https://www.prothomalony.com/
9131
literature
অপবাদ
শর্মিষ্ঠা মিত্র সেনগুপ্ত
কয়েকটা সকাল এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকে
তাদের গায়ে লেপ্টে মধ্যরাত্রির কুটিলতার কলঙ্ক
এইসব সকাল বেশ জড়সড়
ঠাঁই নাড়া হতে হতে শুধু এইটুকু চেয়ে ক্লান্ত - অজস্র কাটাকুটির দাগ গোপনীয় থাক।
সেইসব আর্তি চৈত্র বাতাসে হইহই করে পাক খেয়ে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে
সদরে ঝুলে থাকে আশঙ্কার পাঁশুটে করোটি।
আমরা অনভ্যস্ত আঙুলে ছাই চাপা দুঃখ ঝেড়ে ফেলার
চেষ্টা করি। শরীরে শরীরে কতখানি ফাঁক আছে জেনেও ঝিমঝিম দুপুরে আগলে রাখি রোজের যাপন
প্রাণপণে নিষিদ্ধ করি ভেজা বকুলের এক ঝলক সুগন্ধী বাতাস, অথবা পুরনো প্লাস্টিকে মোড়া হলদেটে কাগজে বুনে রাখা অবিন্যস্ত স্বপ্ন।
আমাদের অস্থি মজ্জায় জটিল থেকে জটিলতর সমীকরণ প্রতিদিন পাল্টে যায়
আমরা অসহায়ের মত দেখতে থাকি-
নিরাপদ লোহার জালিকার ভেতর আমাদের দুর্গন্ধযুক্ত
গলিত জীবাশ্ম বেঁচে আছে।
আমরা ভুলে যাই বকুল বাতাস আর অমানুষ হওয়ার অপবাদ।
একদিন বেড়াতে যাবো ময়মনসিংহ
শেখ জলিল
একদিন বেড়াতে যাবো ময়মনসিংহ-
রাতে থাকবে ঝড়-বাতাস, মুষল ধারে বৃষ্টি
পরদিন শুভ্র সকালে বাগমারা থেকে গুলকিবাড়ি
রেললাইন ধরে ধরে হাঁটবো একাকী আমি৷
তোমাকে নিয়ে আনন্দমোহন কলেজ হয়ে
যাবো সাহেব পার্ক, জয়নূলের সংগ্রহশালা;
তারপর রিক্সায় সোজা চলে যাবো এগ্রি ভার্সিটি
প্রিয় ক্যাম্পাস ঘোরাঘুরি শেষ হলে অনেকক্ষণ
বসে থাকবো ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে৷
বোটানিকাল গার্ডেনে গিয়ে চুপি চুপি
মালির চোখ ফাঁকি দিয়ে ছিঁড়বো লাল গোলাপ
তোমাকে হঠাৎ করে বলবো সেই মনের কথাটি৷
একদিন বেড়াতে যাবো ময়মনসিংহ-
সাথে করে নিয়ে আসবো প্রথম প্রেম
আমার যত না-পাওয়া বিরহ জ্বালা!
জেগে উঠছো তুমি
আহসান জামান
জেগে উঠছো তুমি আঙিনায়
মৃত্তিকার বাঁধন ছিঁড়ে
মেলেছো কোমল সজীবতায়; যেনো
এইমাত্র শিশুর আবিষ্ট ঘুম ভেঙে
খেলছো আনমনে হাওয়াদের সাথে।
সূর্য ছড়িয়েছে রোদ্দুরের দ্যুতি;
তুমি বেণীদোলে উড়ালে
পাতার বাহারী নাচ।
তুমি রঙকরা হরেক ফুলের
সমারোহ। ফাল্গুনী হাওয়ায় হাওয়ায়
এপ্রিলের উঁকি। তোমাকে ভেবে ভেবে
দীর্ঘ হচ্ছে দিন, উনুনের চায়ের কেটলির
হিস হিস শব্দে তুমি বলেছো আজ
বসন্ত এসে গেছে
জাগো হে দামালের দল
সম্মুখে অনেক পথ বিস্তর।
ঘর
নিলয় গোস্বামী
আমাদের দেখা হলো পথে
চোখেরা পড়েছে কত ভাষা
আমাদের মন ভিজে কিসে
নির্বাক থাকে ভালোবাসা!
আমাদের মন ভাসে রোদে
মেঘের জবাব ঢাকে রাত
তুমি চুপ থাকো প্রতিশোধে
আমি বুঝি মিষ্টি আঘাত।
মনে মনে হাঁটি বহুদূর
দুজনের মোহ আজ ভার
আমি শুধু খুঁজি সেই ভোর
কখন হবো যে একাকার।
আমাদের সুর জানে পাখি
আকাশ দেখে রাখে ঘর
তোমার ইচ্ছে ছুঁয়ে থাকি
হাসিরা হলো স্বার্থপর।
আবার দুজন ফিরি চোখে
কথারা বেরুনো বড় দায়
ঠোঁটের চাওয়ারা আলগোছে
হৃদয় দিচ্ছে কতো সায়।
অসহ দুপুর বেলা
জয়িতা চট্টোপাধ্যায়
দুপুর মাখা একটা বিছানা
এলোপাথাড়ি লন্ডভন্ড শরীর
ঠোঁটে ঠোঁটে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ
বুঝি কীভাবে সাহস পেখম মেলে
চারদেয়ালের আকাশ থেকে নির্মোহ মেঘ সরে যায়
দুমড়ে মুচড়ে ওঠা যন্ত্রণায়
উত্তপ্ত বিছানায়
ফুটে ওঠে রক্তাক্ত শান্তি
পিছল জমিতে ক্রমাগত লেখা হয়
রাতের জন্মময় ইতিহাস
উরুর ঘর্ষণে পুড়ে যায় পুরনো ভালোবাসা
আকাশ নেমে আসে ঘরের ভেতর
আণবিক এক বিস্ফোরণ
তোমার চূড়ান্ত অভিকর্ষ ছুঁয়ে
তবু লুকোতে পারা যায় না শোক
রাতের ক্ষতস্থান যত্ন করে তুলে রাখি
তুলে রাখি দিনাবসানে আমার নির্মোক।
আধ্যাত্মিক ময়ূর
সাকিব জামাল
জ্বলজ্বল করে অলৌকিক জল। মস্তিষ্কজুড়ে নাচে
যমুনার প্রেম। হাওয়াকুঞ্জে অভিসার বাসনা। অনাগত অনুজের আহ্বানে, সপ্তর্ষি মন্ডলে গান তোলে
আধ্যাত্মিক ময়ূর- অক্লান্ত যৌবনের আয়োজনে!
প্রকৃতির পুঁথি পাঠ চলে- নদী, পাহাড়, সমতলে।
গুহা সভ্যতা আনন্দে হাসে। আগামী গ্রহিক সভ্যতার
স্বপ্ন দেখে আধুনিক সমকাল।
আমি স্থানান্তরিত করি আমাকে অন্য জনমে! বিনিময়ে, তুমিই আমার আনন্দময়ী সেই সত্তরটি ফুল!
আলোর নোঙর
ফারহানা নীলা
দশকের পর কত দশক পেরিয়ে যাচ্ছি
হয়তো ফুরিয়ে যাচ্ছি একটু একটু করে
অস্তমিত সূর্যের আলোটা চোখে জ্বালা ধরায় ভীষণ
জোছনারা বিবাগী চাঁদের ছায়া ভাঙে
নিজের ভেতর নিজেকে দিয়েছি নির্বাসন
এই পরবাসে ভালোবাসি কথাটা কাকে যে বলি?
এখানে সাগর ছোটে জল ঈশারায়
এখানে বিরূদ্ধ প্লাবনের ভয়
পরবাসে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায় অভিমান,অভিযোগ
দিন ফুরানোর গল্পে কেবল ফুরিয়ে যাই
পরবাসী বাতাসের গায়ে গিঁট দিই
আয়ুরেখা বরাবর হাঁটে আরশোলা
সব রেখা পড়া হয়ে গেলে বাকি থাকেনি কিছুই
কুশির মতন গজিয়েছে রেখা, সেসব রেখায় বসে
পরবাসী জীবনের ক্ষত-কিছু সুখ, কিছু দুখ আর
নিতান্ত অবিবেচক এক ভবিতব্য
ঝরে গেছে ফুলের পাপড়ি-উড়ে গেছে হুহুপাখি
মরা ডালে তবু ঝুলে আছে স্মৃতি
পরবাসী ব্যথা জমটুপিতে খুঁজছে আলোর নোঙর।
বিরহ
দেওয়ান নাসের রাজা
আমার উঠোনে চামেলির সৌরভ কোথায়
বহুদিন আগের বেগুনি হলুদ ক্রোকাস!
এখনও শীতের মৌসুম
চেরিগুচ্ছ ফোটেনি, মধ্য দুপুর বয়ে যায়।
তুমি আসোনি বহু বছর গেলো
গোলাপও তাই মেলেনি পাপড়ি, সুরমা লাগানো
ধূসর মেঘের মতো উড়ে গেলে আফ্রিকায়
শুধু রয়ে গেলো অগণিত কবুতর
তোমাকে খুঁজতে তারা ঘুরেফিরে বসে আঙ্গিনায়।
দিগন্ত জুড়ে বেগুনি ল্যাভেন্ডার যেন শুষ্ক ম্লান।
পার্কের বেঞ্চিতে, নুয়ে পড়া ঘাসের ওপর
ওক বৃক্ষের ডালে কাঠবিড়ালিও শ্লথ, অচঞ্চল
গোল্ড ফিঞ্চ হেলডনের গহীনে হারায় বেদনায়।
তুমি বিহনে আমার মেঘলা আকাশ কাঁদে সারাক্ষণ
শুধু অগণিত কবুতর পাহাড় পেরিয়ে এসে আকুল তাকায়
আমার পৃথিবী জুড়ে বিবর্ণ সময় যায় স্তব্ধতায়
বরফ শীতল করা সমুদ্রের জল টলমল
কবরের নিঃসঙ্গতা চেপে ধরে থমথমে এসময়
ম্লান চোখ মনে পড়ে কবেকার- অলিন্দে হাহাকার
এই মলিন দুপুরে।
তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে কি তা বাংলাদেশ?
শেখর ভট্টাচার্য
একাত্তরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাস।বাস করি নিতান্ত মফস্বল শহর সিলেটে। ঢাকা থেকে আন্দোলনের ঢেউ বহু গুণ হয়ে আছড়ে পড়েছে ছোট ছোট শহর, বন্দরে। ক্ষমতা হস্তান্তরের তাল বাহানা চলছে। স্কুল কলেজে লাগাতার হরতাল। আমাদের ছোট শহরটি মিছিলের শহরে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানি শাসকদের কর্ণকুহরে পৌঁছার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে, "তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা, যমুনা।"
"পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা-।"
দেয়ালে দেয়ালে নতুন বার্তা। বাঙালি কবিরা সারাবাংলার দেয়ালে উঠে এসেছেন। রবিঠাকুর, নজরুল, জীবনানন্দ এমন কী সুকান্ত পর্যন্ত দেশ প্রেমিকদের চেতনার আধার। সিলেট মেডিকেল কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের খুব প্রভাব। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা দেয়ালে দেয়ালে সুকান্তের কবিতা লিখে দিয়েছেঃ "বন্ধু তোমার ছাড়ো উদ্বেগ সুতীক্ষ্ণ করো চিত্ত, বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।"
কারা দুর্বৃত্ত? ক্লাস সিক্সের ছাত্র হলেও বুঝতে অসুবিধা হয়না। কী এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য। হাজার বছরেও এরকম ঐক্য, সংহতি বাঙালি দেখেনি। ভাষা, সংস্কৃতি কেন্দ্রিক বাঙালির সংহতি ছিলো মধ্য যুগ থেকে। আদি যুগ থেকে ৬ দফা আন্দোলনের পূর্ব পর্যন্ত বাঙালির নিজস্ব স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখেনি। সত্তরের নির্বাচনের পর মানুষের সামনে স্বপ্ন ধীরে ধীরে বিমূর্ত থেকে মূর্ত রূপ ধারণ করছে। পাড়ায় পাড়ায় সারাদিন ছোট ছোট দলে নানা বয়সের মানুষদের রাজনৈতিক আড্ডা। সন্ধ্যে হলে বিবিসি, আকাশবাণীতে কান পাতা। ভুট্টো কী ইয়াহিয়াকে বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে দেবে? ছোট, ছোট জমায়েতে সবার মত "দিতে হবে, দিতে হবে।"
না দিলে আমরা দেখিয়ে দেবো। সারা দেশ জুড়ে তখন স্বাধীনতাকামী মানুষেরা এক জোট। কে আওয়ামী লীগ, কে ন্যাপ, কেইবা ভাসানী অনুসারী। শহরের বড় বড় নেতাদের দেখি বিভিন্ন সমাবেশে। দেশ প্রেমিক নেতাদের চোখগুলো জ্বল জ্বল করছে। চোখের ভেতর স্বপ্ন। স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন তারা ছড়িয়ে দিচ্ছেন মানুষের মধ্যে।
নেতারা যখন ভাষণ দিতেন মনে হতো দেবদূতেরা আকাশ থেকে পৃথিবীতে নেমে এসেছেন।
নেতাদের দেশপ্রেম, দেশের প্রতি নিবেদনের কথা সব মানুষ জানে। প্রয়োজনে তারা জীবন বিসর্জন করবেন। আমাদের ছোট শহরটির সব মানুষ মিলে মিশে যেন একটি পরিবার। পরিবারের সবার খবর যেমন সবাই জানে, আমাদের শহরের প্রতিটি পরিবারের খবর আমরা জানতাম।
পুরো বাংলাদেশ তখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। বঙ্গবন্ধুর সাথে ইয়াহিয়া, ভুট্টোর গোল টেবিল বৈঠক শুরু হয়নি। নানা মত, নানা পথ, নানা দল মিলেমিশে তখন একটি দল। স্বাধীনতার স্বপ্নকে বহন করছে সবাই। রাজনৈতিক দলগুলো যা'ই করুক না কেনো, ছাত্র নেতারা এবার স্বাধীনতার দাবি থেকে ফিরে আসবেনা। ছাত্র নেতাদের উপর ভরসা সবার। এক একটি নাম তখন বহুল আলোচিত আমদের ছোট শহরটিতে। মকসুদ ইবনে আজিজ লামা, সবার মুখে তখন লামা ভাইয়ের কথা। দিলদার হোসেন সেলিম, সদর উদ্দিন চৌধুরী, গুলজার হোসেন তখন ডাক সাইটে নেতা। এই নেতারা আমাদের স্বপ্নের বন্দরে পৌঁছে দেবেন। স্বপ্নের বন্দরের ঠিকানা সবার জানা। স্বাধীনতা ছাড়া আর কোন গন্তব্য নেই।
জাতীয় ভাবে স্থানীয় ভাবে এতো ঐক্য কোন কালে কেউ কখনো দেখেনি। নিরস্ত্র, নিরীহ একটি জাতি। যদি হানাদার বাহিনী নেমে আঘাত করতে শুরু করে, কী দিয়ে প্রতিরোধ করবে?
মানুষের হৃদয় ভরা দেশপ্রেম। দেশ প্রেমকে হাতিয়ার করে বুক চিতিয়ে দাড়িয়ে যেতে প্রস্তুত পুরো জাতি। দেশ প্রেম কি ভাবে কামানের গোলা কে ফিরিয়ে দেয় আমরা তা' দেখেছি।
কোথায় সেই দেশ প্রেম? কোথায় সেই ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য? বহমান সময়ে আমাদের বিভক্তি কী রোধ হবে কখনো? স্বাধীনতার মাসে আমরা কী স্বপ্ন দেখতে পারি? আমরা আবার ঐক্য বদ্ধ হবো। নাকি স্বপ্ন দেখাও অলীক কোন বিষয়। আসুন স্বপ্ন দেখি কোন একদিন শহীদের স্বপ্নের কথা আমরা বলবো। আসাদ চৌধুরীর কবিতার ভাষায়-
ফুলের গন্ধ পরাজিত
স্লোগান আসে ধেয়ে
তোমার যা বলার ছিল
বলছে কি তা বাংলাদেশ?
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন