https://www.prothomalony.com/
9317
literature
অটিজম, যাকে অনেক অভিভাবকরা 'নিউরোডাইভার্জেন্ট' বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, মূলত একটি উন্নয়নমূলক, স্নায়বিক অবস্থা বা অক্ষমতা। একটি নিউরোডাইভার্জেন্ট শিশু বা ব্যক্তি কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে, শেখে এবং বিশ্বের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে, তার উপর প্রভাব ফেলে অটিজম। ব্যক্তি কীভাবে শারীরিক নড়াচড়া করে, শব্দ করে এবং দর্শনের মতো সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াগুলোর উপরও এটি প্রভাব ফেলতে পারে। অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা একটি উন্নত শুরু, তবে এর চেয়েও অটিজমের গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সচেতনতা আমাদের একটি শর্ত হিসাবে অটিজম সম্পর্কে বলে, আর গ্রহণযোগ্যতা প্রকৃত সঙ্কটপূর্ণ শিশু বা ব্যক্তির, বাস্তব জীবনযাপনের উপর আলোকপাত করে। অটিজম নিয়ে বাস করা শিশু বা ব্যক্তিকে তাদের মতো করে গ্রহণ করে, তাদের শক্তি, প্রতিভা এবং সমাজে তাদের অবদান উদযাপন করতে, আমরা সহানুভূতি এবং বোঝার একটি উন্মুক্ত দরজা খুলে দিতে পারি। সেই সাথে অটিজম সচেতনতার এ মাসে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি সেই মা-বাবাদের যারা তাদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানটির যত্ন নিতে গিয়ে সময়, শ্রম, ধৈর্য ও সমঝোতায় জীবনকে রঙ্গিন করতে প্রতিটা মুহূর্ত লড়ে যান। -এইচ বি রিতা।
মাকে হতে হবে সন্তানের কণ্ঠস্বর
মনিজা রহমান
এরপর কি? পথের শেষ কোথায়? একটা কাজ শেষ হলে শুরু হয় আরেকটা কাজের চিন্তা! একজন স্পেশাল নিডস্ মা আসলে কী কোনো বিশ্রাম পায়! ঘুমের মধ্যেও মাথার মধ্যে একটা যন্ত্র বসানো থাকে তার! তাকে যেভাবে হোক সব দায়িত্ব সময় মতো পালন করতে হবে।
নিউইয়র্ক সিটিতে আসার পরে প্রথম কয়েক বছর খুব কঠিন সময় গিয়েছে। আমার অটিস্টিক সন্তান সৃজন তখন খুব ছোট ও চঞ্চল। বাসায় সাহায্য করার জন্য তখনও হোম এইড পাইনি। বড় ছেলে মননকেও স্কুলে আনা নেয়া করতে হতো। সৃজনের তখন প্রচন্ড কাগজ ছেড়ার নেশা ছিল। সেই সঙ্গে ছোটাছুটি। খাওয়ানো ছিল বিরাট কঠিন কাজ।
নতুন শহরে আসার পরে ঢাকা থেকে ঘনিষ্ঠ এক আপা বলেছিলেন, 'এখানে বাসায় তেমন কোনো কাজ থাকে না। আমি তো দিনে মাত্র দুই ঘন্টা কাজ করি। বাকী সময় শুয়ে বসে কাটাই কিংবা বাইরে ঘুরতে যাই।' ওনাকে বলেছিলাম একবার আমার বাসায় এসে দেখে যেতে! আমাদের মতো মায়েদের কোন ঘন্টার হিসেব থাকে না।
দিনভর সব কাজের মধ্যে মাথার মধ্যে টিকটিক করে বাজতে থাকে সৃজনের ভাবনা। খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে দিন শুরু হয় সৃজনের নাস্তা বানানো দিয়ে। নাস্তা, দুপুরের খাবার, স্নাকস, তারপর পোষাক পরিয়ে স্কুল বাসে তুলে দেয়া। নিজের কাজের জায়গায় যেতে স্কুল টিচারের কাছে সৃজনের সর্বশেষ আপডেট দেয়া। কারণ ও তো কিছু বলতে পারে না! ও তো বোঝাতে পারে না, কেমন বোধ করে ও! মা তো ওর দ্বিতীয় সত্তা। ওর কণ্ঠস্বর।
লাঞ্চ বিরতিতে সৃজনের কোনো প্রয়োজনীয় ইমেইলের উত্তর দেই। বিকেলে কোন থেরাপিস্ট, জিম কোচ নাকি পিয়ানো কোচ আসবে তার সময়ের হিসাব মেলাই। সৃজন ইদানিং প্রায়ই দিনই রেগে যায়। বাসায় কারো কাছে ওকে রেখে আসার সাহস পাই না। তারপর সন্ধ্যায় টয়লেট করার পরে পরিস্কার করার কাজটাও মা ছাড়া যে কেউ করতে পারে না বা করতে চায়ও না!
মহাশ্বেতা দেবী একবার বলেছিলেন, 'আমাকে কেউ কোন পুরস্কার দিতে চাইলে বলি- ওই পুরস্কারটা কোন স্পেশাল নিডস সন্তানের মাকে যেন দেয়া হয়।' মহান মানুষ বলে উনি বুঝতে পেরেছিলেন একজন অটিস্টিক সন্তানের মায়ের মর্মবেদনা।

বাবা মা-বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চার মহা ঔষধ
শায়লা আজিম
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চারা তীব্র সংবেদনশীল হয়। কখনো তারা সবকিছু প্রকাশ করতে পারে না, বলতে পারে না। তাই বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠে যা অনেক বাবা মা বুঝতে পারেন না। কঠিন অনুশীলন এবং যত্ন একটি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চাকে অনেকটাই স্বস্তি এবং আত্মনিভরশীল করে গড়ে তুলতে পারে।অবশ্যই নির্ভর করবে বাঁচ্চার শারীরিক অবস্থার উপর। বাবা মা তার সন্তানের পরিস্থিতি জানার পরে অব্যশই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে এবং যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকবে হবে। মানসিক প্রেসারে নিজেদের অসুস্থ না করে বরং বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বাচ্চার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।
আমার নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি, আমি আমার জীবনের বেশ কিছু বছর সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে এনে আমার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চাটির জীবনযাপনে প্রতি পদে পদে অনুসরণ করেছি, যা হয়তো অনেক মায়ের পক্ষে সম্ভব হবে না। ফলে কি হয়েছে? মানসিক সমস্যা সংক্রান্ত যত ধরনের ঔষধ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে আমার ছেলেকে দেয়া হয়েছে, সেসব প্রতিটি ঔষধের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সব সময় জানতে চেস্টা করেছি এবং এগুলো ব্যবহার করার পর ছেলের ব্যবহার, রিয়েকশন সব কিছু খুব কাছে থেকে মনিটর করতে পেরেছি।
সুতরাং একজন বাবা মায়ের অনেক অনেক বিষয়ে অত্যন্ত শান্ত ভাবে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখবেন, একজন সচেতন বাবা মা-ই হচ্ছেন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চার মহা ঔষধ। সেই সাথে অটিজম নিয়ে কমিউনিটির সচেতনতা বৃদ্ধি আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কমিউনিটি যখন এ বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হবে তখন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বাচ্চাদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আরো উন্মুক্ত হবে, প্রসারিত হবে।
অটিজম সচেতনতা
রুপা খানম
আমি কোনো ডাক্তার না। আমি একজন স্পেশাল সন্তানের মা। অভিজ্ঞতার আলেকে মনে করি, অটিজম সম্পর্কে ঘর, বাহির, সমাজ বাবা মা সকলের সমানভাবে সচেতন হওয়া দরকার। প্রত্যেক শিশু জন্মগত অধিকার আর ক্ষমতা নিয়ে এ পৃথিবীতে আসে। কিন্তু অটিস্টিক শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেরা কিছু করতে পারে না, নিজে নিজে তাদের বুদ্ধির বিকাশ ঘটে না। তাদের সাহায্য দরকার হয়।
একটি অটিস্টিক শিশু একার সমস্যা নয় এটি একটি পারিবারিক এবং সামাজিক সমস্যা। সবাই মিলেই যার যার অবস্থান থেকে শিশুটিকে সাহায্য করতে হবে। তাকে সনাক্ত করতে হবে আগে। তাকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধ বলে অবহেলা নয় ভালবেসেই উন্নতি করতে হবে।
কিভাবে বোঝা যায় শিশুটি অটিস্টিক?একটি অটিস্টিক শিশু শারীরিক ভাবে বড় হলেও মানসিকভাবে বড় হতে বাধাগ্রস্ত হয়। শিশুকাল থেকেই তাদের আচরণ একটু লক্ষ্য করলে বোঝা যায় একজন স্বাভাবিক শিশু থেকে সে একটু আলাদা।সারাক্ষণ রকিং করে, বসতে চায় না। ঘুমায় কম। চিবিয়ে খায় না, হাত ফ্লিপ করে। খেলনা দিয়ে সঠিক ভাবে খেলে না। ছোট একটি অযাচিত জিনিস নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা খেলা করে। অযথা কান্না করা। কেউ তার সামনে খেলনা বা খাবার নিয়ে এলে উৎফুল্লতা দেখা যায় না। কোনো শব্দ, আলো, খাবার, ঘ্রাণ, ছোঁয়া-এই পাঁচ ইন্দ্রিয় খুব স্পর্শকাতর থাকে।
প্রথমে জানতে হবে অটিজম কি। অটিজম বিভিন্ন লক্ষণ বুঝে একটি অবস্থা সনাক্ত করা। এটি কোন রোগ না। তাদের ক্ষেত্রে ব্রেনের নিউরোগুলি স্বাভাবিক শিশুদের থেকে আলাদাভাবে কাজ করে। তবে, নিউরোনগুলি কেন আলাদা, এখনও তা অজানা। অটিষ্টিক একটি শিশু স্বাভাবিক ভাবে সামাজিকতা বুঝে না। কথার উত্তর দিতে অপারগ থাকে। ওদের নিজেস্ব একটি জগৎ থাকে যেখানে সচেতনতা আর জ্ঞানের মাধ্যমে সে বৃন্ত বা জগৎ থেকে তাদের বের করে আনতে হবে। ভাষার বিকাশ হয় না, বুদ্ধির বিকাশ সেখানেও তাদের সমস্যা হয়। তাদের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা দিতে হবে।একটি শিশু ঠিক বয়সে ঠিক কাজ করছে কিনা সেক্ষেত্রে বাবা মায়ের সচেতনতা সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর প্রতিটি শিশুকে নিয়মিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে বয়স অনুযায়ী স্বভাবিক ভাবে বেড়ে উঠছে কিনা সেই সচেতনত অবশ্যই দরকার। সমস্যা বুঝে ইভালিউশন করে শিশুটিকে নির্ধারণ করতে হবে তার মধ্যে অটিজম আছে কি নাই। সেক্ষেত্রে পরিবার সমাজ সকলের সচেতনতা অবশ্যই দরকার। অটিজম এমন একটি স্নায়ুবিক সমস্যা যা কোনদিন ভাল হয় না। তবে যত্নের সাথে উন্নতি হতে পারে। থেরাপি দিয়ে এদের উন্নতি করা যায়। বাচ্চাটি যদি সঠিক থেরাপি না পায়, বাবা মায়েদের কোর্টে হেয়ারিং করে সেই সব থেরাপি নিতে হবে। প্রতিবছর দেখতে হবে কিসে বেশি উন্নতি দরকার, সেই হিসাবে থেরাপির ঘন্টা বাড়াতে আবার হেয়ারিং 'আইপি' মিটিং করতে হবে। স্কুল বিভাগীয় অফিসে গিয়ে মিটিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।
এখনও অনেক অসচেতন বাবা-মা বা প্রতিবেশী আত্নীয় স্বজন আছে যারা অটিজম শিশুকে জিনে ধরেছে বা কালা যাদু করেছে, পাপের ফল অথবা মায়ের দোষ এসব মনে করে। মনে করে পাগল, তাকে দিয়ে কিছু আর হবে না। তাকে ঘরের বাহির কম নেয়া হয় যাতে লোকেরা না দেখে। দেখলে সেটা লজ্জা বা পরিবারে অন্য ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিতে কষ্ট হবে এ সন্তানের জন্য। অনেক সময় এইসব সন্তানদের বাবা-মা'কে বিভিন্ন দাওয়াত থেকে বঞ্চিত করা হয। এসব কিছুই আমাদের সচেতনতার অভাবে ঘটে।
একমাত্র সচেতনতাই পারে একটি অটিস্টিক শিশুর মানসিক উন্নতি করতে। সমাজে তাদের সভ্য জাতি হিসাবে গড়ে তুলতে। আর সেই সাথে বাবা-মা সহোদর, সমাজ সকলের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা পেলে সেই শিশুই তার কাজের দক্ষতার বিকাশ ঘটাতে পারে সব ক্ষেত্রে।
অটিজম-অভিশাপ নয়
কুলসুম আক্তার সুমী
একবিংশ শতাব্দিতে এসে আধুনিক বিজ্ঞান পৃথিবীর অনেক রহস্যের কারণ উন্মোচন করেছে। তবে কিছু কিছু খুব চেনা পরিচিত রহস্য রয়েছে এখনো অনাবিষ্কৃত। তেমনই এক রহস্যের নাম 'অটিজম।' কেন এটি হয় কিংবা কিভাবে এর চিকিৎসা করা যায়, আধুনিক বিজ্ঞান এ প্রশ্নের এখনো কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
১৯৪৩ সালে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে অবস্থিত জন হপকিন্স হাসাপাতালের মনঃচিকিৎসক ডঃ লিও ক্যানার ১১টি মানসিক সমস্যাগ্রস্ত শিশুর আক্রমণাত্মক ব্যবহারের সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং এ ধরনের সমস্যার নাম দেন-early infantile autism। সেই থেকে 'অটিজম' নামে এই সমস্যাটি চিহ্নিত হলেও এর বিষয়ে সাধারণের আজো কোন স্বাভাবিক বা যৌক্তিক ধারণা নেই। পৃথিবীর উন্নততর দেশে অবস্থান করা অনেকেও এটাকে মানসিক বিকৃতি বলে মনে করে অথচ অটিজম মোটেই সে রকম কিছু নয়।
আসলে অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার একটি স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা। এ সমস্যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ স্থাপন করতে না পারা, আশপাশের মানুষজনের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানে সমস্যা এবং একই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি করা। অটিজম রয়েছে এমন শিশুদের ভাষা শিখতে সমস্যা হয়, শব্দ বা স্পর্শের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা কিংবা সংবেদনহীনতা থাকতে পারে। আবার কখনো কখনো আচরণের সমস্যাও থাকে। অনেকে নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, চোখে চোখ রেখে তাকায় না; কারও কারও অটিজমের সঙ্গে এডিএইচডি (অতিচঞ্চলতা ও অমনোযোগিতা) বা খিঁচুনি থাকতে পারে।
কারো কারো ক্ষেত্রে দু' একটি বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে কারো ক্ষেত্রে একই সাথে অনেকগুলো বিষয়ও পরিলক্ষিত হতে পারে। তবে, স্বতঃসিদ্ধ ভাবে কোন কোন বৈশিষ্ট থাকবে তা বলা সম্ভব নয় কারণ অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রতিটি শিশুই ভিন্ন। ফলে তাদের পরিচালনা, শিক্ষা কিংবা দেখভাল করার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়।
একজন অটিস্টিক শিশুর যত্ন ও পরিচর্যা সহজ বিষয় নয়। এক্ষেত্রে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সেই শিশুর পরিবারটিকে আরো বেশি ক্ষতবিক্ষত করে। আমি নিজে একজন অটিস্টিক সন্তানের মা। প্রাথমিক অনেক ধাক্কা কাটিয়ে এবং এ বিষয়ে পড়াশুনা করে একটা বিষয় নিশ্চিত জেনেছি — 'There's no one cause of autism' — অর্থাৎ অটিজম কারো কারণে হয় না। তার মানে হলো আপনার যদি একজন অটিস্টিক শিশু থাকে তার জন্য মা বাবা হিসেবে আপনি কোনভাবেই দায়ী নন। এটা যে কারোই হতে পারে।
যা হোক, এ ধরনের শিশুদের সামাজিক অবস্থা খুবই নাজুক। এখনো এদেরকে পাগল, মানসিক রোগী কিংবা অস্পৃশ্য ভেবে দূরে রাখতেই অভ্যস্ত আমাদের সমাজ। অনেক সময় বাবা মা ও সেই সামাজিক চাপ সহ্য করতে না পেরে এদের সাথে অমানবিক আচরণ করে ফেলে। কিন্তু পারিবারিক বা সামাজিক ভাবে এদেরকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বাবা-মাকেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সন্তানের এ অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী ভাবা থেকে বেরিয়ে এসে বরং সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আমানত ভাবতে পারলে তবেই তা সম্ভব। অনেক বাবা-মা হীনমন্যতা বোধ থেকে পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান বর্জন করেন। এসব বঞ্চনার জন্য আবার সেই সন্তানটিকেই দায়ী করেন। নিজেদেরকেই এই হীনমন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

অটিস্টিক শিশুও হতে পারে স্বাভাবিক জীবনের অধিকারী
ফারজানা ইয়াসমিন
অটিজম মস্তিষ্কের বিকাশ জনিত একটি সমস্যা। যার ফলে শিশু স্বাভাবিক ভাবে সামাজিক যোগাযোগ করতে পারে না।অটিজম পুরোপুরি ভালো হয় না।এটার আচরণগত সমস্যাগুলো সারাজীবন থেকে যায়। তবে যদি দ্রুত শিশুর আচরণের সমস্যাগুলো সনাক্ত করা যায় এবং সঠিক
চিকিৎসার করা হয় তবে অটিস্টিক শিশুর উন্নতি সম্ভব। তারাও অন্য শিশুদের মতোই এগিয়ে যেতে পারে স্বাভাবিক জীবন নিয়ে। তবে ডাক্তারের মতে পাঁচ বছরের পরে বাচ্চাদের পরিবর্তন আনা খুব কঠিন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দ্রুত অটিজম সনাক্ত করা সম্ভব হলেও সামাজিক সচেতন না থাকায় অটিস্টিক শিশুরা স্বাভাবিক জীবন পাচ্ছে না।কারণ তাদের জন্য স্কুলের বা খেলাধুলার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। থাকলেও তা ব্যয়বহুল। অটিজম কোনো রোগ না। তবুও সচেতনতা ও মানবতার অভাবে অনেকেই এমন শিশুদের থেকে দূরে থাকেন।তাদের আচরণে বিরক্ত হন।অথচ এই শিশুদের সাথে যদি অন্য শিশুরা খেলাধুলা করে এবং অন্যরা তাদের স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে, তাহলে তারাও সামজিক সম্পর্ক তৈরি করতে পারবে।
অটিস্টিক শিশুরাও অন্য শিশুদের মতোই নানান কাজে পারদর্শী হয়।তাদের মধ্যেও অনেক বিষয়ে আগ্রহ থাকে।যা তাকে স্বাভাবিক জীবনে নিয়ে যেতে পারে। তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে অটিজম নিয়ে সচেতনতা খুব কম থাকায় আমরা অনেকেই হাল ছেড়ে দেই।শারীরিক প্রতিবন্ধীদের মেনে নিলেও অটিজমকে আমার এখনো মানতে পারি না। অথচ সঠিক ব্যবস্থা নিলে এবং পারিবারিক ভাবে শিশুর দেখাশোনা করলে অধিকাংশ অটিজমের আচরণগত সমস্যা দূর করা সম্ভব। বর্তমানে অটিজম সমস্যা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই দ্রুত সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। না হলে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
অটিজমঃ অকার্যকর ছয়টি প্যারেন্টিং শৈলী
এইচ বি রিতা
অটিস্টিক বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর যত্নে সব বাবা-মায়েরাই সংবেদনশীল। অনেকের ক্ষেত্রে সহমর্মিতা ও আবেগ একটু বেশিই কাজ করে। আমরা মনে করি, বাচ্চাটি বলতে পারছে না, বুঝাতে পারছে না, শারীরিক নড়াচড়ায় নিজে কিছু করতে পারছে না, কাজেই তার বাড়তি সাহায্য দরকার। আর তখন সাহায্য করতে আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বাচ্চাটির সাথে জড়িয়ে পড়ি। তবে, কখনো কখনো তাদের সহায়ক হতে গিয়ে আমরা এমন কিছু করি যা মূলত তাদেরকে সহায়তা করার পরিবর্তে নিজ প্রচেষ্টাকে একটা সীমানায় আটকে দেয়। আর এক্ষেত্রেই আমাদেরকে প্যারেন্টিং শৈলী পরিবর্তন করার কথা ভাবতে হয়।
আজ আমরা ছয়টি প্যারেন্টিং শৈলী সম্পর্কে জানবো যা অটিজম নিয়ে বাস করা একটি শিশুর লালন-পালনে সহায়ক নয়, এবং কেন সহায়ক নয় তাও জানবো। তবে, মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটা শিশু তার নিজ গতিতে বেড়ে উঠে।
হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং
শব্দটি এমন পিতামাতাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয় যারা তাদের সন্তানদের জীবনে এবং নিয়ন্ত্রণের উচ্চ স্তরে জড়িত থাকেন। 'হেলিকপ্টার' শব্দগুচ্ছটি এই ধারণা থেকে এসেছে যে, কিছু বাবা-মা তাদের সন্তানদের উপর হেলিকপ্টারের মতো ঘোরাফেরা করেন। দৈনন্দিন সকল কাজ থেকে শুরু করে স্কুলের কাজ, পাঠ্য বহির্ভূত ক্রিয়াকলাপ-সামাজিকীকরণ সবকিছুতেই এই প্যারেন্টিং এ থাকা বাবা মা খুব বেশি জড়িত হোন। কোনো সঙ্কট বা অসুবিধা দেখা দিলে তারা সন্তানকে রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হেলিকপ্টার পিতামাতার লক্ষ্য তাদের সন্তানের জীবনে সফল হওয়ার জন্য তারা যা কিছু করতে পারে, তার সবটুকু করা ও সুযোগ তৈরি করে দেয়া। এটি মূলত অত্যধিক নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত। অবশ্যয়ই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের বাড়তি মনোযোগ দরকার আছে, বিশেষ করে অটিস্টিক শিশুদের পিতামাতারা হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং প্রবণতা রাখেন কারণ তারা উদ্বিগ্ন থাকেন যে, তাদের শিশুটি এমন কোনো সমস্যায় পড়তে পারে যেগুলি তারা নিজেরা সমাধান করতে পারবে না। তবে এই প্যারেন্টিং বাচ্চাদের স্বাধীনতা এবং আত্ম-সংকল্প অর্জন করা বিশেষত কঠিন করে তোলে। নিউ হ্যাম্পশায়ারের কিইন স্টেট কলেজের মনোবিজ্ঞানী নীল মন্টগোমেরি দ্বারা পরিচালিত ২০১০ সালের গবেষণা অনুসারে, যে বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের প্রতি অত্যধিক প্রতিরক্ষামূলক, তারা তাদের সন্তানদের মানসিক কার্যকারিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যক্তিত্বের বিকাশ এবং বয়ঃসন্ধি বিলম্বিত করে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
কোম্পিটিটিভ বা প্রতিযোগীতামূলক প্যারেন্টিং
এই অভিভাবকত্ব শিশুদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, কারণ বাচ্চাদের জন্য অন্তর্নিহিত বার্তাটি হল: "আমি একজন ভাল অভিভাবক প্রমাণ করার জন্য তোমাকে এটা অর্জন করতেই হবে।" কোনো কিছু সন্তানের কাঁধে চাপানো ভয়ানক বোঝা।অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত একটি শিশুকে বড় করা অনেক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। কারণ আপনার শিশু প্রায়শই তাদের নিউরোটাইপিকাল সহকর্মীদের মতো যোগাযোগ, খেলা বা আচরণ করতে পারে না। কখনও কখনও, এই আচরণগুলি আপনাকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
তবে, প্রতিযোগীতামূলক অভিভাবকত্ব আপনাকে এবং আপনার সন্তান উভয়কেই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে-যখন আপনি অন্য পিতামাতার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তখন এটি আপনার মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি করবে যেখানে মনে হবে যে, আপনার সন্তান এবং আপনার অভিভাবকত্ব সমান নয়। আপনি যখন এইভাবে অনুভব করবেন, তখন এটি আপনার এবং আপনার সন্তানের স্ব-চিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক অভিভাবকত্ব প্রতিরোধে তাই বাবা মায়ের সচেতন হতে হবে।
হ্যান্ডস-অফ প্যারেন্টিং
কিছু বাবা-মা মনে করেন যে, তাদের সন্তানের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাদের নিজস্ব শখ এবং লক্ষ্যগুলি অনুসরণ করতে স্বাধীনতা দেয়া উচিত। কিছু নিউরোটাইপিক্যাল বাচ্চাদের জন্য যারা স্ব-প্রণোদিত, স্ব-নির্দেশিত এবং সামাজিকীকরণের জন্য প্রস্তুত, এটি দুর্দান্তভাবে কাজ করে। তবে, অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য এটি খুব ভাল বিকল্প কিছু নয়। নিঃসন্দেহে সকল বিশেষ চাহিদার শিশুর জন্য অভিভাবকীয় মনোযোগ, সামঞ্জস্যপূর্ণ, লক্ষ্যযুক্ত পিতামাতার সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। কারণ বেশিরভাগ সময় আপনাকে অটিস্টিক শিশুটিকে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে, অন্যদের সাথে যোগাযোগ করতে, প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে এবং তাদের পরিবেশ অন্বেষণ করতে সহায়তা করতে হয়। যখন এই অত্যাবশ্যক ক্ষমতাগুলি বিকাশের জন্য অটিস্টিক শিশুদের একা ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন তারা আরও একান্ত এবং আত্ম-শোষিত হয়ে উঠতে পারে, সেইসাথে অন্যদের সাথে কম যোগাযোগ বা অনিচ্ছুক হতে পারে। উপরন্তু, তারা তাদের ক্ষমতা বিকাশ এবং তাদের সম্পূর্ণ সম্ভাবনা উপলব্ধি করার জন্য সব ধরনের সুযোগ নাও পেতে পারে।
পারফেকশনিস্ট প্যারেন্টিং
এই প্যারেন্টিং একটি শিশুকে বিশ্বাস করায় যে, যদি সে সর্বোচ্চ মান অর্জন না করে তবে সে ব্যর্থ। নিখুঁত হওয়ার জন্য বাচ্চাদের উপর অত্যধিক চাপ দেয়া মূলত শিশুদের মনে ভুল বার্তা পাঠায়। এক্ষেত্রে একটি শিশু ভালো গ্রেড পেতে তার স্কুলের কাজে প্রতারণা করতে পারে। কারণ সে মনে করতে পারে আপনি সততার চাইতে কৃতিত্বকে মূল্য দিচ্ছেন।
যদিও অটিস্টিক শিশুদের অনেক দিকে প্রতিভা ও শক্তি থাকে, তবে সত্য হল যে তারা প্রায়শই নিউরোটাইপিকাল বিকাশের অনেক প্রত্যাশা পূরণ করতে লড়াই করে। তাদের মৌখিক ক্ষমতার দুর্বলতার কারণে চমৎকার মার্কস এবং ত্রুটিহীন ব্যাকরণ অর্জন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হতে পারে। খেলাধুলা তাদের জন্য বিশেষত কঠিন হতে পারে কারণ তারা শারীরিক সমন্বয়ের সাথে লড়াই করতে পারে।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রায়ই শৃঙ্খলা এবং নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন থাকে। তবে এক্ষেত্রে তারা মনে করতে পারে যে, বিশৃঙ্খলা এবং অনিশ্চয়তা এড়াতে তাদের নিখুঁতভাবে কাজ করতে হবে, যা তাদেরকে উদ্বেগের দিকে পরিচালিত করতে পারে।
পার্মেসিভ প্যারেন্টিং
এ প্যারেন্টিং এ বাবা-মা সন্তানের প্রতি উষ্ণ হোন। সাধারণত সন্তানের কাছে তাদের ন্যূনতম বা কোন প্রত্যাশাই থাকে না। তারা সন্তানদের উপর সীমিত নিয়ম আরোপ করেন এবং স্বাধীনতা দেন। বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিজেদের জন্য জিনিসগুলি খুঁজে বের করতে দেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে,
অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য স্কুলের কাজ সম্পন্ন করা কঠিন, এবং তাদের বিরতি দরকার। আপনি মনে করতে পারেন যে, শিশুটিকে নিজের বা পরিবারের কাজগুলি সম্পূর্ণ করতে বলা, নিজেকে শান্ত করতে বা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে বলা অযৌক্তিক। যদি তাকে 'যা খুশি বা যা চাও তাই করো'-করতে দেয়া হয়, তবে এর দুর্ভাগ্যজনক ফলাফল শিশুকে এমন অভ্যাস এবং আচরণ শিখতে দিবে যা গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে। অটিজম কিছু জিনিসকে কঠিন করে তোলে, কিন্তু প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অটিস্টিক শিশুরা অনেক কিছু করতে পারে যদি তাদের তা করতে বলা হয় এবং উৎসাহিত করা হয়। আপনি যদি অটিস্টিক শিশুকে নিয়মানুবর্তিতার প্রস্তাব না দেন, তবে আপনি তাদের পক্ষে বোঝা হবেন বা উচ্চ প্রত্যাশা অনুযায়ী বেঁচে থাকাকে আরও কঠিন করে তুলবেন। একটি শিশুর চ্যালেঞ্জ বোঝা ভিন্ন জিনিস; কিন্তু একটি শিশুকে অযোগ্য বলে ধরে নেওয়া আলাদা এবং ক্ষতিকারক কিছু।
দ্য ফ্রেনেটিক প্যারেন্টিং
এই ধরনের অভিভাবকত্বে বাবা মা সন্তানের প্রতিটা মুহূর্ত কাজে লাগিয়ে উপভোগ করতে চান। তারা তাদের বাচ্চাদের জন্য উপলব্ধ প্রতিটি ক্রিয়াকলাপে নথিভুক্ত করেন এবং তারা প্রত্যাশার বাইরে অর্জন দেখতে চান। আপনার অটিস্টিক শিশুটি হয়তো ছয়/সাত ঘন্টা স্কুল শেষ করে বাড়ি ফিরেছে, তারমধ্যে কয়েকটা আচরণগত থেরাপি, স্পিচ-অটি-পিটি থেরাপি ছিল। শিশুটি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ার সাথে সাথে, আপনি ইন্টারনেটে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আরও একটি থেরাপিউটিক ক্লাস, প্রোগ্রাম বা কার্যকলাপ শিশুটির সময়সূচীতে যোগ করার জন্য। ফ্রেনেটিক প্যারেন্টিং আপনার সন্তানকে অতিমাত্রায় অভিভূত করতে পারে। স্কুল, থেরাপি এবং অন্যান্য ক্রিয়াকলাপগুলি আপনার অটিজম আক্রান্ত সন্তানকে শিখতে এবং বেড়ে উঠতে সাহায্য করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সময়সূচীতে খুব বেশি কার্যক্রম প্যাক করা মানে শিশুটিকে নতুন দক্ষতা অনুশীলন করতে এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ করার সময়কে বাধাগ্রস্ত করা।
এই প্যারেন্টিং পদ্ধতিটি নিউরোটাইপিকাল বাচ্চাদের জন্য সমস্যা না হলেও অটিজমে আক্রান্ত বাচ্চাদের জন্য কঠিন হতে পারে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের প্রক্রিয়াকরণ, শেখার এবং এমনকি বিকাশের জন্য, খেলাধুলা ও বিশ্রামের জন্য সময় প্রয়োজন। তারা যা শিখেছে তা অনুশীলন করার জন্য তাদের রুম প্রয়োজন। একটি কঠোর সময়সূচী মেনে চলার মাধ্যমে এই শেখার প্রক্রিয়াটি অগ্রগামী করা অবশ্যই সম্ভব নয়। আপনি যখন ক্রিয়াকলাপগুলি নির্ধারণ করছেন, তখন শিশুটির জন্য বিশ্রাম ও বিরতির কিছু সময় আলাদা করতে ভুলবেন না।
অটিজমে থাকা শিশুদের প্রতিদিনের জীবনযাপনকে কিছুটা সহজ করতে সঠিক পদ্ধতি বেছে নেওয়া-আপনার শিশুকে এমনভাবে উৎসাহিত করতে পারে যা তাদের শক্তি এবং ক্ষমতা বিকাশে আরো সহায়তা করতে পারে। আপনার সন্তানকে নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করতে সাহায্য করুন। সন্তানের দুর্বলতা এবং শক্তিগুলি বুঝে নিয়ে তা গ্রহণ করুন এবং তাদের নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের শক্তি ব্যবহার করতে সহায়তা করুন। আপনার সন্তানদের জন্য সবকিছু করা থেকে বিরত থাকুন, পরিবর্তে ধীরে ধীরে কীভাবে তারা নিজের কাজগুলি সম্পন্ন করতে পারে, তা শেখানোর জন্য পদক্ষেপ নিন। তাদের সম্মানজনক পদ্ধতিতে কথা ও আচরণ করতে শেখান, তাদের নিজস্ব সমস্যা সমাধানে উৎসাহিত করতে পাশে থাকুন। তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝে প্রত্যাশা করুন। অন্যের সাথে তুলনা করা এড়িয়ে চলুন। আপনার অটিস্টিজমে আক্রান্ত সন্তানের জন্য সঠিক প্যারেন্টিং স্টাইল নির্বাচন করা মানে-তা উভয়ের জন্য সুবিধা প্রদান করবে।
সন্তানের জন্য উপযুক্ত প্যারেন্টিং কৌশল সম্পর্কে আপনার স্বাস্থ্যসেবা দলের সাথে কথা বলতে পারেন।

অটিজম সম্পর্কে জানতে হবে
শামসুন ফৌজিয়া
অটিজম হচ্ছে শিশুর মস্তিস্কের বিকাশ জনিত সমস্যা।যাকে এএসডি বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসওর্ডার বলে।যে ত্রুটির কারণে জন্মের পর শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ঘটে না।এ ক্ষেত্রে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি হলেও মানসিক বিকাশ হয় না।শিশুর জন্মের তিনবছরের মধ্যে অটিজমের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। এই শিশুরা জন্মের পর নির্দিষ্ট সময়ে হামাগুড়ি দেওয়া, হাঁটা বা কথা বলা এমনকি স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করে না।এদের দুর্বল আই কন্টাক্ট থাকে, চোখের দিকে তাকায় না,ঘাড় সোজা হতে দেরি হয়,শিশু খুব কান্না করে কিংবা যারা কথা বলতে পারে একই কথা রিপিট করে। এই শিশু হাত পা ছুঁড়বে, বেশি বেশি মাথা দুলাবে, রেসপোন্স করবে না। আরো অনেক লক্ষণ থাকতে পারে। অটিজম কেন হয় এর নির্দিষ্ট কোন কারণ এখনো আবিষ্কার হয়নি। এর প্রতিকারের জন্য কোন ঔষধও আবিষ্কার হয়নি। বিজ্ঞানীরা অটিজমের কারণ হিসাবে জিন ও পরিবেশগত সমস্যার কথা বলেছেন।
জন্মের পর শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ না ঘটলে অর্থাৎ, যে বয়সে শিশুর ঘাড় শক্ত হবার কথা সেটা হচ্ছেনা,কথা বলার সময় শিশু চোখের দিকে তাকাচ্ছে না,অন্যমনস্ক থাকছে, সাড়া দিচ্ছে না, অতিরিক্ত কান্না করছে...ইত্যাদি লক্ষণগুলি চোখে পড়লে বুঝতে হবে শিশুটির কোন সমস্যা হচ্ছে এবং দ্রুত ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ নিলে পরবর্তীতে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর মস্তিস্কের অসুবিধাগুলো ধরা পড়ে।
যাইহোক, উপরে যা লিখেছি সেগুলো আমি আগে জানতাম না। পরিস্থিতির প্রয়োজনে জেনেছি। অটিজম নিয়ে যদি ন্যূনতম ধারণা থাকে তাহলে এই পরিস্থিতিতে পড়লে সকল বাবা মায়ের জন্য বিষয়টি মানসিকভাবে গ্রহণ করতে সহজ হয়। অটিজম বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন যে নামে সম্বোধন করি না কেন, এই শিশুরা আমাদেরই পরিবারের, সমাজের কারো না কারো সন্তান।পরিবারে একটি অটিজম শিশু থাকা মানে এই পরিবারের সবার, বিশেষ করে মা-বাবার বাড়তি কিছু দায়িত্ব পালন করা। ডাক্তারের চিকিৎসায় যখন শিশুটির অটিজম ধরা পড়ে তখন মা বাবার ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ পড়তে শুরু করে। সেই সাথে জীবনের স্বাভাবিক গতি বদলে যায়। এই সময় পরিবারের অন্যদের সাপোর্ট খুবই জরুরি। পরিবারের লোকজনের সাপোর্ট থাকলে মা বাবার ওপর চাপ কিছু কমে যায় এবং শিশুর পরিচর্যা সহজ হয়।
প্রথমে যে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে তা হল অটিজম কখনো ভাল হয় না, থেরাপি, চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে কিছুটা উন্নতি হয়। এই ধরণের শিশুকে বেশি করে যত্ন দিতে হয়। গল্প- ছড়া, মিউজিক বা খেলনা ও ডিভাইসের মাধ্যমে কথা বলাতে চেষ্টা করাতে হয়। উন্নত দেশের স্কুলগুলোতে স্পিচ, ওটি-পিটি থেরাপি সহ নানা সুযোগ থাকে। কিন্তু যতদূর জানি বাংলাদেশের সরকারী ভাবে এই সুযোগ বা কেনো স্কুল নেই। যা আছে তা ব্যয়বহূল যা প্রয়োগ করা সবার সাধ্যে নেই।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে তেমন সচেতনতা ছিল না। অটিজম শিশু ও ব্যক্তিকে পরিবার ও সমাজ সোজা বাংলায় 'পাগল' বলত। আমি নিজেই জানতাম না অটিজম কি ও কেন হয়? যখন জানতে পারলাম পুরোটাই বিস্ময় ছিল। ধীরে ধীরে মানসিকভাবে গ্রহণ করতে শিখেছি। অনেক পরিবার অটিস্টিক শিশুকে এখনো সহজে মেনে নিতে চান না, বরং বোঝা মনে করেন, অভিশাপ মনে করেন। সচেতনতার অভাবে অনেক পরিবার সন্তানের এমন সঙ্কটে ডাক্তারের বদলে কবিরাজের কাছে যান। অটিজম শিশুর জন্য মাকে দায়ী করা হয় বেশি। অথচ কেউ ভেবে দেখে না, সে মায়ের মানসিক অবস্থা। কতটা ত্যাগ, ধৈর্য, সময় নিয়ে একজন মা সেই সন্তানের পাশে থাকেন সারাক্ষণ, তা কেউ ভাবে না। বলা বাহুল্য একটি অটিজম শিশুর জন্ম হওয়া মানে মা বাবার জীবন বদলে যাওয়া। বিশেষ করে একজন মায়ের এই শিশুর প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন বদলে যায়। মা বাবা সন্তানের জন্য সময় ব্যয় করেন,তাদের কাছে দিন রাতের কোন ব্যবধান থাকে না, বিশেষ করে মাকে চব্বিশ ঘন্টাই ডিউটি পালন করতে হয়। মা যদি ওয়ার্কিং ওম্যান হন শিশুর পরিচর্যার পরে পরিবারের বাকি কাজগুলোও পালন করতে হয় যা খুবই কঠিন। অনেক সময় অটিজম শিশুর জন্য স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হয় না, মন কষাকষি চলে। একে অপরকে দোষী করেন। এসবও মোকাবেলা করতে হয় অনেক পরিবারে। এই জায়গায় পরিবারের বাকি সদস্যদের সহযোগিতা খুব দরকার।
অটিজম শিশু পরিবারের জন্য বোঝা নয়। তারা অভিশাপ নয়। অটিজম শিশুরা খুব বুদ্ধিমান হয় এবং কোন না কোন বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী হয়। মা বাবাকে শিশুর সেই গুণটি কি জানতে হবে এবং বিকাশে সহায়তা করতে হবে। আমাদের সমাজে সন্তান পালনে মায়েরা বেশি ভূমিকা রাখেন, পুরুষরা রোজগারে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু সকল সন্তানের প্রতি বাবা মা দু'জনেরই সমান দায়িত্ব রয়েছে। বিবাদে না গিয়ে দায়িত্বগুলো ভাগাভাগি করে নিলে, মায়ের উপর চাপও কম পড়ে, সেই সাথে বিশেষ চাহিদার সন্তানটি উপযুক্ত যত্নসেবা পেতে পারে।
এই শিশুরা খুবই সংবেদনশীল এবং আবেগী হয়। তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে। তাদেরকে কখনো অবহেলা করা যাবে না, আঘাত করা যাবে না। অটিজম শিশুর প্রতি সমাজে ও পরিবারে অনেক অবহেলা আছে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রথমে মা বাবাকেই তাদের সন্তানকে গ্রহণ করতে হবে, সুরক্ষা দিতে হবে সে যেমনই হোক। তবেই আসবে সমাজ সচেতনতা।
বিশ্বের সকল অটিজম শিশুর প্রতি ভালোবাসা ও দোয়া রইল। সকল লড়াকু মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা রইল।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন