https://www.prothomalony.com/

18531

new-york

নিউইয়র্ক

সমুদ্রের গ্রাস থেকে নিউইয়র্ককে বাঁচাতে ২ বিলিয়ন ডলারের মহাপরিকল্পনা

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০২:২২

প্রকৃতি যখন প্রতিশোধ নিতে শুরু করে, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শহরও কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারে, তার নির্মম সাক্ষী নিউইয়র্ক। ২০১২ সালের সেই অভিশপ্ত ৪৮ ঘণ্টায় হারিকেন স্যান্ডির তাণ্ডবে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪৪ জন নিউইয়র্কবাসী, অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল ২০ লাখ মানুষের জীবন এবং মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে গিয়েছিল ১৯ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নিউইয়র্ক এবার আর প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করেনি, বরং শুরু করেছে এক অভাবনীয় ‘জলবায়ু যুদ্ধ’।

সমুদ্রের রাক্ষুসে ঢেউ আর ক্রমাগত বাড়তে থাকা পানির স্তরকে রুখে দিতে ম্যানহাটন উপকূলের বুক চিরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা) এক মহাপ্রকল্প। জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই অতি-আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রোমাঞ্চকর বিবরণ, যা একাধারে বিজ্ঞান, স্থাপত্য এবং কোটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার গল্প।

পার্কের ছদ্মবেশে এক অভেদ্য দুর্গ

এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে জাদুকরী রূপ দেখা যাচ্ছে ম্যানহাটনের ঐতিহাসিক ‘ইস্ট রিভার পার্ক’ জুড়ে। নদীর পাড় ঘেঁষে মাটির প্রায় ১০০ ফুট (৩০ মিটার) গভীর পর্যন্ত গেঁথে দেওয়া হয়েছে কংক্রিট ও ইস্পাতের বিশাল সব খাম্বা (পাইল), যা সরাসরি পাথুরে স্তরে গিয়ে ঠেকেছে। এর ঠিক ওপরেই গড়ে তোলা হয়েছে এক অভেদ্য ফ্লাডওয়াল বা বন্যা প্রতিরোধক দেয়াল। লাখ লাখ টন বিশেষ মাটি এনে পুরো পার্কটিকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ ফুট (৩ মিটার) উঁচুতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ বিনোদন পার্ক মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আস্ত একটি আধুনিক দুর্গ।

মহাপ্রলয়ের প্রস্তুতি: স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে শহর

ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানির স্তর বৃদ্ধির গতি দ্বিগুণ হয়েছে। ৫২০ মাইলের দীর্ঘ উপকূলরেখা থাকা নিউইয়র্কের জন্য আসল ভয় এখন আর বড় কোনো সুপারস্টর্ম নয়, বরং প্রতিদিনের সাধারণ জোয়ার। নিউইয়র্ক সিটির ব্যুরো অব কোস্টাল রেজিলিয়েন্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ক্যাথরিন প্রিবিলস্কি সতর্ক করে বলেছেন, এই দেয়াল না থাকলে আগামী দিনে নিউইয়র্কবাসীদের প্রতিদিন জোয়ারের পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার মুখোমুখি হতে হতো।

এই বিপদ ঠেকাতে পুরো সিস্টেমটিকে অত্যন্ত চতুর করা হয়েছে। বড় ঝড়ের পূর্বাভাস পেলেই উপকূলের ১৮টি বিশাল স্লাইডিং ফ্লাডগেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে এবং দক্ষিণের অংশে প্রায় ১০০টি মেকানিক্যাল ‘ফ্লিপ-আপ’ ব্যারিয়ার মাটির নিচ থেকে সটান ওপরের দিকে উঠে এসে পানির তোড় আটকে দেবে। সমুদ্রের পানি যদি আরও ৩০ ইঞ্চিও (৭৬ সেন্টিমিটার) বাড়ে, তাহলেও এই দেয়াল টপকাতে পারবে না। বর্তমানে এর ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

বৈশ্বিক বৈষম্য: ধনী শহরের বিলাসী অভিযোজন বনাম দক্ষিণ এশিয়ার কান্না

নিউইয়র্কের এই মহাপ্রকল্প যখন বিশ্বজুড়ে হাততালি কুড়াচ্ছে, ঠিক তখনই এটি বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতির এক চরম ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ফুটিয়ে তুলেছে। জাতিসংঘ স্পষ্ট জানিয়েছে, নিউইয়র্ক বা মিয়ামির মতো ধনী মেগাসিটিগুলোর বিলিয়ন ডলার খরচ করে নিজেদের বাঁচানোর বিলাসিতা রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার নিচু অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য সমুদ্রের এই পানির তর্জন-গর্জন সরাসরি এক ‘মৃত্যুঘণ্টা’।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থায়ীভাবে উপকূল তলিয়ে যাওয়ার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার—বিশেষ করে বাংলাদেশ (ঢাকা ও উপকূলীয় অঞ্চল) এবং ভারতের প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ চিরতরে উদ্বাস্তু হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। জাতিসংঘের প্রতিনিধি নাভিদ হানিফ বলেন, নিউইয়র্ক যা করছে তা প্রশংসনীয়, তবে এটি বিশ্বনেতাদের জন্য বার্তা যে, অর্থায়নের অভাবে দরিদ্র দেশগুলো যেন পানির নিচে হারিয়ে না যায়।

দেয়ালের ওপারে জীবন যেখানে স্বপ্ন বোনে

এই প্রকল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এটি পরিবেশ ধ্বংস করে তৈরি কোনো কংক্রিটের জঙ্গল নয়। উঁচু করা এই ইস্ট রিভার পার্কের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে সবুজ ঘাসের গালিচা, তৈরি হয়েছে রানিং ট্র্যাক, শিশুদের খেলার মাঠ ও বারবিকিউ স্পট। স্থানীয় বাসিন্দারা এখানে এসে বুক ভরে শ্বাস নেন। নিউইয়র্ক ২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের শতভাগ কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন