https://www.prothomalony.com/

18451

opinion

অভিমত

নদী রক্ষায় পরিকল্পনা নয়, চাই বাস্তবায়ন

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ ০২:২৩

বাংলাদেশের পরিচয়ের সঙ্গে নদী শব্দটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এ দেশের জনজীবন, কৃষি, অর্থনীতি, যোগাযোগ, মৎস্যসম্পদ ও সংস্কৃতির বিকাশে নদীর ভূমিকা অপরিসীম। একসময় নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ, বাজার ও বন্দর। নদীর পানি ব্যবহার করে কৃষক ফসল ফলিয়েছেন, জেলেরা মাছ ধরে সংসার চালিয়েছেন। নদীপথ ছিল দেশের যোগাযোগব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। অথচ সেই নদীগুলোর অনেকগুলো আজ দূষণ, দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
রাজধানীর বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর দিকে তাকালেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায়। একসময় এসব নদীর পানি ও বাতাস ছিল জনজীবনের স্বাভাবিক অংশ। এখন অনেক জায়গায় নদীর পানিতে দুর্গন্ধ, ময়লা-আবর্জনা ও নানা ধরনের বর্জ্য ভাসতে দেখা যায়। শুধু রাজধানীর নদীগুলো নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট-বড় নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। কর্ণফুলী, সুরমা, তিস্তা, ধলেশ্বরী, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোও নানা ধরনের দূষণের চাপ বহন করছে।

নদীদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ শিল্পকারখানার বর্জ্য। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনের নিয়ম থাকলেও সব ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে পরিচালিত হয় না। রং, রাসায়নিক, চামড়া ও বিভিন্ন শিল্পের বর্জ্য পরিশোধন না করে নদীতে ফেলা হলে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয়। এসব বর্জ্যে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘদিন নদীর পানি ও তলদেশের পলিতে থেকে যেতে পারে। এতে শুধু পানি দূষিত হয় না, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবনও হুমকির মুখে পড়ে।

শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি নগরজীবনের বর্জ্যও নদীর জন্য বড় সমস্যা। বিভিন্ন শহরের পয়ঃনিষ্কাশনের পানি ও গৃহস্থালি বর্জ্যের একটি অংশ এখনো যথাযথ ব্যবস্থাপনার বাইরে রয়েছে। কোথাও কোথাও নালা ও ড্রেনের পানি সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য আবর্জনা নদীতে ফেলার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। নদীর পানিতে এসব বর্জ্য জমে জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে।


কৃষিক্ষেত্র থেকেও নদীতে দূষণ ছড়াচ্ছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পর বৃষ্টির পানি জমি থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ধুয়ে খাল-বিল হয়ে নদীতে নিয়ে যায়। এতে নদীর পানির গুণমান নষ্ট হয় এবং মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। কৃষির উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যদি নদী ও জলাভূমির পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার খেসারতও দিতে হবে।

নদী দূষণের সঙ্গে দখলও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। নদীর তীর দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, বালু ও মাটি ফেলা কিংবা নদীর জায়গা ভরাট করার কারণে অনেক নদী তার স্বাভাবিক প্রশস্ততা হারিয়েছে। নদীর জায়গা সংকুচিত হলে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে পলি ও বর্জ্য সহজে সরে যেতে পারে না। একসময় যে নদীতে স্রোত ছিল, সেখানে ধীরে ধীরে পলি জমে নাব্যতা কমে যায়। বর্ষাকালে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নদী রক্ষায় আইন ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কম নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনের নিজ নিজ দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি অনেক সময় নদী রক্ষার উদ্যোগকে দুর্বল করে দেয়। একটি প্রতিষ্ঠান অভিযান পরিচালনা করলেও অন্যদিকে আবার নতুন করে দখল বা দূষণ শুরু হয়। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।

শুধু অভিযান চালিয়ে নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়। দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পকারখানার ইটিপি বাস্তবে চালু আছে কি না, তা শুধু কাগজপত্র দেখে নয়, নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ আইন ভঙ্গ করলে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে আইন অমান্য করা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনক না হয়। একই সঙ্গে নদী দখলের ক্ষেত্রেও পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার নদী রক্ষায় নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। নদীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্বয়ংক্রিয় পানির মান পরিমাপক বসানো হলে কখন এবং কোথায় দূষণের মাত্রা বাড়ছে, তা দ্রুত জানা সম্ভব। এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে সাধারণ মানুষও নদীর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবে। শিল্পকারখানাগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তথ্যও একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে।

কৃষিতেও পরিবর্তন দরকার। রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার ও পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বর্জ্য ফেলার ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। একই সঙ্গে নদীর পাড়ে পরিকল্পিত সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুললে ভাঙন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের অনেক নদী সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে এসেছে। ফলে উজানের দেশের কর্মকাণ্ডের প্রভাবও এসব নদীর পানিতে পড়ে। আন্তঃসীমান্ত নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে তাই শুধু দেশের ভেতরের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
নদী রক্ষার কাজে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করাও জরুরি। নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষ, জেলে, কৃষক, শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সংগঠনগুলোকে যুক্ত করা গেলে নদীর প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ বাড়বে। গণমাধ্যমও নিয়মিত নদীর অবস্থা তুলে ধরে জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়। নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের জীবন ও জীবিকা। নদী হারালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন ও জীববৈচিত্র্য। হারিয়ে যাবে বহু এলাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও। তাই নদী রক্ষার উদ্যোগকে কোনো বিচ্ছিন্ন পরিবেশ প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দেশের অর্থনীতি, জনজীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বছরের পর বছর নদী নিয়ে আলোচনা হয়েছে, পরিকল্পনা হয়েছে, অভিযান হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা। নদী দখল বন্ধ, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, শিল্পবর্জ্য শোধন, পয়ঃনিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি—সবকিছু একসঙ্গে করতে হবে। নদীকে বাঁচানোর কাজ যত দেরি হবে, সংকট তত গভীর হবে। তাই কথার চেয়ে এখন কার্যকর উদ্যোগই বেশি জরুরি। নদী বাঁচলে দেশের প্রকৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনও বাঁচবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

অভিমত থেকে আরো পড়ুন