https://www.prothomalony.com/

9850

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত্য

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪ ১১:৫৪

তোমার জন্য 

আহসান জামান 

 

 

তোমার জন্য স্পর্শগুলো এখনও 

যেন এই মুহুর্তের মতো সতেজ

উবু হয়ে বসে আছে ঘরে।


তোমার জন্য পথ পড়ে থাকে, জানালায়

গ্রিল ফুঁড়ে বাতাস দোল দেয় পর্দায়

নিভু নিভু আলোয় ছায়া হাঁটে, একা।


তোমার জন্য ব্রেকফাস্ট টেবিলে একা

চায়ের কাপে ধোঁয়ারা উড়ে যায় দূরে

দুপুর গড়িয়ে বিকেলের শান্ত হাওয়ায়

পাখিদের বাড়ি ফেরার ডানায় চড়ে

অন্ধকার নেমে আসে, ধীর পায়ে।


সমুদ্রে হাওয়ার গর্জনে তুমিহীন সে 

বিরহ; তুমুল তোড়পাড়ে আরও 

একা হয়। প্রীদিম আলোর কম্পন 

কেবলই বসে থাকে অপেক্ষায়।

 

 

মুখ

হাশিম কিয়াম 

 

 

কোনো নারকেল বাগানে ফুঁপিয়ে কাঁদছে অনাগত

শতাব্দীর শব্দ-ছেঁড়া 

মুখ, দিনের মৃত্যু রেখা ধরে গিয়ে সাগরতলার বিরল 

সংগীতের টুঁটি চেপে-ধরা সভ্যতার সাথে যুদ্ধ শেষে 

ঢেউয়ের করাতের উপর ভেসে ওঠে কলাপাতারঙা  মুখ, 

রক্ত ঝরে, তবু কী এক মায়ার জোছনায় ভিজতে উদগ্রীব 

সেই মুখ! হয়তো 

কিছু বলতে চায়, কিছু শুনতেও চায়... 

তোমার হাতে কি মুষ্টির চালের মতো কিছু সময় জমিয়ে রেখেছো? খরচ করো... যাও... ফিরে এসো মুখের ভাষার

নকশিকাঁথা গায়ে জড়িয়ে, বেদনার ছাইগাদায় বিছিয়ে 

দাও, বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের ঘুম-নাকাল শরীর ঘুমিয়ে

পড়ুক সব পিছুটান সত্যের কাঁচা কবর থেকে জন্মানো 

সভ্যতার চোখে পুরে  দিয়ে...

 

 

ধুপ জ্বলে স্বপ্নের কফিনে 

আবদুল লতিফ

 

 

বৃষ্টির অপেক্ষায় 

অনন্ত প্রহর যায় 

শিশির শুকিয়ে গেছে কবে 

সবুজ ঘাসের বুকে তৃষ্ণার হাহাকার 

চৈত্রের খরতাপে ফেটে চৌচির 

হৃদয়ের জমি 

অতঃপর ..... 

কালবৈশাখীর ধ্বংসলীলা 

ধুপ জ্বলে স্বপ্নের কফিনে 

অধর ভাসায় অশ্রুবৃষ্টির ভারি বর্ষণ। 

 

 

চোখের ক্ষুধা 

আরফান হোসাইন রাফি 

 

 

শোকস্তব্ধ পৃথিবীর কোথাও —

শুকিয়েছে আরাল সাগরের জল,

কোথাও উড়ে গেল পাখি,

ধু-ধু মরুর বুকে তৃষ্ণার্ত প্রেমাতল।

 

কাতর সন্ধ্যার আঁধারে   

ঘাস পেরোলেই শৈশবের ঘ্রাণ।

হৈচৈ বিকালে ফেলে আসা

বুভুক্ষা কৈশোরের প্রাণ।

 

এরপর যুগ যুগ ধরে ক্ষুধার্ত ভ্রমর

মালতীর বুকে আঁচড়ে পড়া সকাল।

কোথাও শুকিয়েছে আরাল সাগর—

শিশুর গালের মতো টকটকে বিকাল। 

 

আমি গিলে ফেলি ধরণী,

লাল-নীল কিংবা ধূসর রঙিন।

তবু মেটেনা চোখের ক্ষুধা,

অদেখার অসুখে ক্রমশ হচ্ছি বিলীন।

 

 

চিত্রকথা 

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় 

 

 

ওই যে উচ্চকিত পরবাসগুলি গজিয়েছে স্পর্ধিত

পরিচয় লেখা উজ্জ্বল ঠিকানা ওখানেও কিছু

কান্না লেখা, হতে পারে সে সব হায়ারোগ্লিফ

সবার বোধগম্য নয়; তাতে কিছু নীলজল নেই

পাঁচ বছরও জানে লালজলের ব্যাকরণ

নীল জানি দূরের নাগালে।

 

এখানে খর মাটি শুকনো গরমে লিখেছে কত কথা

অবিরাম ব্রজভূম নয়, আরবের হঠাৎ বসতি ও নয়

অথবা বেথেলহেম তবু গরু ও ছাগল চরে,

কয়েকটি ভেড়াও কণামাত্র সবুজের খোঁজে

তৃণভোজী চোখ উল্লাসে ছোটে সারামাঠ

ডিঙির মিছিল সরল চোখের কাছে যাচ্ঞাহীন চেয়ে

চেনা গ্রামবেলা ওখানে যে সুখের সংজ্ঞা লেখা

তাতে খুব আক্ষেপ নেই।

 

যেটুকু গাছতলা চলমানছায়া অবলম্ব ভালোলাগাগুলি

নিয়মের সীমা পার সেও কিছু অস্পষ্ট দৃশ্যলিপি

চেয়ে দেখি অপেক্ষা মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে

সামনে সেই স্বপ্নগ্রাম যেখানে অনবদ্য লেখা

শান্তি বহমান।

 

 

একগুচ্ছ অণু কবিতা

সাজু কবীর

 

 

প্রথম প্রেম

বৈরী রোদ্দুরে ঘামঝরা পৃথিবী

নিথর বাতাসের রোদে পোড়া ডেরায় 

যুথিকাদলের প্রাণখোলা হাসি,

যেন আমার শিমুলতলার প্রথম প্রেম

যাকে আজো ভালোবাসি।

 

লোভ

চোখে জলনালি শুকে গেছে

এতো কাঁদি

অশ্রু ঝরে না আর,

বড় লোভ হয় দেখে

ভেজাচোখ তার!

 

আশা

পাখির ডানায় সন্ধ্যা নামে 

ঝাপটানো ডানার হার্দিক টানে 

নীড়েরাও ছুটে পাখির আলিঙ্গনে,

হা করে থাকা ছানাগুলোর চিঁচিঁ শব্দে

আশা'র চাল ফুটাতে থাকে 

বেঁচে থাকার সুস্বাদু কবিতা।

 

 

সংকোচন

দ্বীপ সরকার

 

 

ক্রমশঃ ঢুকে যাচ্ছি নিজের ভেতর

সংকুচিত হতে হতে প্রশ্নাতীত শূন্যে

শূন্য মানে একটা ছোটোখাটো মারবেল

 

এই যে সংকোচন পদ্ধতিতে আমি বা আমরা

ছোটো হতে হতে-ঘূর্ণির মতো ঘুরছি

আমাদের যান্ত্রিক জীবন-বাস্তববাদী হতে শেখো

কলোনিয়ান যুগ-প্রযত্নের ইতিহাসজুড়ে

বিবিধ প্রশ্নের বিপরীতে টিকে যাচ্ছি আমরা

 

ক্রমশঃ পৃথিবীর পথে আমরা ঢুকে যাচ্ছি

পর্যাপ্ত বিষুদবার পাইনা বলে শুক্রবার ভুলে যাই

বিষুবরেখার কাছাকাছি এলে

পৃথিবী ফেটে যাবে জেনেও

আমরা হেঁটে হেঁটে আরও যতদুর যেতে পারি....।

 

 

দারুচিনি ফুল 

বশির আহমেদ 

 

 

কৃষ্ণচূড়ার ডাল ছুঁয়ে একটা চামচিকা উড়ে 

গেল মধ্যরাতে। 

বিদ্রূপ আচরণে কারো মুখে বিষের গন্ধ ছড়ায়!

বিনয়ী মনে দারুচিনি ফুল ফুটে অন্তরে। 

বিভাবরী চাঁদ মাঝে মাঝে জ্যোস্না ঢালে নিকষ অন্ধকারে। 

আকাশের নিচে সবুজ বৃক্ষের পাহাড় পরার্থে 

দাঁড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে।

মানুষের জীবন চোরাবালির মতন আটকে আছে

বেহুদা মায়ার অ্যাকুরিয়ামে।

 

 

মাত্রাতিরিক্ত 

হাফিজুর রহমান

 

 

একটি পাগলা কুকুরের কামড় থেকে বাঁচতে, প্রায় এক হাজার মানুষ নিয়ে বসবাস করা একটি গ্রামের, শুধুমাত্র একজনের  পরিবার ছাড়া সকলেই পালিয়েছেন এক রাতেই! কীরকম অবাক করার বিষয়, চমকে উঠার মতো - আজগুবি কাণ্ড; বিশ্বাস করা যায়?

বাইরের দেশের বা এটি কোনো গ্রামের ঘটনা নয়, লক্ষ লক্ষ শহিদের তাজা লাল রক্ত ও মা বোনদের মহামূল্যবান সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জন করা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার, এই স্বাধীন বাংলাদেশেরই ঘটনা। 

আমরা জানি নির্দিষ্ট ভাইরাস বহনকারী কুকুর ছাড়া সকল কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক রোগে মানুষ, আক্রান্ত হয় না। কিন্তু ঐ পাগলা কুকুরের কামড়ে নাকি জলাতঙ্ক রোগের থেকেও সাংঘাতিক রকমের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যে রোগ মৃত্যুর কারণের জন্যে খুব একটা দায়ী না হলেও - মৃত্যু যন্ত্রণায় ভোগানোর, ভয়াবহ রকমের বিপজ্জনক ভাইরাস। কেউ কেউ বলেন এই রকমের জটিল যন্ত্রণায় ভোগার থেকে, মৃত্যুই অনেক ভালো, তুলনামূলক ভাবে অনেক কম ভোগান্তির।

চমকপ্রদ এই খবরটি, রেডিও - টিভি মিডিয়া, ইলেট্রিক, প্রিন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া বা কোনধরনের প্রচার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি! প্রচার বা প্রকাশের সমস্ত উৎসকে নিস্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল, দক্ষ কোনো কৌশলীর নিখুঁত কৌশলে, নাকি ঐ পাগলা কুকুরের ভয়ে, সংবাদ পরিবেশনের সাহস পায়নি কোন সংবাদ কর্মী বা উৎসাহী হয়নি কোন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, আলোচিত ভিডিও ধারণ করে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু উপস্থান করার?

সে যাইহোক, এক হাজার নিরীহ মানুষকে তাড়াতে একটি সামান্য অসুস্থ কুকুরই যথেষ্ট, বড্ড পাগল হলে তো এক হুংকারে পুরো মাঠ ফাঁকা।

বর্তমান পেক্ষাপটে, এই ধরনের নিরীহ মানুষগুলোকে দিয়ে সমাজের কোন রকম উন্নতি করানো সম্ভব নয়। সবল মেরুদণ্ডকে অকেজো করে রাখতেই ওরা পছন্দ করে বেশি। হাঁটতে চায় না প্রতিরোধের পথে, নিতে চায় না প্রতিশোধ। সংঘাত এড়াতে মুখ বুজে সহ্য করে নির্যাতন। ভুলতে বসেছে ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করতে, গর্জে উঠে না অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠ! ফলে অপরাধ বাড়ছে, বাড়ছে অপরাধী, ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পরছে দেশের সবখানে। বেড়েছে ভুক্তভোগী, মামলা, হামলা, ঝামেলায় জর্জরিত মানুষের নাকাল অবস্থা, যা জলাতঙ্ক রোগের থেকেও খারাপ, জ্বালাতঙ্ক রোগের ভাইরাস।

মামলা, আসামি, উকিলে সরগরম আদালত পাড়া, ফাইলের উপর ফাইলের স্তুপ, মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে, এ সংক্রন্ত বিষয়গুলো ভীষণ অসহ্যের।

সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের চেষ্টা না করা মানুষগুলো নিরীহ হলেও নীতিবান নয়, বরং অপরাধীদের ক্ষতিগ্রস্ত মনুষ্যত্ববোধে জন্তুর হিংস্রতা স্থাপনে সহযোগিতা করার শামিল। ঘুরে না দাঁড়ালে নিরীহ মানুষগুলো, অক্ষমতার দোহাই দিয়ে নষ্ট সমাজের দায় এড়াবে কীভাবে? পালাতে তো হবে, পাগলা কুকুরের আক্রমণ থেকে বাঁচতে!

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন