https://www.prothomalony.com/

18497

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৪৭

রূপসী কাবিন 

আরণ্যক শামছ 

 

আমার একলা জীবনের ভূগোলজুড়ে কেবল 

মাটির তৃষ্ণা।

তুমি যখন আঁচল ছড়িয়ে এই কাদা-জলে পা রাখো,

আমার মনে হয় আউশ ক্ষেতের বুক চিরে এক হাজার 

বছরের সোনার শস্য জেগে উঠলো।

তোমার উরুতে আর বুকে লেগে থাকা সোঁদা 

খড়কুটোর গন্ধে

আমি পেয়ে যাই পৃথিবীর সমস্ত আদিম উপত্যকার 

রূপকথা।

আমায় কোনো সোনার রাজ্য দিতে হবে না,

আমি তোমার নাকে গুঁজে দেব এক চিলতে মাটির 

নোলক,

যা পরে তুমি হাসলেই পুরো চরের নদী আবার 

উজান স্রোতে বইতে শুরু করবে।


ঘুম

হাশিম কিয়াম 

 

গাছটি যৌথ উঠোনে হাই তুলছে,  

কতোদিন তার ঘুম হয়নি তা জানে না কোটি শতাব্দীর

ঘুমে বিভোর এই তল্লাটের বাসিন্দারা, রক্তাক্ত বাতাসে গাছটির ডালপালা ভিজে যায়, সে লম্বা শ্বাস নেয়, ভাবতে থাকে, কী যেন বলতে চায়...আচমকা ঘুম ভাঙলে 

বাসিন্দারা মন লাগিয়ে পাহাড় কাটে, উপড়ে ফেলে 

সোনালি শেকড়, তারপর ক্লান্ত ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্নের সাথে 

পাশা খেলে

ঝড় উঠেছে, সবকিছু লণ্ডভণ্ড, গাছটি দাঁড়িয়েই থাকে...

মধ্যরাতে সূর্য উঠলে সবাই জেগে ওঠে, পাহাড়ের মাথায় শাখাপ্রশাখার কাঁচা রং ছড়িয়ে গাছটি ঘুমিয়ে পড়ে, 

অনাগত শতাব্দীর ঘুমের ক্যানভাসে চিত্রিত হবার 

উত্তেজনায় উঠোন আর মানুষ কোলাকুলি করতে 

করতে পাহাড়ি ঝরনায় রূপান্তরিত হয়, গাছটি ঝরনার 

গভীরে শেকড় গেড়ে পাতার রক্তের নুন ধুয়ে ফেলে...


কনস্যুলেট

বশির আহমেদ 

 

মনটা পলিমাটি বলে পাথরের আঘাতকেও 

সহ্য করতে হয়,

কাঁচ ভাঙার মতো ভেতর ভাঙ্গে—

শব্দহীন অশ্রুজল!

বারংবার একই জায়গায় থমকে যাই, 

কষ্টের কনস্যুলেটে খোয়াব হয়ে আসে ডানা,

অন্যকে ঘষামাজা করতে করতে 

সূর্য ডুবে যায় সমুদ্র তীরে।

 

অনুচ্চারিত পদাবলি 

জসীম উদ্দীন মুহম্মদ


আজ একটা ম্যাড়ম্যাড়ে দিন নির্বাণে গেলো

গেলো আশ্বিনের মহাশক্তিধর বৈকালিক ঘুম

এখানেই শেষ নয় সন্ধ্যেটাও গেলো জলে

একঘটি জলের জন্য সমুদ্র জুড়ে নৌকা চলে! 

অথচ মহাবিশ্বের কোথাও কোনো জল নেই

শুধু সারবাঁধা সারঙ পদাবলির আকাল আছে

তবুও যেমন-তেমন কবিতার প্রসব থেমে নেই

তবুও কে না বিশ্বাস করতে চায় 

সময়ের স্বপ্ন পূরণে কবিদের কোনো জুড়ি নেই!

তথাপি আমি এখনও মধ্যরাত হলেই মনে মনে

সেই তোমাকেই খুঁজি... 

আকাশের পৃষ্ঠা জুড়ে অনুচ্চারিত পদাবলির 

ভিড়ে আরেকবার এসো জোছনা জলে ভিজি!

 

হেমন্তের পোশাক

ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয় 

হেমন্তের পোশাকে কখনো বদলে ফেলা যায় না রাষ্ট্রের পলিটিক্স। রাষ্ট্র তো আর হেমন্তের কাটা ধান নয়। হেমন্ত পালিয়ে যায় শোষিত হৃদয় থেকে পতনের ক্রমভাবে ঢের দূরে। সরকারি পোশাকে ঢেকে যায় পরিচিত মুখ। 

কলিগদের কফি আড্ডায় কখনো কথা হয় না হেমন্তের অহেতুক খরচ নিয়ে। বেকার প্রেমিকের চেহারা ক্ষয় হয়, চোয়াল বসে যায়, ক্ষুধামন্দার পাণ্ডুলিপিতে বাড়ে 

গর্ভকালীন একাকিত্ব।

হেমন্তের পোশাক যে পরে সে প্রেমিক; রাষ্ট্রের সবচেয়ে অবহেলিত কবি— এক অন্ধকার চুলের ভেতর প্রাচীন সভ্যতার গাছ এবং পাখিদের নিরাপদ মৌলিক চাহিদার জোগান। তাকে দেখলেই মনে পড়ে ভেষজ হেমন্তের বুক; ঔষধি গুল্মলতার হেমন্ত প্রেম। 

 

আমি তোমার ভেতরে বেড়ে উঠি

মোস্তফা হক

 

আমার হাত ধরে থাকো যেমন পাহাড় মাটির
গভীরে নিজের বিশালতার ভরসা লুকিয়ে রাখে।
মাঠভরা ফসল দেখে কৃষকের হাসির মতো
আমাকে দেখে তুমি হেসে ওঠো গভীর রাতে।

পথের মতো বুকে টেনে নাও আমার নিঃশ্বাস
নীলাঞ্জন সুর তুলে সব দুঃখ ভোলাও
আমাকে ধরে রাখো যেমন চোখ ধরে রাখে তার
আনন্দাশ্রু।

ঝরা শিউলির মতো আমাকে নাও কুড়িয়ে
গাঁথো দীর্ঘ আদরের সুরভি-স্নিগ্ধ মালা।

দীঘির শান্ত জলের মতো আমাকে ছুঁয়ে থাকো।
অমরত্বের সুখ চাই না; আমাকে তোমার চিন্তার
জালে স্মৃতি করো তোমার চেতনায় আমি বেড়ে উঠি।

আমাকে তোমার সকাল করো, প্রথম সূর্যকিরণ,
করো দুষ্টু দুপুর, তোমার বুকের শীতল ছায়া;
দীর্ঘ রাত করো, জেগে জেগে মিষ্টি অপেক্ষার পালা।

তোমার ভেতর বিলীন করো, ভেঙে ভেঙে রক্তকণিকায়
করো মিহি লাল দানা; নাভিমূলে ওম
তোমার ভেতর বসে দেখি - আমার তুমি হয়ে যাওয়া।

 

সদ্যস্ফুট প্রণয়

মোর্শেদা মৌ
 

কত যাতনা রসনার তির্যক আঘাতে

অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিল চোখের চাহনিতে,

নতবৃন্ত পদ্মসম মৌন মন্ত্রে—

নিঃশব্দে অশ্রু ঝরে নিষ্পন্দ নয়নে।

মর্মভেদী কষ্টগুলো চিতাগ্নিশিখায় জ্বলে

হঠাৎ দগ্ধ তাম্র হৃদয়ে পূর্ণশশী ওঠে,

ক্ষণিকের জন্য যদি প্রিয় নামে ডাকে;

উদাসী বৈরাগ্য মনে স্থিত ছিল স্বতন্ত্র আসনে।

বসুধার গ্রন্থিতে যখন ক্রন্দনের সুর বাজে;

দুলছে ব্রহ্মাণ্ড মাঝার সদ্যস্ফুট প্রণয়ের ভারে,

গ্রীষ্মের দাবাগ্নির চৌচির মগজে জল প্রয়োজন

গোধূলি লগ্নে যৌবনমোহের সমস্ত আয়োজন।

 

মানবশিখা

বৈশাখী খাতুন

 

নির্মল কবিতার জন্মক্ষণলগ্নে,

নিষ্পাপ সুরে পদার্পণ এ মহীতে—

নাহি বোধগম্য জীবন-যাতনার ক্লেশ,

কল্লোলিনীর শান্ত সাগরে ভাসবে স্বদেশ।

এখনো পথ বাকি সমাপ্তির দ্বারে,

দু'মুঠো স্বপ্ন ছুঁতে নক্ষত্র পানে

কখনো বা যায় ভুলে ক্ষণজন্মার মানে।

নিরাকার স্তব্ধ আকাশে ভাসছে মহাকাব্য,

স্বীয় অন্তরালে বইছে নীরব একলব্য।

জমে থাকা হাসির আড়ালে তিমির রাত,

তবুও যেন অনুচ্চারিত নীরব প্রপাত।

বাড়িয়ে হাত কতশত মায়াবী ক্ষণে,

যায় মরে নিস্তব্ধতার নীল আকাশে—

জ্বলছে প্রাণপ্রদীপ নিঃশ্বাসের নীড়ে,

আঁকড়ে ধরে চক্ষুদীপ নশ্বরতার ভিড়ে।

 

কোমা

জান্নাতুল ফেরদৌস

 

পূজোর ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলাম। দু'দিন কাটতে না কাটতেই হঠাৎ হাসপাতালের কী এক জরুরি কাজে তলব করা হলো। আজকেই ঢাকায় ফিরতে হবে। রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। অগত্যা!

বাসস্ট্যান্ড নদীর ওপারে। খেয়া নৌকার জন্যেও আজকাল লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিতে হয়। রাত বেশি হওয়ায় ভিড় নেই। আমি একাই দাঁড়িয়ে, তবুও টিকিট নিতে হলো। এ অব্দি আসতে বাজারের এক চাচা সাহায্য করেছিলেন। মা'কে আর কষ্ট করে এতদূর টেনে আনতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। সাহস করে তাই একাই বেরিয়ে পড়েছিলাম।

নিঝুম নদীর বুক চিরে ঘন কুয়াশার মধ্য দিয়ে একলা ভেসে চলেছে এক বিশাল কাঠের নৌকা। বাইরে কী সব অচেনা পোকার ডাক আর জলের ছপছপ শব্দ।

নৌকার গলুইয়ে বসে থাকা প্রবীণ মাঝিটা হঠাৎ বৈঠা বাওয়া থামিয়ে ডুগি-কণ্ঠে বলে উঠল, "আজকের রাতের এই নৌকায় যারা উঠেছে, তাদের কেউ আর নদীর ওপারে পৌঁছাতে পারবে না।"

কথাটা শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। হঠাৎ! এ কেমন উচ্চারণ!

আমি পার্স ব্যাগ থেকে ওপার পারাপারের টিকিটের টুকরোটার দিকে তাকালাম। অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না দেখে ফোনের টর্চ জ্বেলে নিলাম।

সেখানে গন্তব্য হিসেবে লেখা আমার নিজেরই জন্মগ্রামের নাম। অথচ, আমি তো আজ শহরের দিকে যাওয়ার জন্য ঘাটে এসে উঠেছিলাম!

আমি শুকনো গলায় বললাম, "আপনি ভুল বলছেন, আমার যাত্রা তো শহরের ঘাটে!"

বৃদ্ধ মাঝি মৃদু হেসে নিজের জ্যাকেটের পকেট থেকে একই রকম দেখতে আরেকটি টিকিট বের করল।

অবাক হয়ে দেখলাম, সেই টিকিটে স্পষ্ট নাম লেখা—আমার নিজের! আর যাত্রার তারিখ... আগামীকালের!

"ভয় পাবেন না," মাঝি বিড়বিড় করে বলল,

"আমি এই খেয়াঘাটের পুরোনো ইজারাদার।"

"গত বছর আজকের এই রাতেই মাঝনদীতে নৌকা ডুবে আমি মারা যাই। আজ এসেছি আপনাকে সতর্ক করতে। কারণ, ঘাটে যে লোকটা আপনাকে এই নৌকায় তুলে দিয়েছে, সে জীবিত কোনো মানুষ নয়।"

মাথার ভেতরে রিমরিম করে উঠল। কী বলে! মজা করছে? এত রাতে একা একটা মেয়েমানুষ পেয়ে এমন করছে?

তবুও হিসেব কষতে শুরু করলাম। ঘাবড়ে গেলে চলবে না।

একটু আগেই যে লোকটা হ্যারিকেনের আলোয় আমাকে নৌকায় তুলল, তার মুখটা তো একটা কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল! দেখতে পেলাম না। দেখার খুব একটা ইচ্ছেও ছিল না। তাড়াহুড়োয় এত কিছু মাথাতেই আসেনি। সাহায্য পাচ্ছি এই ঢের।

ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল আমার মায়ের নম্বর। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, "তুই কোথায়? ওরা কিসব ভিডিও ছবি পাঠাচ্ছে! ফোন দিচ্ছে! ঠিক আছিস? কিরে ঠিক আছিস! তুই নাকি আইসিইউতে ভর্তি!"

মা কাঁদতে কাঁদতে এক নাগাড়ে এতসব বলে যাচ্ছিল। শুধু বললাম, "ঠিক আছি মা। টেনশন নিও না।"

বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করে উঠল। চারপাশের দিকে তাকালাম। সত্যিই তো...

লণ্ঠনের আলোটা নীলচে হয়ে আসছে, নদীর পানি আলকাতরার মতো কালো আর স্থির!

ফোনটা হাত থেকে খসে পানিতে পড়ে গেল। আমি পেছনে ঘুরতেই দেখলাম, সেই বৃদ্ধ মাঝিও আর নেই। 

বৈঠাটা একাই জলের ওপর ভেসে আছে। কাঠের তক্তায় পড়ে আছে একটা ভেজা চুপচুপে পুরোনো ডায়েরি। থরথর করে কাঁপা হাতে ডায়েরিটা খুলতেই সত্যটা এক নিমেষে স্পষ্ট হয়ে গেল।

 

ডায়েরির পাতায় লেখা____

"এটি কোনো বাস্তব নদী নয়। এটি জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী ছায়ানদী। যে মানুষগুলো কোমায় চলে যায়, তাদের অবচেতন আত্মা ওপারে যাওয়ার জন্য এই নৌকায় এসে উপস্থিত হয়।"

রহস্যের সব জট খুলে গেল। আমি জীবিত বা মৃত কোনোটাই নই। আইসিইউর বেডে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে আমার নিথর দেহ। আর এই নদীটি হলো আমার জীবনের শেষ প্রান্ত।

কুয়াশা চিরে ওপার থেকে একটা অস্পষ্ট, আলোহীন তীরের অবয়ব ফুটে উঠল। হাওয়ায় ভেসে এলো মাঝির সেই ভুতুড়ে কণ্ঠ,

"নৌকা ওপারে ভিড়ছে। ওপারে গেলে চিরশান্তি, আর জলে ঝাঁপ দিলে তোমাকে ফিরে যেতে হবে সেই ব্যথাতুর, নল লাগানো আইসিইউর ভেতরের নিথর শরীরে..."

আমি নৌকার প্রান্তে থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। একদিকে পরলোকের অনন্ত নীরবতা, অন্যদিকে হাসপাতালে ফিরে গিয়ে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম।

নৌকাটা ধীরে ধীরে তীরের দিকে ঘেঁষছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কালো জলের দিকে তাকিয়ে আমি স্থির করতে পারছি না, কোথায় আমার আসল গন্তব্য.....

হয়তোবা আমি ঝাঁপ দেবো। বাঁচার চেষ্টা করব।

হয়তো সবকিছুই গোলকধাঁধা!

নয়তো এখানেই সমাপ্তি!

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন