https://www.prothomalony.com/

18406

literature

সাহিত্য

মুক্তিহীন কারাগার

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪৯


রাতের আকাশে সেদিন চাঁদ ছিল না। জানালার কাচে জমে থাকা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মেহেরের মনে হলো, পৃথিবীতে এমন কিছু রাত আছে, যাদের কোনো ভোর নেই। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলে, ঋতু বদলায়, মানুষের বয়স বাড়ে; অথচ কিছু মানুষের জীবনে মুক্তির সকাল আর আসে না।
 
মেহের একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সমস্যা শোনে, ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব মেলায়, দায়িত্বের টেবিলে বসে মানুষের অধিকার রক্ষার চেষ্টা করে। অথচ নিজের জীবনের হিসাব মেলাতে গিয়ে সে বারবার পরাজিত হয়। যে নারী অন্যের অধিকারের পক্ষে কলম ধরতে জানে, সে নিজের বঞ্চনার কথা লিখতে গেলেই থমকে দাঁড়ায়।
 
তার জীবনের কারাগারটি ইট-পাথরে তৈরি নয়। সেখানে কোনো প্রহরী নেই, কোনো লোহার শিকও নেই। আছে সামাজিক কুসংস্কার, লোকলজ্জার ভয়, সম্পর্কের নামে চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্ব আর নারীর সহিষ্ণুতাকে মহৎ গুণ বলে প্রতিষ্ঠা করার দীর্ঘদিনের রীতি।
 
এই কারাগারে বন্দি হওয়ার জন্য কোনো অপরাধ করতে হয় না। নারী হয়ে জন্মানো, সংসার টিকিয়ে রাখতে চাওয়া এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকাই যেন যথেষ্ট।
 
মেহেরের স্বামী রাশেদ দীর্ঘদিন কর্মহীন। কর্মহীনতা মানুষের জীবনে সাময়িক অন্ধকার নামাতে পারে, কিন্তু সেই অন্ধকারকে অন্যের জীবন ধ্বংস করার অনুমতিপত্র বানানো যায় না। মেহের কখনো স্বামীর উপার্জনহীনতাকে তুচ্ছ করেনি। সে চেয়েছিল, দুজন মিলে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়বে, অভাবের পাথর সরিয়ে সংসারের জন্য একটু আলো তৈরি করবে।
 
কিন্তু রাশেদ নিজের ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর পরিবর্তে স্ত্রীর সাফল্যকেই অপরাধের মতো দেখতে শুরু করেছিল। মেহেরের পদমর্যাদা তার কাছে গর্বের কারণ হয়নি; হয়ে উঠেছিল আহত অহংকারের আয়না। নিজের অক্ষমতার প্রতিচ্ছবি মুছে ফেলতে সে আয়নাটিকেই ভাঙতে চাইত।
 
কখনো অপমান, কখনো অকারণ সন্দেহ, কখনো দীর্ঘ নীরবতার শাস্তি—এভাবেই সংসারের বাতাস বিষিয়ে উঠত। একসময় কথার আঘাত শারীরিক নিপীড়নেও রূপ নিল। মেহের বুঝতে পারল, যে ঘরের প্রতিটি প্রয়োজন মেটাতে তার উপার্জন অপরিহার্য, সেই ঘরেই তার সম্মান ও নিরাপত্তা সবচেয়ে অনিশ্চিত।
 
স্বামীর পরিবারের কাছ থেকেও সে সহযোগিতা পেল না। তাদের কাছে মেহেরের উপার্জন ছিল প্রয়োজনের সময় নির্ভরতার জায়গা, কিন্তু তার দুঃখ ছিল অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ। সংসারের দায় তার, অথচ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার নয়; দায়িত্ব তার, কিন্তু মর্যাদার বেলায় সে যেন বহিরাগত।
 
কেউ তাকে বোঝাল, স্বামীর মন রাখতে হয়। কেউ বলল, পুরুষের রাগকে এত বড় করে দেখতে নেই। কেউ আবার পরামর্শ দিল, সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে সবকিছু সহ্য করতে।
 
কেউ একবারও জিজ্ঞেস করল না, সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে যে নারী প্রতিদিন নিজের কান্না গোপন করে, তার মুখের দিকে তাকাবে কে?
 
সমাজের বিচারসভায় মেহেরের জন্য কোনো সাক্ষীর প্রয়োজন ছিল না; তার বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার জন্য একটি পরিচয়ই যথেষ্ট—সে একজন বিবাহিত নারী। সংসারে অশান্তি হলে তার সহনশীলতা যাচাই করা হবে, স্বামীর আচরণ নয়। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে তার ত্যাগের হিসাব চাওয়া হবে, তার ওপর চালানো অন্যায়ের নয়।
 
মেহেরের মনে হতো, সে যেন এমন এক নদী, যার জল সবাই ব্যবহার করে, অথচ নদীটির নিজের তৃষ্ণার কোনো স্বীকৃতি নেই।
 
সকালে সে অফিসে যেত পরিচ্ছন্ন পোশাকে, মুখে দায়িত্বশীলতার ছাপ নিয়ে। সহকর্মীরা বলত, "আপনি তো ভাগ্যবতী! নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, সরকারি চাকরি করছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎও সুন্দর করতে পারবেন।"
 
মেহের হাসত। সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকত একটি দীর্ঘ আর্তনাদ।
নিজের পায়ে দাঁড়িয়েও যে মানুষ নিজের ঘরে নিরাপদে দাঁড়াতে পারে না, তার স্বাধীনতার সংজ্ঞা কে লিখবে? উপার্জন করেও যে নারী নিজের অপমানের বিরুদ্ধে নির্বিঘ্নে প্রতিবাদ করতে পারে না, তার ক্ষমতার মূল্য কতটুকু? রাষ্ট্রের চোখে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়েও যে নারী ঘরের দরজার ওপাশে অসহায়, তার পরিচয় কোন খাতায় লেখা থাকে?
 
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর মেহের খুঁজে পেত না।
 
তার দুটি সন্তান—ঋদ্ধ ও রোদেলা। তাদের শৈশবের আকাশে অন্য শিশুদের মতো নির্মল রোদ ছিল না। বাড়িতে বাবার কণ্ঠ উঁচু হলেই ঋদ্ধ বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকত। রোদেলা মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে ভাবত, মায়ের শরীরের কাছে বুঝি পৃথিবীর সব বিপদ থেমে যায়।
 
কিন্তু শিশুরা কত দিন মায়ের আঁচলকে ঢাল বানিয়ে বাঁচতে পারে?একদিন স্কুল থেকে ফিরে রোদেলা মাকে জিজ্ঞেস করল, "মা, অন্যদের বাবা তাদের নিয়ে গল্প করে, খেলতে যায়। আমাদের বাবা আমাদের সঙ্গে এমন করেন না কেন?"
 
মেহের মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কী বলবে? বলবে, একই ছাদের নিচে থেকেও সম্পর্ক কখনো কখনো মরুভূমি হয়ে যায়? বলবে, সামাজিক পরিচয়ের খাতায় বাবা লেখা থাকলেই শিশুর মনে পিতার নিরাপদ আশ্রয় তৈরি হয় না?
 
সে মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে শুধু বলল, "তোমাদের কোনো দোষ নেই মা।"সেদিন কথাটি বলতে গিয়ে তার নিজের বুকের ভেতরও কান্না জমে উঠেছিল। সন্তানদের নির্দোষ হওয়ার কথাটি বারবার বলতে হয় কেন? বড়দের ব্যর্থতার দায় শিশুদের মনে এমন অপরাধবোধের জন্ম দেয় কেন?
 
ঋদ্ধের কষ্ট ছিল আরও নীরব। সহপাঠীরা যখন বাবার পেশা, সাফল্য কিংবা পরিচয় নিয়ে গর্ব করত, সে তখন কথার ভিড়ে নিজেকে গুটিয়ে নিত। তার বাবার নাম আছে, পরিচয় আছে, সামাজিক অবস্থানও আছে; অথচ সেই পরিচয় উচ্চারণ করতে গেলেই তার মনে এক অদ্ভুত দ্বিধা জেগে ওঠে।
 
একদিন খাতার শেষ পাতায় সে লিখেছিল—
'আমার বাবাকে আমি অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু বাবার পরিচয় দিতে গিয়ে নিজের কষ্টটাকেও অস্বীকার করতে হয় কেন?'বাক্যটি ছিল একটি শিশুর; অথচ তার মধ্যে জমে ছিল এমন এক সামাজিক ট্র্যাজেডি, যার ভাষা অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরও অজানা।
 
মেহের সন্তানদের সামনে বাবাকে অপমান করতে চাইত না। সে জানত, পিতৃপরিচয় সন্তানের আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু বাবার আচরণে যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল, তা শুধু ভালো কথা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। শিশুরা মুখের ভাষার চেয়ে প্রতিদিনের ব্যবহার বেশি বিশ্বাস করে। তারা দেখছিল, মায়ের চোখে হাসি নেই, ঘরের বাতাসে স্বস্তি নেই, আর বাবার উপস্থিতি মানেই কখনো কখনো অজানা আতঙ্ক।
এক রাতে রাশেদের সঙ্গে বিবাদের পর মেহেরের হাতে আঘাত লাগল। রক্তের দাগ শুকিয়ে গেলেও সন্তানদের চোখের ভয় শুকোল না।
 
ঋদ্ধ মায়ের হাত ধরে জিজ্ঞেস করল, "মা, তুমি কি একদিন আমাদের ছেড়ে চলে যাবে?"
মেহেরের মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের মধ্যে একটি বন্ধ দরজা ভেঙে দিয়েছে। এত দিন সে ভেবেছিল, সবকিছু সহ্য করে সন্তানদের আগলে রাখছে। অথচ তার সন্তানরা প্রতিদিন ভয় পাচ্ছে, তাদের শেষ আশ্রয়টুকুও একদিন হারিয়ে যাবে।
 
সেই রাতে মেহের প্রথমবার নিজের কাছে স্বীকার করল—এই সংসারে শুধু তার শরীর নয়, তার সন্তানদের শৈশবও আহত হচ্ছে।
 
তবু মুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া কি এত সহজ?
 
সমাজ তাকে বলবে, সংসার টিকিয়ে রাখতে পারেনি। আত্মীয়রা বলবে, একটু মানিয়ে নিলে কী এমন ক্ষতি হতো! কেউ হয়তো তার সরকারি চাকরির দিকে আঙুল তুলে বলবে, এত ক্ষমতা, এত উপার্জন—তবু সংসার সামলাতে পারল না?
 
মেহের জানে, তার দুঃখের চেয়ে মানুষের কৌতূহল বড় হয়ে উঠবে। তার ক্ষতের চেয়ে আলোচনার বিষয় হবে তার সিদ্ধান্ত। যে মানুষগুলো তার দুর্দিনে পাশে দাঁড়ায়নি, তারাই হয়তো তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি রায় দেবে।
 
এই সমাজে নারীর জন্য অনেক দরজা খোলা থাকার কথা শোনা যায়; কিন্তু সেই দরজার ওপারে দাঁড়ালেই শুরু হয় নতুন জিজ্ঞাসাবাদ। সংসারে থাকলে সহ্য করার পরীক্ষা, বেরিয়ে এলে চরিত্র ও সিদ্ধান্তের পরীক্ষা। স্বামীর অন্যায় মেনে নিলে সে ভালো স্ত্রী, প্রতিবাদ করলে সে সংসারবিরোধী। সন্তানদের নিয়ে নীরবে কাঁদলে সে ত্যাগী মা, আর তাদের নিরাপত্তার জন্য নিজের পথ বেছে নিলে সে স্বার্থপর!
 
তাহলে নারীর জন্য সঠিক পথটি কোথায়?
 
মেহের কখনো কখনো মনে করত, তার সামনে দুটি অন্ধকার দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে নিপীড়নের ঘর, অন্যদিকে সমাজের বিচারসভা। একটি থেকে পালাতে গেলে অন্যটি তাকে গ্রাস করবে। সে যেন এমন এক বন্দিনী, যার কারাগারের বাইরে আরেকটি কারাগার অপেক্ষা করছে।
 
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে দেখল, রাস্তার পাশে একটি পুরোনো গাছের গোড়ায় নতুন চারা জন্মেছে। বিশাল গাছটির ছায়ায় চারাটি সূর্যের আলো প্রায় পায় না। তবু সে আলো খুঁজে পাতাগুলো মেলে ধরেছে।
 
মেহের থেমে দাঁড়াল। চারাটিকে দেখে তার মনে হলো, প্রকৃতি অন্তত জন্ম নেওয়ার জন্য কাউকে কৈফিয়ত দিতে বলে না। সেখানে বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে সামাজিক সম্মানের মাপে মাপা হয় না।
 
কিন্তু মানুষের সমাজে কেন জীবনের চেয়ে লোকের চোখ বড়? কেন সম্পর্কের নাম রক্ষা করতে গিয়ে মানুষের মর্যাদা বিসর্জন দিতে হয়? কেন একটি নারীকে নিজের যন্ত্রণার সত্যতা প্রমাণ করতে করতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু নিঃশেষ করে ফেলতে হয়?
 
সে উত্তর পেল না।
রাতে সন্তানদের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মেহেরের বুক ফেটে কান্না এল। সে চাইল, তাদের নিয়ে এমন কোথাও চলে যেতে, যেখানে কেউ তাদের বাবার পরিচয় নিয়ে বিদ্রূপ করবে না, মায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না, যেখানে মানুষকে তার পারিবারিক অবস্থানের জন্য নয়, তার মানবিকতার জন্য বিচার করা হবে।
 
কিন্তু সেই জায়গাটি কোথায়?সমাজের নিয়মের বাইরে কি কোনো পৃথিবী আছে? অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকলেই কি মানসিক নিরাপত্তা পাওয়া যায়? সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে যে নারী নিজের বর্তমানকে বিসর্জন দেয়, তার ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব নেয় কে?
 
মেহেরের কান্না ঘরের চার দেয়ালে আটকে রইল। বাইরে পৃথিবী ঘুমিয়ে ছিল। কোথাও কোনো প্রতিবাদ শোনা গেল না, কোনো অদৃশ্য প্রাচীর ভাঙার শব্দও নয়।
 
পরদিন সকালে সে আবার অফিসে গেল। ফাইল খুলল, মানুষের কথা শুনল, নিয়ম অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিল। তার টেবিলের ওপর রাখা কলমটি অন্যের জীবনের জট খুলতে ব্যস্ত রইল; অথচ তার নিজের জীবনের গিঁট আরও শক্ত হয়ে উঠল।
 
সহকর্মীরা তার হাসি দেখে বুঝতে পারল না, সে কতটা ভেঙে পড়েছে। সন্তানরা তার স্নেহ পেয়ে বুঝতে পারল না, সে নিজে কতটা আশ্রয়হীন। আত্মীয়রা তার উপার্জনের হিসাব জানল, কিন্তু তার অশ্রুর হিসাব রাখল না।দিন গড়িয়ে মাস হলো। মেহেরের জীবনে দায়িত্ব বাড়ল, সন্তানদের বয়স বাড়ল, অভিজ্ঞতার ভার বাড়ল। শুধু তার মুক্তির পথটি যেন আরও দূরে সরে গেল।
 
কোনো এক সন্ধ্যায় জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। মনে হলো, আয়নার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটি তারই মতো দেখতে, কিন্তু সে যেন বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কেউ। যে নারী একসময় স্বপ্ন দেখত, হাসত, ছোট ছোট আনন্দে বাঁচত, সে কোথায় হারিয়ে গেল?
 
মেহের মনে মনে বলল, 'আমি কি শুধু দায়িত্ব পালনের জন্য জন্মেছি? আমার কি নিজের মতো করে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই? আমার সন্তানদের কি এমন একটি শৈশব পাওয়ার অধিকার নেই, যেখানে বাবার পরিচয় নিয়ে তাদের মনে লজ্জা নয়, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার স্মৃতি থাকবে?'
 
কোনো উত্তর এল না। শুধু দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি রাতের নীরবতাকে ছুঁয়ে গেল।
 
মেহের জানত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রয়োজন। জানত, নিরাপত্তা ও মর্যাদা তার অধিকার। কিন্তু অধিকার জানা আর অধিকার ভোগ করার মধ্যে যে বিস্তীর্ণ ব্যবধান, সেই ব্যবধান পেরোনোর শক্তি সব সময় মানুষের হাতে থাকে না। সামাজিক শোষণের শিকল শুধু শরীরকে আটকে রাখে না; কখনো তা আত্মবিশ্বাস, সাহস, আশ্রয় ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকেও বন্দি করে।
 
তারপরও সে সন্তানদের বুকে টেনে নিল। তাদের ঘুমন্ত মুখে হাত বুলিয়ে দিল। নিজের বুকের মধ্যে জমে থাকা আর্তনাদটুকু কাউকে শুনতে না দিয়ে আবার নীরব হয়ে গেল।হয়তো আগামীকালও সে একই পথে হাঁটবে। একই ঘরে ফিরবে। একই প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। হয়তো সমাজের অদৃশ্য প্রাচীর এত সহজে ভাঙবে না, হয়তো তার জীবনের গল্পে কোনো নাটকীয় মুক্তির দৃশ্যও আসবে না।
 
তবু তার নীরবতা একটি প্রশ্ন রেখে যাবে পৃথিবীর কাছে যে সমাজ একজন নারীর ত্যাগকে সম্মান বলে, তার সহিষ্ণুতাকে কর্তব্য বলে, আর তার প্রতিবাদকে অপরাধ বলে চিহ্নিত করে, সেই সমাজে তার মুক্তির ঠিকানা কোথায়?
 
যে সন্তান নিজের বাবার নাম জানে, অথচ সেই পরিচয়ের সঙ্গে নিরাপদ স্মৃতি জুড়তে পারে না, তার কাছে পিতৃত্বের অর্থ কে ব্যাখ্যা করবে? যে নারী নিজের উপার্জনে সংসার চালায়, অথচ নিজের ঘরে মর্যাদার ভাতটুকুও পায় না, তার সাফল্যের মূল্যায়ন কোন পাল্লায় হবে?
 
প্রশ্নগুলো বাতাসে ভাসতে থাকল। কেউ উত্তর দিল না।

রাত আরও গভীর হলো। জানালার বাইরে অন্ধকার জমল। মেহের চোখ বন্ধ করল, কিন্তু ঘুম এল না। তার মনে হলো, সে যেন এমন এক কারাগারে বন্দি, যার চাবি কোনো একজন মানুষের হাতে নেই। চাবিটি ছড়িয়ে আছে সমাজের কুসংস্কারে, আত্মীয়তার স্বার্থে, লোকলজ্জার ভয়ে, আর সেই পুরোনো নিয়মে—যেখানে নারীর কষ্টকে সংসারের স্বাভাবিক মূল্য বলে মেনে নেওয়া হয়।
 
এই কারাগারে বন্দিরা চিৎকার করে না সব সময়। কেউ অফিসে যায়, কেউ সন্তানকে স্কুলে পাঠায়, কেউ হাসিমুখে অতিথি আপ্যায়ন করে। তাদের দেখে কেউ বুঝতে পারে না, বুকের ভেতর কতখানি ধ্বংসস্তূপ জমে আছে।তাদের কেউ কেউ মুক্তির স্বপ্ন দেখে। কেউ আবার স্বপ্ন দেখার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলে।মেহের জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। দূর আকাশে একটি তারা মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ছিল।
 
তার মনে হলো, তার জীবনটিও যেন সেই তারার মতো—আলো আছে, অথচ আলো ছড়িয়ে দেওয়ার আকাশ নেই।আর অন্ধকারের কাছে তার শেষ প্রশ্নটি নিঃশব্দে ঝরে পড়ল—'আমার অপরাধ কী ছিল? নারী হয়ে জন্মানো, সংসারকে ভালোবাসা, নাকি মানুষের মতো বাঁচতে চাওয়া?'
 
পৃথিবী নীরব রইল।সেই নীরবতাই যেন বলে দিল, কিছু কারাগারের সবচেয়ে নির্মম শাস্তি বন্দিত্ব নয়—মুক্তির অধিকার থাকা সত্ত্বেও মুক্তির পথ খুঁজে না পাওয়া।
আর কিছু আহাজারি এমন, যা কেউ শোনে না; অথচ সেই কান্নার ভারেই একটি মানুষের সম্পূর্ণ জীবন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।।
 
লেখক:
প্রভাষক সমাজকর্ম
কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ
চাঁদপুর।।
 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন