https://www.prothomalony.com/

18575

new-york

নিউইয়র্ক

মেডিকেইড জালিয়াতির অভিযোগে শতাধিক ডে-কেয়ারে তদন্ত

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৫০

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটিতে প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্কদের দিবাযত্ন কেন্দ্র বা অ্যাডাল্ট ডে-কেয়ারে সরকারি স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি মেডিকেইডের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বড় ধরনের তদন্ত শুরু করেছে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ। অর্থপাচার, অবৈধ কমিশন, ভুয়া সেবার হিসাব এবং সেবা না দিয়েই বিল জমা দেওয়ার অভিযোগে শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ব্রুকলিন, কুইন্স ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ডসহ নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন এলাকায় একযোগে তল্লাশি চালায় এফবিআইসহ একাধিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। কয়েক মাস ধরে চলা ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের তদন্ত, মেডিকেইডের ব্যয়সংক্রান্ত অস্বাভাবিকতা, আগের নিরীক্ষায় পাওয়া অনিয়ম এবং বয়স্কদের নামে ভুয়া সেবা দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগের ভিত্তিতে এ সমন্বিত অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

অভিযানে অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের মহাপরিদর্শকের কার্যালয়, নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ, মেডিকেইড ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয়, অ্যাটর্নি জেনারেলের মেডিকেইড জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণ ইউনিট এবং অন্যান্য ফেডারেল, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সংস্থা।

এ তদন্তের মধ্যেই ২১ অক্টোবর বুধবার স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের ফরেস্ট অ্যাভিনিউতে অবস্থিত একটি পারিবারিকভাবে পরিচালিত ডে-কেয়ার প্রতিষ্ঠানের মালিক ইয়াংসিম উম (৭৯) ও তাঁর মেয়ে এবং প্রতিষ্ঠানটির কর্মসূচি পরিচালক জুয়ং চোয়েকে (৪৯) গ্রেপ্তার করা হয়। স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের জেলা অ্যাটর্নি মাইকেল ম্যাকমোহনের কার্যালয়ের অভিযোগ, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত তাঁরা সেবা না দিয়েই মেডিকেইড ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিল জমা দিয়ে ৫ লাখ ৩০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ নিয়েছেন। অন্তত ৩২ জন মৃত অথবা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থানরত ব্যক্তির নামে প্রায় ১৩ হাজার ডলারের বিল জমা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এছাড়াও ব্রুকলিনের সানসেট পার্ক ও বরো পার্ক এবং কুইন্সের ফ্লাশিং এলাকায় অভিযান চালানো হয়। স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও তল্লাশির আওতায় আসে। অভিযানের সময় কর্মকর্তাদের বাক্সভর্তি নথিপত্র, কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে যেতে দেখা যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক ডজন ডে-কেয়ার কেন্দ্রে তল্লাশি চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ২০টি প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া এবং আরও ৮০টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সব প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড সেবা কেন্দ্রের প্রশাসক ডা. মেহমেত ওজ এবং সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিম ব্র্যান্ডটকেও তদন্তসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে দেখা যায়। তাঁরা কুইন্সের ফ্লাশিং এলাকায় কয়েকটি ডে-কেয়ার কেন্দ্র পরিদর্শন করে পরিচালনাকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। 

তদন্তকারীদের অভিযোগ, কিছু ডে-কেয়ার প্রতিষ্ঠান এমন ব্যক্তিদের নামে মেডিকেইডের কাছে বিল জমা দিয়েছে, যারা বাস্তবে কোনো সেবা গ্রহণ করেননি। এমনকি মৃত ব্যক্তি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অবস্থানরত ব্যক্তিদের নামেও সেবা দেওয়ার হিসাব দেখানো হয়েছে। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত সেবাগ্রহীতা দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন এবং গ্রাহক সংগ্রহের বিনিময়ে অবৈধ কমিশন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অভিযানের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো নিউইয়র্কের মেডিকেইড কর্মসূচিতে অস্বাভাবিক ব্যয় এবং সামাজিক ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের তদারকির দুর্বলতা। এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নিউইয়র্কের সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক দিবাযত্ন কর্মসূচিতে মেডিকেইড থেকে প্রায় ২৪০ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। নিউইয়র্কে মেডিকেইডের আওতায় জনপ্রতি ব্যয় জাতীয় গড়ের তুলনায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি বলেও এফবিআইয়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অর্থের পুরোটাই জালিয়াতির অর্থ নয়। এর কতটুকু অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা নির্ধারণে তদন্ত চলছে।

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের কম্পট্রোলার থমাস ডিনাপোলির নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও স্যোসাল এডাল্ট ডে-কেয়ার কর্মসূচির তদারকিতে গুরুতর দুর্বলতা উঠে আসে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের অর্থ পরিশোধের তথ্য পর্যালোচনা করে ২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সন্দেহজনক অর্থ পরিশোধ শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে আগে থেকেই অনিয়ম, অপচয়, জালিয়াতি বা সেবার মানের কারণে কোনো নেটওয়ার্ক থেকে বাদ পড়া প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী সময়েও অর্থ দেওয়ার ঘটনা ছিল।

নিরীক্ষায় আরও দেখা যায়, তিনটি ডে-কেয়ার কেন্দ্রে সেবা দেওয়ার যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই প্রায় ১৩ লাখ ডলারের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। একটি ফ্লাশিং কেন্দ্রের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ছিল ৩২৩ জন। অথচ নিরীক্ষায় এমন ৩৮৬টি দিনের তথ্য পাওয়া যায়, যেদিন কেন্দ্রটি অনুমোদিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষের সেবা দেওয়ার দাবি করেছে। এর মধ্যে একদিন ৫৩০ জনের সেবা দেওয়ার হিসাব দেখিয়ে ৪৭ হাজার ২৫৫ ডলার উত্তোলনের তথ্যও উঠে আসে।

নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল জানিয়েছেন, অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ এবং মেডিকেইড ইন্সপেক্টর জেনারেলের কার্যালয় কয়েক মাস ধরে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত চালাচ্ছে। যেসব সেবা প্রদানকারীর বিরুদ্ধে অর্থপাচার, অবৈধ কমিশন, অনিয়মিত বিল জমা ও অন্যান্য জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের কারণে পুরো ডে-কেয়ার কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়েও পর্যালোচনা শুরু করেছে অঙ্গরাজ্য সরকার। গভর্নর হোকুল স্বাস্থ্য বিভাগকে বর্তমান কর্মসূচির তদারকি আরও শক্তিশালী করা, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং বিকল্প সেবা চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। নতুন ডে-কেয়ার প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ওপর স্থগিতাদেশও ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, নিউইয়র্কে বর্তমানে ৪০০টির বেশি সামাজিক প্রাপ্তবয়স্ক ডে-কেয়ার কর্মসূচি চালু রয়েছে। এসব কেন্দ্রে প্রায় ৪৫ হাজার মেডিকেইড সুবিধাভোগী সেবা নেন। বয়স্ক ও বিশেষ সহায়তাপ্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের দিনের বেলা তত্ত্বাবধান, খাবার, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যা দেওয়া হয় এসব কেন্দ্রে। এ কর্মসূচির পেছনে বছরে ৫০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় হয়।
 

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন