https://www.prothomalony.com/
9398
literature
ক্ষমা করো তার ভুল
কাকন রেজা
কলস ভেঙে গেলে গলে যায় প্রাকৃত পানি
তুমিও কলস ভেঙে গেছো জানি
রাত্রির নৈঃশব্দ্য গভীর হলে মিমিকে মনে পড়ে
তোমার কি পড়ে কোনো অবসরে
দেখিনি অনেকদিন, অদেখা তাকে
আঁধার নিবিড় হয় অচেনা বৈশাখে
বৃষ্টির অশ্রু রুখতে পারে না গাল
অশ্রুও হয় ধীবর, ঘিরে ফেলা জাল
নিয়তিবদ্ধ মানুষ, তাকে ছুঁয়ে দিলো যে আঙুল
ক্ষমা করো নিয়তি ফিরে না এলে তার ভুল
মিথ্যার ডামাডোল
এবি ছিদ্দিক
আজকাল মিথ্যার ডামাডোলে
সত্য হারিয়ে যাচ্ছে...
নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে বিশ্বাসের ভীত
কেউ রাখে না মনের খবর...!
আত্মকেন্দ্রিকতা গিলছে বোধ ও বিবেক!
তবু যাপিত জীবন চলছে... চলুক..
জীবনের ফিরিস্তিতে দেখি প্রায় সবাই -
আঁটকুড়া সময়ের সেবা দাসি!
কেউ আর পাঠ করে না পুরোনো পৃষ্ঠা
চোখ ধাঁধানো নতুনত্বে মিলছে ভাঁওতাবাজি।
বৈশাখের এই দিনে
আহম্মদ হোসেন বাবু
দ্রাবিড় বাঙালি জাতি এসেছে বাংলায়
পাল, সেন, মোগলেরা যুগে-যুগে পার
চর্যাপদে পঙতি সাজে চৈতালি হাওয়ায়
জাগে শুভ্র সত্য, মরে মিথ্যা বার-বার।
চৈত্রসংক্রান্তিতে বসে বন্দনা তোমার
ব্যাকুলতা বৈশাখের নতুন সূর্যের
নবীন কিরণে জাগে নতুন খামার
অন্ধরাতে ফোটে ফুল নতুন বীর্যের।
মৃত্তিকার সন্তানেরা পোড়ে তাপদাহে
ধ্যানমগ্না বসুধা পান করে সূর্যসুধা
কৃষ্ণচূড়া, ম্যাগনেলিয়া তোমাকেই চাহে
মিলনশ্বাসে রক্তস্রোতে অনন্তের ক্ষুধা!
নতুন বছরে শান্তি আবার আসুক
বৈশাখের এই দিনে কোলজুড়ানো সুখ!
আমিটা অসুস্থ
সীমান্ত সরকার
কাঁচা টাকার উনুনে আগুনটা ভালোই জ্বলছে;
আগুনের ফুলকিতে অর্ধেক আলোকিত সময়
অর্ধেক আলোকিত আমি
আর অর্ধেক দু'জনেরই অন্ধকারে।
যেন হিংসার তেল দিয়ে উল্টিয়ে উল্টিয়ে
নুন-মসলায় নিজেকে উপাদেয় করে তুলছি দক্ষ হাতে।
শরীর পুড়ছে, মনকে শুকিয়ে শুকিয়ে ছোট করছি;
রাঁধুনির লোভার্ত কণ্ঠনালীর পথে ক্রমশ
জাহান্নামের জন্য তৈরি হচ্ছি।
যেভাবে পোড়ে শুকতারার আগুনে শয়তানেরা
সেভাবেই ওপার থেকে পুনর্জন্মরা ডেকে বলে
ও আগুন নিভতে দিও না–
ভালো লাগে শেষ হতে
সংকীর্ণ কড়াইয়ে দোজখের কারাগারে
ভাজছি আত্মা; গন্ধ ছড়াচ্ছি,
নিজেকে মৃত্যুর জন্য তৈরি করছি!
ঘুমকাতুরে
সারওয়াৎ জাবীন লুবনা
ঘুমকাতুরে মনটা তাহার, শুধুই ঘুমে ক্লান্ত
দিনদুপুরে ঘুমই আহার, কর্ম যদি জানতো
জানতো যদি জানতো,
ঘুমটা দিতোই খ্যান্ত!
খোশমেজাজে কর্ম করে, ঘর্ম যদি ঝরতো
মুলতবিতে কর্ণ বুজে, বসতো কাজে বসতো
মানতো নিয়ম মানতো,
সফলতাই আনতো!
শোরগোলেতে টনক যদি একটু সেদিক নড়তো,
শিরদাঁড়াতে নিজেই নিজের মানটা খানিক গড়তো!
ছুটতো কাজে ছুটতো,
সব যা ভালো লুটতো!
এ জীবনে আর নহে ভুল, আর নহে যে ভ্রান্ত,
খ্যান্ত দিতো ভ্রান্ত সবই পৌঁছে সঠিক প্রান্ত!
নতুন প্রাণেই বাঁচতো
বাঁচার মতোই বাঁচত!
অগ্রযাত্রা
তোফায়েল তফাজ্জল
মাথা তুললে দাবানোর প্রবণতা পিছনে লাগবেই।
মেঘের মুলুক থেকে তড়িৎ দেখাবে
নাগ বা নাগিনী নৃত্য,
শ্রবণ করাবে ভয়কে বাড়িয়ে তোলা লাগাতার শব্দ।
ডান থেকে, বাম থেকে চাপিয়ে সংকীর্ণ করতে চাবে
লব্ধ অবস্থান বা নড়াতে চাবে বসার আসন।
পূর্ব সংকেত দিয়ে বা না দিয়েই নেমে আসবে ঝড়!
ভি-আঙুল উঁচু করে তবু
অব্যাহত রাখবে অগ্রযাত্রা।
বাধাকে বানিয়ে হাদা পৌঁছে যাবে লক্ষ্যে তাহলেই।
জেনো, হিসাব গুলিয়ে ফেলা শৈথিল্য প্রাধান্য পেলে
ঝুড়ি হবে তলাহীন।
লাল শুধু লাল
সিরাজুল ইসলাম
ছেলেবেলা চৈত্রের খাঁ খাঁ করা দুপুরে
ফুলমালাদের ঘর পুড়ে গেলো লাল আগুনে।
সেদিন প্রথম দেখলাম, লাল কতোটা ভয়ংকর!
কৈশোরে ক্লাসরুমে আমাকে একা পেয়ে, 'ময়না'
তার লালঠোঁট চেপে ধরেছিলো আমার মুখে
জানলাম, লাল কতোটা আবেগ আনে!
দীর্ঘদিন ভালোবাসার অভিনয় শেষে, 'সোনাবৌ'
লাল বেনারসি পরে অন্যের ঘর গোছাতে গেলো
জানলাম, কতোটা লাল জমাট হলে বুকে রক্ত ঝরে!
লালবাতি দেখলে এখন ট্রাফিক সিগনালে-
বুকের মাঝে কষ্টের এক নৌকো চলে,
ফুলমালাদের ঘর
নির্জন ক্লাস আর
সোনাবৌ'কে মনে পড়ে!
আহতি
মুকুল রাজ
দ্বগ্ধভাগ্যে দহনে নিজেকে আড়ালে রেখেছি
চাই না উন্মুক্ত হতে-হৃদয়যন্ত্রণা বাড়াতে
দুরে থাক স্মৃতিরা, অন্তর্হিত স্মৃতি আকস্মিক বেগ
দুর হোক ইতঃপূর্বের যত আবেগ!
আভিরুপ্য মাধুর্যময়ীর স্পর্শানুভূতির মোহে
মিথ্যা আবাহনে নিজেকে ভাসিয়েছিলাম নিরালোকে
হৃদয়ে না আসুক ঐ অনুলাপ, অনু্ভব আঁখিপাত
সমাহরণে সতত দেখি যেন চাঁদ
বন্ধন-সখিত্ব করেছি ছিন্ন
একাকিত্বে চিত্তপটে হয়েছি অভিন্ন।
এখন চন্দ্রিমা রাতে জেগে থাকতে শিখেছি
নিসর্গের প্রেমে পড়তে শিখেছি
নীলাকাশ অবলোকন করে আদ্যিকালের অঙ্গগ্লানি
ভুলে যেতে শিখেছি
আর নিজেকে চিৎকার করে বলতে শিখেছি-
ভালো আছি।
মনের জমিন
গাজী তারেক আজিজ
মনের জমিন সেও আবাদ করা যায়! শীত গ্রীষ্মের আলাদা বপন প্রক্রিয়া, আলাদা ধরন, আলাদা ফসল। সবই কল্পনার অকল্পনীয় অনুভূতির চাষবাস মাত্র। একজনের জমিন, অন্যজনের আবাদ। যে বোঝে বা বুঝতে চায় তার কাছে বহুকিছু।
আমার অনাবাদি জমিনে আজ পাহাড়িয়া জুমের বাম্পার ফলন। অথচ আবাদ করা হয়নি। হয়তো মনের বসন্ত চলছে। আর তাই ফসলেরও বসন্ত ফুটেছে! কি দারুণ সে বসন্ত। সে আমার মৌন বসন্ত। আমার সে মনের জমিনে যে জুমচাষী তার খবর মনে মনে জানা হয়ে যায়। এক ফসলী এই জমিন কখনো একা ফেলে রাখা যায় কি?
ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ করে চাষবাস। গোসল রান্নাবান্না খাওয়া সেও এক বৈচিত্র্যময়। পাহাড়ের সৌন্দর্য লুকায়িত থাকে পরতে পরতে ভাঁজে ভাঁজে। আমার মনে যে জমিন তারও আছে অর্বাচীন অনুভূতি। কেন অর্বাচীন বলছি? সেও নাকি ভালোবাসতে জানে! কতজনকে বলেছে এই কথা। কেউ বিশ্বাস করতে পারে না। কারো বিশ্বাস অর্জনই তার উদ্দেশ্য নয়। তারপরও সে ভালোবেসে যেতে মরিয়া হয়। অসম্ভব মরিয়া সে মন। আজ দেহ চলে না। মন সীমানা অতিক্রম করে অসীমে উড়তে চায়। পাখিদের মত করে। ডানা ঝাপটে। কি দারুণ সে অনুভূতির রেশ! আমি আনমনা হই মনে মনে।
এভাবেই একদিন সে আসে জমিনের মালিকানা চেয়ে বসে। কি আবদার তার। আমি কি মনকে মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিতে পারি যদি সে না চায়? মনের জমিনে ভূমিকম্প হয়। ঝাঁকুনি দিয়ে যায়। এ যেন সংজ্ঞাহীন শরীরে সম্বিত ফিরিয়ে আনার মত সে ঝাঁকুনি। বড় অস্থির আমার মন ধীরে ধীরে চঞ্চলতা ফিরে ফিরে পায়। আমি তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করি। আহারে এই বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠতেও আমার কয়েক যুগ পেরিয়ে যায়। তবু ঘোর কাটে না। কাটতে চায় না। আমার কাছে তাই মানুষ এক দ্বিধার বেলুন। যে নিজেকে ছাড়া কিছুতেই আস্থা খোঁজে পায় না। কত কত সংকট মোকাবেলা করে মানুষই আজ মানুষ হয়ে রয়। মানুষের এ এক কানামাছি জীবন!
পৃথিবীর ভূভাগের মতো করে মনের জমিন বন্ধক কিংবা নিলাম হয় না। এই রাত এই পাখিদের ঝিমুনি সে জমিনে নেই একদমই। অথচ সে জমিনে জোয়ার আসে ভাটা আসে। কখনও চর জাগে। কখনও বিলীন হয় সে চর। আহা চরের জীবন। কত উদাসীন তার ভাব ভঙ্গি। আমি নির্মোহ থাকি। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার জাগিয়ে তুলি এই চরাচরে। এই যে কষ্টকর অনুভূতির অকল্পনীয় সময়ের অকপট গল্প হয়তো আর কারো নেই। আমার আছে সে কষ্টের অনুভব পুরোমাত্রায়।
আমি যাকে ভালোবেসে এই জমিনের মালিকানা হস্তান্তর করব বলে ভাবছি সে আজ যোজন যোজন দূরে। দেহের আলিঙ্গন নিয়ে যার আপত্তি সেই জড়িয়ে ধরে আবার ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কিভাবে সম্ভব তার রূপান্তর প্রক্রিয়া। আমি নির্বিকার থাকি। মনের জমিন অনাবাদি সত্ত্বেও ফসলে ভরে ওঠে। যে ফসল কেউ ভোগ করতে আসবে না। আমি তার কষ্টের কথা জেনে বুঝে এড়িয়ে গেছি। অথচ তাও আমাকে ভোলানোর সরল পরিক্রমা। যার শেষ আছে বলে আমরা শুরুটা কল্পনা করি। তার কি আদৌ কোন শেষ আছে?
আমি শেষের খবর জানি না। জানিনা বলেই এই ঘোরগ্রস্ত প্রলাপ। যে আমাকে চায় আমিই নিজেকে সঁপে দেব তার কাছে। কখনও নদীর মতো। কখনও সাগরের মতো। কখনও পাহাড়ের মতো। আর কখনও সত্যিই মানুষ। নির্বিকার মানুষ। ভাবলেশহীন মানুষ। মাঝেমাঝে প্রেমিক মানুষের অভিনয়ে নিজেকে ঝালাই করি পুরোদস্তুর। আমার এই অকপট রূপান্তর প্রক্রিয়া আমাকেই আরও শক্তপোক্ত করে। আরও নিখাঁদ করে ছাড়ে। আনমনে সেই মানুষটার কাছে। আমি প্রশ্নের উর্ধ্বে থাকতে চেয়েছি। সীমাহীন আগ্রহ নিয়ে কখনো ঘোরগ্রস্ত থেকেছি।
আজ সেই কথা অকপটে জানিয়ে রাখি যারা ভালোবাসে তারা অগ্নিস্ফুলিঙ্গের রূপ ধরতে জানে। নদীতে জোয়ার তুলে সেই আগুন নেভাতে জানে। জানে প্রাণে প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে নিজেকেই অমূল্য করে তুলতে। তাই আমার সে মনের জমিন আমি কাউকে দিতে চাইনি। আমি জানি কেউই আমাকে আমার চেয়ে বেশি ভালোবাসে না।আমাকে ভালোবাসতে দিতেও সম্মত নই। অনাহুত জটিলতার মানদণ্ডে কিংবা নিক্তিতে মাপে তুলতে চাই না। আমার এ ভালোবাসা হোক আকাশের মতো। দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে উড়ে যাক মহাশূন্যে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন