী চরমপন্থী কর্মকাণ্ডের কারণে ইসলাম ধর্মকে অনেক সময় ভুলভাবে জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়। এর ফলে, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরও 'জঙ্গী' বা 'জামাত-শিবির' বলে আখ্যা দেওয়া একটি প্রচলিত, কিন্তু ভুল ধারণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সাধারণীকরণ শুধু ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে না, বরং এটি সামাজিক বিভাজন ও বিদ্বেষকেও উস্কে দেয়। এই লেবেলিংয়ের পেছনের বাস্তবতা এবং এর বিপর্যয়কর প্রভাব নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত।  ল্যাটিন শব্দ 'মিলিট্যার' থেকে জঙ্গী শব্দের উৎপত্তি। 'মিলিট্যার' শব্দের অর্থ হলো সৈনিক হিসেবে কাজ করা। তবে, আচরণগত দৃষ্টিকোণ থেকে "জঙ্গি" বলতে তাদের বোঝায় যারা যুদ্ধবাজ, আক্রমণাত্মক, হিংসাত্মক এবং ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে লিপ্ত। এই শব্দটি বিশেষ করে এমন লোকদের বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয় যারা তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য উগ্রপন্থা, সন্ত্রাসবাদ, এবং সহিংসতার আশ্রয় নেয়। জঙ্গিরা সাধারণত আক্রমণাত্মক ও হিংসাত্মক উপায়ে রাষ্ট্র বা সমাজে অনুমোদিত সংস্কারের বিরুদ্ধে বা অননুমোদিত সংস্কারের সমর্থনে সমবেতভাবে কাজ করে। তারা চরম এবং হিংসাত্মক পন্থার আশ্রয় নিয়ে সমাজে তাদের বিশ্বাস বা আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। শুধুমাত্র ধংসাত্মক কাজে সরাসরি অংশগ্রহণকারী নয়, বরং এই ধরনের কর্মকাণ্ডে চাঁদা প্রদান, সংগ্রহ, পরিকল্পনা গ্রহণ, এবং অন্যান্য সহায়তাকারীরাও জঙ্গি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। জঙ্গি কার্যক্রম এককভাবে বা দলীয়ভাবে পরিচালিত হতে পারে, এবং এর মূল লক্ষ্য থাকে বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণে তাদের সংগঠন প্রণীত ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ধারণা বা দর্শন সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রবর্তন করা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তবে, "জঙ্গী" শব্দটি প্রায়শই অপব্যবহার করা হয়, এবং এটি এমন লোকদের বর্ণনা করতেও ব্যবহৃত হয় যারা কেবলমাত্র তাদের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাস অনুসারে জীবনযাপন করে, যদিও তারা সহিংস নয়।  আমরা 'সংখ্যালঘু' নিয়ে কথা বলি যেখানে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর করা জুলুমের কর্মকাণ্ড উঠে আসে। কিন্তু এখানে ইসলাম বিশ্বাসী বা ধর্মাবলম্বীদের যে গণহারে 'জঙ্গী-জামাত শিবির' বলে পৃথক করা হয় এবং কখনো মৌখিক, মানসিক, শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়, তা নিয়ে আমরা খুব কমই কথা বলি।এটা কেন? 
গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে সাধারণত সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া নির্যাতনের খবর বেশি উঠে আসে, কারণ এটি সমাজের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি হওয়া নির্যাতনের বিষয়টি অনেক সময় প্রচার পায় না, কারণ এটি কিছু মানুষের কাছে সংবেদনশীল বা বিরোধপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিচয়ের সাথে ধর্মীয় পরিচয় জড়িত। কেউ যদি ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপর নির্যাতনের কথা বলে, তবে সেটি অনেক সময় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ধরা হয়। ফলে অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। বাংলাদেশে অনেক সময় ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। এই পরিবেশে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মৌখিক বা মানসিক নির্যাতন ঘটে, কিন্তু এটি বৃহত্তর সমাজে আলোচিত হয় না, কারণ মনে করা হয় যে, এটি দ্বন্দ্বকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা রাখে। আবার সমাজে অনেক সময় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের নির্যাতনের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও সমর্থন পায় না। ফলে প্রশাসনিক পর্যায়ে অথবা সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি একটি কম গুরুত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।  ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের 'জঙ্গী' বা 'জামাত-শিবির' বলে আখ্যা দেওয়া একটি ভুল সাধারণীকরণ। এটি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ছোট একটি গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করা, যা প্রচলিত ধারণাকে বিকৃত করে। ফলে, অনেক সময় এটি একটি "সামাজিক ট্যাবু" হিসেবে রয়ে যায়, এবং এ নিয়ে আলোচনা না করে সবাই বিষয়টি এড়িয়ে চলে। কেউ নামাজ করলে, কোরআন তেলওয়াত করলে, টুপি পাঞ্জাবি, হিজাব পরলে, হাতে তসবিহ নিলে, তাদেরকে "জঙ্গী, জামাত শিবির" বলে আখ্যা দেয়া হয়, নানাভাবে কটাক্ষ করা হয়, সমাজ রাষ্ট্রের কাছে তাদেরকে অপরাধী কেউ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। এটা অন্যায় এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর মানসিক নির্যাতন এবং বৈষম্যমূলক একটি আচরণ। ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার, এবং কেউ তার ধর্মীয় অনুশীলন পালন করার জন্য হেনস্তার শিকার হলে তা অবশ্যই একটি গুরুতর সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যা। কেউ যখন শরীরের উত্তেজনামূলত স্থানগুলো উন্মুক্ত করে বের হন, তখন প্রকৃত মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা সেদিকে তাকাবে না, এ নিয়ে কটাক্ষও করবে না। হয়তো সুযোগ পেলে পরামর্শ দিবেন। কিন্তু কে তাকায় জানেন? কটাক্ষ কে করে জানেন? আপনার, আমার মতো চতুর্থ লিঙ্গের অজ্ঞানী মানুষেরা যারা না জানে আধুনিকতার প্রকৃত  সংজ্ঞা, না জানে ইসলাম ধর্মের প্রকৃত সংজ্ঞা। হ্যাঁ, আমরা স্বাধীনভাবে থাকতে চাই। স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে চাই। আমরা অনেকেই ইসলামী রাষ্ট্র চাই না। কারণ এমন রাষ্ট্র হয়তো আমাদেরকে পর্দা করতে বাধ্য করবে, হয়তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনাপনে খোলামেলা চলাচলের স্বাধীনতাকে খর্ব করবে। হয়তো আমাদের হাতাকাটা, শর্টপ্যান্ট, শর্টড্রেস, উড়ু-হাঁটু-বুকের ভাজ প্রদর্শন করা বাদ দিতে হবে। পরকিয়ার সুযোগ থাকবে না। আসর, পার্টিতে নাচ গান, মদ-গাঁজায় সুখটান বাদ দিতে হবে, বিশেষ করে নারীদের। পুরুষরা হয়তো সে সুযোগে চারজন বিছানার সঙ্গী পাবার সুযোগ খুঁজে নিবেন। এগুলিই হচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ভয়। বিষয়টা হল ইসলাম নারীর শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে কোনো বাধা না দিলেও সমাজের কতিপয় ধর্মান্ধরা সেখানে বহু বাঁধ তৈরি করেছেন। ভয়টা সেখানেই। রাষ্টীয় আইনে সকল ধর্মের সম্মান ও সমান সুযোগ থাকবে, এবং রাষ্ট্র যেন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধিনিষেধে না চলে-এটাই আমাদের বহুজনের প্রত্যাশা। এখানে কোনো সমস্যা নেই। 
প্রসঙ্গটা হল, গণহারে ইসলাম ধর্ম পালন করাদের জঙ্গী-জামাত শিবির বলা। কেন গণহারে ইসলাম ধর্ম পালন করাদের জঙ্গী-জামাত শিবির বলা হয়?
বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই রাজনীতি ও ধর্ম জড়িত। কিছু রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী ইসলামিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকায়, তাদের সমর্থকদেরকে বা ধর্ম পালনকারীদেরকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করতে বিরোধীরা "জঙ্গী" বা "জামাত-শিবির" বলে আখ্যা দেয়। এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একটি কৌশল হতে পারে।  বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইসলামফোবিয়া বা ইসলামের প্রতি ভীতি একটি বড় কারণ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ ধর্ম পালনকারী মুসলমানদেরও জঙ্গী বলে ভুলভাবে আখ্যায়িত করা হয়। এটি একটি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি যা পুরো মুসলিম সমাজকে অন্যায়ভাবে লক্ষবস্তু বানায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, জামাত-শিবিরের সাথে মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং পরবর্তী সময়ে সংঘটিত অপরাধ ও সহিংসতার ইতিহাস জড়িত। তাই, যারা ইসলাম ধর্ম পালন করে, তাদেরকে সহজেই এই লেবেল দেওয়া হয়, যদিও এরা সহিংসতায় জড়িত নয়। আবার, সমাজে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে কেউ কেউ তাদের ভিন্নমতের লোকদের হেয় করার জন্য "জঙ্গী" বা "জামাত-শিবির" বলে আখ্যা দেয়। এটি সামাজিক বিভাজন ও বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই ধরনের সাধারণীকরণ গভীরভাবে ক্ষতিকর, কারণ এটি ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে এক করে ফেলে, যা কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের প্রতি অযৌক্তিক বৈষম্য সৃষ্টি করে। যে কেউ ধর্ম পালন করতে পারেন এবং এটি তার মৌলিক অধিকার, আর সেই ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য কাউকে জঙ্গী বা উগ্রবাদী বলে আখ্যা দেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায়। সমাজে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং উদারতা বজায় রাখতে এই ধরনের লেবেলিং এড়িয়ে চলতে হবে। 

 

 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন