https://www.prothomalony.com/
18449
decoration
"ভ্রমণ শুধু চোখের জন্য নয়, এটি মন, আত্মা, আর হৃদয়ের জন্যও এক বিশাল উপহার।"
প্রাগ অনেক দিন ধরেই আমাদের বাকেট লিস্টে ছিল। নিউইয়র্ক টু হেলসিংকি এবং হেলসিংকি থেকে বুদাপেস্ট খুব ভালো ডিলে ফ্লাইট পাওয়া গেল। আর বুদাপেস্ট থেকে ট্রেনে খুবই কম খরচে প্রাগে আসা যায়। অনলাইনে সব বুকিং প্রায় মাস চারেক আগেই করা হয়েছিল। আগস্ট মাসের ১২ তারিখে জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে হেলসিংকি হয়ে বুদাপেস্ট পৌঁছালাম। হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন বুদা আর পেস্টের কিছু স্পট ঘুরলাম।
পরের দিন, ১৪ তারিখে, সকাল ১১টায় আমরা বুদাপেস্ট সেন্ট্রাল রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠলাম। হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট থেকে ট্রেনে করে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ যাচ্ছি। বহুদিন আগে দেখা স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে! একদম সময়মতো ট্রেন ছেড়ে দিল। দানিউব নদী, পাহাড় আর লোকালয় পেছনে ফেলে সর্পিল গতিতে এগিয়ে চলেছে ট্রেন, আর তার পাশেই বয়ে চলেছে দানিউব। একসময় দেখলাম মাইলের পর মাইল শুধু সূর্যমুখীর হাসি। বিকেল চারটায় আমরা প্রাগে পৌঁছলাম। হোটেল শহরের প্রান্তে; একদম হোটেলের সামনেই ট্রাম থেকে নামলাম।
রাগে এসে ১৫ আগস্ট সকালে যে কাজটা করলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খোঁজে চলে গেলাম 'ঠাকুরোভা' রোডে। ফেসবুকের বন্ধু ডাক্তার অঞ্জনাদিদির কাছে শুনেছি, ট্রাম থেকে নেমে অল্প হেঁটে পৌঁছে যাওয়া যাবে। হোটেল থেকে বেরিয়ে ট্রামে উঠলাম। মাথার ওপর ঝলমলে রোদ নিয়েই ঠাকুরোভা স্ট্রিটে এসে ট্রাম থেকে নামলাম।
নেমে রাস্তা পার হয়ে একদিকে হাঁটছিলাম, তবে ভুলবশত উল্টো দিকে চলে গিয়েছিলাম। একটি মেয়ে আমাদের সাহায্য করল; মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করতেই সে নিজের ফোনে রবীন্দ্রনাথের মূর্তির ছবি বের করে আমাদের পথ দেখিয়ে দিল।
ঠাকুরোভা স্ট্রিটের পাশেই পার্কের ঠিক মধ্যিখানে রবীন্দ্র ভাস্কর্য—এই পার্কটি একেবারে প্রাগের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির দুয়ারে। দু'পাশে সারি সারি বনবীথিকা আর মাঝখানে বেদিতে ব্রোঞ্জ নির্মিত ৬ ফুট উঁচু বেদিতে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি। একসময় দেখলাম ক্যাম্পাসের সবুজ মাঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দাঁড়িয়ে আছেন। 'টাগোর' নয়, স্পষ্ট লেখা—'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর'। গাছেরা সেখানে অবিরাম পাতা দুলিয়ে যাচ্ছে।
প্রাগের ঠাকুরোভা স্ট্রিটের নামকরণ করা হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত কবি ও নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে। ঠাকুরোভা স্ট্রিট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির প্রতি এক বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন। চেক বানানরীতি অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে 'রাবিন্দ্রনাথ থাকুর' (Rabíndranáth Thákúr) বলা হয়, এবং তাঁর নামেই এই রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি 'গীতাঞ্জলি' পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব ঘুচিয়ে চেক বুদ্ধিজীবীদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। এই রাস্তাটি ১৯২১ এবং ১৯২৮ সালে প্রাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সফরকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা চেকোস্লোভাকিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল।
"তুমি একটু কেবল বসতে দিও কাছে
আমায় একটু কেবল বসতে দিও কাছে।
আমি হাত জোড় করে রবো তোমার মুখোমুখি,
আমার এই যা কিছু কাজ আছে।"
মনে মনে গুনগুন করে কবির চারপাশে ঘুরলাম খানিকটা। ছবিও তুললাম, ভিডিও করলাম।
তারপর চললাম অন্য প্রান্তে। এ শহর কাফকার শহর; একদিকে এই শহরটা অনেকটাই ফেইরি টেইল-এর মতো। প্রাগ ক্যাসল থেকে যখন পুরো শহরটা দেখলাম, তখন বুঝতে পারলাম কেন এই শহর প্রেমের শহর হিসেবে পরিচিত। এই সৌন্দর্য শুধু চোখের জন্য নয়, এটি এক অনুভূতির ব্যাপার! এই শহর দেখলে, অনুভব করলে, মন যেন এক মোহে আটকে যায়। প্রাগের প্রতিটি ইটে, প্রতিটি রাস্তায়, প্রতিটি আকাশে যেন লুকানো আছে এক অজানা প্রেমের গল্প। কোবল স্টোনের পুরনো পাথরের রাস্তা, মাথার ওপর গথিক চূড়া, আর কোথাও থেকে ভেসে আসা কফির উষ্ণ ঘ্রাণ—এসব যেন এক অন্য জগতে নিয়ে গেল। ক্যাসল আর ক্যাসল, প্রাগ ক্যাসেলের শহর!
আজ রোদ বেশ কড়া। তাই হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। হোটেলের পাশের রেস্টুরেন্টে ডিনার করে নিলাম কিছুটা বিকেল বেলাতেই।
পরদিন সকালে ট্রাম ছুটে চলল পুরনো শহরে। প্রথমে গেলাম ওল্ড টাউনে মাথাবিহীন কাফকা'র ভাস্কর্য দেখতে। ওল্ড টাউনে তখনো পর্যটকদের ভিড় জমেনি; কফির মায়াবী ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে চারপাশে। ফ্রানৎস কাফকাকে নিয়ে তৈরি করা সবচেয়ে চমৎকার এই ভাস্কর্যটির শিল্পী ইয়ারোস্লাভ রোনা। এটি রয়েছে প্রাগের ওল্ড টাউন আর ইহুদি কোয়ার্টারের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়—যার একপাশে স্প্যানিশ সিনাগগ এবং অন্যপাশে চার্চ অব দ্য হোলি স্পিরিট।
এখানে দেখা যায়, মাথাবিহীন একটি বিশালাকার দেহের কাঁধে চড়ে বসে আছেন মাথাওয়ালা কাফকা; চোখ ক্লান্ত, ডান হাতের তর্জনী কিছু নির্দেশ করছে। ১৯১২ সালে লেখা কাফকার বিখ্যাত ছোটগল্প 'ডেসক্রিপশন অব অ্যা স্ট্রাগল' গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই শিল্পী রোনা এই ভাস্কর্যটি গড়েছেন।
যে শহরে আছে চার্লস ব্রিজ, ক্লক টাওয়ার আর আলবার্ট আইনস্টাইনের স্মৃতিবিজড়িত বাসস্থান। ঘড়িটি জোডিয়াক ক্যালেন্ডার ও সময়—দুটোই প্রদর্শন করে। প্রাগের এই অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ঘড়িটি পৃথিবীর একমাত্র প্রাচীন ঘড়ি, যা আজও নিখুঁতভাবে সময়, দিন, সপ্তাহ ও বছর প্রদর্শন করে আসছে। আমরা যখন ঘড়িটির কাছে এসে দাঁড়ালাম, তখন বেলা ১২টা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। হাজার হাজার উৎসুক পর্যটক ঘড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম। ঠিক ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ঘড়ির পার্ট খুলে গেল! টুং টুং শব্দ করতে করতে পাখি, কঙ্কাল, বিভিন্ন পশুপাখি চক্রাকারে গান গাইতে লাগলো। সে এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
ওল্ড টাউনের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটি প্রাচীন দরজার দেওয়ালে চোখ আটকে গেল। দেওয়ালে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের প্রতিকৃতি ও কিছু বিখ্যাত উক্তি খোদাই করা। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে এখানে দেখা হতো বিখ্যাত কাফকার।
আর এই ঘড়ির মতোই বিস্ময়কর প্রাগ শহরটি—যেখানে ওল্ড টাউনের মধ্যযুগীয় দুর্গ ও প্রাসাদ থেকে শুরু করে আধুনিক কাচের অট্টালিকা পর্যন্ত সবকিছুই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়! এর রূপে মুগ্ধ হয়ে প্রতিবছর হাজারো পর্যটকের আনাগোনা লেগেই থাকে।
আজ হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় আবহাওয়া চেক করা হলেও ছাতা নেওয়া হয়নি। এখন হঠাৎই দেখি বৃষ্টি শুরু হলো। আমরা ওল্ড টাউন স্কোয়ার থেকে হোটেলে ফিরে ছাতা নিয়ে আবার বের হলাম। প্রাগের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা সত্যিই দুর্দান্ত! এই যাওয়া-আসায় আমাদের প্রায় ৪০ মিনিট দেরি হয়ে গেলেও পরে তা আমরা পুষিয়ে নিতে পেরেছি।
ট্রাম প্রাগের মনোরম বাহন। রাস্তা আর ট্রামলাইন চলেছে পাশাপাশি; কী অপূর্ব এই মায়াবী নেটওয়ার্ক! পুরো শহরের অলিগলি ও রাজপথ থেকে সর্পিল গতিতে রঙিন সুন্দর সুন্দর ট্রাম অনবরত ছুটে চলেছে। আর এরা কত সুন্দরভাবে এই যানটিকে ব্যবহার করে সেটাই দেখবার বিষয়। প্রাগের ট্রামের নেটওয়ার্ক চেক রিপাবলিকের মধ্যে সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে বৃহৎ। প্রাগ হয়ে গেছে 'দ্য সিটি অব কে'। শহরটি প্রাহা নামেও পরিচিত।
শহরের কোয়াদ্রিও কমপ্লেক্সে অবস্থিত ডেভিড চের্নির তৈরি কাইনেটিক যা আধুনিক ১১ মিটার উঁচু ভাস্কর্য নিখুঁতভাবে কাফকার অবয়ব ফুটিয়ে তোলে, আবার কখনো কখনো এলোমেলো হয়ে যায়। ৩৯ টন ওজনের এই চলমান শিল্পকর্মটি ৪২টি স্টেইনলেস স্টিলের ঘূর্ণায়মান স্তর দিয়ে নির্মিত, যা সুনিপুণ গতিশীলতার মাধ্যমে ফ্রানৎস কাফকার মানসিক অস্থিরতা ও দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে।
অন্যান্য পর্যটকদের মতো আমিও বারবার বিস্ময়ভরে তাকিয়ে থাকি এর দিকে। খুঁজে পাই প্রিয় লেখকের পুনর্গঠিত চেহারা, যেখানে একদিকে ভঙ্গুরতা, অন্যদিকে দৃঢ়তা যেন একসঙ্গে লুকিয়ে আছে। একজন মানুষের মনোভাব, যা কাফকার লেখনীর মতোই জটিল এবং গভীর। মুহূর্তে মুহূর্তে কাফকার মুখটি ভেঙে যায়, আবার গড়ে ওঠে।
"ভয়ংকর এক পৃথিবী আমি বয়ে চলেছি আমার মাথার মধ্যে! আমার নিজের ভেতর ওগুলো ধরে রাখার চেয়ে হাজার গুণ ভালো হয় মাথা ছিঁড়ে-কেটে টুকরো করে ফেলা।"
এই স্থাপত্যের নির্মাতা এই ডায়লগ মাথায় নিয়েই এটি তৈরি করেছেন মনে হয়। এই ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে তার মেটামরফোসিস এর আরশোলায় রূপান্তরিত গ্রেগর সামসা ধীরে ধীরে অনিবার্যভাবে তার চেনা জগৎ থেকে তার স্নেহশীল পারিবারিক বন্ধন থেকে, সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ট্র্যাজেডি আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে কারণ গ্রেগর নিজে সবকিছু অনুধাবন করতে পারে; অন্যের প্রতিটি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তীক্ষ্ণভাবে তার চেতনায় ধরা পড়ে, কিন্তু প্রবল ইচ্ছা ও চেষ্টা সত্ত্বেও সে তার ভেতরের মনোভাব, ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও আবেগ-অনুভূতি কাউকে বোঝাতে সক্ষম না।
চিন্তা করে পাই না কীভাবে তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি লিখেছেন। ভাস্কর্যটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এটি যেন শুধু একজন লেখকের মুখাবয়ব নয়—তাঁর ভেতরের অস্থিরতারও একটি প্রতীক। পরিচিত মুখটি বারবার ভেঙে গিয়ে আবার তৈরি হচ্ছে। ঠিক যেন কাফকার নিজের সাহিত্যজগত । বাস্তবতা আছে, অথচ বাস্তবতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত স্বপ্ন, ভয়, অনিশ্চয়তা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।
সাজসজ্জা থেকে আরো পড়ুন