https://www.prothomalony.com/

18521

opinion

অভিমত

ডাইভার্শন পলিসি, বিভ্রান্ত করার কৌশল এবং ব্যাকফায়ারের আলাপ 

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:০৬

আমজনতা দলের তারেক যাকে কমনলি আমতারেক বলা হয়, তাকে নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে। কেন তাকে জাপান সফরে নেয়া হলো। এক্ষেত্রে ক্ষমতাশীন দলের স্ট্র্যাটেজিক পজিশন ঠিক আছে। চরম চালাকির পরিচয় দিয়েছে দলের নীতিনির্ধারকরা। আমার কথাই ধরুন, আমার বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান নিয়ে আমতারেকের মুখোমুখি হতে হবে এমন চিন্তায় আমার চরম বিব্রত হবার কথা। নিজেকে দিয়েই উদাহরণ দিলাম, অন্য যারা আছেন, যারা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে অপরিহার্য, তারাও চরম বিব্রত হবেন এবং তা সঙ্গত কারণেই। ফলে তাদের অর্থাৎ আমাদের মধ্যে যা জন্ম নেবে তা হলো ঈর্ষা, ইংরেজিতে জেলাসি। 

জেলাসি'র খারাপ দিকটা হলো, তা সব যুক্তিতর্ককে গুলিয়ে ফেলে। চিন্তাকে বিভ্রান্ত করে। কথাটা সত্যি কিনা যাচাই করে দেখুন। দেখবেন, এখন বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের অনেকেই আমতারেককে নিয়ে পড়ে আছেন। কারণ, তারা মেনে নিতে পারছেন না, তার বর্তমান অবস্থানকে। জেলাসি তাদের চিন্তাকে বিভ্রান্ত করছে, তাই কুমিরের মতন লেজ ছেড়ে লাঠি নিয়ে আছেন। ডিপস্টেটের কোনো অংশহয়তো এটাই চাচ্ছে। আমরা যেন জাপান সফরের খুঁটিনাটি নিয়ে কথা না বলি, আমাদের চিন্তায় যেন থাকে আমতারেক। আমাদের ক্রিটিসিজমের টপিক যেন হয় এমন চিপ বিষয়। তাই হচ্ছে। 

মীর জাহান, মুন্নি চৌধুরী, দিলশানা পারুলদের মতন গ্রেট প্রমিজিংএক্টিভিস্টদের দেখুন, তারাও এসব নিয়ে কথা বলছেন। অথচ তাদের মতন মানুষদের উচিত এসব পাশ কাটানো। সোশ্যাল মিডিয়ায় চিপ টপিক নিয়ে পড়ে থাকা উচিত নয়। আমরা তাদের থেকে আরো অনেক বেশি ডিজার্ভ করি। তারা আমরা মিলে দেশ থেকে বিদেশে বিগত ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিলাম। তখন আমাদের মধ্যে জেলাসি ছিল না, কারণ চিপ কেউ বুদ্ধিবৃত্তির জগতে আমাদের সামনে আসেনি। আমাদের সে শক্তি সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা রয়েছে। সে কারণেই এমন কাউকে সামনে রাখা হচ্ছে জেলাসি উৎপাদনে। যাতে আমাদের বুদ্ধি গুলিয়ে যায়, আমরা বিভ্রান্ত হই। আমরা সব ছেড়ে এসব নিয়ে মেতে থাকি। যেমন আমি এখন লিখছি, এটাও সেই স্ট্র্যাটেজির সাফল্য। 

এই স্ট্র্যাটেজি বলা যায় অনেকাংশেই সফল। টকশোতে বলেন কিংবা গণমাধ্যমে, বুদ্ধিবৃত্তির জগতে চিপদের সাথে মুখোমুখি হতে হচ্ছে মেইনস্ট্রিমের। তাদের চিপ কথার জবাব দিতে গিয়ে প্রায়সময়ই মূল কথা নিচে পড়ে যাচ্ছে। ফলে মূল সমস্যা ও সমাধানকে অ্যাড্রেস করা যাচ্ছে না। সম্ভবত ব্যাকস্টেজে প্রবল ক্ষমতাশালী একটা অংশ এমনটাই চাচ্ছে, যাতে মুখ্য বিষয়গুলো মূলক্ষমতাকেন্দ্রের নজরে না আসে। আসলেও তা যেন বাকোয়াজের কারণে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। আর তা হলে লাভ কার, কারা বেনিফিশিয়ারি তা বুঝতে অন্তত ড্রোন সায়েন্টিস্ট হতে হয় না। 

তবে মুশকিলের কথা হলো, এই স্ট্র্যাটেজি একসময় ফেইল মারে। যুগে যুগে তাই মেরেছে। ভারতের বিজেপির দিকে তাকান, ক্লাউনগুলোকে সামনে রেখে মূল বিষয় আড়াল করতে গিয়ে, খোদ সরকার প্রধানই এখন ক্লাউনে পরিণত হয়েছেন। জেন-জি'দের ভাষা পড়তে চেষ্টা করুন, তারা মোদিজিকে কী বলছে, কী ভাষায় অ্যাড্রেস করছে। অথচ বিজেপি যখন কংগ্রেসের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে হাজির হলো, তখন মানুষের কী উচ্ছাস ও সমর্থন ছিল বিজেপি'র প্রতি। কিন্তু এখন, একদম তার উল্টো। মানুষকে সঙ্গতই সবসময়ের জন্য বিভ্রান্ত করা যায় না, বোকা বানানো যায় না। ডাইভার্শন পলিসি একসময় না একসময় ফেইল মারে, ব্যাকফায়ার করে। বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমে তাই করেছিল। 

ফ্যাসিস্ট রেজিমে দেখেছি আমরা ডাইভার্শন পলিসি'র অবলীলায় প্রয়োগ। ইস্যু দিয়ে ইস্যু ঢেকে দেয়ার চেষ্টা। নায়িকা-গায়িকা-খেলোয়ারদের সামনে এনে তাদের আলোচনায় রাখা, যাতে মূল ইস্যু হারিয়ে যায়। এবং তাই গিয়েছে। যারফলে দীর্ঘায়িত হয়েছে ফ্যাসিস্টকাল। কিন্তু দীর্ঘায়িত হলেও শেষমেশ চরম ব্যাকফায়ার করেছে সেই পলিসি। এতটাই চরম যে, গুষ্ঠিশুদ্ধ দেশ ছেড়ে ভাগতে হয়েছে। তাই হয়। মানুষকে ভুলভুলাইয়াতে ঢুকিয়ে দিতে গিয়ে নিজেদেরই রাস্তা হারাতে হয়। সুতরাং সঠিক রাস্তাতে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। সেই বুদ্ধিমানের কাজটা যেন ক্ষমতাশীনরা করেন। তাদের জন্য শুভকামনা। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন