https://www.prothomalony.com/

18450

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০২:২১

সমন্বয়ক

খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন 

কিছুদিন যাবৎ এলাকায় নতুন উৎপাত শুরু হয়েছে।'নতুন' বলতে—আগের অসংখ্য উৎপাতের সঙ্গে  যোগ হয়েছে উঠতি বয়সের পোলাপানদের মাস্তানি! 

ঘরে পিঁপড়া-তেলাপোকা, মশা-মাছি আর ইঁদুর-চিকার যন্ত্রণায় গৃহস্থ যেমন বিব্রত হয়। রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুর এবং বন্য শিয়াল-বাঁদরের উৎপাতে গ্রামবাসীর শান্তি বিঘ্নিত হয়—ঠিক তেমনই এদের সাথে যোগ দিয়েছে মহল্লার ও বহিরাগত বখে যাওয়া উঠতি কিছু তরুণ। অতি সম্প্রতি বিষয়টি মহামারীর রূপ ধারণ করেছে! চেনা-পরিচিতদের পাশাপাশি অপরিচিত আরো অনেকেই এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা নিজেদের 'সমন্বয়ক' বলে পরিচয় দেয়। কিশোর গ্যাং অবশ্য আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে এই নতুন চক্রটির পরিচয় ও সত্তা আলাদা। তাদের ধারণা, তারা প্রচলিত ধারার মাস্তানও নয়,আবার সাধারণ কিশোর গ্যাংও নয়। তারা নিজেদের 'সমন্বয়ক' ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মাস্তানদের ঊর্ধ্বে এবং কিশোর গ্যাংয়ের বাইরে তাদের অবস্থান। 

 

'সমন্বয়ক' ট্যাগধারী এই চক্রটি মনে করে, মাস্তান আর কিশোর টোকাইদের চেয়ে তারা অনেক বেশি 'মেধাবী'। দেশ ও সমাজের জন্য তাদের রয়েছে গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ, যা ওদের নেই! তাই এদের কেউ মাস্তান বা কিশোর গ্যাং বললে আর রক্ষা নেই, তখনই প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে তাদের আসল রূপ!  তথাকথিত মেধার তাড়নায় অতিষ্ঠ হয়ে তারা সারাক্ষণ ছটফট করে ও বিরক্তিকর আচরণ করে বেড়ায়। যৌবনের অসহনীয় তাড়নায় কোনো কোনো প্রাণী যেমন অস্থির হয়ে ওঠে, এদের অবস্থাও হয়েছে অনেকটা তেমনই।

মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এই সমন্বয়কদের ভাষ্যমতে, মাস্তান ও কিশোর গ্যাং হলো সমাজের 'কীট', আর শক্ত হাতে এদের দমন করাও তাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রয়োজনে আমজনতাকে রাস্তায় নামিয়ে 'মব' সৃষ্টি করার ক্ষমতাও তাদের আছে। অবশ্য এই মহাযজ্ঞ সাধনের জন্য আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজনও রয়েছে ব্যাপক। তাই তারা দেশ ও সমাজের সকলের সহৃদয় সুদৃষ্টি কামনা করে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান স্বপ্রণোদিত হয়ে আর্থিক অনুদান দিতে চাইলে, তারা সানন্দে ও কৃতজ্ঞতার সাথে তা গ্রহণ করতে সর্বদাই প্রস্তুত। তাদের দাবি, চূড়ান্ত বৈষম্যহীন সমাজ গড়তেই তারা রাস্তায় নেমেছে এবং এ ব্যাপারে মানুষের অকুণ্ঠ সহযোগিতা দরকার। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই খাতা-কলম সাথে নিয়ে তারা এলাকা চষে বেড়ায়। মানুষের কাছে গিয়ে নিজেদের উপস্থাপন করে এবং তাদের কথা শুনতে বাধ্য করে। 

 

রহমান মিয়ার 'আব্বা-আম্মার দোয়া' দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চিতে বিকেলের তপ্ত রোদে বসে চা-বিস্কুট খাচ্ছিলেন মকবুল সাহেব। রাস্তার ডান দিকে তাকিয়ে তিনি খেয়াল করলেন, আসাদুল সাহেবের মতো কেউ একজন বাজারের দিকে আসছেন।

ঠিক তখনই দুটি দামি মোটর-বাইক এসে থামল মকবুল সাহেবের সামনে। আকস্মিক এই দৃশ্য দেখে নড়েচড়ে বসলেন তিনি। মকবুল সাহেব দেখলেন, বাইকগুলোর হ্যান্ডেলে লাল-সবুজ ফিতা ঝুলছে, আর সবার বুকে ঝুলছে চকচকে ল্যামিনেটেড কার্ড—যেখানে বড় লাল অক্ষরে লেখা 'সমন্বয়ক'।

আসাদুল সাহেব পাশের একটি ছোটো বেঞ্চে বসলেন। মকবুল সাহেব বললেন, 'আসাদ চা খাবি নাকি?' 'এখন না' বলে আসাদুল তাকিয়ে রইলেন সামনের দিকে।  

নেতা গোছের এক তরুণ বাইক থেকে নেমেই গম্ভীর গলায় বলল, 'এই যে মুরুব্বি, রাস্তায় এইভাবে জটলা পাকাইয়া বইসা আছেন কেন? সিস্টেমের গতিশীলতা কী ব্যাহত হইতেছে না?'

মকবুল সাহেব চায়ের কাপে ছোট একটা চুমুক দিয়ে নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকালেন। এরা তাঁর পরিচিত নয়। সম্ভবত তাঁর এলাকার নয় তারা। তিনি মাথা উঁচু করে বললেন, 'জটলা কোথায়? আমি তো দোকানের জায়গায় বসে আছি!'

অন্য একজন হাত নেড়ে বলল, 'আমরা তো জটলাই দেখিতেছি!'

'বাবারা, বয়স হয়েছে তো! একটু জিরিয়ে নিচ্ছি।' মকবুল সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, 'গতিশীলতা তো বাইকের চাকায় থাকে। আমাদের এই বুড়ো শরীরে তো ওই ইঞ্জিন নেই!'

তরুণটি ভুরু কুঁচকে খাতা বের করে বলল, 'বলিতেছি কী, আপনাদের এই চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করিতে হইবে। হ্যাঁ, সমূলেই পরিবর্তন করিতে হইবে। আমরা সমাজকে নূতন করিয়া গঠন করিতেছি। আপনারা হইলেন পুরনো প্রজন্মের অবক্ষয়ের নমুনা। আপনাদের কারণেই সমাজে বৈষম্য টিকিয়া আছে। এই সমাজ গতি পাইতেছে না, আর আমরা ইহার পরিবর্তন চাই! এই জন্যই আমাদের বিপ্লব!  হ্যাঁ, আমরা জেন-জি!'

ঠিক তখনই আসাদুল সাহেব মকবূল সাহেবের বেঞ্চে এসে তাঁর গা ঘেঁষে বসলেন। দু'চোখ গোল করে তরুণটির দিকে তাকিয়ে তিনি ফিসফিস করে মকবুল সাহেবকে বললেন, 'শুনছিস মকবুল, এরা সাধু ভাষায় বলে কী! আমরা নাকি অবক্ষয়ের নমুনা! মানে বাতিল মাল! আবর্জনা!'

মকবুল সাহেব বিস্কুট চিবুতে চিবুতে বললেন, 'আরে রাখ তো! এই সব পোলাপান এখন আসমান ফুঁড়ে বের হয়েছে। এরা তো দেখি মেধার ফানুস ছাড়া কাজের কিছুই না! হে!  জেন-জি! সমন্বয়ক!'

আসাদুল সাহেব ডান তর্জনী উঁচিয়ে সমন্বয়কদের উদ্দেশে বললেন, 'এই যে দেখছ মুরুব্বীকে। জানো তিনি কে? তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কলেজ-শিক্ষক!' 

মকবুল সাহেবও এবার তর্জনী উঁচিয়ে বললেন, 'আর উনাকে দেখতে পাচ্ছ, জানো উনি কে? তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী-কর্মকর্তা! আমরা এমনি এমনি মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসিনি!'

'চুপ করেন আপনারা!' তেড়ে এল হলুদ গেঞ্জি পরিহিত সমন্বয়ক। 'আপনারা জানেন না আমরা কারা? মাস্তান বা কিশোর গ্যাংয়ের মতো ভাবিবেন না আমাদের। আমাদের দেখিয়া কি মাস্তান আর কিশোর গ্যাং মনে হয়? আমরা হইলাম প্রেসার গ্রুপ। সমাজ হইতে সমস্ত আবর্জনা-কীট পরিষ্কার না করা পর্যন্ত আমাদের বিপ্লব থামিবে না!'

বাইক থেকে কালো গেঞ্জি পরিহিত সমন্বয়ক বলে উঠলো, 'বৈষম্য আমরা দূর করিবোই! তাহার পূর্বে আমরা ফিরিবো না!'  

মকবুল সাহেব এবার চশমাটা নাক থেকে নামালেন। শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, 'বাবারা, তেলাপোকা মারার জন্য কেউ কি কখনো পুরো বাড়িটাই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়? বৈষম্য দূর করতে নেমে তোমরা যে রোজ সাধারণ মানুষের মনের শান্তি তছনছ করে দিচ্ছ, সে হিসাবটা আমরা কার কাছে দেবো একটু বল তো?'

সমন্বয়করা থমকে গেল। আসাদুল সাহেব মনে মনে ভাবলেন, এদের মুখে 'বৈষম্য' দূর করার স্লোগান তত্ত্বের বইয়ে সাধারণ মানুষের এমন সহজ ও মোক্ষম যুক্তির কোনো উত্তর লেখা নেই। তিনি তাকিয়ে দেখলেন, তারা একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।

 

আসাদুল সাহেব কোমরে হাত রেখে হো হো করে হেসে উঠলেন। তিনি গলা উঁচু করে বললেন, 'যাও বাবারা! পুরা দেশের বৈষম্য দূর করো গে যাও ...!' তিনি দুহাত নাড়িয়ে যোগ করলেন, 'তবে যাওয়ার আগে রাস্তাটা ঝাড়ু দিয়ে যাও তো! দেখছি তোমাদের দাপটে বাজারের রাস্তাটা আরও বেশি নোংরা হয়ে গেছে!'

 

পরিস্থিতি এবার অন্য দিকে মোড় নিয়েছে। সমন্বয়কদের কারও মুখে শব্দ নেই। মানুষের ভিড় দ্রুতজমাট বাঁধল অকুস্থলে। উপস্থিত লোকজন, পথচারী ও পাশের দোকানদারদের মধ্যে চাপা হাসির রোল উঠল। 

এবার মোটর-বাইক দুটি গুলি খাওয়া বাঘের মতো গর্জে উঠল। চার সমন্বয়ক হতাশার চাহনি নিয়ে তাকাল মকবুল ও আসাদুলের দিকে। 

ওদিকে ভিড়ের মধ্যে 'সমন্বয়ক!' ও 'নীপাত যাক!' সম্মিলিত গুঞ্জন উঠল। 

মকবুল সাহেব এবার বললেন, 'আমি তো দেখছি পায়ে পারা দিয়ে অনর্থক ঝগড়া বাঁধানোর মতো কাজ করছ। বাবারা, তোমরা যদি ভালো কাজ করতে চাও, তবে মানুষদের বুঝাও। তাদের কষ্ট লাঘব করতে এগিয়ে আসো, হাত বাড়িয়ে দাও। দেখবে, তারা তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছে, কাছে টেনে নিচ্ছে।'

আসাদুল সাহেবও কেশে বললেন, 'এখন তোমরা যা করছ, তাতে মানুষ তো বিরক্ত হচ্ছে! প্রশ্নও তুলছে। শুনতে পাচ্ছ তো, তারা স্লোগান দিচ্ছে, 'সমন্বয়ক নীপাত যাক!' কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো? যাও তোমরা আগে নিজেদের সংশোধন করো। তোমাদের এই আচরণ তো মাস্তানদের আর টোকাইদের থেকে ভিন্ন কিছু নয়! এ ভাবে বৈষম্য দূর করা যায় না! মানলাম তোমরা মেধাবী। যাও পড়াশুনায় মন দাও! আগে প্রতিষ্ঠিত হও। তোমাদের মা-বাবার স্বপ্ন সফল করো। তোমাদের সেই সফলতা দেখার জন্য আমরা মুখিয়ে আছি!'

 

নিজেদের তথাকথিত মেধার বেলুন এভাবে চুপসে যেতে দেখে 'সমন্বয়ক' ট্যাগধারীরা আর এক মুহূর্তেও দাঁড়াল না। প্রচণ্ড শব্দ তুলে ধুলো উড়িয়ে সাদা-কালো রঙের মোটরবাইক দুটি বাজারের গলির মোড় পার হয়ে হারিয়ে গেল ।

মকবুল সাহেব মুচকি হেসে এবার চায়ে চুমুক দিলেন। রহমান মিয়া উঁচু স্বরে বলে উঠলেন, 'আসাদ চাচা, চা-বিস্কুট খান তো! কী আর কমু কন! দেখলেন তো, এরা মাছি খেদাইতে আইসা বাঘের দেখা পাইয়া জান নিয়া পালাইল কেমনে!' 

আশে পাশের দোকানি, ক্রেতা ও পথচারী সকলে শব্দ করে হেসে ওঠল, সুর মিলিয়ে একযোগে হাত উঁচিয়ে বলে উঠল, 'সমন্বয়ক নিপাত যাক! নিপাত যাক...!' 

 

এ সময় শান্তিপুর বাজারের শতবর্ষী বটগাছের সবগুলো কাক ডানা মেলে উড়ে আসে 'আব্বা-আম্মার দোয়া' দোকানের উপর। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত কা-কা রব মিশে গেল  প্রতিবাদী জনতার 'নিপাত যাক! নিপাত যাক!' মুখরিত স্লোগানের সাথে।

 

 

ভাষার বিবর্তন ও সাহিত্যের ভাষা

আরজাত হোসেন 

আমরা কমবেশি সবাই নিজের লেখা পাঠকপ্রিয় হোক তা প্রত্যাশা করি। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছি কি, কেন আমার লেখাটি তাঁরা পড়বেন? কেন লেখাটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে? একটি লেখা পাঠকপ্রিয় হতে ভাবের সৌন্দর্য বেশি প্রয়োজন, নাকি ভাষা সৌন্দর্য? 

এই দ্বন্দ্ব আমাদের সবারই থাকে। তবে সবাই এসব বিবেচনা করি না। ফলে অনেক ভালো লেখাও পাঠকের কাছে পৌঁছায় না; সময়ের সঙ্গে লেখকও বিস্মৃত হয়ে যান। পাঠককে আকৃষ্ট করার জন্য অনেক লেখক অনেক রকম কৌশল অবলম্বন করে থাকেন, কেউ যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে সমকালীন বিষয়ে লিখেন কেউ নতুন ভাব তৈরি করেন, আবার দেখা যায় কেউ কেউ ভাষাগত পরিবর্তন আনেন । এমনও আছে সাহিত্য ভাষাকে আলাদা পরিচয় দেন, তবে "সাহিত্যিক ভাষা নামে আলাদা কিছু আদৌ আছে কি?" 

মৌলিকভাবে বলতে গেলে আমি বলব সাহিত্যের আলাদা কোনো ভাষা নেই, আমরা যা বলি তার উত্তম গঠনই হচ্ছে সাহিত্য, সাহিত্যের ভাষা। সাহিত্যিক ভাষা হলো কোনো ভাষার সাহিত্যিক প্রয়োগের একটি বিশেষ রীতি; এটি সেই ভাষার বাইরে পৃথক কোনো ভাষা নয়।

 

ভাষার গতিশীলতার কারণে একেক সময় ভাষার একেক রকম অবস্থান ছিল। সহজ উচ্চারণের মাধ্যমে ভাষার পরিবর্তন হয় বলে যুগের পরিবর্তনকালে ভাষার ভিন্নতা লক্ষ‍্য করা যায়। প্রাচীন যুগের ভাষার সাথে বর্তমানের ভাষা আকাশসম তফাৎ, মধ্যযুগের চেয়ে বর্তমান ভাষা পরিমার্জিত এবং সহজ । তাই আমাদের কাছে মনে হয় মধ্যযুগীয় এবং প্রাচীন ভাষা অনেক কঠিন ছিল। আবার এমনও হতে পারে আজকের এই ভাষা ভবিষ্যতে কোনো সময়ে গিয়ে দারুণ পরিবর্তন আসবে। তখন আজকের এই ভাষাকে তারা দুর্বোধ্য মনে করবে । কাজেই বলা যায় সাহিত্যের আলাদা কোনো ভাষা নেই, কিন্তু ভাষার আলাদা ভাব, চয়ন ও সৌন্দর্য আছে । আজকের দিনে এসে মধ্যযুগীয় ভাষায় লিখলে তা কখনোই লেখার শিল্প নয়। যুগে যুগে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত কবিই চেয়েছেন সহজ ও মার্জিত ভাষায় নিজের লেখা পাঠকের কাছে উপস্থাপন করতে। লেখার সহজ ভাষায় জটিল বিষয় উপস্থাপন করাটাই সাহিত্য ।

 

চেক ভাষাবিজ্ঞানী ইয়ান মুকারোভ্‌স্কি (Mukarovsky, J. (1976). On Poetic Language) বলেছিলেন, কবিতার ভাষা ভাষার একটা আদর্শমান (norm) থেকে সরে যায়, সৌন্দর্যসৃষ্টির কতকগুলি বিশেষ প্রকরণ সম্পাদনের জন্য। স্ট্যান্ডার্ড ভাষাই সেই আদর্শমান(norm)। বর্তমান অনেকে হয়তো একেই সাহিত্যের ভাষা বলে চিহ্নিত করে। কিন্তু আদতে তা কেবলই ভাষার একটি মার্জিত গঠন, না কোনো সাহিত্যের আলাদা ভাষা।

যে লেখকরা ভাষার উক্ত সৌন্দর্য ও মার্জিত রূপকে সাহিত্যের আলাদা ভাষা বলেছেন পরিচিতি দিচ্ছেন তা কি আদৌ সঠিক বিবেচনায় আনা হয়েছে ? পাঠকের ওপর পূর্ববর্তী যুগের দুর্বোধ্য ভাষারীতি চাপিয়ে দিয়ে সেটিকে 'সাহিত্যিক ভাষা' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সমীচীন নয়। দুর্বোধ্য লেখা সান্ত্বনা হতে পারে, সাহিত্য নয়। ভাষার গতিশীলতা আজকের সহজ ভাষাকে আগামীকাল কঠিন করে তুলবে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। মধ্যযুগীয় ভাষা আজকের সাহিত্যভাষা হতে পারে না, যারা পাঠকের মাথায় এভাবে কাঁঠাল ভাঙেন, তাঁরা মূলত ভাষাকে সামনে নয়, বরং পেছনে নিয়ে যেতে চায়!

 

সময়ের পরিবর্তন, মানুষের কর্মব্যস্ততা এবং জীবনের নানা বাস্তবতার কারণে বর্তমান পাঠকসংখ্যা কমেছে। এর মধ্যেও বাস্তবতাকে ধারণ করতে গিয়ে মানুষ সাহিত্যের দিকে ঝুঁকেছে। অথচ এই বৈপরীত্যের মধ্যেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের পাঠকসংকটগ্রস্ত সাহিত্যসমাজ ! মানুষের সময় কমেছে, লেখার গঠন ছোট হয়েছে, পত্রিকায় বড় বড় অক্ষরে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া, এত এত শব্দের মধ্যে লেখতে হবে, এত এত পঙক্তির মধ্যে লেখতে হবে । অবশ্য সাহিত্যের এমন করুণ সময়ে কিছু পত্রিকা এখনো আছে যেগুলো লেখায় সীমাবদ্ধতা রাখেনি, লেখক যেখানে থামে । এই পত্রিকাগুলোকে আমি সাধুবাদ জানাই ।

 

গত কুড়ি বছরে সাহিত্যিকগণ যা বলেননি, আজ আমি তা বলব।

পুরোনো সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রভাব: বাংলা সাহিত্যে সাধুভাষার দীর্ঘ ব্যবহার ছিল। পরে চলিত রীতি প্রতিষ্ঠিত হলেও আগের ধারণাটি পুরোপুরি বিলীন হয়নি। ফলে অনেকের মনে রয়ে গেছে, সাহিত্যের ভাষা বুঝি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার চেয়ে আলাদা কোনো পরিশীলিত ভাষা। অথচ চলতি ভাষাই সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপাদান; কিন্তু সাহিত্যিক প্রয়োজনে সেটি নির্বাচিত, পরিশীলিত ও শিল্পিত হয়ে ওঠে।

সাহিত্যের মর্যাদা তার দুর্বোধ্যতায় নয়, তার শিল্পে।সাহিত্যিক ভাষার মূল্য তার অপরিচিতিতে নয়, তার প্রকাশক্ষমতায়। পাঠককে অভিধান হাতে নিয়ে লেখকের দরজায় দাঁড় করানো সাহিত্যিকতার প্রমাণ নয়।

 

এবার আসি কেন মানুষ আপনার লেখাটি পড়বে? কীভাবে পাঠকপ্রিয় হবে? 

লেখক যদি এমন কিছু বলেন যা পাঠক নিজে অনুভব করেছে কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করতে পারেনি, তখন লেখাটি পাঠকের কাছে বিশেষ হয়ে ওঠে। 

ভাষা সহজ, কিন্তু সাধারণ নয়:  সহজ ভাষা মানে সাদামাটা ভাষা নয়। ভালো লেখায় ভাষা স্বাভাবিক, পরিষ্কার, অর্থবহ ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়। পাঠককে প্রতিটি বাক্যের অর্থ উদ্ধার করতে অভিধানে যেতে হলে পড়ার স্বচ্ছন্দতা নষ্ট হয়।

 

অপ্রয়োজনীয় কথা বাদ দিতে হবে: একটি ছোট গল্প, কবিতা বা প্রবন্ধও গভীর হতে পারে। যে বাক্যটি লেখার প্রয়োজন মেটায় না, সেটি বাদ দেওয়ার সাহসও লেখকের থাকতে হয়।

পাঠককে সম্মান করতে হবে: লেখক যদি মনে করেন, "আমি কঠিন লিখব, পাঠক বুঝতে না পারলে তার সমস্যা", তাহলে পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। লেখকের কাজ হলো জটিল ভাবকে সহজ ও শিল্পিতভাবে প্রকাশ করা। তবে পাঠকপ্রিয় লেখার জন্য শুধু সুন্দর ভাব যথেষ্ট নয়, শুধু সুন্দর ভাষাও যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ভাবের মৌলিকতা, ভাষার স্বচ্ছতা, প্রকাশের শিল্প এবং পাঠকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযোগ।

 

তাই উচিত হবে লেখায় জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা এড়ানো। মধ্যযুগে ভাষা যে অবস্থান ছিল তা আজকের দিনে সাহিত্য ভাষা ভাবাটাই নির্বোধের পরিচয়। আজকের দিনের চলমান ভাষাতেই সহজবোধ্য প্রকাশ হতে পারে উৎকৃষ্টতার  উদাহরণ। নিশ্চয়ই আজকের এই ভাষা আগামী কোনো এক সময় আজকের মতো থাকবে না। সাহিত্যও যুগে যুগে ভাষার পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ভাষার পরিবর্তিত রূপকে ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন