https://www.prothomalony.com/

18487

literature

সাহিত্য

জলের উপর বেঁধেছি ঘর সাগরে পেতেছি শয্যা

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:১৬

দরজা খুলে কেবিনে ঢুকতেই যেনো আমাদের সামনে অন্য এক জগতের দরজা খুলে গেলো।  মুগ্ধ হয়ে গেলাম। দেয়ালে  ঝুলন্ত টেলিভিশনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে "ওয়েলকাম এবরোড,শেলী জামান খান  এণ্ড নুরুল আলম” আর নিচে চলছে ক্রুজ ডিরেক্টরের বক্তব্য দেয়া একটা ছোট ভিডিও। একটা বড় টেবিলের উপর ঠান্ডা শ্যাম্পেনের বোতল এবং দুটো স্যাম্পেইন গ্লাস অভ্যর্থনা মুডে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমার এই দীর্ঘজীবনে কোথাও গিয়ে এমন অভিনব আপ্যায়ন কখনো  পাইনি। অর্থের বিনিময়ে হলেও কিন্তু সব বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান প্রাপকদের যথার্থ মূল্যায়ন এবং তাদের প্রাপ্য যথাযথভাবে প্রদান করে না। ভাইকিংস অন্তত আমাদের সেই সম্মানটুকু দিচ্ছে।বাকীটা যদিও এখনো জানি না—তবে শুরুটা নিঃসন্দেহে চমতকার। 

টেবিলের পাশেই ছোট্ট ফ্রিজে কয়েকটা ফল, কিছু স্ন্যাকস, গোটা কয়েক পানির বোতল, কয়েকটা সফট ড্রিংকস, বিয়ার এবং ওয়াইনের বোতল রাখা আছে। রুমের ফ্লোর থেকে শুরু করে চারিদিকে চোখ বোলাতেই বোঝা গেলো টপ-টু-বটম সবকিছুই  ডিপক্লিন করা। দুটো টুইন বেড জোড়া লাগিয়ে কিং সাইজ ডাবল বিছানা। ধবধবে সাদা বিছানায় ভাইকিং এর বিখ্যাত নরওয়েজিয়ান মারিয়াস-ব্ল্যাঙ্কেট ভাঁজ করে রাখা। সেই মূহুর্তে বিছানার দিকে তাকাতেই আমার দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো।

রুম সংলগ্ন ব্যালকনিটি দেখেই আমার পরাণ জুড়িয়ে গেলো। শোবার ঘরের সাথে একটা ব্যালকনি যদি থাকে, তাহলে জীবনে আর কিছুই লাগে না। তারপর সেই ব্যালকনীতে দাঁড়ালে যদি উন্মুক্ত সাগরের দৃশ্য দেখা যায়, সেই মূহুর্তকে স্বর্গীয় না বলে উপায় নেই। ফিনফিনে সাদা পর্দার আড়ালে ব্যালকনির লোভনীয় হাতছানি এড়ানো কঠিন। তাতে শরীর যতই শ্রান্ত হোক। ফ্লোর-টু-সিলিং স্লাইডিং স্বচ্ছ কাঁচের দরজা। দরজায় দুই পরতের পর্দা। হেভি ডিউটি ভারী পর্দা দু’ভাগ করে দু’পাশে টেনে রাখা আছে। মাঝে পাতলা পর্দা ভেদ করে বাইরের সুর্যের আলো এসে ঘরে লুটিয়ে পড়েছে। আমরা কাঁচের স্লাইডিং দরজা ঠেলে বারান্দায় গেলাম। ছোট প্রাইভেট বারান্দা। সেখানে ২টা চেয়ার আর একটা টেবিল পাতা। বুক সমান রেলিং দিয়ে বারান্দা ঘেরা আছে। বারান্দা থেকে নোঙ্গর করা বিশাল জাহাজের দুই প্রান্তে তাকাতেই সারি সারি রুম আর ব্যালকনীর অংশ বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। বোঝা গেলো কেবিনগুলো এমনভাবে তৈরি যাতে প্রতিটি কেবিনেই প্রাইভেট ব্যলকনী থাকে।সেইসব ব্যালকনী থেকে আমাদের মতোই অন্যসব উৎসুক অতিথিরা তাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সদ্য বুঝে পাওয়া নিজস্ব ঘর এবং বারান্দার দখলদারিত্ব উদযাপন করছে।

বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই টের পেলাম,  অগাস্টের শুরু, কিন্তু গ্রীষ্ম যেনো রোমের আকাশ-বাতাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। গরম নেহায়েতই কম না। এবার জাহাজের পেছেনের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করতেই টাইরেনিয়ান সাগরের জলের উপর ছলকে পড়া মধ্যান্হ সূর্যের আলোর ছটা ঝকমকিয়ে উঠল।  অদূরেই মাইকেলেঞ্জেলো দূর্গের চূড়ায় একঝাঁক গাঙ্গচিল চক্রাকারে ঘুরছে, সম্ভবত তাদেরই কোন সঙ্গীর শিকার করা মৎস হয়তো তাদের  আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে। শিকার যেই করুক, সবারই তাতে ভাগ বসানো চাই। দীর্ঘদিন ধরে কনি আইল্যান্ডের সৈকতের কাছাকাছি  বসবাস করার কারণে গাঙচিলদের চরিত্র, স্বভাব সম্পর্কে খানিকটা ধারনা তৈরি হয়েছে। ওরা বোর্ডওয়াকের ফেলে দেওয়া ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, হট ডগ, চিপস, অন্য পাখির ডিম, ছোট বাচ্চা পাখিও খেয়ে ফেলে। ময়লা-আবর্জনা থেকেও খায় - তাই ওদেরকে অনেকে "সমুদ্রের কাক" বলে।গাঙ্গচিলরা খাওয়া নিয়ে যতই লড়াই করুক নিজেদের বাচ্চার জন্য এদের মধ্যে মূহুর্তেই একতা তৈরি হয়ে যায়। যখন কোনো বিপদ আসে, তখন সব গাঙচিল একসাথে চিৎকার করে, একসাথে আক্রমণকারীকে তাড়া করে।পাড়াপড়শির সাথে ঝগড়া, মারামারি করে বেরালেও গাঙচিলরা পরিবারের প্রতি খুব সৎ। একবার জোড়া বাঁধলে তারা নাকি আর বিচ্ছেদের পথে পা বাড়ায় না। সারাজীবন একসাথেই থাকে।অন্তত মানুষের থেকে এই বিষয়ে তারা সম্ভবত ব্যাতিক্রম। তবে গাঙ্গচিল নারী-পুরুষের মাঝে পরকিয়া, সমকামিতা বা বহুগামিতা যে একেবারেই নেই, তা কে হলফ করে বলতে পারবে? 

প্রখর রোদ আর গরমের কারনে বারান্দায় বেশীক্ষণ বসা সম্ভব হল না। তাই পাখি বিষয়ক গবেষণা বাদ দিয়ে ঘরে ফিরে এলাম।বিছানার সামনের ফ্ল্যাট স্ক্রিন টিভিতে তখন আত্মরক্ষামূলক ড্রিলের ভিডিও চলছে।বারান্দা থেকে ফিরে মনে হল ঘুমঘুম ভাবটা চটে গেছে।  সিদ্ধান্ত নিলাম, সুটকেস আনপ্যাক করে, জিনিসপত্রগুলো যথাযথ স্থানে গুছিয়ে রেখে তবেই ঘুমাবো। সুটকেস আনপ্যাক করে বাথরুমের পাশের ক্লোজেট এবং ড্রেসারটাতে আমি নিজের  কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখলাম। বাবুলকে দিলাম বিছানার পাশে ক্লোজেট। সে তার কাপড় চোপড় গোছাতে শুরু করলো। 

গোছগাছ শেষ হতেই বাবুলের চায়ের তেষ্টা পেলো। সে কেবিনের কফি কর্নারে গিয়ে সবকিছু পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করলো, কিন্তু অবধারিতভাবেই সাহায্যের ডাক পড়ল। অগত্যা আমাকে কফি কর্নারের তদারকিতে যেতে হল। ছোট্ট ছিমছাম কফি কর্নার। কোনো বাড়াবাড়ি নেই। একটা ছোট এসপ্রেসো মেশিন। ইলেকট্রিক কেটলি। দুটো সাদা মগ।পাশেই ক্যাপসুল, টুইনিংস ব্র্যান্ডের ইংলিশ ব্রেকফাস্ট এবং আর্ল গ্রে চায়ের কতগুলো প্যাকেট। চিনি, মিল্ক, চামচ,  দুটো পানির বোতল। সবকিছু একটা কালো ট্রেতে এত পরিপাটি গোছানো যে হাত দিতেও মায়া লাগে। বাবুলকে চা বানিয়ে দিতেই সে সোফায় গিয়ে আরাম করে জাকিয়ে বসলো। চায়ে চুমুক দিয়ে ঘরের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললো। 

আমি ডিসিশন নিলাম এই ফাঁকে আমি বরং লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে নেই। বাথরুমে ঢুকতেই আমার অবস্থাও বাবুলের মতোই। কেবল চারিদিক দেখি। কী সুন্দর! কাচের দরজার শাওয়ার, হিটেড ফ্লোর, অ্যান্টি-ফগ আয়না, ভাইকিংস এর নিজস্ব নরওয়েজিয়ান ব্র্যান্ড ফ্রেয়া’র  শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, বডি লোশন,  ডিসইনফেক্ট করা তোয়ালে।

প্রাকৃতিক ক্রিয়াদি শেষ করে শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম।পানির ধারায় নিজেকে সিক্ত করতেই একটা আরামের অনুভব শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।  ফ্রেয়া’র  শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে,কন্ডিশনার লাগিয়ে, সারা গায়ে সাবানের ফেনা তুলে গোসল শেষ করলাম। 

নরওয়ের পুরানে  ‘ফ্রেয়া’ হলেন ভালোবাসা, সৌন্দর্য আর সৌভাগ্যের দেবী। ফ্রেয়া নামটা এসেছে নর্স দেবীর নাম থেকে।ভাইকিং যেহেতু নরওয়েজিয়ান কোম্পানি, তাই ওরা ওদের প্রোডাক্টের নামও ওদের দেবীর নামে নামকরন করেছে।

সুন্দর শান্তিময় একটা গোসল সেরে, ফুরফুরে মনে, সুরভিত শরীরে আমি এবার বিছানায় নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পন করলাম। আমি এখন জলের উপর বেঁধেছি ঘর, সাগরে পেতেছি সজ্যা। এখন আমার নির্ভার মন, প্রশান্ত শরীর। বিনা আমন্ত্রণেই ঘুমের দেবী এসে দেখা দিলেন। দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো। ক্রনিক ইনসমনিয়া রোগে ভোগা এই আমি কখন, ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম…
ভাইকিং সি ক্রুজের কেবিন-সংলগ্ন বারান্দায় লেখক
 

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন