https://www.prothomalony.com/

18405

opinion

অভিমত

প্রবাসী গণমাধ্যম: সেতু, নাকি নিজস্ব জগৎ?

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪৮

হাজার মাইল দূরে থেকেও এখন মুহূর্তে নিজের দেশের খবর জানা যায়। মুঠোফোনের পর্দায় ভেসে ওঠে পরিচিত শহরের ঘটনা, রাজনৈতিক বিতর্ক, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা স্বজনের সাফল্যের সংবাদ। প্রবাসী বাংলা গণমাধ্যম এই যোগাযোগকে অর্থবহ করার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু স্বদেশের খবর কাছে পাওয়া আর স্বদেশের মানুষকে বোঝা কি একই বিষয়? প্রবাসের জীবন ও অভিজ্ঞতাই বা কতটা পৌঁছায় দেশের মানুষের কাছে? যোগাযোগ সহজ হয়েছে, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়াও কি সেই অনুপাতে বেড়েছে? প্রবাসী গণমাধ্যমের ভূমিকা বুঝতে হলে এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন।

প্রবাসী বাংলা গণমাধ্যমের প্রয়োজন শুধু সংবাদ সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবেশে থেকেও মানুষ নিজের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখতে চায়। সংবাদপত্র, সাময়িকী, বেতার, টেলিভিশন ও অনলাইন প্রকাশনা সেই প্রয়োজন পূরণে ভূমিকা রাখে। এগুলো প্রবাসীদের স্থানীয় খবর জানায়, সাংস্কৃতিক আয়োজন তুলে ধরে এবং নতুন অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে। বৃহত্তর সংবাদমাধ্যমে যথেষ্ট জায়গা না পাওয়া কোনো জনগোষ্ঠীর জীবন ও সমস্যাও এসব মাধ্যমে দৃশ্যমান হতে পারে। এই সামাজিক ভূমিকার মূল্য কম নয়।

তবে সেতু তৈরি করতে হলে যোগাযোগের দুই দিকই সচল থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের খবর প্রবাসী পাঠকের কাছে পৌঁছানো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রবাসের বাস্তবতা দেশের মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলাও জরুরি। অভিবাসনের কারণ, কাজের অনিশ্চয়তা, নতুন সমাজে মানিয়ে নেওয়ার চাপ, নাগরিক অধিকার ও পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা না থাকলে প্রবাসজীবন কয়েকটি পরিচিত সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার প্রবাসীরা দেশের খবর জানলেও সেই খবরের পেছনে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁদের ধারণা অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। গণমাধ্যমের কাজ তাই শুধু দূরের খবরকে কাছে আনা নয়, দূরের জীবনের অর্থও ব্যাখ্যা করা।

প্রবাসী গণমাধ্যম নিজের জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দেবে—এটাই স্বাভাবিক। স্থানীয় সংগঠনের অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, ব্যক্তিগত সাফল্য ও সামাজিক উদ্যোগের সংবাদ অপ্রয়োজনীয় নয়। এসবের মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠী নিজের অস্তিত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্ককে দৃশ্যমান করে। সমস্যা এসব সংবাদে নয়; সমস্যা দেখা দিতে পারে যখন সংবাদ নির্বাচনের পরিসর এতটাই সংকুচিত হয় যে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। একটি কমিউনিটির মানুষ কোথায় মিলিত হচ্ছেন, তা যেমন সংবাদ, তেমনি তাঁরা কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, কী নিয়ে মতভেদে জড়াচ্ছেন এবং কীভাবে বদলে যাচ্ছেন, সেগুলোও সংবাদ হওয়ার দাবি রাখে। অবশ্য নির্দিষ্ট কোনো সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে তার প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রবাসী সমাজের সব মানুষের জীবন এক রকম নয়। কেউ প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউ শিক্ষার্থী, কেউ নতুন অভিবাসী; আবার কেউ অনিশ্চিত কাজ ও আর্থিক চাপের মধ্যে জীবন চালান। তাঁদের অভিজ্ঞতার পার্থক্য সংবাদে প্রতিফলিত না হলে প্রবাসের অসম্পূর্ণ ছবি তৈরি হতে পারে। প্রবাসী নারীর জীবিকা, পারিবারিক দায়িত্ব, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক অবস্থানের অভিজ্ঞতাও আলাদা মনোযোগ দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি প্রবাসী সাংবাদিকদের নিয়ে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণায় বাংলা সাংবাদিকতার পেছনে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় রাখা, নতুন অভিবাসীদের সহায়তা এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমে নিজেদের জনগোষ্ঠীর উপস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগের মতো প্রেরণার কথা উঠে এসেছে। গবেষণাটি অর্থ ও জনবলের সীমাবদ্ধতার মতো বাধার দিকেও ইঙ্গিত করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা দিয়ে বিশ্বের সব প্রবাসী বাংলা গণমাধ্যমকে বিচার করা যায় না।

প্রজন্মের পরিবর্তনও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে বসতি গড়েছেন, তাঁদের কাছে জন্মভূমির স্মৃতি, পরিচিত ভাষা ও পুরোনো সামাজিক সম্পর্কের বিশেষ গুরুত্ব থাকতে পারে। কিন্তু প্রবাসে জন্মানো বা বেড়ে ওঠা সন্তানদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাঁদের জীবন গড়ে ওঠে অন্য দেশের বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে। বাংলা ভাষা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে তার প্রকাশ প্রথম প্রজন্মের মতো নাও হবে। এই পার্থক্যকে সাংস্কৃতিক অনাগ্রহ বলে চিহ্নিত করলে সমস্যার প্রকৃতি বোঝা যায় না। বরং প্রশ্ন করা দরকার, প্রবাসী গণমাধ্যম নতুন প্রজন্মকে শুধু উত্তরাধিকার সংরক্ষণের আহ্বান জানাচ্ছে, নাকি তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও প্রশ্ন প্রকাশেরও জায়গা দিচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রবাসী গণমাধ্যমের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। ছোট পরিসরের একটি অনলাইন প্রকাশনাও এখন ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে। সংবাদ ভাগ করা, আলোচনা করা কিংবা দূরের মানুষের অভিজ্ঞতা জানা আগের তুলনায় সহজ। কিন্তু তথ্যের সহজলভ্যতা মানেই তার নির্ভরযোগ্যতা নয়; যোগাযোগের বিস্তারও পারস্পরিক বোঝাপড়ার নিশ্চয়তা দেয় না। একই ধরনের মতামত ও পরিচিত সংবাদ বারবার সামনে এলে পাঠক বৃহত্তর বাস্তবতার বদলে নিজের আগ্রহের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকতে পারেন। এই ঝুঁকি শুধু প্রবাসী গণমাধ্যমের নয়, সমগ্র ডিজিটাল সংবাদজগতের। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি তথ্য যাচাই, প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা ও ভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতি মনোযোগ জরুরি।

প্রবাসী গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা বিচার করতে গিয়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাও মনে রাখা দরকার। ছোট প্রকাশনার অর্থ, জনবল ও সময় সীমিত হতে পারে; অনেক উদ্যোগ স্বেচ্ছাশ্রমের ওপর নির্ভর করে চলে। ফলে নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা তৈরি হয়। বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভরতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ, যদিও তার প্রভাব প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা। সীমিত সম্পদকে অজুহাত করে সাংবাদিকতার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি বাস্তব সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে সব প্রতিষ্ঠানের কাছে একই সামর্থ্য প্রত্যাশা করাও ন্যায্য নয়। তথ্যের নির্ভুলতা, সম্পাদকীয় সততা ও পাঠকের আস্থা ছোট গণমাধ্যমেরও বড় শক্তি হতে পারে।

তাহলে প্রবাসী গণমাধ্যমের নিজস্ব জগৎ কি তার সীমাবদ্ধতা? বিষয়টি এত সরল নয়। বৃহত্তর সংবাদমাধ্যমে যথেষ্ট জায়গা না পাওয়া কোনো ভাষা, সংস্কৃতি বা জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে নিজস্ব পরিসর প্রয়োজন। সেই পরিসর মানুষকে দৃশ্যমান করে এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। নিজস্বতা তাই বিচ্ছিন্নতার সমার্থক নয়। প্রশ্নটি নিজস্ব পরিসর থাকবে কি না, তা নয়; বরং সেই পরিসর কতটা উন্মুক্ত, বহুস্বরিক এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত।

এই সংযোগ বাড়াতে প্রবাসী গণমাধ্যম স্বদেশ ও প্রবাসের সংবাদকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত করে তুলতে পারে। অভিবাসী শ্রম, শিক্ষা, পরিবার, নাগরিক অধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে প্রতিবেদন দুই ভূখণ্ডের পাঠককে একে অপরের জীবন বুঝতে সাহায্য করতে পারে। নতুন প্রজন্মকে শুধু পাঠক হিসেবে নয়, লেখক, সংবাদদাতা ও আলোচনার অংশীদার হিসেবেও যুক্ত করা প্রয়োজন। যাঁদের অভিজ্ঞতা সাধারণত কম দৃশ্যমান, তাঁদের বক্তব্যের জন্য জায়গা তৈরি করাও জরুরি। সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়; কিন্তু নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে তথ্যের নির্ভুলতা, মতের বৈচিত্র্য ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা থেকেই অর্থবহ পরিবর্তন শুরু হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রবাসী গণমাধ্যমের মূল্যায়ন শুধু এই দিয়ে করা যায় না যে, তা কত দ্রুত স্বদেশের খবর পৌঁছে দেয় কিংবা কত পাঠকের কাছে পৌঁছায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তা কত মানুষের অভিজ্ঞতাকে দৃশ্যমান করে এবং কতটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি করে। নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্মৃতির জন্য একটি পরিসর থাকা প্রয়োজন; কিন্তু সেই পরিসর যদি নতুন প্রশ্ন, ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর সমাজের জন্য উন্মুক্ত থাকে, তবে তা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ না হয়ে সেতু হয়ে উঠতে পারে। প্রবাসী গণমাধ্যমের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু নিজের পরিচয় ধরে রাখার নয়—নিজের পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই অন্যের বদলে যাওয়া জীবনকে কতটা বুঝতে পারার।

লেখক: জহিরুল ইসলাম ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট, কক্সবাজার, বাংলাদেশ।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন