https://www.prothomalony.com/
10032
opinion
গোপন কথাটি তারে বলা হয়েছিল কোন এক দূর্বল মুহূর্তে। উদ্দেশ্যে ছিল, নিজেকে হালকা করা। সেও শুনেছিল মনোযোগ দিয়ে। কারণ সে ছিল কাছের কেউ। বক্তা হালকা হয়ে ভুলেও গিয়েছিল সেই সময়ের স্মৃতি। জীবনে আরও বহু ঝড় এসে গিয়েছে। ভালো সময়ও ধরা দিয়ে গেছে কখনও সখনও। এক কষ্টের স্মৃতি নিয়ে দশবার নিজে কান্নাকাটি করা গেলেও, দশবার যে শুনবে দশবার একি এনার্জি তার ধরে রাখা কঠিন। ফলে একি দুঃখের বা সুখের ঘটনা কথা বার বার শুনাতে নেই। কোন কারণে কথার কথা বলতে গিয়ে সরল মনে বহুকাল পর কথা প্রসঙ্গে কাছের ব্যক্তিটি সেই গোপন কথাটি কাউকে বলে দিল। বলার পর বুঝতে পারল বলাটা ঠিক হয়নি। তখন সেই শ্রোতাকে নিষেধ করলো কথাটি কাউকে না বলতে। এইসব ক্ষেত্রে নিশ্চিত থাকতে হবে, যাকে নিষেধ করা হবে সবার আগে এই কথাটি সেই প্রকাশ করবে। যা প্রায়ই হতে দেখা যায়।
এবার ঠিক উল্টো দিক থেকে আসা যাক। দূর্বল মুহূর্তে কাছের মানুষকে কিছু বলার পর যখন ব্যক্তির হঠাৎ মনে হলো, ইস্ ভুল করে ফেলেছি, এখন সে যদি বলে ফেলে। হয়ত সেই ব্যক্তি জীবনেও কাউকে কিছু বলবে না, মরলেও না। কিন্তু বলার কারণে বক্তার ভেতরে যেই যযন্ত্রণার সৃষ্টি হলো তা থেকে নিজের মুক্তি নেই। ঠিক তখন নিজের যান্ত্রণা কমাতে গিয়ে, যাকে গোপন কথাটি বলা হয়েছিল বিনা কারণে তার পিছনে লেগে যেতে ইচ্ছে হলো। সেই ব্যক্তির দূর্বল দিকগুলিকে খুঁজে বের করতে হবে এখনই। তাকে বিপদে ফেলতে হবে। তার সম্পর্কে আজেবাজে কথা ছড়াতে হবে। যাতে করে সেই ব্যক্তি সকলের কাছে ফাউল হয়ে যায়। এটা মানুষ করে নিজের হীনমন্যতা থেকে। যাতে করে সেই গোপন কথাটি যদি ব্যক্তিটি কখনও প্রকাশ করে, কেউ যেন তাকে বিশ্বাস না করে। সেই ব্যক্তিটি অকারণে শত্রুতে পরিণত হয়। সে যাই বলে, মনে হয় তাকে উদ্দ্যেশ্য করেই বলছে। ফলে দূরত্ব সৃষ্টি হতে থাকে দুই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মধ্যে। অথচ কথা ছিল একজন বলে হালকা হবে, আর অন্যজন শুনে কিছু সান্ত্বনা দিবে। বেচারা হয়ত সান্ত্বনা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু অন্যের দুঃখ শুনতে গিয়ে তার নিজের জীবনে অশান্তি নেমে আসবে বুঝেনি।
এর থেকে বের হবার উপায় কি, যদি বলতে বলা হয়, তো বলবো; জীবনে ভালো সময়ের আয়ু খুব কম থাকলেও খারাপ সময় কারো কারো জীবনের সঙ্গী হয়ে যায়। তখন কষ্ট থেকে বা আবেগে অথবা নিজেকে হালকা করতে গিয়ে মনের কথা কারো সাথে গরম গরম শেয়ার না করাই ভালো। দুই/ তিনদিন অপেক্ষা করে, প্রথমে একটা কাগজে নিজের রাগের সব কারণ লিখে, নিজে নিজেকে কিছু প্রশ্ন করে ও সমাধান বের করে, তারপর ছিঁড়ে ফেলে দেয়া। দ্বিতিয়ত- কাউকে যদি বলতেই হয় তো, সেইসব কথা একসময় ফাঁস হতেই পারে, এই ধারণা নিয়েই বলা। আর মনের মধ্যে রাখা উচিত; বললে বলুক গিয়ে, আমি কেয়ার করি না। আমি'ত দুনিয়ার সবাইকে মাইক লাগিয়ে বলিনি, বিশ্বাস করে নিজের কাছের মানুষকে বলেছি। সে যদি সেই বিশ্বাসের মর্যাদা না দিতে পারে তো সে বেইমান। এতে নিজেকে দোষারোপ করার কিছু নেই।
তবে এমন কিছু সময় থাকে, যখন কেউ কিছু নিজ থেকে বললে, না শুনে উপায় থাকে না। অন্যের দুঃখ শুনার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্যের জীবনের কোন সমাধান আমাদের হাতে নেই। সমস্যা যার, পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে ব্যক্তিকেই সমাধান বের করতে হবে। অন্যে যা আমাদের বলে আমরা তাই শুনি, তাই জানি। একপাশ থেকে বক্তব্য শুনে, অপরপাশের বক্তব্য না জেনে সমাধান দিতে গেলে উল্টো ভেজাল বাড়তে থাকে। তাই প্রথমত কোন সমাধান দিতে যাওয়াটা বোকামি। আর দ্বিতিয়ত সমস্যা হচ্ছে, আমরা অন্যের দুঃখ শুনতে পছন্দ করি, যতটা না পছন্দ করি অন্যের আনন্দের কথা শুনতে। কিছু কিছু মানুষের নেশায় পরিণত হয়ে যায় অন্যের দুঃখ শুনা। এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করবে, যাতে ভেতরে আর কি আছে না জানলে পেটের খাবার হজম হবে না। তারপর নিজের সাথে দুঃখের তুলনা করবে মনে মনে। কখনও নিজেকে এরচেয়েও দুঃখী মনে হবে। কখনও সুখী ভেবে নিজেকে নিজে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবে।
আবার নিজেকে দুঃখী দেখানোও কিছু মানুষের নেশা হয়ে যায়। ফেইসবুকে প্রায়ই দেখা যায়, এইসব নাকিকান্না। আমার এই হয়েছে, সেই হয়েছে। একবার, দুইবার, তিনবার হজম করা যায়। দুইদিন পর পর যারা আহা্, উহু শুনার লোভে দুঃখ বিলি করে বেড়ায়, তখন বুঝতে হবে এটা দুঃখ নয়, মানসিক সমস্যা। এই একি ফেইসবুকে প্রতিদিন যারা গানের সাথে নেচে ভিডিও দেয়, রেস্টুরেন্টে আনন্দ করে খাচ্ছে সেইসব ছবি দেয়, বা সদ্য ডিভোর্সের পর বন্ধুদের নিয়ে খুব আড্ডা, মাস্তি করার ছবি দেয়, এমন না যে এদের কোন দুঃখ নেই। আগে বুঝতে হবে প্রতিদিনের দুঃখী মানুষদের কেউ মন থেকে পছন্দ করে না। বরং বিষন্নতা এক প্রকাশ ছোঁয়াচে রোগ।
অন্যদিকে একেবারে যদি বিপরীত ভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবা যায় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, তো বলবো কাছের মানুষদের সাথে দুঃখের কথা বেশি শেয়ার না করাই উত্তম। কারণ, এতে করে তাদের মনে ও জীবনে এর প্রভাব পড়তে পারে। মানুষের চিন্তার খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় আছে। আমরা মনের ডাক্তারের কাছে গিয়েও হাজার জন দুঃখের কথা বা ইতিহাস বর্ণনা করি। মনে রাখতে হবে এটা তাদের পেশা। তারা জানেন কিভাবে রোগীর ইতিহাস শুনতে হয়, রোগী সম্পর্কে জানতে হয়। এতে করে চিকিৎসা দিতে তাদের সুবিধা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের সেইভাবে অন্যের দুঃখ ধারণ করার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। যে বলে তার কাছে তার দুঃখ অনেক বড়, কিন্তু যে শুনে সে হালকাভাবেও বিষয়টি নিতে পারে। কৌতুহল বসত সরাসরি এমন প্রশ্ন করে ফেলতে পারে যা ব্যক্তি দিতে অনিচ্ছুক। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে বলা আর একজন মনো বিশেষজ্ঞের কাছে বলার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।
একি বিষয় যখন সাধারণ কোন মানুষ শুনে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্নের মাধ্যমে ব্যক্তির নিজের কথা নিজের মুখ দিয়ে নিয়ে আসতে চায় কথার ছলে, অপরপক্ষ উত্তর দিলেও, পরে যখন ঠান্ডা মাথায় ভাবে সবই বুঝে। সে কারণেও সম্পর্কে ফাটল ধরতে সময় লাগে না। তাই সমাধান হচ্ছে; ব্যক্তি যা বলে, যতটুকু বল, তার বাইরে তাকে কোন কিছু বলার জন্যে কৌশলে চাপ না দেয়া। দূর্বল মুহূর্তে মানুষের চিন্তা লোভ পেলেও, স্থির সময়ে সেই চিন্তা একি জায়গায় বসে থাকে না। আর তারচেয়েও বড় বিষয় কেউ যদি হালকা হওয়ার জন্যে কিছু বলে, তো বলতে দেয়া কিন্তু এই একি বিষয় নিয়ে আর কখনো কোন প্রশ্ন করো না। অনেকে ভুলে যাবার জন্যেও বলে, যাতে নিজেকে ফ্রেস করতে পারে। যদিও আমরা সাধারণ হিসাবে এটাকে দায়িত্ব হিসেবে দেখি। সেই চিন্তা থেকেই অবস্থার উন্নতি হলো কি না জানতে গিয়ে; গাড়লের মতো ব্যক্তিকে সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেই। একবারও ভাবি না, ব্যক্তি যেই মুহূর্তে কথাগুলো শেয়ার করেছে আর এখন যেই মুহূর্তে আছে, দুটি মুহূর্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটা সময় শেষে ফেলে আসা কথা বার বার সামনে নিয়ে আসা, বিব্রতকরও হতে পারে কারো কারো জন্যে।
এইখানে যা বললাম, সম্পূর্ণ আমার জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেখেছি। সবার সাথে না গেলেও কারো কারো যাবে। বহুবার সরলভাবে বন্ধুদের দুঃখের সাক্ষী হতে গিয়ে শত্রু হয়ে গিয়েছি কিছু প্রকাশ না করেই। পরে লজিক্যালি হিসাব মিলিয়েছি। এখন কেউ কিছু বলতে চাইলে সহজে শুনি না, আর যদি শুনতেই হয়, তো বাড়তি প্রশ্ন করি না। এই বিষয় নিয়ে যে কোনকালে কথা হয়েছিল, সেইদিকে যাই না। নিজ থেকে বললে, বলি, খেয়াল নেই, আজকাল মনে থাকে না অনেক কিছু। কথাটা মিথ্যা না, আজকাল নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিছু মনেও রাখতে চাই না। তবে মনে রাখতে এইসব ক্ষেত্রে নিজেকে দোষারোপ বা অনুশোচনা করার কিছু নেই। যে আমি ওকে বলে ভুল করেছি বা সময় নষ্ট করে তার কথা শুনে ভুল করেছি। এই সবকিছুই জীবনের একেকটা শিক্ষা। পড়াশোনা করে আমরা যেইসব জ্ঞান অর্জন করি, জীবনের অভিজ্ঞতা গুলো আমাদের তার থেকেও বেশি কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন