https://www.prothomalony.com/
18443
literature
কবিতার একপাতা—অস্টম বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা
—————————————————————-
পাতা-১
কত দ্রুত সময় ফুরিয়ে যায়! আট বছর হয়ে গেল!
বিশেষ সংখ্যাসহ ৯৬ টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে গেছে!
আমরা আনন্দিত। যাঁর শ্রমে,মেধায় ও ভালোবাসায়
এই অসাধ্য সাধন, সম্পাদক কবি ফারুক ফয়সলকে বলি— আপনি পেরেছেন। আপনাকে টুপি খোলা অভিবাদন!
যাঁদের কবিতা গত আট বছর প্রকাশ হয়েছে, তাঁদের সহ বাংলা ভাষার সকল কবিকে অভিনন্দন ও ভালোবাসা। কবিতাপ্রেমী পাঠকদের জন্য আমাদের ভালোবাসা।
ইব্রাহীম চৌধুরী
সম্পাদক, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা
অষ্টম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা বার্তা
——————————————————
অভিনন্দন ও শুভকামনা
মাসুদ খান
(কবি)
বাংলাভাষার চর্চাকে বিশ্ববাংলায় সম্প্রসারণ ও বিস্তারের কাজে ’প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা’ আর বাংলাকবিতাকে স্পন্দমান রাখার কাজে ‘কবিতার এক পাতা’-র ভূমিকা অনস্বীকার্য। নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ‘কবিতার এক পাতা’ সম্পাদনা করে আসছেন কবি ও প্রাবন্ধিক ফারুক ফয়সল। পাতাটির জন্য যথাসময়ে কবিতা সংগ্রহ, যত্নসহকারে সেগুলি ছাপানো, এমনকী মুদ্রিত কবিতাগুলির সফট কপি কবিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সবই তিনি করে আসছেন ব্যত্যয়হীনভাবে। পাতাটির সজ্জা, অলংকরণ ও মুদ্রণসৌকর্য প্রশংসনীয়। অপরাপর কবিদের পাশাপাশি পাতাটিতে আমারও কবিতা ছাপা হয়ে আসছে নিয়মিত। ’কবিতার এক পাতা’-র অষ্টম বর্ষপূতি উপলক্ষে পাতাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা।
‘কবিতার একপাতা’ নয় নিতান্তই একপাতা
তাপস গায়েন
(কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক)
‘কবিতা কী’— এই প্রশ্নের সম্ভাব্য একটি উত্তর হলো কবিতা হচ্ছে তাই যা এখনো লেখা হয়ে উঠেনি। এই ধরণের উত্তর আমাদেরকে এমন এক প্রান্তিকতায় নিয়ে যায়, যেখানে কবিতা নিয়ে আলোচনা আর সহজসাধ্য হয়ে উঠে না; তবে আমরা অলিখিতভাব মেনেই
নিয়েছি—কবিতা হলো ভাষার সর্বোত্তম প্রকাশ, আর যে কোন ভাষারই আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। তিনিই প্রকৃত কবি যিনি তাঁর অবচেতন এবং চেতন—এই দুই স্তরেই ভাষা এবং সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস এবং তার বৈভবকে উত্তরকালে বইয়ে দেন। কবি এবং সম্পাদক ফারুক ফয়সল ‘কবিতার একপাতা’র মধ্য দিয়ে কবিদের ফেরি করে ফিরছেন। যদিও প্রকৃত কবিকে ধরা উজ্জ্বল দিনের আলোয় হারিকেন নিয়ে ঈশ্বর সন্ধানের মতো, তবু ফারুক ফয়সল এই দূরুহ কাজটি করে চলেছেন দীর্ঘ আট বছর ধরে। কবি ফারুক ফয়সলের সুযোগ্য সম্পাদনার মধ্যে দিয়ে ‘কবিতার একপাতা’র তরীটি বাংলা কবিতাকে বেগবান করে বয়ে চলছে ভবিষ্যতের দিকে। ‘কবিতার একপাতা’ এবং কবি-সম্পাদক ফারুক ফয়সল বাংলা সাহিত্যে অচ্ছেদ্য হয়ে উঠুক—
এই আশা রাখছি।
কবিতার একপাতা
নাহার মনিকা
( কবি ও কথা সাহিত্যিক)
‘কবি নয়, কবিতা ছাপা হয়’—‘প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা’ গত আট বছর ধরে প্রতিমাসে সাম্প্রতিক কবিতার যে একপাতা প্রকাশ করছে, তা দেখে একথা মনে আসা খুব অস্বাভাবিক নয়।
কবিতা বাংলা ভাষায় সাহিত্যের একটি বহুল চর্চিত শাখা। প্রচুর কবিতা লেখা হচ্ছে, সেসবের মধ্য থেকে শিল্পসুষমাময় ও মানসম্পন্ন কবিতা দিয়ে নিয়মিতভাবে
একটি পাতা প্রকাশ করতে কবিতার প্রতি গভীর অনুরাগ থাকা দরকার। এই পাতার সম্পাদক— কবি ও প্রাবন্ধিক ফারুক ফয়সল নিবিষ্টভাবে দীর্ঘদিন ধরে সে কাজটি সম্পাদন করে চলেছেন। একটি চিত্তাকর্ষক কবিতার একপাতা প্রকাশ যে দেশের বাইরে বসেও সম্ভব, ‘কবিতার একপাতা’ এর একটি সেরা উদাহরণ।
নানা বিষয় নিয়ে ‘কবিতার একপাতা’ প্রকাশিত হয়, বিষয়গুলো খুবই বিবেচনাপ্রসূত। সমসাময়িক বিষয় তো আছেই, সেই সঙ্গে বাঙালির বিশেষ দিবস ও ঐতিহ্যও স্মরণে রাখা হয় ‘কবিতার একপাতা’য়। উত্তর আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হলেও এতে দেশের এবং প্রবাসের তরুণ ও জ্যেষ্ঠ সকলেই মনোযোগ পান, অর্থাৎ কবিতার মান ও বৈশিষ্ট্য গুরুত্ব পায়। যে কারণে, সুন্দর অলংকরণ সহযোগে মনোগ্রাহী ‘কবিতার একপাতা’ কবি ও পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করছে।
কবিতার এক পাতা’র সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করি।
কবিতার সৌন্দর্যচর্চায় নিরলস অভিযাত্রী
ওবায়েদ আকাশ
(কবি ও সম্পাদক)
কবিতাকে ভালবাসেন না অনেকে। কারণ হিসেবে দাঁড় করান যে, তারা কবিতা বোঝেন না। অর্থাৎ, তাই বলে কি তারা কবিতাকে ভালবাসেন না? এ কখনো হতে পারে না। কেননা কবিতার সঙ্গে অপরূপা নারী কিংবা অনিঃশেষ ঘ্রাণময়ী ফুলের সৌন্দর্য চিরকাল পাশাপাশি হাঁটে। কিন্তু কবিতার সৌন্দর্য এতটাই চূড়াস্পর্শী যে, তাকে অনেকে স্পর্শ করতে পারেন না। আবার অনেকে তা চেষ্টাও করেন না। তবু সারা পৃথিবীতে কবিতার যে রাজত্ব চলছে— রাজপ্রাসাদ থেকে দলিত অবহেলিত পর্যন্ত— এর প্রমাণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। যে কোনো আবেগঘন মুহূর্তে যখন আমরা সুনির্বাচিত শব্দের মাধ্যমে ভাষার কাব্যিকতা খুঁজি— তখন কবিতাকে স্পর্শ করতে হয়। আমাদেরকে কবিতা বুঝতে শিখতে হবে যেমন, তেমনি কবিতা পাঠের উপযোগী করে নিজেকে নির্মাণও করতে হবে। উত্তর আমেরিকা থেকে নিয়মিত প্রকাশিত কবিতার একপাতা দীর্ঘ আট বছর ধরে সৌন্দর্য চর্চা করে চলেছে। দেশ বিদেশের বিপুল-সংখ্যক বাঙালির কবিতা ও কবিতা ভাবনাকে একত্র করে পাঠক মহলে ছড়িয়ে দিচ্ছে অর্থ তারা কবিতাকে সযত্ন ভালবাসা দিয়ে লালন করছে। একটি কবিতাপাগল হৃদয় যখন কবিতার একপাতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন, তখন এই সম্পাদনার সার্থকতা অনুভূত হয়। কবিতার একপাতার যাত্রা সুগম ও ঐশ্বর্যময় হোক। অষ্টম বর্ষ পূর্তিতে শুভেচ্ছা ও ভালবাসা।
আমাদের সাহিত্যচর্চায় অনন্য মাত্রা যোগ
রুদ্রশংকর
( কবি, লেখক ও সম্পাদক)
বাংলা কবিতার প্রসার ও বিকাশকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ‘কবিতার এক পাতা’ যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই প্ল্যাটফর্মটি নতুন ও প্রবীণ লেখকদের লেখনীকে এক সুতোয় গেঁথে সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ পরিবেশ গড়ে তুলেছে। সম্পাদক- কবি ও প্রাবন্ধিক ফারুক ফয়সলের মেধা, শ্রম ও নিষ্ঠার ফলেই এটি আজ পাঠকের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
আমাদের আত্মপরিচয়ে ও সাহিত্যচর্চায় অনন্য মাত্রা যোগ করেছে ‘কবিতার এক পাতা’। আমরা বিশ্বাস করি, আগামী দিনগুলোতেও ‘কবিতার এক পাতা’ তার এই গৌরবময় ধারা বজায় রেখে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে এবং বিশ্বজুড়ে বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে যাবে।
পাতা-২
বাংলাদেশের কবিতাঃ
——————————
পঞ্চজন্মগুচ্ছ
ঝর্না রহমান
বিজ্ঞান শিক্ষক বলেছিলেন, পদার্থের কোনো ধ্বংস নেই,
রূপান্তর আছে। মানুষও মৃত্যুর পরে শেষ হয় না, দেহের
রূপান্তর ঘটে মাত্র। তুমি কাফকা পড়ে বলেছিলে,
ছেলেটা বেঁচে থেকেই গুবরে পোকা হয়ে গেল? ধেৎ! এ
কেমন রূপান্তর, এ তো তার কদর্য মৃত্যু! এর চেয়ে মৃত্যুর
পর সুদর্শন হয়ে জন্মানো কত ভালো! সন্ধ্যার
আলোছায়ায় উড়ে উড়ে আমার পুরনো গ্রাম খুঁজে
নেবো। তুমি কী চাও? রূপান্তর না পুনর্জন্ম - আমাকে
প্রশ্ন করেছিলে।
আমি? আমি পঞ্চজন্মের একটি গুচ্ছ নিয়ে পৃথিবীতে
হেঁটে যেতে চাই। একটি জন্ম শুধু তোমার জন্য হেঁটে
হেঁটে শিল্পকলার প্রত্ননগরীতে প্রেত হয়ে ঘুরে বেড়াবো।
আরেক জন্ম নিয়ে রঙখেলা হবে তুমুল। স্বপক্ষ ও
প্রতিপক্ষ দুইই থাকবে তুমি। তৃতীয় গুচ্ছটিকে আমরা
সাজাবো নদীর ধারে বনকুটিরে, ময়ূর আর বুনো হাতির
সঙ্গে যাপন করার জন্য। বাকি দুই জন্মে পাঠ করবো
জীবন ও মৃত্যুর মহাগ্রন্থগুলো।
কেউ একা বাঁচতে পারে না
রেজাউদ্দিন স্টালিন
কেউ একা বাঁচতে পারে না
একটা গাছ পারে না
একটা পাথরও না
করোনার সময় অনেকে
একা বাঁচতে চেয়েছিলো
তারা মারা গেছে
যারা সন্ত-নি:স্ব-বিরহকাতর
একা বাঁচার জন্য তারা
ঝাঁপ দেয় নির্বাণ সাগরে
তাদের আর্তনাদ ফিরে আসে
পারমাণবিক প্রতিধ্বনি হয়ে
যুদ্ধে কেউ একা জিততে পারে না
একা পরাজিত হয় না
কোনো ধনকুবের সে হোক কারুন
কিংবা ইলন মাক্স
কেউ একা কিছুই করতে পারে না
বাঁচতেও পারে না
মরতেও না
ব্লেজার ও গান্ধিগাঁও
শিহাব শাহরিয়ার
কর্পোরেট নারীরা বিক্রি করে না বেদনা!
তারা চিনে না খড় ও পলিশ করা নখপীঠ?
তারা অন্ধকারে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে নীল কাচ
তারা ডাউন টাউন থেকে সংগ্রহ করে ব্লেজার
ব্লেজারের খয়েরি বাতাসে খোঁজে নতুন শহর
ব্লেজার নারীরা জানে না নদীরা বুবুর মতো
বুবু-ফুফু পেরোতে পারে না পার্লারের দরোজা
তারা জানে না—অনাগরিক রিফাত চৌধুরীর
দীর্ঘ নিঃশ্বাসে—টেমসে ভাসে শামীম আজাদ
তারা জিন্সের পকেটে খোঁজে জ্বিনের দানা!
আইফেল টাওয়ারে ওঠে দেখে না রেইন নদী
২.
তুমি নাকে পরিত্যাক্ত ডেটলের ঘ্রাণ মেখে
অভিমানী শাড়ির মতো উড়ছ গান্ধিগাঁওয়ে
থান ইটের মতোন আলো
জিললুর রহমান
ঠিক রাতদুপুর, একখানা থান
ইটের মতোন আলো মেঝের ওপর বসে।
বাইরে বাতাস, পাতা নড়ে, আলোটিও
ব্যাকুল বাউল নড়ে। আমিও কি নড়ে উঠি
আলোর ডানার খোঁজে?
আলোটি পাখির ছন্দে ওড়ে,
ছুঁয়ে দেখি নরম চাঁদের মায়াগন্ধ…
চারপাশে এতো অন্ধকার,
আলোটা কি মরীচিকা তবে!
স্বয়ম্বর
শিবলী মোকতাদির
বসন্ত এলেই মনে পড়ে বাম জামানার কথা
এক চিলতে রাগের ঢঙে মিছিলের মতো
পাল্লা দিয়ে ফুটছে—
অযান্ত্রিক অশোক, কনকলতা, শিমুল ও পলাশ
লুকিয়ে, স্মৃতিচারণের নকশা হয়ে বনের গভীরে যাও,
যে কোন ফুলই ঝলসে ওঠে দুরন্ত কৌতুকের চকিত বিদ্যুতে
অদৃশ্য রাতের কাছে মেলে ধরো,
অচেনা ফলের সহমর্মিতার জলছবি—
যা তুমি এঁকেছ,
শেয়ালমূর্তির গন্ধের ভাণ্ডার ভেঙে ছুটে যাচ্ছে
ফ্রোকপরা ছোট্ট এক মেয়ে
যতই রাগ রাগিনী ঢালো, এ দৃশ্য
কল্পনাতেও কুলোবার নয়!
বসন্ত এলেই উঁকি দেয় দ্বন্দ্ব,
পাতা ঝরা প্রেমের ঝাণ্ডায় ফুটে ওঠে একগুচ্ছ স্বয়ম্বর কাম।
বিবিধ বাগডাশ
খলিল মজিদ
বর্ষার বর্ধমান ঋতুর নাম কাশফুল। শরতের
চিত্রপটে কেন তবে রক্তমাখা থাবা? নদীতীরে
কার নখরের চিৎকার, হে ভাদ্র মাস? চেনা পথে
অনেক অচেনা কুকুরই তো আসে, গায়ে শুঁকে
পিছু নেয়, কেননা ভাদ্রই প্রিয় মাস তার। তবুও
বালক-বালিকারা ঘুরে-ফিরে সারমেয়-সাথে।
গুগোলে ভূগোল ঘুরে দেখে-শুনে হারায় লালমাই
এতটাই অবিশ্বস্ত হলে তুমি জগৎপুর! আলপথ,
ধানক্ষেত, সারি সারি রেইনট্রি, চেনা সবই—
হঠাৎ অচেনা হলো রাতের বাতাস, কুকুরগুলো
বিবিধ বাঘডাশ— কণ্ঠনালি চেপে ধরে
কার মুখ বন্ধ করে রাখো তুমি, আলেখার চর?
ভালোবাসা
আলফ্রেড খোকন
হতেই পারে
সে এসে রোজ
এই বুকের কাছে
জড়িয়ে ধরে বলবে
এইতো এসেছি আমি
আমাকেই নিন;
ভালোবাসা
নি:শব্দের সুবাতাসে
ভেসে আসা
প্রতীক্ষার ডালপালা
এইতো এসেছি কাছে
আমাকেই ছেপে দিন
সফর
মোস্তাক আহমাদ দীন
সফেদ স্টিমারে বসে নিরঞ্জন গ্রামে চলো যাই
যাত্রাপথে কোনো কথা হবে না সেখানে।
মনাই নদীতে গিয়ে সুস্থির পানি পেয়ে গেলে
ধরে নাও আমরা যাব মৃতের পাড়ায়:
পথে পথে জলাবন, হিজলের পাড়া;
তারই পাশে গোরস্তান, উঁচু-নিচু টিলা;
হয়ত-বা যাওয়ার পথে পেয়ে যাব
গোপীগ্রাম—রাধাপুর— বাঁশের বাজার…
তবু কি ব্যাকুল বাশি বাজবে না পথে ?
স্টিমারে যাবে না দেখা সুবল সখারে?
নিরঞ্জনের কাছে, ধীরে, পৌঁছে গেলে
পাই কি না-পাই কিছু, চুপচাপ রইব সেখানে
জলের সুতোয়
রিমঝিম আহমেদ
কতটুকু গড়াও তুমি পাথর
কতটুকু ইচ্ছেময়ী হলে
যাত্রাপথে থামছে বুকের ঝড়
কত জলে আকাশ ভারানত
বিন্দু বিন্দু মেঘের উড়ো ছাই
হারিয়ে ফেলা নদীর গন্ধ নিয়ে
সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে পড়ি ঠাই
তুমি বললে পাদটীকা জুড়ে
লিখে রাখছি শূন্যতারই বোধ
কাঁটাদীর্ণ পায়ে হেঁটে বুঝি
পথ টের পায় ঠাণ্ডা রক্তস্রোত
কতটুকু বাতাস ধরে গাছ
আশায়-নেশায় জড়িয়ে ধরে স্নায়ু
এলেই যদি ফেরার কীসের তাড়া?
জলের সুতোয় শরীর গাঁথো–
গাঁথো তোমার অবাক পরমায়ু!
পাতা-৩
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বহির্বিশ্বের বাংলা কবিতা
———————————————————————
বিপর্যাস
শামীম আজাদ
তাহারও কি হয়েছে বয়স, হাড়ে বসে গেছে বিবর্ণ হলুদ
অবনত হতে হতে বেঁকে পড়েছে মেরুদণ্ড
স্মরণ পাথরে ঘষা দিতে দিতে সরু হয়ে গেছে সকল স্মরণ?
সে কি ক্লান্ত, মহাক্লান্ত
নাকি পরিবর্তিত এই আমাদেরে আর ভাল লাগছে না।
গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ আমাদের অবস্থান দেখেই বলে যাই ...আমি যাই?
কে তার বুকের সোনার বোতাম খুলে লাগিয়ে দিয়েছে ঐ সব বেমানান প্লাস্টিক?
সব্বনেশে কথা-
সময় গেলে সাধন না হলে স্ববশতাও কি এভাবে অশক্ত হয়ে যায়?
বসে আছি স্বত্তা থেকে বহু দূরে টেমস এর স্নায়ুতে-
বাতাসে খণ্ডিত রোদ, ভেজা ভেজা
রোদ নয়, জলবাস নয় এ অদ্ভুত জিজ্ঞাসা ঘাই মেরে উঠছে আর
সিমলেস স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার জোড়াগুলো খুলে যাচ্ছে আবার।
কী করে আমাদেরে লাগবে আর ভালো?
লটকে যে আছে অদ্যাবধি এই সৃষ্টিছাড়া মীড়ে, এই জঘন্য কার্নিভালে
সে শুধু পূর্বপুরুষের কৃপায়।
তোমরা বলো গো আসিয়া, কী ভাবে তাঁর অভীষ্ট গেল ভাঙিয়া ভাঙিয়া...
কোন কোন শনিবার সন্ধ্যাবেলা
মঈনুস সুলতান
সূর্য যখন কুম্ভরাশিতে…সচরাচর শনিবার সন্ধ্যাবেলা
চেতনায় ছড়িয়ে পড়ে চন্দ্রকান্তমণির রূপালি দ্যুতি—
আমার শরীর সহসা বৃক্ষে বিষ্ফোরিত হয়ে ফোটায় অজস্র ফুল,
ডার্করুমে মাউন্ট-ফুজির ছায়া হয়ে ফুটে কার যেন প্রতিশ্রুতি—
কাঠবিড়ালীরা মচ্ছব করে খুঁটে ডালপালায়
বাদামবীজের তন্দুল;
কোন কোন শানিবার গোধূলিতে —
বেদুঈন তোরেগদের সঙ্গে ছোটাই অশ্ব বল্গাহারা,
দেখি—তিমবাকতুর বালুকাচিত্রে সিক্ত হচ্ছে পান্ডুলিপি…
ঝরঝরিয়ে ঝরছে শ্রাবণের বারিধারা;
কখনো কুপতি হন গ্রহ—অপয়া… ভোরবেলা
গ্রহশান্তির আচার পুষ্পে ছড়ায় না সুরভি,
তীব্র হয়ে বাজে কারো অহেতুক অবহেলা—
সারা দিনমান খোঁড়াখুঁড়িতে হয় না কিছু আবাদ;
গোধূলিতে দেখি— মিনিওতোর চিত্রপটে
আঁকছি… দারা শিকোহের রাজ্যহারা বিষাদ।
যে দিকে তাকাই আমি
শামস আল মমীন
যে দিকে তাকাই আমি ঈশ্বরও দেখে সেই দিকে-
আমি গুটি-সুটি হয়ে মিশে যাই কারো কুটিল হাসিতে।
শুয়ে বসে থাকি...স্থির হয়ে বসি, কিছু ক্রোধ জাগে।
আলপথ, সরুপথ, হাইওয়ে- যে পথেই যাই
আমার প্রাণের শক্তি আসে একই উৎস থেকে।
জানালার শিক ধরে, ভাঙা দরোজায় হেলান দিয়ে এতকিছু দেখি...
কিন্তু যা দেখতে চাই তার কিছু দেখি না।
জীবন আমাকে ভীষণ উল্লাসে দুঃখ দিয়েছে আজীবন।
সেই সব মনে হলে পোকামাকড়দের মতো তুচ্ছ হয়ে যাই।
জীবন দেখেছি আমি চোখের দেখার চেয়ে বেশী;
কিছু তার দেখা যায়, কিছু- শুধু অনুভুতি...
তোমার এআই নির্মিত মুখ
তমিজ উদ্দীন লোদী
তারা তোমার চোখ বানায়—তোমার চোখ নয়। তোমার হাসি বানায়—তোমার হাসি নয়।
কোনো অদৃশ্য আঙুল তোমার কপাল ছুঁয়ে দেয়, আর আমি বিশ্বাস করতে শুরু করি:
এই মুখ, এই ছায়া, এই নীরবতা—সবই তুমি।
কিন্তু তুমি তো অনুপস্থিত। তুমি আছ অদৃশ্যের ফাঁকে, ডেটার গভীরে, সম্ভাবনার স্তরে স্তরে।
প্রতিটি স্তর খুলে দেখি—একটু রোদ, একটু ধোঁয়া, একটু পুরনো ছবির গন্ধ।
তুমি কোনোদিন ছিলে, না কেবল ছিলে বলে আমার মনে হয়—এআই জানে না।
সে শুধু তোমার অবয়বের অনুকরণ করে, যেন জলের উপর জলের লেখা।
আর আমি? আমি কৃত্রিম চোখের দিকে তাকিয়ে বলি: তুমি সুন্দর।
তুমি নও। তুমি নও, তবু এতটা তুমি যে আমার ভিতরের মানুষটি
বিভ্রান্ত হয়ে প্রশ্ন করে—ভালোবাসা কি স্মৃতি, না কি স্মৃতির ছবি?
উত্তর নেই। শুধু সার্ভার-ঘরে জ্বলে থাকে নীল আলো, আর তোমার
এআই-নির্মিত মুখ ধীরে ধীরে মুছে যায় নিজের অস্তিত্বের ভিতরে।
মোচড়
বদরুজ্জামান আলমগীর
এভাবেই দূরে কোথাও একসাথে হলে বুঝি
আমরা নদীর দেশ থেকে উড়ে এসে নেমেছি
পুরনো দিনগুলো উন্মোচিত হবার আগেই
আমাদের অন্তঃশীলা এই নরম অঞ্চলগুলি
জিয়ল মাছের কল্লোলে জলের স্ফটিকাঞ্জলি।
এভাবেই আকস্মিক একসাথে হলে বুঝি
আমাদের কুশল বিনিময়ের রাফখাতা ভরা
লেবুপাতার গন্ধে, প্রতিটি চোখের ঢালুতে
পাখিদের বাসা- খয়েরী ফুটকি ডিমের মায়া
পূর্বপুরুষেরা জামার ভাঁজে ভেজা ভেজা হিয়া।
গানের বনে একা একসাথে ছুটে যায় হরিণ
আমাদের পিছনে ওড়ে শৈশবের ওড়া কেশর
আঙুলের ফাঁক গলে ঝনঝনিয়ে লাটিম ঘোরে
আমাদের ছিন্ন কাঁধে জমাট বাঁধে লৌয়ের ব্যথা
শহীদি কারবালা, বিসর্জনী মা, একাত্তরের সুতা।
প্রণয়াবর্তকাল
তুষার গায়েন
যখন পরম চেতনা সুষুপ্তির মাঝে সৃষ্টির স্বপ্নে বিভোর
একাকিত্ব ঘুচিয়ে বহুভাগে বিভক্ত হবার মাহেন্দ্রক্ষণে
পাশ ফিরছেন তিনি—স্থানের বক্রতায় জন্ম নিচ্ছে কাল
আর আমাদের অবয়ব ফুটে উঠছে নামহীন গোত্রহীন
কোনো পরিচয়ে বিধৃত হবার আগে অমলিন সত্তার—
তুমি কাঙ্ক্ষা করো যদি আমাদের দেখা হতো সেই পরিসরে
থাকত না জাগতিক দ্বন্দ্ব কোনো, বাঁধার পাহাড় !
আমার তো সাধ হয়, সন্ধান করি সেই সম্ভাবনার তীরে
যেখানে অসম্ভব পাহাড়ের মতো মাথা তুলে আছে—
সেই পাহাড় উদ্গমের আগে যদি দেখা হতো আমাদের
যখন ডিঙিয়ে যাবার কিছু নেই, আনন্দ কি হতো মনে ততো
পেরিয়ে যাবার পর, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরার অতলান্ত আবেগ?
আদি সমুদ্রের তীরে শুয়ে আছ তুমি ...
তারামাছ, শঙ্খ, শামুকাকীর্ণ বালিতে ছড়িয়ে মহাজাগতিক চুল
স্পন্দিত জমজ পৃথিবী—তোমার উত্তল বুক, একটিতে তার তিল !
যত দ্রুত বেগে আমি আসি না কেন হাওয়া ঠেলে তোমার নাগাল পেতে,
আমার আংশিক চুলে সাদা রঙ যায় ধরে—যত না বিস্ফার করি নিজেকে
সঙ্কোচনের ছাপ ফেলে ফেলে আমাকে বিব্রত করে মহাকাল !
আলোকবর্ষ ঘুরে পরস্পরের সন্ধানে প্রেমিক প্রেমিকা দাঁড়িয়েছে অবশেষে
মুখোমুখি, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ! তারা কি নেবে টেনে পরস্পর আনন্দ-ক্রন্দনে
নাকি দূরে সরে যাবে বিবিধ বিবেচনার জটিল অংক কষে?
মেঘমুখ
জাফর ওবায়েদ
অস্পষ্ট সম্মুখপথ
খানা-খন্দে বাঁকাচোখভীতির বারুদ
একটু এগোলেই নির্জন ঘন অন্ধকার।
প্রচণ্ড অনিশ্চয়তায়ও তুমি দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসে
পশ্চাতে সবলসুঠাম ভীমহাতে খুব প্রিয় কেউ
তার সবটুকু বল নিংড়ে তোমাকে ঠেলছে সম্মুখে ।
তুমি নিজেকে সামলে ক্ষীণকায় পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করে যাচ্ছ
তোমার ঘামভেজা শরীর থেকে বেরুচ্ছে আত্মবিশ্বাসের ঘ্রাণ
তবু, চারদিক যেন অস্থির, চরম শঙ্কাকুল!
তোমার এ মেঘমুখ দেখে বড়ো মায়া হয়
তুমুল প্রেমের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড আমি
কাছে এসে একটু অভয় শোনাবার কথা ভাবি
অথচ, বামুন প্রতাপ আমার - কিছুই পারি না!
আমার এ দুঃস্বপ্ন শুধু, তোমার সে মেঘমুখ!
সাদা নিশিপদ্ম
মনিজা রহমান
আয়েশ করে বসেছিলে রকিং চেয়ারে।
বলেছিলাম, সেফটিপিন দিয়ে শাড়ির কুচি যুথবদ্ধ করতে
এক পলক তাকিয়েই বললে, দরকার কি, এমনিই তো ঠিক আছে।
--খোপাটা ঠিক মতো বসছে না, হেয়ারক্লিপটা লাগিয়ে দেবে?
মুখ না তুলে বললে, খোপার দরকার কি? চুল ছেড়ে দাও
ছাড়া চুলে তোমাকে ভালোই লাগে।
‘ঠিক আছে’ বলে সামনে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলাম,
দ্যাখো তো টিপটা ম্যাচিং হয়েছে কিনা শাড়ির সাথে?
ফোন থেকে চোখ না সরিয়ে বললে
আজকাল অনেকেই মিক্স-এন্ড-ম্যাচ পরে। কীইবা এসে যায়।
বললাম, আমি রেডি। চলো। বললে, আজ না, অন্যদিন।
আমি জানালায় দাঁড়িয়ে দেখলাম
ধীরে ধীরে বিনয়ী অন্ধকার জমাট বাঁধছে,
ধূসর বাতাসে তানপুরার মত করুণ বিলাপ।
হায়, ও যদি বুঝতো কোনো কোনো ইচ্ছা
একবার জন্ম নিয়েই দ্রুত হারিয়ে যায়, যেন সফেদ নিশিপদ্ম।
পাতা-৪
পশ্চিমবঙ্গের কবিতাঃ
—————————-
অষ্টম বর্ষপূর্তিতে আমরা চার পাতার বিশেষ আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গের কবিদের সংযুক্ত করতে পেরে আনন্দিত! তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা!
কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি বিশিষ্ট কবি, কথাসাহিত্যিক, কথক শামীম আজাদ, বিজ্ঞানী, কবি, লেখক রুদ্রশংকর এবং বাংলাদেশের স্বনামখ্যাত লিটলম্যাগ 'নিসর্গ' খ্যাত সম্পাদক সরকার আশরাফের প্রতি, তাঁরা আমাকে যথেষ্ট সময় দিয়ে কবিতাগুলি সংগ্রহ করে দিয়েছেন।
*** কবি ও কবিতাপ্রেমী সকল পাঠককে এক বুক ভালোবাসা!
ফারুক ফয়সল
বড়ো দুর্দিনে ডাক দিলে
সৈয়দ খালেদ নৌমান
বড়ো দুর্দিনে ডাক দিলে পাঞ্চালী
লক্ষ্য ভেদের স্বপ্নও বাতুলতা,
শূন্য তুনীর স্কন্ধে বহন করি
চলিনা কদাচ প্রকাশ্য রাজপথে।
বড়ো দুর্দিনে ডাক দিলে পাঞ্চালী
বীর্য শুল্কে তোমাকে যে নেবো জিতে
তেমন ক্ষমতা নিঃশেষ বহুদিন;
অধুনা জরার লাঞ্ছনা সারা দেহে।
পাঞ্চালী তুমি ডেকোনা বারংবার
শিথিল শিরায় রক্তের কোলাহল;
বড়ো ভয়াবহ এবং করুণাহীন...
প্রাণের মূল্যে কেবা করে উৎসব।
তার চেয়ে শোনো সহজ কথায় বলি
পাইনা তো আর মৃত্যুতে উৎসাহ,
যেমন তেমন বাঁচতে পারলে খুশি
পর্ণকুটিরে অথবা বৃক্ষতলে।
সূক্ষ্ম ঘরবাড়ি
রঞ্জন মৈত্র
কাচের ওপাশে গাছেরা বড় হয়
মাছেরা ঘোরেফেরে
এপাশে যাই যাইয়ের মধ্যে
কিছু চঞ্চল সর্বনাম
কিছু শিরোনাম খালিচোখে স্থির
জলের যত্ন মাটির প্রযত্ন আর
বড় হওয়া ঘোরাফেরাগুলো
ঝড়খালি শিমুলতলা সন্ধের মারাং বুরু
ছুঁতে চায় চলতি পথে
এস্কেলেটরের বশে অবিরত ওঠে নামে
দেয়াল সূক্ষ্ম কাচ ও সুনীল স্থিতিরেখা
মাছগুলি গাছগুলি তারই বেনাগাল
তারই ছোঁয়া স্টপেজে দাঁড়িয়ে
পরিচিত বাস এলে
জলরং বাড়ির টানে ভেসে চলে যায়
অন্ধের ফিকিরি
শঙ্খশুভ্র পাত্র
কল্পনায় কী না হয়! হাওয়ায় জড়ানো গল্প শেষ৷
বাংলার তিন এবং ইংরেজির একুশ, স্মরণিকা
তা ফেলে কোথায় যাব, বস্তুত আঁটোসাঁটো রেশ
আগমনিগমে স্থির— কথাহারা, অফুরন্ত শিখা...
উপেক্ষা, অরূপ ছন্দে, গাঁথি এই অনির্ণেয় হার৷
স্পর্শ ব্যতিরেকে, বাতি, নিষ্প্রদীপ, অন্তরীপ ঘোর
বিপ্রতীপে, বলি এসো, পাওনা আছে দুর্দান্ত প্রহার৷
সব শোধ চুকেবুকে গেলে, সুখে বন্ধ কর দোর৷
এটাই আপাত, সত্য। স্পর্শদোষ, লিখনে না যায়৷
স্বপ্নের অধিক তুমি, মুক্তি কীসে? বিষে-বিষক্ষয়...
'অদ্য শেষ রজনী'-কে বসিয়েছি মাটির দাওয়ায়,
অতঃপর কবিতার— সঙ্গে কারও বন্ধুত্বও হয়৷
প্রতিজ্ঞা ফতুর, আজ্ঞা— যথারীতি ফকিরের গুণ,
অন্ধের ফিকিরি, ছন্দ, সৃজনই তো প্রথম আগুন...
পুনর্নিমাণ
অদিতি বসুরায়
(১)
শিশুমুখ ঝুঁকে আছে, পড়ার টেবিলে
গাছের পাতার যেমন , যেমন আদর চাওয়া মেঘ ঝোঁকে-
-দেখি, মেয়ের বইয়ে, বাংলা অক্ষরমালা
ফুল হয়ে আছে।
(২)
বিকেলের আগে, সে বুকের কাছে ঘেঁষে আসে
উড়ো চুল, স্বপ্ন দেখা চোখ – তিরতির কর
কাঁপে সুখ।
অকরুণ শিশু, আরেকটু ঘুমাই, বলে
জেগে ওঠে।
(৩)
ভোরের সাইরেন, একত্রে বাজাই আমরা
জানলা খোলা থেকে পরপর রোদের ঝাঁপান –
দুগ্ধঘ্রাণ আলতো মুছে দি, ইউনিফর্ম থেকে
- মেয়ে স্কুলে যায় ।
(৪)
পর্দায় হরিণের মুখ দেখে, সে হাসে
হাসে মালকোষ, ইমন, কাহারবা –
শ্লোকে গান, কন্যায় শ্লোক ফোটে
- তার স্কুলে যাওয়া মানে,
- প্রতিটি ভোরই দেবীপক্ষ ।
(৫)
শোকের দিনে, তার বাগানে ফুল দেখি
দেওয়ালে আলো, জানালায় ফুলছাপ-
লক্ষ্মীর পায়ের মতো চিহ্ন ফেলে রাখে।
আমরা ক্ষুদ্র প্রতিমাটিকে রং করি, আসনে বসাই
মেয়ে জ্যোৎস্না লেখে খাতার পাতায়।
অন্ধকার -উদযাপন
শান্তা চক্রবর্তী
এখন বাতাস বড় সন্দেহপ্রবণ, সময় আত্মঘাতী
আলোও অন্ধকারের চেয়ে হিংস্র হয়ে উঠছে আরও
আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের ভেতর অদৃশ্য ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে
তবে কি শুরু হয়ে গেল আর-এক অন্ধকারের উদযাপন-পর্ব
এমত গ্রহণ-বেলায় স্বপ্নগুলো ফিরে যাচ্ছে অজ্ঞাতবাসে
সুদূর ইতিহাস থেকে যুদ্ধাহত ঘোড়াদের শীৎকার ভেসে আসে
কে কবে কাকে কোন শর্তে সময় বিনিময় করেছিল
কার কোন অঘোষিত অদৃশ্য সনদপত্রে সমর্পণ লেখা হয়েছিল
সেইসব অমীমাংসিত আলো উঠে আসছে ঘুমন্ত বিচার-সভায়
এই রূপবদলের রহস্যখেলায় নেমে আসছে আর কোন কৃষ্ণপ্রহর
হাওয়ায়-হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে অসহায় আত্মাদের আর্তনাদ
কেউ কি কোথাও ফেলে এসেছিল নিজেকে বেহিসেবী জন্মের ভুলে
সমূহ পথ এখন তার দিকে সংকেত পাঠায় নক্ষত্র -নিশানায়
শুধু সময়কে চোখে-চোখে রাখো, দ্যাখো ফুলের পাপড়িতে রক্ত লেগেছে কিনা!
দু'টি প্রেমের কবিতা
রেহান কৌশিক
ভাষা
কীভাবে বোঝানো যায় এই সমর্পণ
তোমার ছায়ার নীচে শব্দহীন ঝরে?
আলোর সুতোয় বোনা বিশুদ্ধ সংগীত
কখনও কি কথা বলে দখলের স্বরে?
সুদীর্ঘ ধ্যানের মুদ্রা, ফকিরের সুর
শুয়ে থাকে অর্থহীন পথের ভিতর?
এভাবেই ধুলো ছুঁয়ে গাঢ় স্তব্ধতায়
গড়ে ওঠে হৃদয়ের অভ্রান্ত অক্ষর...
শুদ্ধতম আলো দিয়ে চেয়েছি সাজাতে,
যদি পার, ছুঁয়ে থেকো নিজেকে দু'হাতে
কৃষি
শতাব্দী-প্রাচীন ঘুম মুছে ফেলে চেয়েছি জাগাতে
নিজের ভিতরে থাকা সব রং, আলোর ফসল।
অন্ধকারে আর নয়, আলো-শস্যে সাজাব তোমাকে।
ঠোঁটের কিনারে ঠিক জ্বেলে দেব রৌদ্রমাখা জল...
তাকাবে স্পষ্ট আবার? বাজাবে ঘুঙুর কাছে এসে?
আবির ওড়ানো দিনে ফিরে যাব পুরোনো শহরে।
হারানো সুড়ঙ্গ খুঁড়ে তুলে আনব ধুলো গান আর
যে-লাবণ্য নিভে গিয়ে ঘুমিয়েছে বিমর্ষ পাথরে।
মৌন দাঁড়াও এখানে, বুনে দেব তোমার ভিতর
আমার সমস্ত ভাষা, মুঠো-ভর্তি সমস্ত অক্ষর...
দেবতার যন্ত্রণা
দিব্যেন্দু ঘোষ
গাছকে থাবা তুমি মারতেই পারো
সে দৃশ্যত বোবা
নীরবে সহ্য করে ব্যথা
তারপর পৃথিবীতে ঘটনা ঘটে একটা—
রিখটার স্কেলের মতো
পাখিরা ঠোঁট দিয়ে
দাগ কাটে মাটিতে...
লেখা হয়— দেবতার যন্ত্রণা!
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন