https://www.prothomalony.com/
9245
literature
উষা
শঙ্খশুভ্র পাত্র
এই দ্বিপ্রহরে দীপ্র, মধ্যরাত মিশে যায়, স্মৃতি
শিশুর সারল্যে তাকে ধরে রাখি, চন্দ্রাহত ডানা
সহমতে রহমত— ঋতাক্ষরে গেঁথে রাখি প্রীতি৷
দূরভাষে এত যে নিকট-সুর ছিল না তো জানা৷
অন্তর্মুখী চরাচরে জ্যোৎস্না ঝরে— যে পায় সে পায়৷
মধ্যযামে নীল খামে উড়ে আসে কবিতার চিঠি,
আমি যে দিনানুদিন, আলাদিন, দীনের উপায়
আশ্চর্য প্রদীপে আজও জ্বেলে রাখি আঁধারের ভীতি৷
আসলে সে-অন্ধকার ছন্দোময় সমুদ্রের ঢেউ
হার-না-মানার দৃঢ় অঙ্গীকারে একাকী শপথ...
পথে-পথে আলোগৃহ, সংবেদন, অভাবিত কেউ
দু'হাত বাড়িয়ে দেবে আশাতীত, শান্তির কপোত৷
নিশিরাত ক্রমে ক্রমে আমারই সে-দেশ, বেশভূষা—
যে-রকম তিসিফুলে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে উষা...।
আলোক অনুবর্তী
পিনাকী রঞ্জন মিত্র
মাঝেমাঝে ট্রেন অন্ধকার গুহার ভেতর দিয়ে চলে
সেই সময় হঠাৎ যদি কামরার আলো নেভে
কী ভয়ানক!
পাশে সূর্যের ঝলমলে রোদ্দুর নেই
গুহার ভেতর দিয়ে চলে যায় সূর্ষহীন খানিকটা দূর
এ যেন জীবনেরই কোনো অন্ধকার সীমানা
তারপর একসময় আঁধার কেটে যায়
ট্রেন চলে আসে আলোকোজ্জ্বল আঁচলায়, তখন
ঝেড়ে ফেলে দিতে হয় অন্ধকারের বীভৎস কাল
মনে থাকে অন্ধকার
আলোও অন্ধকার কালার্ণবের বিপ্রতীপ
তবুও সবুজকে আলোক অনুবর্তী হতে হবেই।
মশা
অমিতাভ সরকার
বড়ো বিপদ,
যেখানেই গাছ দেখা যাচ্ছে সদলবলে ওরা এসে হাজির, অনেক দিন গোঁফ-দাড়ি না কাটলে চেহারার আসল
দামটা বাড়ে,
সবাই ফোন দেখে কবিতা পড়ছেন,
পড়া মুখস্থ করে আসেননি কেউই
যা হচ্ছে তাতেই হাততালির কেতাদুরস্ত রেওয়াজ,
চিৎকারও বাড়ছে, পরিষ্কার রাখার অনেক উপায়
সবার জানা তবু
সারাদিন প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ কবির জন্ম,
করোনার পরে আরও বেশি...
ফেসবুকেই সবার হুল ফোটানোর পরম আশ্রয়স্থল
জামার বোতামে হাত দিতেই আটকে পড়ে সময়,
রোজ এত এত জমলে জল সামলাতেই তো...,
আঙুল আরও বড়ো হচ্ছে, একদিন ডাইনোসরের চেয়েও...
রাস্তায় দেখা হলে আবার না বই গছায়।
বাতাশের দু'পেয়ালা
কোমল দাস
বাতাসের রন্ধ্রদেশে অলৌকিক কতো খেলা চলে
মাতাপিতা দু'টি ভাগে সঙ্গ করে দুটি লীলা পথে
সোম শুক্র বুধে বাম মায়ের কোঠোরে যাত্রা শুরু
বিঘ্নরা পালায় দূরে অমাবস্যা ভাঙে রাঙা চাঁদে
দক্ষিণেতে পিতৃদেব বাকি দিনে সূচনায় এনে
সমস্ত বন্ধন খুলে নদী যায় মোহনা সঙ্গমে।
এই তত্ত্ব জানা হলে তার খোলে সোনালি সোপান
অপঘাতে মরে না সে, স্বরবর্ণে স্বরলিপি গায়
মৃত্যুর নব্বই দিন আগের যে বাতায়ন খোলে
বোঝেন তা মহাজন অবিচ্ছিন্ন সূক্ষ্ম অনুভবে
বাতাসের দু'পেয়ালা এভাবে ইলশেগুঁড়ি খেলে।
ফড়িং ভাগ্য
স্বপন শর্মা
পাখিদের মতো ফড়িঙের স্বপ্ন ছিল
আকাশে আকাশে উড়ে বেড়াবে
অথচ সেই স্বপ্নটা ভেঙে যায়
বিধ্বস্ত জেট ইঞ্জিনের হুইসালে।
জবা ফুলের পাপড়ি যেভাবে ভাগ হয়
তাদেরও ভাগ্য বিভক্ত হয়- দলে
অথচ জানে না শালিক ফিঙের সন্ধি
পুঁজিবাদি সূত্রে গাঁথা...
শালিকের ঠোঁটে আহত ফড়িং
যেমন বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর
সাম্যবাদের স্লোগানে মুখরিত জীবন
শোষকের রাজ্যে তবুও বেঁচে থাকা।
কে যেন
তাহমিনা শহীদ
কোথায় যেন প্রলয়ঙ্করী এক ঝড় বয়ে গেল!
কে যেন হাঁটছে, হাঁটছে
শুধুই হেঁটে চলেছে নদীর তীর ঘেঁষে
কার যেন বুকের পাঁজরগুলো পুরনো জানলার
খড়খড়ির মতন, ঝুর ঝুর করে ভেঙ্গে পড়ছে
কে যেন হঠাৎ খুব একা হয়ে গেল
যেন আনন্দের এক মেলা থেকে,
বাড়ি ফিরবার পথে; একেবারে শূন্য হাতে
এমনকি মাটির পুতুলগুলোও পথে পথে হারিয়ে
খেলাঘরের সব আনন্দ, উল্লাস মুছে দিয়ে
এক মুখ মেঘ নিয়ে কে যেন খুব দুঃখ হয়ে;
ঘরের দাওয়ায় এসে নিশ্চুপ বসে রইল!
কোথায় যেন প্রলয়ঙ্করী এক ঝড় বয়ে গেল!
কলঙ্কিত পালঙ্ক
তুহীন বিশ্বাস
জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ভরসাস্থল-
নিঃশ্বাস দীর্ঘশ্বাসে প্রতিমুহূর্ত কণ্টকিত;
তবুও চরিত্রটা অদ্ভুত নেশায় মাতাল
পূণ্য ঘুমিয়ে পড়ে পাপিষ্ঠের বালিশে।
সামাজিক দায়বদ্ধতার সাইনবোর্ড-
সযত্নে ঝুলে আছে দরজার ওপাশে;
কলঙ্কিত পালঙ্কে লাগে পরিত্যক্ত রক্ত
শাড়ির আঁচলে গোঁজা সভ্যতার ভক্ত।
অতঃপর পাঠালে এক টুকরো মেঘ
দীপান্বিতা চৌধুরী
বৈষ্ণব, অবাক করে দিয়ে একদিন বলেছিলে
তুমি হলে বৃষ্টি ভেজা পুইয়ের লতানো ডগা
বলেছিলে, তোমায় দিলাম পৃথিবীর সমস্ত সবুজ।
করোতল ভর্তি সবুজ নিয়ে এ বর্ষাও গেল।
অথচ তুমি বৈশাখীবনে হারিয়ে গেছ স্বেচ্ছায়
দিব্যি দেইনি ফিরে আসার
তুমিও তো বলনি অপেক্ষায় থেকো পদ্ম
দু'জনেই জেনেছি স্বেচ্ছা দূরত্বে কতখানি পূর্ণতা।
অতঃপর!
তুমি পাঠালে এক টুকরো মেঘ।
বিনিময়ে তোমায় পাঠালাম ভেজা মাটি আর
বুনো ফুলের ঘ্রাণ
ভীষণ খরায় হাত পেতেছিলাম তোমার কাছে
ওই এক টুকরো মেঘ আমার সরল উচ্ছ্বাস
অযাচিত অনলে নিজেকে ফোঁটা ফোঁটা পোড়াই
অথচ ওই মেঘটুকু লুকাই সন্তপর্ণে
বৃত্ত বন্দী আমি আর এক টুকরো মেঘ।
যখন নিষিদ্ধ আমি
চর্যা আম্মার
যখন নিষিদ্ধ আমি তোমার মনোজগতে বারবার উঁকি দিয়ে জানলা খোলার চেষ্টা করি, আমি কি আমি? নাকি তোমার প্রেমিক হয়ে যাই-বনে যাই!
পাহাড়ের অভয়ারণ্য দেখে যেমন নির্বিকার বাঘ, আমি তেমন এক চোরা শিকারী। তারপরও আমি নিষিদ্ধ! নিষিদ্ধ বললেও ভুল হবে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে জোর জবরদস্তি করে। এ যেনো অধিকার হরণের মহোৎসব। তারপরও আমি থেমে নেই। আমি থেমে থাকার পাত্র নই। দমে যাবার প্রশ্নই ওঠে না।
চোখে চোখ পড়তেই আমাকে ভেদ করো কামানের গোলার মত। কেউ বুঝে ওঠার আগেই ফিরিয়ে নেয়া চোখ দুটিতে যে ঘোর, তা আর কারো নেই। অথচ আমি নিষিদ্ধ। দেহ জগতে নিষিদ্ধ। মনোজগতে নিষিদ্ধ। আর সবই নাটকীয়। এতসব নাটকীয় নিষিদ্ধতার মাত্রা ভেদ করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। মানুষ যা নিষিদ্ধ জানে আমি তার ঢের বেশিকিছু। পারতপক্ষে তুমি জানান দিলে জানবে বিষের বাঁশী। বাজবে আর ক্ষয়ে যাবে। তারও আছে অদ্ভুত ক্ষরণ রোগ। যেন ক্ষরণ পরিক্রমা।
একসময় ভাবতাম তোমার মন খারাপের সাথে আকাশের সংযোগ আছে। নীলিমায় ঘেরা আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে যায়। আর মেঘে ঢাকা আকাশ উজ্জ্বল ধবধবে শাদা হয়ে যায়। আবার তোমার চোখে জল দেখে আকাশও অঝোর কেঁদে ওঠে। সবাইকে জানিয়ে দেয় তোমার ব্যথায় ব্যথিত। কিন্তু না, তা নয়! একদমই নয়! নিবিড় পর্যবেক্ষণ শেষে আমি বুঝতে পারি, এটাই বৈচিত্র্য। ফাগুনে যেমন করে প্রকৃতি উদ্বেল হয়, ঠিক যেন তেমনই। আশার প্রদীপ জ্বেলে কারো জন্যে অপেক্ষা। যে অপেক্ষা ফুরাতে চায় না। কতকাল বয়ে চলা নদীও এক সময় চর জেগে ধীরে ধীরে মরে যায়। সরল নিয়তি মেনে আমি অপেক্ষা করি। শ্যামক্লান্ত অধীর অপেক্ষা। শীত শীত অপেক্ষা। জবুথুবু অপেক্ষা। তারপরও নিষিদ্ধতা শিথিল হয় না। মেয়াদ পেরিয়ে দীর্ঘতর হয়। হতে থাকে।
মনোজগতের ঘোর কেটে গেলে, দেহ জগতে নেমে আসে আরো দূর্যোগ! নিষিদ্ধতার মাত্রা আরো বাড়ে আরো বাড়ে। এই নিষিদ্ধতা নিষিদ্ধ জগতের নয়। মনের মিল অমিলের নয়। তাইতো আমি মানি না। মানতে পারি না। আর পারি না বলেই সীমাহীন কষ্ট আমার। দুর্যোগের মত কষ্ট। প্লাবনের মত কষ্ট। বিষাক্ত নিঃশ্বাসের মত তেজস্ক্রিয় কষ্ট। এত এত কষ্ট পুষে রেখেও আমি নিষিদ্ধ। আমাকে ফেরার করার কষ্ট উপেক্ষা করা যায়। তোমার উপেক্ষা সওয়া যায় না। দিনদিন এই পরিক্রমা আমাকে গিলে খায়। কুরেকুরে খায়। কুড়ে কুড়ে খায়।
আমি আঁধার সয়েছি। প্রাণপণ উপেক্ষা সয়েছি। বারবার নিষিদ্ধ থেকেছি। তারপরও তোমাকে ভুলে যেতে পারিনি। একদা যে তুমি আমার অবারিত আকাশ দেখায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলে। সে তুমি নদী ফুল পাখি প্রকৃতি সবকিছুতেই দিয়েছিলে অবরোধ। আমি যেন একটা দেশ! যার কোন মিত্রশক্তি নেই। প্রাণের আবেশ নিয়ে যে মেতে উঠতে পারে না। এত এত অবরোধ আর নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে খেই হারাই। নিজস্বতা বলে যা ছিল সবই হারিয়ে মরিচা ধরা লোহার মতই গুরুত্ব হারিয়ে ফেলি। আর এতেও তুমি ক্ষান্ত দাওনি।
বল, আমার ওপর কেন এত আক্রোশ তোমার? ভালোবাসা যদি অপরাধ হয় তবে এই অবরোধ কিংবা যে কোন অপবাদ আমিও সয়ে যাব। আমার ভেতরকার আমাকে ফিরে পেতে দাবী জানিয়ে যখন কাজ হয় না, তখনই তোমার কাছে সরল আবদার নিয়ে হাজির হই। তুমি তাতেও সায় দাও না! আমি নিজের সাথে নিজের কথা বলার অধিকারও হারিয়ে ফেলি। তুমি সেই অধিকার হরণ করে নিজেকে একচ্ছত্র রাজাধিরাজ ঘোষণা করতেও দ্বিধা করনি। এই যখন অবস্থা তখন আমার মনে বসন্তের বাতাবরণে এক ঝটকা বাতাস এসে কেমন শিরশির অনুভূতির পরশ বুলিয়ে যায়। তুমি পিটপিট চোখে মিটমিট ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটিয়ে জানান দিলে এতদিনের এত অবরোধ নিষেধাজ্ঞা সবই ছিল সাজানো। সবই নাটক। শুধু আমাকে তোমার করে রাখবার নাটক। আমিও কষ্ট ভুলে তোমাকে স্বাগত জানাই। বুকে টেনে নিতে উন্মুখ হই। তুমিও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। এভাবেই প্রেমের শক্তপোক্ত অবস্থান গড়েছি আমরা। শুধু দু'জনে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন