https://www.prothomalony.com/
18576
north-america
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৫৪
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে এ ফল ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিল, যা ঘটে গেল ঠিক সেই ঐতিহ্যের ধারায়, যেখানে প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন হারায়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ফলকে ট্রাম্পের দল ও রিপাবলিকান শাসনের বিরুদ্ধে ‘চমকে দেওয়ার মতো সুস্পষ্ট’ রায় বলেছে।
নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ২১৮, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪। সিএনবিসির প্রক্ষেপণে ডেমোক্র্যাটরা এখন অন্তত ২৫০ আসনে এগিয়ে; সিবিএসের আনুমানিক হিসাব ২৫১ থেকে ২৬৮। বুধবার সকালে সিএনএনের গণনায় সংখ্যা ছিল ২৪০, কারণ কাছাকাছি লড়াইয়ের আসনে ভোট গোনা চলছিল। সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩–৪৭ সংখ্যাগরিষ্ঠতা উল্টে দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা সাতটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে: আইওয়া, কানসাস, ওহাইও, মেইন, নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাস। এনবিসি নিউজের গণনায় সিনেটের অবস্থান ৫৪–৪৪, সিএনবিসির হিসাবে নিশ্চিত ন্যূনতম ৫১। গভর্নরের দপ্তরেও ডেমোক্র্যাটরা জর্জিয়া, আইওয়া, নেভাদা, ওহাইও ও টেক্সাস ছিনিয়ে নিয়েছে, আর স্টেটলাইনের হিসাবে অধিকাংশ রাজ্যে গভর্নরের ক্ষমতা তাদের হাতে এসেছে ষোল বছর পর প্রথমবার।
ওবামা আমলের ‘শেল্যাকিং’ থেকে আজকের ঢেউ: এই জয়ের তাৎপর্য বুঝতে ফিরে তাকাতে হয় ২০১০ ও ২০১৪-র মধ্যবর্তী নির্বাচনে। ২০১০ সালে বারাক ওবামার প্রথম মেয়াদের দুই বছরের মাথায় রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৬৩টি আসন জিতে নেয়, যা ১৯৪৮-এর পর এক নির্বাচনে আসনের সবচেয়ে বড় রদবদল। সিনেটেও তারা ছয়টি আসন বাড়ায়, তবে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে। ওবামা নিজেই এই ফলকে বলেছিলেন ‘শেল্যাকিং’। সে সময় রিপাবলিকানরা হাউসের জাতীয় ভোটে প্রায় ৬.৮ শতাংশ পয়েন্টে জেতে, ছয়টি গভর্নরের দপ্তরও হাতে আনে। ২০১৪ সালে ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে রিপাবলিকানরা সিনেটে নয়টি আসন জিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিনিয়ে নেয়, হাউসেও তের আসন বাড়ায়। মার্কিন গণমাধ্যমে সেই ফলকে ২০১০-এর চেয়েও কঠিন পরাজয় বলে বর্ণনা করা হয়েছিল, আর ওবামা বলেছিলেন, তিনি ভোটারদের বার্তা ‘শুনেছেন’।
২০২৬-কে ২০১০-এর সঙ্গে মেলালে প্রথমেই চোখে পড়ে প্রতীকী মিল: তখন ডেমোক্র্যাটরা এককভাবে ওয়াশিংটন শাসন করছিল, আর এবার রিপাবলিকানরা। দুই ক্ষেত্রেই ভোটারের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল অর্থনীতি ও সরকারি নীতির প্রতি অনাস্থা। তবে পার্থক্যও স্পষ্ট। ২০১০-এ রিপাবলিকানদের সিনেট দখলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসেনি; ২০২৬-এ ডেমোক্র্যাটরা সাতটি সিনেট আসন ছিনিয়ে নিয়েছে, যার মধ্যে আছে টেক্সাস ও কানসাসের মতো দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান দুর্গ। হাউসে ২০১০-এর ৬৩ আসনের লাফ এবার সম্ভবত অতিক্রান্ত হচ্ছে না, তবে ডেমোক্র্যাটদের ২১৪ থেকে ২৫০-এর বেশি পৌঁছানো বড় ধাক্কাই। আর ২০১৪-র সঙ্গে সবচেয়ে বড় মিল সিনেটের নাটকে: সেবার রিপাবলিকানরা যেমন ‘লাল’ রাজ্যগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়েছিল, এবার ডেমোক্র্যাটরা সেই কাজ করেছে প্রতিপক্ষের ঘাঁটিতে ঢুকে।
মার্কিন রাজনীতির পরিচিত এক সূত্র অনুযায়ী ১৮২৬ সালের পর ৪৭টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ৪১টিতে প্রেসিডেন্টের দল আসন হারিয়েছে, আর ১৮৬২ সালের পর গড়ে হাউসে তাদের ক্ষতি ৩২ আসন (ডেইলি সিগন্যালের সংকলন)। গত তিন দশকে বহুবার হাউসের হাতবদল ঘটেছে মধ্যবর্তী নির্বাচনেই: ১৯৯৪, ২০০৬, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২-এ। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মাঝপথে ডেমোক্র্যাটরা হাউসে প্রায় চল্লিশ আসন জিতে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, কিন্তু সিনেটে রিপাবলিকানরা আসন বাড়ায়। ২০২২-এ ‘রেড ওয়েভ’-এর প্রত্যাশা ম্লান হয়, রিপাবলিকানরা হাউসে সামান্য ব্যবধানে জেতে, ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ধরে রাখে। ২০২৬-এর বিশেষত্ব হলো, এবার একসঙ্গে দুই কক্ষ ও বহু রাজ্য, অর্থাৎ ঢেউয়ের প্রস্থ ও গভীরতা দুটোই বেশি।
এপি-র বিশ্লেষণে ভোটারের ক্ষোভের তিনটি উৎস: উচ্চ দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম, ইরান যুদ্ধ, এবং সরকারি দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ। প্রাথমিক বুথফেরত জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদন-হার ছিল ৩৮ শতাংশ, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোনো প্রেসিডেন্টের সর্বনিম্ন হওয়ার পথে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে’। ট্রাম্প এ কথাকে ‘অনেকাংশে সত্য’ বললেও দাবি করেছেন, যুদ্ধ ছাড়া তাঁর ‘উপায় ছিল না’ এবং দরকারে তিনি তা আবারও করবেন।
২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ওয়াশিংটনে ক্ষমতা ভাগ হয়ে যাচ্ছে। হোয়াইট হাউস রিপাবলিকানদের, কংগ্রেস ডেমোক্র্যাটদের। ওবামাও ২০১১ ও ২০১৫-র পর এমন অবস্থার মুখে পড়েছিলেন, তবে তখন বিরোধী ছিল রিপাবলিকান কংগ্রেস। এবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের এজেন্ডা ভেটো করার হুমকি দিয়েছেন। আইনপ্রণয়ন কঠিনই থাকবে, কারণ সিনেটের ফিলিবাস্টার-নিয়মে অধিকাংশ আইনে ৬০ ভোট লাগে, যা ডেমোক্র্যাটদের ৫১ বা ৫৪ আসনেও মেলে না।
ডেমোক্র্যাটরা গ্যাস, মুদি ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমানোর ‘একশ দিনের এজেন্ডা’ নিয়ে এগোতে চান, পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে অভিশংসনও একটি বিকল্প। সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটি ইতিমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন, ইলন মাস্ক এবং রাশিয়ার ডিজেল চুক্তি-সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে নথি সংরক্ষণের চিঠি পাঠিয়েছে। বিচারক ও কর্মকর্তা নিয়োগে সিনেটের সম্মতি ছাড়া ট্রাম্পের পথ কঠিন, সুপ্রিম কোর্টে শূন্যপদ হলে তো বটেই।
ভ্যান্সের প্রকাশ্য ময়নাতদন্ত, ট্রাম্পের পাল্টা অবস্থান আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দিকে আড়ালে আঙুল তোলা, সব মিলিয়ে ২০২৮-এর রিপাবলিকান প্রার্থিতা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে বর্তমান স্পিকার মাইক জনসন সংখ্যালঘু নেতার পদে না দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছেন, আর ডেমোক্র্যাটদের হয়ে হাকিম জেফ্রিজ স্পিকার পদে দাবি জানিয়েছেন।
২০২৪ সালে ট্রাম্প টেক্সাসে প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টে জিতেছিলেন; এবার সেখানে ডেমোক্র্যাটরা বত্রিশ বছর পর রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জিতেছে (সিনেট, গভর্নর, অ্যাটর্নি জেনারেল ও লেফটেন্যান্ট গভর্নর)। এনবিসির বিবরণে আইওয়ায় ট্রাম্পের প্রচারে ‘লাল’ হয়ে ওঠা কাউন্টি ডেমোক্র্যাটদের দিকে ফিরেছে। এটি ২০১০-এর সেই চিত্রের উল্টোপিঠ, যখন ওবামার জোট থেকে সরে গিয়েছিল এই ধরনের কাউন্টিগুলোই।
২০১০ ও ২০১৪ দেখিয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিশাল জয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে স্থায়ী বিজয়ের নিশ্চয়তা নয়। ওবামা ২০১২ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়েছিলেন, যদিও মাঝখানে ২০১০-এর ‘শেল্যাকিং’ গেছে। আবার ২০১০-এর ফল দুই দশকের রিপাবলিকান আধিপত্যের সূচনাও হতে পারত, কিন্তু ২০১২-র ফল তা নাকচ করেছিল। রিপাবলিকানরা যুক্তি দিতে পারেন, এ ক্ষোভ যুদ্ধ ও দ্রব্যমূল্যের ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া; ডেমোক্র্যাটরা বলবেন, লাল রাজ্যের জয় প্রমাণ করে তাঁদের বার্তা (সাশ্রয়ী জীবন) বহুদূর পৌঁছেছে। কে ঠিক, তার উত্তর ২০২৮-এর আগে মিলবে না।
নিউইয়র্কে গভর্নর ক্যাথি হকুল ব্রুস ব্লেকম্যানকে হারিয়ে পুনর্নির্বাচিত হচ্ছেন বলে এবিসি নিউজ জানিয়েছে। নিউজার্সিতে সিনেটর কোরি বুকার সহজে জিতেছেন। সপ্তম ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান টম কিন জুনিয়র ডেমোক্র্যাট রেবেকা বেনেটের কাছে হেরেছেন। দ্বাদশ ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম হামাউই নিউজার্সি থেকে প্রথম মুসলিম মার্কিন কংগ্রেস সদস্য হতে চলেছেন। দ্বিতীয় ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান জেফ ভ্যান ড্রু ডেমোক্র্যাট জ্যাক মালকের পেছনে ছিলেন, তবে গণনা তখনো শেষ হয়নি।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন