https://www.prothomalony.com/
9662
literature
রাতের চিরকুট
সৈয়দ নূরুল আলম
গভীর রাত। নবারুণের কাছে গ্রামের অন্ধকারকে আরও বেশি বুনো মনে হয়। ও আসছে বিয়ে করতে। পাকা রাস্তার পরে পুরো রাস্তা কাঁচা। শুধু কাঁচা বললে সবটা বলা হবে না। এবড়ো থেবড়ো, উচুঁনিচু। গরুর গাড়ি চলে রাস্তার এ অবস্থা। তার উপর রাত। রাস্তায় কোনো আলো নেই। গ্রামের রাস্তায় যে লেমপোস্ট থাকে না, এ ধারণা নবারুণের নেই। ও যদিও গ্রামের ছেলে কিন্তু বরাবর থেকেছে ঢাকা শহরে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সব ঢাকায়।
নবারুণ যে লিজাকে বিয়ে করতে আসছে সেটা লিজা জানে না। বিয়ে তো দূরের কথা, এভাবে হঠাৎ চলে আসবে সেটাই বলেনি। বলবে কী, ওতো বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছে, তাই লিজাকে কোনো কিছুই বলার সময় বা সুযোগ কোনোটা-ই পায়নি। ও শুধু ভেবেছে মনিরার হাত থেকে বাঁচতে হলে আজই ওকে বিয়ে করতে হবে। ও যখন সন্ধ্যায় মনিরাদের বাসা থেকে ওয়াল টপকে বড় রাস্তায় এসে একটা রিকসায় চড়ে বসে, তখন একটু নিশ্চিন্ত বোধ করে। হাফ ছেড়ে বাঁচে। বিকেল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত দম আটকা অবস্থায় ছিল। যেন বিনা অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামী। এখনই কালো কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে জল্লাদের মুখোমুখি হতে হবে।
হঠাৎ জানালা দিয়ে একটা চিরকুট এসে লিজার টেবিলে পড়ে। লিজা একটু ভয় পায়। কাগজটা ধরবে কি ধরবে না, কী লেখা আছে পড়বে কি পড়বে না। অবশেষে না খুলে পারল না, এতরাতে জানালা দিয়ে চিরকুট! নিশ্চয় প্রেম ট্রেমের চিঠি হবে। এসময় সতের বছরের মেয়ের পক্ষে নিজেকে দমিয়ে রাখা কঠিন। তাই আর দেরি না করে কাগজটা খুলে, মেলে ধরে চোখের সামনে। আর দেখা মাত্র চিৎকার দিয়ে ওঠে। নবারুণের চিঠি! নবারুণ এসেছে!
টেলিফোনে, ফেসবুকে ওদের পরিচয়। পরিচয়ের শুরুর দিকে লিজা বলেছিল, "মাঝেমাঝে তোমার চিঠি পাবো তো?"
নবারুণ হেসে বলেছিল, "এ যুগে কেউ চিঠি লেখে?"
"আমার খুব ইচ্ছে, আমাকে কেউ চিঠি লিখুক। আমি কারো চিঠির অপেক্ষায় থাকি।"
কথা রেখেছিলো নবারুণ। চিঠি আসতো লিজার কাছে খুব গোপনে। সে চিঠি শুরু হত 'স্নেহের লিজা ' দিয়ে, আর শেষ হত 'তোমারই নবারুণ ' দিয়ে। তখন 'স্নেহের' শব্দটার উপর খুব রাগ হত লিজার। ও কি খুব ছোট? লিজা ঠিকই "প্রিয় নবারুণ" বলে চিঠি শুরু করত।
লিজা ভেবেছিল তার চিৎকার শুনে পাশের রুমে ঘুমানো বাবা-মা জেগে উঠবেন। তারা ঘুমানোর আগে লিজাকে বলে গিয়েছিলেন, বেশি রাত করে না পড়তে। কিন্তু লিজা পড়া শেষ না করে উঠতে চায়নি।
ওর চিৎকার শুনে বাবা-মা কেউ ঘুম থেকে জাগেনি। ও সন্তর্পণে দরজা খুলে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। নবারুণ একটু দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল, লিজাকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে। ওর হাতে একটা পিঠ ব্যাগ। পরনে নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি, মাথার চুল এলোমেলো, চোখমুখ ভয়ার্ত ও মলিন। লিজার রুমের জানালা দিয়ে গলিয়ে আসা আলো থেকে এতটুকুই লিজা দেখতে পায়। এভাবে নবারুণকে দেখে একটা অজানা ভয় লিজার মধ্যে কাজ করে। একটু আগের টগবগ আনন্দ আর থাকে না। তবু কাছে যেয়ে নবারুণের হাত ধরে বলে, "কী হয়েছে তোমার, এভাবে না বলেকয়ে চলে এসেছ? আর তোমাকে দেখেও কেমন মনে হচ্ছে। একদম হুজুর সেজে এসেছ। তুমি তো কখনও পায়জামা পানজামি পরো না।" একটু থেমে, একটু হেঁসে, লিজা আবার বলে, "তুমি কি সাত সমুদ্র তের নদীর জল ভেঙে, বর সেজে আমাকে বিয়ে করতে এসেছ?"
লিজার রসিকতা যে নবারুণের মনের কথা কী ভাবে মিলে গেল, এটা ভেবে নবারুণ লিজাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কাঁপা মুখে বলে,"ঠিক ধরেছ, আমি তোমাকে বিয়ে করতে এসেছি। আমি মনিরাদের বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি। ওরা আমাকে জোর করে অস্ত্রের মুখে মনিরার সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিল।"
একটু থেমে, পায়ের গোড়ালি থেকে মশা তারিয়ে নবারুণ আবার বলে,"মনিরা নিজেই ওর ভাইদের আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। চল, তোমার রুমে যেয়ে বাকি সব কথা বলব।"
লিজা নবারুণের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে বলে, "আমার কাছে যখন একবার চলে এসেছ, আর ভয় নেই। মনিরা তোমার কিছু করতে পারবে না। কিন্তু কে এই মনিরা? ওর কথা তো কোনো দিন বলোনি। আর শুনেছি ছেলেরা সুন্দরী মেয়েদের জোর করে অস্ত্রের মুখে বিয়ে করে। তোমার ক্ষেত্রে উল্টো। তোমার ভাগ্য তো ভালো বলতে হবে।" শেষ কথাটুকু বলে লিজা হা হা করে হেঁসে ওঠে।
ওর হাসির শব্দে পাসের রুম থেকে বাবা বলে ওঠেন, "ওখানে কে, কে কথা বলে?"
বাবার কথা শুনে লিজা ভয়ে নবারুণের হাতটা দ্রুত ছেড়ে দেয়।
একটি গোলাপি গোলাপ
অংশুমালী বর্ম্মন
চৈত্রের শেষদিন। সংক্রান্তির মেলা বসে তোমার বাড়ির পাশে বিলপাড়ে। আমি প্রতি বছর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। তুমি এই একটি দিনে শুধু শাড়ি পড়ো। মেলার চুড়ি ফিতার দোকানে ঘুরো। আমি কখনো দূর থেকে, কখনো কাছ থেকে তোমাকে দেখি। তোমাকে দেখতে দেখতে কখন যে তোমার প্রেমে পড়েছি, তা আমি নিজেও জানি না।
আজ চৈত্রের শেষদিন। তুমি মেলাতে আসবে। তোমার সাথে আমার দেখা হবে। অনেক সাহস করে উঠোনের গোলাপ গাছ থেকে সদ্য অর্ধ ফুটন্ত একটা গোলাপি গোলাপ নিলাম, তোমাকে দিবো বলে।
কিন্তু বিকেল গড়িয়ে গোধূলি লগ্ন হলো। মেলার ভিড় বাড়লো, তারপর ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। তবুও তোমার দেখা নেই। তোমার বান্ধবী টিনার কাছে জানতে চাইলাম, তুমি কোথায়।
তুমি নাকি মামাবাড়ি। বিষ্ণুপুর। সেখানে তোমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে তোমার বাবা। এখন তুমি সেখানে থাকবে। কেন পাঠিয়ে দিয়েছে, জানতে চাইলে টিনা বলল, ও কথা নাইবা শুনলেন৷
টিনার কথা শুনে মনটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মনে হলো কি যেন লুকাতে চাচ্ছে টিনা। আর তা নিশ্চয়ই এমন কিছু যা কাউকে হুট করে বলা যায় না।
বললাম, আমি অনুপমার জন্য একটা গোলাপ এনেছিলাম। তাকে দিবো বলে।
টিনার মুখের হাস্যোজ্জ্বল ভাবটা খানিকক্ষণের জন্য যেন মিলিয়ে গেল। কণ্ঠস্বরেও তার এই আকস্মিক পরিবর্তনের রেশ পেলাম। গলার স্বরে খানিকটা অভিমান মিশিয়ে বলল, আর কতজন তার জন্য গোলাপ নিয়ে আসবে।
আর কতজন মানে, বলো কি টিনা।
আমার কল্পনার রাজপ্রাসাদ তখন ভেঙে পড়া শুরু করেছে। কি স্বপ্নই না দেখেছিলাম। আমি অনুপমাকে কিভাবে ফুল দিবো। তাকে কি বলবো। সে কি কি বলতে পারে। এ রকম কত সম্ভাব্য অসম্ভাব্য কথা হতে পারে আমাদের মাঝে বলে ভেবেছিলাম আমি।
টিনা বলল, আপনাকে তাহলে বলেই ফেলি। অনুপমার পাশের বাড়ির নকুল। তার সাথে মন দেয়া নেয়া ছিল অনুপমার। গত সোমবার রাতে তারা ধরা পরেছিল কু্ন্ডদের আম বাগানে। আর সে জন্যই তো অনুপমাকে ওর বাবা মামা বাড়ি পাঠিয়ে দিল।
আচ্ছা ভালো থাকবেন। আমি আসছি।
এই বলে টিনা আমাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেল।
তখন গোধূলির শেষ আলোক রেখা অন্ধকার আকাশের বুকে মিশে যাচ্ছে। আমার হাতের গোলাপি গোলাপ তো কোন কাজেই এলো না। নিজের মনকে বলছি, অনুপমা সুন্দরী। তার জন্য আট দশ জন ছেলে ঘুরবে, এটা তো স্বাভাবিক। তাদের কারো সাথে তার মন দেয়া নেয়া থাকতেই পারে। আমি তার সম্পর্কে ভালো মতো না জেনে তাকে নিয়ে বছর বছর ধরে যে স্বপ্নগুলো দেখেছি, তাতে তো তার কোনো দোষ নেই। সব দোষ আমার। এখন এ গোলাপ আমি কি করি। এ তো কোনো কাজে এলো না।
এক বার ভাবলাম, ফেলে দিবো। কিন্তু তাতে ফুলকে অপমান করা হবে। না, আমি ফুলকে অপমানিত করতে পারবো না। ঠিক তেমনি অপমানিত করতে পারবো না অনুপমাকে। আর এ জন্য গোলাপকে চিবিয়ে খেলাম আমি। গোলাপের সাথে হাজারো স্বপ্ন, হাজারো দিন রাত্রি সব যেন নিশ্চিহ্ন করতে চাইলাম। কিন্তু সব কি চাইলেই মুছে ফেলা সম্ভব। সম্ভব নয়।
অগ্নিপুষ্প
পার্থ প্রতিম দে
গোধূলীর আকাশে অপলক চেয়ে আছে ছাবেকুন্নাহার। এই ইট পাথরের শহরে কোথাও বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার জায়গা নেই; চোখ ফেটে কান্না করার উপায় নেই; স্তব্দ হয়ে উড়ে যাওয়ার পথ নেই। জীবন্ত কয়েদখানা হয়ে উঠেছে এই শহর। অথচ যেদিন দুই বোচকা মাল-সামানা দুই কাঁধে চাপিয়ে একাকী এই শহরে উঠে এসেছিল তখন দুচোখে কত স্বপ্নরা আনাগোনা করছিল। শৈশবের বেলা ফুরনোর আগেই পিতৃহীন হয়ে কখনো উচ্ছল হতে পারেনি ছাবেকুন্নাহার।
মনে পড়ে বাবা কর্মক্লান্ত হয়ে যখন ঘরে ফিরত তখন কত জৌলুসে কোলে তুলে নিত ওকে। বুকে জড়িয়ে গালে ঠোঁটে চিবুকে চুমু খেয়ে বলতো, আমার রাজকন্যা, পরী। ভাবনারাও সান্ধ্য আকাশে দীপ্তিমান তারাদের মতো মিটমিট করে জ্বলে উঠছে। গোধূলির রক্তিম আকাশকে গ্রাস করে নিয়েছে নিকষ কালো আঁধারের রঙ ঠিক যেমনটা তার জীবনের সব রঙ গ্রাস করে নিয়েছিল বাবার মৃত্যু। এরপর আর কখনো পরী হয়ে ওঠা হয়নি ওর; কেউ কোলে তুলে বলেনি, আমার রাজকন্যা।
ছাবেকুন্নাহার ইজি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়; মনের মধ্যে যে দীর্ঘশ্বাস আটকে রেখেছে তার থেকে মুক্তি পেতে হলে এই গুমোট পরিবেশের বাইরে যেতে হবে। কিন্তু কোথায় যাবে? এই শহরে তো যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই; কষ্টে মন ভার হয়ে আসলে কারোর বুকে মাথা গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে সান্ত্বনা খোঁজারও কোনো মানুষ নেই; যে মানুষটা খুব আপন। ছাবেকুন্নাহারের মনে পড়ে; মাধ্যমিকে তার ফলাফল শোনার পর অনেকেই অখুশি হয়েছিল। যার বাবা মারা গেছে বহুকাল আগে, যার মায়ের মুখের হাসি ভুলতে বসেছে এই সমাজ; সেই মেয়ে কীভাবে এমন ফল পায়। ছাবেকুন্নাহার বুঝতে পেরেছিল আগেই, বাঁচতে হলে তাকে এদের মুখ বন্ধ করতে হবে। ওদের মুখে ঝামটা ঘষে দিয়ে তরুণ মেয়েটি পাড়ি জমিয়েছে এই শহরে। আত্মীয়-অনাত্মীয় কেউ এগিয়ে এসে বলেনি, দাও তোমার কাঁধের বোঝা দুটো দাও। তুমি নিজের ইচ্ছে মতো দৌড়াও! কেউ বলেনি এ কথা। আশাও করেনি সে। ভাগ্য হাতড়িয়ে, সমুদ্র সাঁতড়িয়ে কোনো রকমে ছাত্রী হোস্টেলের তীরে ভিড়তে পেরেছিল সেদিন।
ছাবেকুন্নাহার পা বাড়ায় অন্দরমহলে; দামি চৌকিতে আরামে ঘুমোচ্ছে পরম আত্মজ। এই ছেলেটিই এখন বেঁচে থাকার আকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়টা ভালোই চলছিল। পরিস্থিতিও কিছুটা পাল্টেছে। আগে যারা চোখের ওপর, মুখের ওপর কথা বলতে ছাড়ত না; ওরাও এখন সমীহ করে চলছে। উচ্চ-মাধ্যমিকের পর ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ার সুযোগ হয়ে যায়। মনে পড়ে যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খবর নিয়ে মা'র সামনে দাঁড়িয়েছিল; অঝোরে কেঁদেছিল দুজনে। অথচ সময়টা ওদের জন্য সুখের বার্তা নিয়ে এসেছিল। ছাবেকুন্নাহার ভেবেছিল হাসতে ভুলে যাওয়া মায়ের মুখে হাসি ফুটবে ওর ভর্তির ফলাফল শুনে। সেদিন ছাবেকুন্নাহার মর্ম দিয়ে বুঝেছিল সব কান্না কষ্টের হয় না; অনেকদিন পর মা নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছিল সেদিন।
দেখতে দেখতে সময় কেটে যায়। স্নাতক শেষ করে ছাবেকুন্নাহারের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পারওয়ারদিগার যা কেড়ে নিয়েছিলেন তার সবটাই সুদ সমেত ফেরত দিতে বদ্ধপরিপকর। অল্পদিনেই জুটে গেল চাকরি যদিও ওর বন্ধুদের অনেকেই কপালে বেকারত্বের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে জুতোর সুকতলা ক্ষয় করে চলছিল নগরীর রাজপথ মাড়িয়ে। ওকে দেখে কজন যে হিংসেই জ্বলে পুড়ে মরছিল তার ইয়ত্তা নেই। ছাবেকুন্নাহারের এসবে মন নেই; ধ্যানও নেই। সে জানে গেছে দিন ভালো, আসছে দিন কালো। আগামীর পথ সুগম করতে হলে অযাচিত বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া উত্তম। সময়, পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা মেয়েটাকে কঠিন করে তুলেছে। বাস্তবতা কঠিন। ছাবেকুন্নাহার জীবনের বাস্তবতা পরখ করে এসেছে বহুকাল আগে।
ঘরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপ কিছুটা বাড়িয়ে দিল। ছেলেটা বেশি গরম কিংবা বেশি ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে না। একদম বাবার মতো। সাইফুল সম্পর্কে পতি হলেও; বর্তমানে তাদের সম্পর্কে শীতাতপ যন্ত্রহীন শীতলতা নেমে এসেছে। অথচ সাইফুলই একদিন বলেছিল, ছাবেকুন্নাহারকে দেখলে মাঘের কনকনে শীতেও ও উষ্ণতা অনুভব করে। ছাবেকুন্নাহার আড় চোখে তাকিয়ে দেখে। স্টাডিরুমে ল্যাপটপে কী যেন দেখছে সাইফুল। এভাবেই পার হয় মধ্যরাতের গল্পগুলো। সকাল হতে না হতে ছাবেকুন্নাহার বেরিয়ে পড়ে কাজে, সাইফুল তখনো পূর্ণ দিবালোকে ঘুমের ঘোরে স্বর্গালোকের অপ্সরাদের সাথে কথা বলে। ছেলেটাকে নিয়ে শুরু হয় নতুন দিনের সংগ্রাম; প্রথমে দিবা যত্ন সেন্টার এরপর অফিস।অফিস শেষে যখন ঘরে ফেরে, সাইফুল অফিসের কাজে মগ্ন থাকে। এমন মগ্নতা এখন রোজকার ঘটনা। এভাবেই চলছে বিগত বেশ কয়েকটি বছর। এই ভদ্রলোক তার ভীষণ অপরিচিত। ছাবেকুন্নাহার প্রতিদিন খুঁজে বেড়ায় হারিয়ে ফেলা সেই পাগলটাকে; যে তাকে একটাবার দেখার জন্য তীব্র জ্বর নিয়েও অফিসে চলে আসতো; তার সাথে কথা বলার জন্য নানান রকম অভিনব কিন্তু শিশুসুলভ কায়দা বের করতো।এই শহর তার সব কেড়ে নিয়েছে ধীরে ধীরে। দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণতায় শীতলতা রুদ্ধ হয় চার দেয়ালের মাঝে।
ছাবেকুন্নাহার তখন ফর্মের তুঙ্গে, বাঘা বাঘা অডিটররা ওর পারদর্শিতায় মুগ্ধ। তার এই মুগ্ধতার দুটো বিষয় মূলত কাজ করছিল, এক-কর্মদক্ষতা, দুই-টইটুম্বুর যৌবন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে যে মেয়েটা দৌড়ে নিজেকে ব্যস্ত করে তুলেছিল নিজেকে, সে ভুলতেই বসেছিল সময় তাকে যৌবনের নৌকায় তুলে দিয়েছে। তিব্বত পাউডারের আলতো ছৌঁয়াতেই অনন্যা হয়ে ওঠে সে নিমেষে; চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়ছিল অফিসসহ কর্মীদের। মেয়েটার সেসবে মনোযোগ না থাকলেও তার দিকে মনোযোগ ছিল অনেকেরই; একটা নীরব প্রতিযোগীতায় নেমেছিল অফিসের অবিবাহিতদের অনেকেই। হাওয়া গরম করা কত কথাই তার কানে আসে। মাঝেমাঝে ভালোও লাগে এসব শুনতে; পরক্ষণে নিজেকে বুঝিয়ে নেয়, এসব তার জন্য নয়।
জামানের কথা বার্তা কিছুটা ভালো লাগলেও কখনো প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলেটা এত লাজুক যে কখনো সামনে এসে কিছু বলেনি অথচ তার আচরণে স্পষ্ট বোঝা যায় সেও ছাবেকুন্নাহারের পানি গ্রহণে মরিয়া। ভেবে হাসি পায় শিরোপাখ্যাত মেয়েটার। তবে এদিক দিয়ে সাইফুল বেশ এগিয়ে। দূর থেকে তীক্ষ্ণ নজরে লক্ষ্য রেখেছে। এসব অবশ্য পরে জেনেছে ছাবেকুন্নাহার। জামানের কথা জানতে পেরে আর দেরি করেনি সাইফুল; ঢালি সাজিয়ে গৃহলক্ষ্মী হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে বাসায় হাজির হয়। পরিবারের সম্মতিতেই চার হাত এক হয়ে যায়। বেচারা জামান কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছাবেকুন্নাহারের নামের পাশে সাইফুলের নাম সম্বলিত আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে যায় তার দপ্তরে। এইসন্ধ্যা বেলায় জামানের জন্য বুকটা কি কিছুটা খালি খালি লাগছে ছাবেকুন্নাহারের?
ধীর পায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে বেসিনে আয়নার সামনে দাঁড়ায় মেয়েটা। নিজেকে দেখে ভীষণ বিব্রত লাগে। চোখের নিচে কেমন কালশিটে দাগ, উষকো খুষকো চুল! এই চুলেই তো এককালে রৌদ্রছায়ারা উদাম খেলা করতো, চোখের মায়ায় ডুবে মরতো শতশত টিউলিপ, নাইট কুইন, জারবেরা। অবহেলা সবটুকু কেড়ে নিয়েছে ওর থেকে। সাইফুলের অবহেলা ওকে ধ্বংস করে ফেলছে একটু একটু করে। ওর মনে পড়ে বিয়ের পর তো সাইফুল এমন ছিল না। কত স্বপ্নীল ছিল সময়টুকু। ছেলেটা যে এতটা কেয়ারিং হবে ভাবেনি সে। প্রেম বলতে যা বোঝায় তা তো কখনো হয়ে ওঠেনি তার। বিয়ের পর কয়েক বছর চুটিয়ে প্রেম করেছে দুজনে। প্রজাপতির ডানায় ভর করে চষে বেড়িয়েছে এই শহর। তবে কেন এই ইট পাথরের শহরের কোনো দেয়ালেই আজ প্রেম খুঁজে পায় না সে? বুঝতে পারে না; চোখের কোণা দুটো জলীয় হয়ে উঠছে কেবল। কল ছেড়ে শীতল পানির ঝাপটা দিয়ে চোখের পানির অস্তিত্ব বিলীন করতে চায় ও। পারে না। কোনোটা গঙ্গার মতো তো কোনোটা যমুনার মতো দুর্নিবার ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে।
ছাবেকুন্নাহারের দুচোখে শীতলতা ভর করে না। কোথায় শান্তি সে বোঝেনা! বোঝে না কোন অপরাধে সৃষ্টিকর্তা আবার তার সব সুখ কেড়ে নিতে চাইছে; বিষিয়ে তুলছে জীবন! এত মানুষের ভিড়ে কোথাও শীতলতা নেই; আগুনের উত্তাপ অনুভব করে বুক ভরে। ঘরের চার দেয়ালের বন্দিশালার মতোন এই সমাজও তার কাছে আগুন যন্ত্রণা দেয়; সবাই তার নারীত্বের ফায়দা নিতে চায়। এখনো বুড়ো শিয়াল কিংবা গলির মাদিখোর কুকুর তাকে দেখে জিব লালায়িত করে, হায়েনাগুলো চোখের নজরে তাকে খুবলে খেতে চায়; তাকে বুঝিয়ে দিতে চায় এই সমাজে নারীরা কেবলই ভোগ্য; অথচ সে যাদের সাথে তালে তাল মিলিয়ে চলাফেরা করে, উঠেবসে, খায়, প্রায় সবাই নিজেদের সুপুরুষ বলে দাবি করে। এই শহরে এখন অভিনয়ের আগুণ দাউ দাউ করে জ্বলছে। সবাই তাকে পেতে অভিনয় করে চলছে নিপুণ দক্ষতায়। তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করলেই ভয়ংকর হয়ে উঠতে চায় সবাই।
বেসিনের কল বন্ধ করে ছাবেকুন্নাহার। আয়নায় অনড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে জানে এই আগুনের সাথেই তার লড়াই করে বাঁচতে হবে। দু'চোখ মুছে দৃঢ় হয়ে দাঁড়ায়; নিজেকে আশ্বস্ত করে বলে, ছাবেকুন্নাহার, তুমি আগুনে ফোটা রক্তজবা। তোমার পায়েই মাথা নত করবে এই সমাজ। তুমি শুধু মাথা উঁচু করে রেখো।
ছাবেকুন্নাহার বের হয়ে আসে ওয়াশরুম হতে। সাইফুল তখনো স্ট্যাডিরুমে। ওর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ঝরে পড়ে; মনে মনে বলে, আফসোস এতটুকুই - জীবনে ভালোবাসাটা অধরাই রয়ে গেল।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন