https://www.prothomalony.com/
9663
literature
সন্তান মাতৃ শরীরের অংশ। আমরা মায়ের ছায়ার অধিবাসী আমৃত্যু। মায়ের কাছে আমাদের জন্মের ঋণ। মায়ের কাছে আমাদের স্তন্যদুগ্ধ পানের ঋণ। পরম মমতায় আগলে রাখার ঋণ। শেষ পর্যন্ত তবু এই একজনের কাছে কোন ঋণই ঋণ হয়ে থাকে না। মায়া হয়ে, ছায়া হয়ে, আশীর্বাদ হয়ে সন্তানকে ছুঁয়ে থাকে। জগৎ জুড়ে সকল মাকে আমাদের শ্রদ্ধা। হৃদয় উৎসারিত ভালোবাসা।
মানুষের সবরকম ত্যাগ ও মেহনতের প্রতি আজো আমরা শ্রদ্ধাশীল, তার নজির উপস্থাপন করলেন ‘কবিতার এক পাতা’র কবিগণ। প্রায় সবগুলো কবিতাই হয়ে উঠেছে মে দিবস স্মারক। মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং মেহনতি মানুষের জয়গান কবিতাসমূহের উচ্চারণ! সকলকে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
আমন্ত্রণ জানাচ্ছি বৈচিত্র্যসন্ধানী ‘কবিতার এক পাতা’র কুড়িচব্বিশের মে সংখ্যার ভিন্নধর্মী আয়োজনে।
ফারুক ফয়সল
আমার মৃত্যু হলে যা যা হতে পারে
রাজু আলাউদ্দিন
Voces de muerte sonaran --Lorca
আমার মৃত্যু হলে তোমরা কে কে লিখবে, বল তো হে শুভাকাঙ্ক্ষীগণ?
পত্রিকায় আমাকে নিয়ে লিখবে না কেউ, সে আমার জানা।
হয়তো শিমুল তার পত্রিকায় কিছুটা জায়গা ছেড়ে দেবে।
মিলন ভাই কিংবা মাসুদ হয়তো কাউকে দিয়ে লেখাবেন শিলালিপিতে।
মাহবুব হয়তো বা কালের খেয়ায়।
প্রথম আলো বেমালুম চেপে যাবে মৃত্যুর খবর যেন আমি মরিনি কখনো।
ওদের কারণে আমি কোনদিন মরবো না এই ধরাধামে।
তবে এই ফেসবুকে লিখবে অনেকে।
তিনি খুব ভালো লিখতেন, কয়েকটি কবিতা খুব ভালো লিখেছেন—বলবে অনেকে।
জাকির বলবেন, হ্যাঁ, কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধেও তিনি খুব সিদ্ধ ছিলেন।
বাকিরা অন্ধের মতো আমার তর্জমার প্রশংসা করবেন।
যদিও তর্জমা আমি হাবীবের চেয়ে খুব কমই করেছি।
কেউ কেউ হাফ ছেড়ে বাঁচবেন আমার প্রয়াণে—অবশেষে আপদটা গেল।
সুব্রত, সুমন ও তানিয়ারা তালিয়া বাজাবে।
--বদমাশটা এতদিনে বিদেয় হয়েছে। এবার সাহিত্য কর, ফেসবুকে উৎসব কর, যে যেভাবে পার।
কিন্তু এই উৎসবের মাঝপথে রাইসু এসে বলবেন: আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন, হে বাংলার বীরপুঙ্গব,
সাহিত্যের সাধু কুশীলব? প্রয়াণের পরে এসে জড়ো হন নিন্দাসভায়!
গালিব তার স্বভাবসুলভ একটি এলিজি লিখবেন তির্যক ভঙ্গিতে, কড়ি ও কোমলে।
মাযহার লিখবেন দীর্ঘ এক গদ্যভাষ্য যার মর্মবাণী:
দেশি ও বিদেশি—দুই ভূখণ্ডে তার যাতায়াত থাকবে অক্ষয়।
ধ্রুব খুব কান্নাকাটি করে ফেস বুক ভাসাবেন।
মারিয়া, পাউল আর ব্রাউলিও লিখবেন তাদের শীলিত শোকগাথা।
অর্ক দেব দূর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবেন:
এক সাথে আমাদের বহু স্বপ্ন ছিল…
এইসব ভেবে ভেবে আমার সত্যি খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে।
মনে হয় মরেই দেখি না আসলে কী হয়!
জীবনে যা হচ্ছে না মৃত্যুর পরে যদি হয়!
মে দিবসের ভবিষ্য পুরাণ
তুষার গায়েন
অনেক নির্মাণ শ্রমিকের কাজ গুটিয়ে নিয়ে একটি রোবট শ্রমিক
দ্রুতলয়ে ইটের পর ইট ৌৌৌসাজিয়ে গেঁথে তোলে সুদৃশ্য ইমারত
সিমেন্ট-বালির পলেস্তরায় মসৃণ করে দেয়ালের পরিসর --
তার অঙ্গ সঞ্চালন মানুষের মত, কিন্তু যন্ত্রবৎ ও ক্লান্তিহীন
এক ফোঁটা ঘাম ঝরে না সারাদিন কাজের পর -- ক্ষুৎপিপাসা হীন
মজুরি-বিহীন, 'হেনরীর হাতুড়ির ঘায়ে' গান গেয়ে সমস্বরে হৃৎকম্পন
জাগিয়ে তোলে না মুনাফালোভী পুঁজিপতির মনে !
একবার ইলেকট্রিক চার্জ দিলে পরের দিন সিঁড়ির পর সিঁড়ি বেয়ে
ইমারতকে টেনে তোলে আকাশের উচ্চতায়।
ছয়শত শ্রমিকের সংবৎসরের কাজ ষাটটি রোবট করে ফেলে এক মাসে।
ষাট তলা উঁচু ইমারতের চূড়ায় কর্পোরেট প্রধান কে হবে যে কিনা
পৃথিবীর বুক-পিঠ-পেটের ভিতর থাকা সম্পদ, মনুষ্যমেধা ও শ্রমসঞ্জাত
সহস্র পরিকল্পনার জাল বিন্যাস করতে পারে নির্ভুল ও নিমেষেই খুলতে পারে
তার গিঁট যাতে পুঁজির অদৃশ্য পাহাড় মেঘের মত ছাপিয়ে পড়ে পৃথিবীর'পর --
মনুষ্যকুলের ভিতর যোগ্য কাউকে না পেয়ে অবশেষে স্থলাভিষিক্ত হলেনএ.আই. রোবট !
'মানুষেরা অস্থির, বিবদমান ও খণ্ডিত চেতনার' এই অভিযোগে রোবট, কর্পোরেট প্রধান
একে একে ছাঁটাই করেন কর্পোরেশনের উচ্চ পদাধিকারী বহু মানবসন্তান
এবং এ.আই. রোবটেরা এসব পদে সসম্মানে বসে যান।
কর্পোরেশনের বার্ষিক সভায় গোল হয়ে বসেছেন নিষ্কম্প রোবট এবংতাদের
কর্পোরেট প্রধান এ সিদ্ধান্ত নিতে যে কতজন মনুষ্য কর্মচারীর পদায়ন প্রয়োজন
যাতে মানুষের কিচির মিচির কাটাতে পারে তাদের কর্মজনিত ক্ষণিক অবসাদ!
মানুষকে ভালোবাসি বলে
রুদ্রশংকর
যেদিন কৃষকের শ্রমের উপর দিয়ে
ভেসে গেছে সবুজ ঘাম
সেদিন মানুষের প্রয়োজনে আমার জন্ম হয়েছিল
যেদিন আলোর উৎস খুঁজতে গিয়ে
শান্ত হয়েছিল শ্রমিক
সেদিন আবার জন্ম হয়েছে আমার
মানুষকে ভালোবাসি বলে
সকল সভ্যতায় আমার জন্ম হয়
আর জন্মের পর থেকেই মাপতে থাকি
চারপাশের খেটে খাওয়া মানুষদের
কালেভদ্রে শোষকের সঙ্গে দেখা হলে
আমার সুপক্ক মেধায়
বেঁচে থাকার ইচ্ছে নিয়ে মিছিল করি
ভাঙতে ভাঙতে ভেঙে ফেলি শোষণের বীজ
মানুষকে ভালোবাসি বলে
আমাদের উঠোনে আলো আসে
শান্তির আলো
সান্ত্বনার আলো
মাথার নিচে অসংখ্য মাথা আসে
হাতের মুঠোয় অসংখ্য হাত
একটু একটু করে সমাজের মুখ হয়ে উঠি
যেখানে আমার নিজস্ব কোন নাম নেই
সেখানে কঠোরভাবে বুঝতে পারি
শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ালে
খেটে খাওয়া মানুষ কতটা উঁচু হতে পারে!
রৌদ্র মাখা ঘামের গন্ধ
মনিজা রহমান
আমার আঁচলে সকাল রেখে চলে গেলে অলীক শহরে,
স্ট্রবেরি আর ঘামের মৌতাতে হেলে পড়ে দিন
দু’চোখে সন্ধ্যা মেখে ফিরে আসো। ঘামে স্ট্রবেরির রূপটান।
আহা, স্ট্রবেরি বাগান, আহা, রোদ্দুরের রূপকল্প !
এমন নিমগ্ন দিনে রাগান্বিত সাপ ময়ূর হয়ে যায়,
পেখমের মত মেলে দ্যায় ফণা।
স্ট্রবেরির গন্ধে মাতাল সাপে তুমিও কি হারিয়েছিলে স্মৃতি ?
কার কানের লতিকার অনুভব পাওয়ার জন্য ছুঁয়েছিলে?
সাপের সব প্রতিভাই ছোবলে, কেন যে বিহবল হলে মিথ্যা রূপ টানে?
সাপ কি তোমার রৌদ্র-মাখা ঘামের গন্ধ পায়নি?
চেনেনি কি হাতের ট্যাটু দেখেও?
শোনেনি কি তোমার আইপডের ভীমপলশ্রী ?
টসটসে স্ট্রবেরি নিমিষেই হয়ে গেল গন্ধর্ব ।
মধ্যরাতে আঁচলে সন্ধ্যা নিয়ে বসে আছি
দংশনের সৌন্দর্য দেখার জন্য।
তারপর ফিরে যেতে চাই আখক্ষেত পাটক্ষেত বরই বাগানে।
গোলাপবীজ বুনে চাষ করব নিজস্ব মাটি।
চলো ক্ষত চিহ্নের বৃত্তান্ত পড়ি
উদয় শংকর দুর্জয়
আমার হৃদয় এখন রক্তাক্ত ক্ষত। একশ স্টারলিংকের ডানায় আঁকা শোষণ
আর নিপীড়নের রেখাচিত্র। আমি এখনও ঘুম থেকে উঠে টের পাই আমার
পাশে ঘুমিয়ে আছে আমার ঘর্মাক্ত বাবা। বাবার শরীরে এখনো পূর্বপুরুষের
কাস্তে আর গাঁইতির চিহ্ন আঁকা। মায়ের আঁচলে এখনও ইট-শুঁড়কি-ধুলো
জমে থাকা গন্ধ।কারণ অকারণে আমার মুখমণ্ডলে দএক শ্রম্যজীবনের ইতিহাস
উঠে দাঁড়ায়। লণ্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে আমার পাশের ছিটে রং আর ধুলো
মাখা শরীর নিয়ে বুক ফুলিয়ে যে শ্রমিক বসে তাকে দেখলে রাশিয়ার বিপ্লব চোখে
ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে লেনিন, মার্ক্স, স্টালিন, মাও, ক্যাস্ট্রো, শিবদাস ঘোষ,
মিখাইল বাকুনিন, লুক্সেমবুর্গ, ট্রটস্কি, গুয়েভারাদের অবিসংবাদিত চেহারা।তবু
বিলাসিতার ডামাডোলে হারিয়ে যায় অন্তরালে সেঁধিয়ে থাকা পেটানো পেশী আর
কলখারনার হুইসেলের ডাক।
আমরা ভুলে যাই এই রাজসড়ক, প্রাসাদ, আকাশ ছোঁয়া ইমারতের পেছনে ঘাম
ঝরানো ইতিহাস।আলো আর কাচের ঝলকানিতে চাপা পড়ে থাকা জন্মদাগের
বৃত্তান্ত। বিত্ত আর বৈভবের রঙিন আলোয় এখন সবাই বদলে নিয়েছে পরিচয়।
তবু রক্তের হিমোগ্লোবিনে পূর্ব পুরুষের দাসত্বের ইতিহাস জমে আছে। পেশীর
নিংড়ানো আর্তনাদ এখনো ঘুমের ঘোরে হানা দেয় অতর্কিত। মে দিবস এলেই
পৃথিবীর দৃশ্যপট একটু হলেও পাল্টে যায়, ক্ষত চিহ্নকে জাগিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন