https://www.prothomalony.com/
18534
literature
দ্বিপদী অবয়বে অমানুষ
মৃদুল রহমান
যুগে যুগেই এসেছে কিছু দ্বিপদী প্রাণী
কেউ তাদের সৃষ্টিসেরা মানুষ বললেও
আমি তাদের অযোনিসম্ভূত বলে জানি
ওরা মানব সভ্যতার এক অভিসম্পাত
অসভ্য আদিমতায় অনাহুত পয়দাজাত
যুগে যুগেই এসেছে কিছু দ্বিপদী প্রাণী
কেউ তাদের সৃষ্টিসেরা মানুষ বললেও
আমি কেবল তাদের চ্যবন বলেই চিনি
ওরা অকালে গর্ভচ্যুত নারীছেঁড়া জারজ
ওরা পয়দা নিয়েও ঘৃণ্য অনাদি ও অজ
যুগে যুগেই এসেছে কিছু দ্বিপদী প্রাণী
কেউ তাদের সৃষ্টিসেরা মানুষ বললেও
আমি ওদেরকে কীটপতঙ্গ বলেই মানি
ওরা মৃত্যু জেনেও ঝাঁপায় তপ্ত আগুনে
ওদের অভিশপ্ত আত্মার শান্তি ঐ দহনে
আকাশঅতল
নিলয় গোস্বামী
মোহনার খোলা স্রোতে আঁকুক ছবি আকাশঅতল
দৃষ্টির তর্পণ শেষে বহু আলোর প্রহর ছুটে
তোমার মনের হয়ে স্মৃতিরা ভোরের মতো ফুটে।
স্মৃতিভুক চিঠিগুলো মুছে দেয় কার আঁখিজল।
তবুও এখন যারা দোষারোপে গড়ে যায় দেহ
পরিণাম মুছে দিয়ে কাটুক কিছুটা তার ঘোর
তোমার শরীর ছুঁয়ে জেগে আছে মেঘরাঙা ভোর
তাদের উদ্দেশ্যে আছে তোমাদের প্রতিবাদী কেহ।
ছায়া শুধু ধরে রাখে নিজের মোহের অবিকল
আমার পাঁজরে থাকে আকাশ তুমি হলে অতল।
ভাবনার ঘোর
গোলাম রববানী
এখন জীবনের ভাবনা, এই ভবঘুরে হিসেব
মেলানো বোকামি, জাগা আর ভাঙা সামান্য ঘুমের ঘোর
এতটা তো এই অর্থ, পেটের ভুকা জগত তলে
শব্দ কারিগরের শিল্প, শুধু ন্যাকামোর নলে;
পৃথিবী পুরাণ থেকে মৃত্যু হেসে হেসে ওঠে,
পৃথিবী ক্ষণকাল, পৃথিবী যেনো নৃত্যের উঠোন।
এই সুখকর কথোপকথন কেন হয় মহামুশকিল
আমাদের চোখে অবিরল দৃষ্টি ফোটে অকারণ
তবে এই ঠোঁট আর এই কান বেড়াজালের কাল
না বুঝি প্লেটোনিক, না বুঝি ফ্রয়েডীয়, যা মরণ!
এই প্রাণ পাজর ধরে অস্তিত্বের মৌলিকতা,
যদি খুলুকুন তাওহীদে হয় বিশ্বস্ততার সমাদর।
আমাদের মস্তিষ্কের শিরা, তবু খোরাকের চাহিদা
অনুভূতি আর অনুমানে শুধু বোধহীন ব্যাকরণ,
এই স্বতঃস্ফূর্ত নিবেদন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ঊর্ধ্বে
তবে ভাব সম্প্রসারণ অসংগত দীপহীন মূলধন
এখন জীবনের ভাবনা, এই ভবঘুরে হিসেবটুকু
মেলানো কঠিন, জাগা আর ভাঙা সামান্য ঘুমের ঘোর।
ঋতুহীন অভ্যন্তর
নাবিল নিশাত
আমার ভেতরে আজ কোনো ঋতু নেই।
শব্দেরা লুকিয়ে গেছে বুকের সবচেয়ে গোপন আয়নায়,
যেখানে প্রতিফলনের বদলে ভেসে ওঠে অতীতের
গন্ধহীন ছায়া।
তুমি কি জানো, নির্জনতা কখনোই নিঃশব্দ হয় না?
ওটা আসলে একধরনের চাপা অনুরণন,
যা নিজের নাম ভুলে যাওয়া কোনো কবিতার মতো
চুপচাপ হাঁটে প্রতিটি অসমাপ্ত অনুভবের মধ্য দিয়ে।
আমি হেঁটেছিলাম একদা—অরণ্যের ভেতর নয়,
কোনো স্মৃতিচিহ্নহীন ল ভূখণ্ডের দিকে।
সেখানে ঋতুরা জন্মায় না,
কেবল নির্ধারিত সময়মতো মারা যায় কিছু অনুভব।
একটি হাসির পেছনে যদি জমে থাকে অগণিত কান্না,
তবে সেই হাসি কি সত্যিই জীবিত থাকে?
জানি, তুমি ভাবো আমি নিস্তেজ হয়ে গেছি,
তবে সত্যিটা ভিন্ন—
আমি এমন এক আগুনে পুড়ছি,
এমন জলাধারে জীবনের গান গাইছি —
যার ধোঁয়াও আর চোখ ভেজায় না।
পথ চলতে চলতে
রওশন মতিন
পথ চলতে চলতে চলতে চলতে সমস্ত পথ ফুরিয়ে যায়,
মুছে যায় পথের ঠিকানা, মুছে যায় পথের নিশানা।
স্বপ্নময় বসন্তের আলোময় বালিকার গোধূলি বেলায়,
পথ চলতে চলতে পথে পথে-পথ থেকে পথে
অন্য এক পৃথিবীর পথ তো ফুরিয়ে যায় না!
রঙের ঝাঁপি খুলে এই পথে খুঁজি ভালোবাসার আস্তানা,
এখন তো জ্যোৎস্নার গ্রীবায় গাঢ় রক্তের প্লাবন।
এ যেন ঘুমের ভেতরে গাঢ় জাগরণ—
শান্ত জলের আয়নায় পাতালপুরীর রূপকথার আকাশ
ডাকে তার অপার্থিব হাত বাড়িয়ে।
জানি না, ডাইনিরা এ পথে ওঁৎ পেতে আছে কি না,
কেননা পথগুলো চেনা নয় ছলনার বিরহী কাঁকরে।
কোমলতার কবর
আরমান দেওয়ানজী
আমি দেখেছি বসন্তের কান্না,
সতেজ তনুর অবসন্নতায়
নীরব, ক্লান্ত, জীর্ণ রমণী;
সন্ধ্যার আকাশে বিষণ্ন এক ঝাঁক কাক
মিছিলে ব্যস্ত।
প্রস্ফুটিত রূপের অন্তরালে,
অর্ধ-মৃত্যু কিশোরী,
যে বিসর্জন হয়েছে দেবীর অবয়বে,
প্রেম নামক শব্দে!
অথচ বিকেলের রক্তিমতায়,
জীবনের বৈপরীত্যে,
যদি ফাগুনপুত্রের নরম স্পর্শে
কনক্রিটের শহর হলুদ হতো,
তবে প্রস্ফুটিত হতো অসংখ্য ফুল।
আমি এক ঝাঁক কাকের দুঃখ দেখেছি;
এই শহরে কত নারী
জীবনের জীর্ণতায় আবদ্ধ কক্ষে
বিসর্জন দিয়েছে যৌবন,
হৃদয়ের কোমলতার কবর দিয়েছে
সমাজ-চাহিদার কাছে, দূষিত শহরে।
আত্মার পুনর্জন্ম
আফরিন সুলতানা
আত্মা কখনো ভস্মে পরিণত হয় না;
সে কেবল রূপান্তরের গুপ্ত অনুশাসনে
অন্তর্লীন দীপ্তি ধারণ করে।
ক্ষয় তার পরিণতি নয়,
বরং নবচেতনার প্রাক-অভিষেক;
যেমন প্রভাত জন্ম নেয়
দীর্ঘতম রাত্রির অন্তরাল থেকে।
পতিত বীজ
মৃত্তিকার অন্ধকারে বিলীন হয় না,
সেখানে নিভৃতে প্রস্তুত হয়
অঙ্কুরের প্রথম উচ্চারণ।
যে চেতনা
অহংকারের আবরণ অতিক্রম করে,
সে প্রত্যক্ষ করে
বিলয় কোনো অন্তিম বিধান নয়;
সে অস্তিত্বের দ্বিতীয় আলোকোন্মেষ।
অতএব আত্মার পুনর্জন্ম
কোনো অলৌকিক উপাখ্যান নয়;
সে অনন্তের অন্তর্গত- চিরায়ত পরিক্রমা,
যেখানে প্রতিটি অবসান
আরও বিশুদ্ধ সত্তার উন্মেষ,
আর প্রতিটি পুনর্জাগরণ
অসীমের প্রতি এক নীরব অভিষেক।
অভাবের মানচিত্র
জাকিয়া রহমান
চোখে নেই কোনো স্বপ্ন, যেন মৃত মাছের অবয়ব।
হা করে গিলে খেতে চায় দিন আর রাত,
নেই কিছু—নেই ঘর, নেই পেটে সামান্য ভাত!
চারিদিকে শুধু অভাবের ব্যঙ্গাত্মক মুখ,
চেয়ে থাকে অপলক, কেড়ে নিয়ে সবটুকু সুখ।
হাড়গোড় বিদ্রোহ করে অবিরত,
ভেঙে পড়ে শরীরের শক্তি, ক্লান্ত ক্ষতবিক্ষত।
আজ পড়ে আছে মৃত মাছের মতো মানচিত্রের বুকে
এক মুঠো ভাতের আশায় কাটছে জীবনের বেলা।
পাকস্থলীতে চলছে তুমুল এক যুদ্ধ,
ক্ষুধার অনলে যেন চারদিক আজ দগ্ধ।
নেই কিছু—নেই আজ ভিক্ষের ঝুলিটাও,
এ শহরে করুণা করে হাত বাড়িয়ে দেবে বা কে?
পথের ধারে শুয়ে মেলে না এক তিল শান্তি,
যানবাহনের নিষ্ঠুর শব্দে বাড়ে ক্লান্তি।
তীব্র অভিশাপে পাপী সূর্যটাও মাতে নিপীড়নে,
শীতল হাওয়া বয় না আর এ মানচিত্রের মনে।
ডেভিল ট্রি
শাহানাজ মিজান
অফিস ছুটি হয়ে গেছে সন্ধ্যা ছয়টায়, এখন রাত সাড়ে ন'টা বাজে।
শানুর সাথে একচোট ঝগড়া হয়ে গেছে সকালে, ভেবেছি আজ আর বাসায় ফিরব না। নাইট শিফটে অনেকেই কাজ করে, ওদের সাথেই রাতটা কাটিয়ে দেব। থাকুক আজ একা, দেখুক কেমন লাগে!
লিফটম্যান জামিলকে পাঠালাম ব্রেড আর কলা কিনতে।
আমি এশার নামাজ পড়ে ছাদের ওপর এসে একটা সিগারেট ধরালাম। পুরো ছাদ ফাঁকা, সিগারেটে টান দিচ্ছি আর পায়চারী করছি। ছাদের ওপর নানা রকম ফুলের গাছ। হরেক রঙের অনেক অনেক ফুল ফুটেছে।
সিগারেটের ধোঁয়ার মাঝেও একটা তীব্র সুগন্ধ ভেসে আসছে। ওপাশে গিয়ে দেখলাম, রাস্তার ধারে বেশ বড় একটি গাছ, থোকা থোকা ফুল ফুটেছে; এটা ছাতিম ফুলের গাছ।
এই ফুলটা শানুর খুব পছন্দের, ওর মুখেই শুনেছি—এই গাছের ইংরেজি নাম নাকি 'ডেভিল ট্রি'। এই গাছে নাকি ভূত থাকে! যত্তসব আজগুবি কথা! আমি একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, আমি এসবে কোনো দিনও বিশ্বাসী নই।
মনে মনে হাসলাম, সারাদিন একা একা বাসায় থাকে, যত্তসব হরর মুভি দেখে, অ্যাডভেঞ্চার বই পড়ে—নিজেই নিজের মাথাটা নষ্ট করে ফেলেছে! পারে শুধু উটকো বিষয় নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করতে, আর ভালো লাগে না।
সিগারেট অর্ধেক খাওয়া হয়েছে, হঠাৎ কোথা থেকে শাঁ শাঁ শব্দ আসছে। তাকিয়ে দেখলাম, খুব সুন্দরী একটি মেয়ে ছাতিম ফুলের ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে ইশারায় ডাকছে। আমি ভাবলাম, এটাই হয়তো পরী। দু'পা এগিয়ে যেতেই নাকে এল পচা মাছের বিকট গন্ধ। সেই পচা গন্ধে আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম! চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম, কোথাও কোনো গাছের পাতা নড়ছে না; ছাতিম গাছ বা ছাদের ওপরের সমস্ত গাছগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ কোথা থেকে প্রচণ্ড বাতাস বয়ে গিয়ে আমাকে উলটপালট করে দিচ্ছে, আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারছি না।
আমার চশমাটা কোথায় যেন পড়ে গেল, তাকাতে পারছি না। কোনোমতে তাকিয়ে দেখি, গল্পের বইয়ে পড়া কালো দৈত্যাকার একটা কিছু আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তার সারা গা ভর্তি দগদগে ঘা, আর সেখানে পোকা কিলবিল করছে। সে আমাকে ধরতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। আমি তাকে দেখেই ওয়াক ওয়াক করতে করতেই সরে সরে যাচ্ছি, পা দুটো চলছে না, গায়ের সমস্ত লোম, এমনকি আমার দাড়িও যেন শক্ত কাঁটার মতো হয়ে গেছে।
বুঝতে পারছি আমার গায়ে জ্বর এসে গেছে, আমি ঠকঠক করে কাঁপছি। সিগারেটটা পায়ের নিচে ফেলে দিয়েও নেভাতে পারছি না। জোরে চিৎকার করতে চেয়েও পারছি না। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে—হঠাৎ মাথা কাজ করল, মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করলাম। মনে হলো, পেছন থেকে কে যেন আমাকে ধাক্কা দিয়ে স্যারের রুমের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি, জামিল আমাকে ডাকছে—"স্যার, আপনার তো অনেক জ্বর আসছে! এমডি স্যারের রুমের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, আমি এখানে নিয়ে আসছি। চলেন স্যার, আপনাকে বাসায় দিয়ে আসি।"
এদিকে ওদিকে ঘুরেফিরে দেখি, আমি আমার ডেস্কে বসে আছি। ঘড়িতে দেখলাম, সবে রাত দশটা বাজে, অথচ আমি কত বছর ধরে তার সাথে বাঁচার লড়াই করলাম! আসলে সে কে ছিল?
শানুর বলা কথাগুলো মনে পড়ল—পৃথিবীতে সত্যিই এমন কিছু আছে, যা আমাদের চোখে পড়ে না বা পড়লেও তার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারি না বলে মন সেটা সত্য বলে বিশ্বাস করতে চায় না।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন