https://www.prothomalony.com/

9919

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪ ১০:৪৬

মধুমিতা ছয় মাসের গর্ভবতী 

এম এ ওয়াজেদ 

 

 

মধুমিতার কেশগুচ্ছে দোল খায় অভিমানী কষ্টগুলো 

দোল খায় ধর্ষিত ঝুলন্ত স্তনবৃন্ত 

সমাজের অন্ধকার আপোষনামা সে মানেনি 

মানেনি রক্তচক্ষুর বিষমাখা নষ্টামির 

আবাসিক চৌহদ্দির বিপথগামী পলাতকা চ্যাপ্টার

মধুমিতা হিসেব করে-

জীবনের প্রশ্নগুলোর অস্পর্শনীয় অত্যাচারিত সওগাত।


আনন্দিত অসভ্য নজরানা ঘিরে ধরে 

মধুমিতার তিমির রাতের নৈঃশব্দিক চুম্বন স্পৃহা 

বেদনার অঙ্কুরিত গর্ভাশয় স্ফীত হয় 

স্ফীত হয় দৈহিক অস্থিরতার আনাড়ি ভবিষ্যত 

প্রযুক্তির আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রকাশ করে-

কুমারী মধুমিতা ছয় মাসের গর্ভবতী।


বিপর্যয়ের স্মরণাতীত নৈসর্গিক শোভায়

প্রদোষের স্থবিরতা ভর করে 

লালায়িত কামনা পেশিশক্তির গুরুভারে

লৌহকঠিন বাজেয়াপ্তির উপকূলে আছড়ে পড়ে 

মধুমিতা হয়তো আগেই জেনেছিল; 

তার গর্ভাশয়ের পিতৃত্ব কিসমতের অপরাধী ট্রাইব্যুনাল।

 

 

সর্বনাশ 

সুশান্ত হালদার 

 

 

মনের অর্গল খুলে দিয়েছি ফারজানা 

দেখ হু হু করে বাতাস ঢুকছে কৈবর্ত ভবনে 

যে কয়টি ফুল ঝরেছিল আহত বিকেলে 

তারা এখন সতেজ

পাপড়ি মেলে দিয়েছে ষোল কোটি বাহুমূলে 


মাটিভেদী বৃক্ষ জানে 

জীবনদায়িনী, জীবনানন্দ ওই নীলাকাশ 

সাঁতার কাটা মৎস্য জানে 

উজান গাঙে ভাটির অবকাশ 

গীতাঞ্জলি জানে, গীতবিতানে 

পাতায় পাতায় তার শ্মশ্রুমণ্ডিত রবীন্দ্রনাথ 


আমিতো জানি 

রুক্ষ দিনে বৈরী বাতাস আমার-ই করবে  সর্বনাশ!  

 

 

প্রশ্ন

সুশান্ত সেন 

 

 

বড় ঠাকুমার ছিল পবিত্রতায় বালাই 

শুচিবাই বলতো সকলে,

সারাদিন ধরে জল ঘাটছেন

সরে যা সরে যা ছুসনি ছুসনি-করছেন

আমরা অবাধ্য ছুঁয়ে দিতাম।


এইভাবে বাড়তে বাড়তে ছুঁতে ছুঁতে এগিয়ে চলল

সভ্যতা। 

জানা গেলো "ছুওনা ছুওনা ছি"-কেবল 

বিভেদ বিভেদ বিভেদ

এবং অধিকার নিয়ে যুগ যুগ চলে আসা 

অচ্ছুত প্রথা; দাবিয়ে রাখা মানুষদের হাহাকার।


বৌদ্ধ ধর্ম কে হাটিয়ে দিয়ে অধিকার নিয়ে

ছিনিমিনি করে চলেছি জীবনভর।

অসীম বেদনার আম্বেদকর

বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। 

 

 

কমরেড 

রুদ্র সাহাদাৎ 

 

 

(১)

কমরেড 

সুন্দরবন পুইড়্যা ছাই, 

বন আর বন নাই 

হচ্ছে কী যা ইচ্ছে তাই

দেখছে কে শুনছে কে 

পুড়ছে পুড়ছে আগুন আগুন


(২)

কমরেড 

আমাগো মনুষ্যত্ববোধ জ্ঞান বিদ্যা বুদ্ধি পাইছে লোপ 

মানুষের ভীড়ে দ্যাখি আজও কোনো মানুষ নেই

মুখোশে হাসে জোড়া চোখ....


(৩)

কমরেড 

আজও মনুষ্যত্ববোধহীন মানুষ 

স্বার্থেহীন নয়

অবাক-পথচলা। 


(৪)

কমরেড 

নিত্যপণের হঙ্কারে বেহুশ বাবা-মা, নিকটবর্তী স্বজন 

বাজারে আগুন মনের গহীন জ্বলে আরও দ্বিগুণ 

শান্তি নেই স্বস্তি নেই জীবনের মূল্য কতোটুকু নেই জানা

দিকহারা পথভ্রষ্ট মানুষ আকষ্মিক মাঝপথেই দাঁড়িয়ে যাই 

তবুও, উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যহীন ছুটে যেতে চাই 

কি চাই কি পাই জানা নেই..


(৫)

কমরেড 

শতবর্ষী বৃক্ষরা কাঁদে কুরবানির শঙ্কায়

প্যারাবন কাঁদে স্বজন হারিয়ে সবুজ হারিয়ে 

হাওয়া উল্টে যায় গরম হাওয়া 

আবহাওয়া অফিস জানান দেয় সতর্ক সংকেত 

কই আছি কোথাই আছি-জানে ঐ ওপরঅলা


(৬)

কমরেড 

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ 

আরও কতোকাল। 

 

 

শুক্রবার রাতে

আহসানুল করিম

 

 

শুক্রবার রাতে অনেক কিছু করা যেতে পারে।


পানীয় আর প্রিয় কবিতার বই নিয়ে

ঢিলেঢালা উদাসিনতা আর লুঙ্গি পরে

বসা যেতে পারে বালিশে হেলান দিয়ে।


চিৎকার করে সুপর্ণাকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে

শীতকাল আদৌ যাবে কিনা।

অথবা শেষ ইচ্ছের উইলের ড্রাফট লিখতে বসা যায়।


এই যেমন এই মুহূর্তে আমি লিখছি-

দাফনকালে যেন আমার সাথে মোবাইলটা 

দিয়ে দেওয়া হয়

যাতে হারামি বন্ধুরা সব 

যে কোনো রাতে 

ফোন করে নিশ্চিত হতে পারে 

একাকিত্বের এই জাহান্নাম আসলেই যে;

অপেক্ষা করে আছে।

 

 

হয়ত লিখো না

অনিন্দ্য পাল 

 

 

হয়ত লিখো না কবিতায় 

বরং শরীরে লেখ তেত্রিশ পংক্তি 

হয়ত বড় রহস্যময় 

ঢেকুর উঠে গেলে শান্তি 


আকাশ লিখতে পারো গাঢ় লাল 

রাতের গায়ে দিতে পারো সবুজ ফোঁটা 

সমুদ্রকে বলতে পারো নিস্তব্ধ হতে 

'হয়ত' ভেসে যাক, সময়ের সোঁতা 


হজম হোক না হোক গলার নীল 

তুমি হতেই পারো বিষের কুঠুরি 

মৃত্যু জীবনের ডাল থেকে ঝরলে 

হয়তরা সব হবে হলুদ পাতা 


আনন্দের পংক্তিমালা নির্জলা 

'হয়ত'- একাই মাসিক দাবানল 

আর কত বছর বয়ে বেড়াবে 

বস্তাপাগল 

এবার কাটো শুকনো টুনদড়ি 

কলস মুক্ত কর দেহগত আদরজল... 

 

 

শৃঙ্খলার ফলাফল

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম

 

 

বিকেলের চোখে গোধূলির ছায়া নেমে গেলে 

আরও গভীরে আরও অন্ধকারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে 

অনিশ্চিত জীবনের সুক্ষ্ম আয়ুরেখা।

অনেকেই মনে রাখে না অনেকেই ভুলে যায়

চোখের ভেতর অন্য পৃথিবীর ছবি ভেসে ওঠে;

জীবন্ত হয়ে ওঠে বিদায়ের শ্বাশত বার্তা।

মানুষ তবু চোখে দেখা পৃথিবীর কথা ভাবে

নিয়মে-অনিয়মে সঞ্চয়ের কথা ভাবে

অমরত্বের পিছু ছোটে সর্বত্রই শৃঙ্খলিত হয়!


অথচ মৃত্যুই শ্বাশত—

মৃত্যুর মধ্যদিয়েই আমরা চিরস্থায়ী জগতে

অস্থায়ী পৃথিবীর ফলাফল ভোগ করি!

 

 

বেওয়ারিশ খাম

সারমিন চৌধুরী

 

 

সকালে পাঠানো একখানা চিঠি 

সন্ধ্যাবেলায় আবার ফিরে আসে যদি,

সেই ঠিকানাবিহীন বাদামী বেওয়ারিশ খাম

চিনে শুধু প্রেরকের উপনিবেশ।  


এখনও বুঝি অচেনা থেকে গেল- 

আমার সোজাসাপ্টা কাঁচা হাতের লিখা 

যাতে ছিল প্রণয়ভর্তি নিগূঢ় পরিশুদ্ধ আবেগ 

কী করেইবা বুঝবে তুমি কোন আবেগে হৃদয়ে 

রক্ত ঝরায়

হঠাৎ জ্বলে জ্বলে নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো

পাক দিয়ে ওঠে মন-পোড়া ধোঁয়া

লেখা বেঁকে গেলে থরথর কাঁপে পাঁজর 

অবশেষে ইতি টানি একশো এক পৃষ্ঠা নষ্ট করে 

সেই চিঠিও যদি অর্থহীন ঠেকে, কষ্টের স্ফুরণ ঘটে


জানলে না প্রতিটি আঁকিবুকি জুড়ে হায়

কত অভিলাষ অলক্ষে রয়ে গেলো

সেই ফিরতি খামের অন্তরালে।

 

 

কালো মানুষ

আবদুল কাদের আরাফাত

 

 

ভাই উঠেনতো, সাড়ে আটটা বাজে, আর কত ঘুমাবেন?

-ছুটির দিন একটু ঘুমাতে দিবা না মিয়া? রোজইতো ভোরে অফিসে যেতে হয়। চোখ কচলাতে কচলাতে আফাজ ভাইয়ের এমন মেকি রাগ আমার চেনা।

-আরে চলেনতো, একসাথে নাস্তা করবো, চাকুরির প্রথম মাসের বেতন পেলাম।

এই শহরে আপন বলতে আফাজ ভাই, গ্রামেও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই, যেটুকু আছে হায় হ্যালোর মোড়কে আবৃত। ওরা এড়িয়ে চলতে চায় বুঝে উঠতে সময় লেগেছে, আমার সাথে নাকি ওদের ম্যাচ হয়না। এত কালো মানুষ আমাদের দেশে তেমন নেই বলে ওদের ধারণা। প্রথম প্রথম খারাপলাগতো, কয়েক বছর ধরেই এসব গায়ে মাখি না। 

আফাজ ভাইয়ের হাতে মেন্যু কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ভাই আপনি পছন্দ করে অর্ডার দেন। ভাই মুচকি হাসিতে আমার পিঠে আলতো থাপ্পড় দিয়ে বললো- এত অস্থির হইও না মিয়া, মাত্র শুরু। 

এই হোটেলে আমি আর আফাজ ভাই খেতে এলে বিল তিনি দিবেন, এটাই যেন নিয়ম। মাঝেমাঝে আমি বিল দিতে চাইনা তা নয়, তবে বলার ধরন দেখে উনি ঠিকই বুঝে নেন আমার অবস্থ। এই প্রথম আমি উনাকে নাস্তা করাবো বলে নিয়ে এসেছি ভাবতেই চোখ ভিজে এলো। 

বিকালে নিউমার্কেট থেকে মা ও ছোট বোনের জন্য কিছু কেনাকাটা করলাম, বড়ো আপাকে ফোন করে কি লাগবে জিজ্ঞেস করতেই দেখি চুপ হয়ে গেলেন। বুঝতে পারছিলাম নিঃশব্দে কাঁদছে, ক্ষণিক পরেই বললো, এখন কিছু লাগবে না, সামনের মাসে একটি নাকফুল কিনে দিস। আর শুন ভাই, সম্ভব হলে একটু বড় ফুলেরটা নিস, যেন স্পষ্ট দেখা যায় নাকফুল আছে নাকে।

সকালে অফিসে আসার কিছুক্ষণ পরেই এমডি স্যার ডাকলেন। নানান বিষয়ে খোঁজ নিলেন। এক মাসেই আমার কাজে সন্তুষ্ট জানালেন তিনি। এভাবে মনোযোগী থাকলে আমার জন্য আরও ভালো কিছু অপেক্ষা করছে বলেও উৎসাহ দিলেন। 

স্যারের রুম থেকে ফেরার পর দেখি সফিক সাহেব চিৎকার করছেন, টাকা হারিয়েছে বলে। 

চিৎকার শুনে পাশের রুমের অনেকেই হাজির, এমডি স্যারও এসেছেন। সফিক সাহেব কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন- দেখছেন স্যার আর কখনো কিছু গায়েব হতে, নতুন লোক আসতে না আসতেই এই ঝামেলা শুরু।

সফিক সাহেবের সাথে তাল মেলালেনআরও দুইজন। এতক্ষণে নিশ্চিত হলাম ওরা আমাকেই ইঙ্গিত করছে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না কেন এমন করছে, ওদের কোন ক্ষতি তো করিনি। এমডি স্যার আমার কাজে খুশি এটাই কি ওদের হিংসার কারন? নাকি আমার মত কাউকে ওরা মেনে নিতে পারছে না? তীব্র অপমানে হাত পা কাঁপছে, বুঝা যাচ্ছে এমডি স্যারও বিব্রত।

সফিক সাহেব এলোমেলো কথা বলেই যাচ্ছেন। ক্ষাণিক পরেই এমডি স্যার আমাকে ডাকলেন। অনেকটা বিব্রত হয়েই বললেন, 'আপনাকে আমাদের খুব দরকার ছিল, আপনার মেধা আর শ্রমে আমাদের প্রতিষ্ঠান উপকৃত হবে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আজকের ঘটনায় বুঝতে পারছি এখানে আপনার পথ মসৃণ হবে না, ওদের আচরণ দেখে মনে হলো আপনি থাকলে একটা না একটা ঝামেলা করতেই থাকবে। আমি যে কিছু বুঝিনা তা নয়, কিন্তু কি আর করবো বলুন! ওরা অনেকদিন ধরে এখানে, ওদের ডিঙিয়েও প্রতিষ্ঠান চালাতে পারবো না। আপনি বরং চলে যান আজ, আর আসার দরকার নেই কাল থেকে। এই মাসের পুরা বেতন পাঠানোর ব্যবস্থা করবো। আপনার প্রতি দোয়া রইলো, নিশ্চয়ই এর চেয়ে ভালো কিছু হবে, ধৈর্য ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে যান।'

স্যার একটানা কথাগুলো বলে থামলেন। আমার চোখে তখন প্লাবন। স্যারকে কোনমতে বললাম, 'দোয়ায় রাখবেন স্যার, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ইনশাআল্লাহ একটা না একটা ব্যবস্থা হবে। কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে শীঘ্রই।'

কলিগদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছি, এমন সময়ও সফিক সাহেবের খোঁচা, 'কইছিলাম না এত উড়াউড়ির দরকার নাই, এক মাসেই এমডি স্যারের প্রিয় হয়ে যাবেন এত সোজা! যান গ্রামে গিয়ে হালচাষ করেন, আপনারে এটাই ভালো মানাবে।' 

ভেজা চোখ মুছতে মুছতে শেষ বারের মত দেখে নিলাম বিতাড়িত হওয়া কর্মস্থলের গেট। আমার কানে বেজেই চলেছে বড় আপার সেই আবদার, 'সামনের মাসে একটি নাকফুল কিনে দিস, আর শুন ভাই, সম্ভব হলে একটু বড় ফুলেরটা নিস, যেন স্পষ্ট দেখা যায় নাকফুল আছে নাকে।' 

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন