https://www.prothomalony.com/
18436
opinion
নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে চিৎকার, অপমানজনক স্লোগান এবং নানা অভিযোগের যে দৃশ্য সামনে এসেছে, তা আমাকে নতুন করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। একজন মানুষকে ঘিরে এমন আচরণ শুধু ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সহনশীলতা, প্রতিবাদের ভাষা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও পরীক্ষা। মতপার্থক্য থাকবে, সমালোচনা হবে, প্রতিবাদও হবে—কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা কতটা শালীন এবং যুক্তিনির্ভর, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস কে, তার পরিচয় কী, আন্তর্জাতিক পরিসরে তার অবস্থান কোথায়, তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। ক্ষুদ্রঋণ, গ্রামীণ ব্যাংক এবং সামাজিক ব্যবসার ধারণার মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি অর্জন করেছেন। ২০০৬ সালে তিনি ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই স্বীকৃতি তার ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশের পরিচিতিকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমৃদ্ধ করেছে। তবে তার পরিচিতি যত বড়ই হোক, সেটি তাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখে না।
আমার বক্তব্যের মূল জায়গাটি এখানেই। কোনো ব্যক্তির কাজের সমালোচনা করা আর তাকে প্রকাশ্যে অপমান করা এক বিষয় নয়। কেউ যদি মনে করেন, ড. ইউনূস কোনো সিদ্ধান্তে ভুল করেছেন, তার নেতৃত্বে কোনো নীতিগত ব্যর্থতা ঘটেছে কিংবা তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার অসংগতি রয়েছে, তাহলে সেসব প্রশ্ন তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে উত্থাপন করা উচিত। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন স্লোগান এবং বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ দিয়ে কোনো অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করা যায় না; বরং এতে প্রতিবাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
বিমানবন্দরের ঘটনায় প্রকাশিত ভিডিও ও বিভিন্ন বক্তব্যে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলার কথা সামনে এসেছে। তাকে সন্ত্রাসী বলা, গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ করা কিংবা হত্যাকাণ্ডের দায় তার ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ যত গুরুতর, সেটি যাচাইয়ের দায়ও তত বেশি। স্লোগান আদালতের রায় নয়; জনসমক্ষে উচ্চারিত অভিযোগও প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিকল্প হতে পারে না।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের ঘটনাবলি আমাদের জাতীয় জীবনের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাধারণ মানুষের প্রাণহানি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যু এবং রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও ন্যায়বিচার অত্যন্ত জরুরি। শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে ৫ আগস্ট। ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৮ আগস্ট। এই সময়ক্রম বিবেচনা না করে প্রতিটি ঘটনার দায় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি তার দায়িত্বকালের সিদ্ধান্তগুলোর জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
আমি মনে করি, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে তথ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি কিংবা নির্বাচনী রূপরেখা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। নাগরিক হিসেবে এসব প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার রয়েছে। তার আন্তর্জাতিক খ্যাতি দেখিয়ে সব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করা যাবে না; আবার তার সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত অপমানকেও রাজনৈতিক অধিকার বলে চালানো উচিত নয়। একই মানদণ্ড সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া দরকার।
আমাদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, বিরোধী মত দমনের অভিযোগ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং দুর্নীতির প্রশ্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপে ফেলেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটির ক্ষেত্রেই তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে যায় না। প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবা, অপমানকে বিজয় মনে করা এবং যুক্তির বদলে গালাগালকে অস্ত্র বানানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকলে গণতন্ত্রের পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে জেএফকে বিমানবন্দরের ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—কাউকে ঘিরে চিৎকার করে কিংবা অপমানজনক স্লোগান দিয়ে কি তার দীর্ঘদিনের কাজ ও অর্জন মুছে ফেলা সম্ভব? আমার তা মনে হয় না। বরং এমন আচরণ প্রত্যক্ষ করে মানুষ প্রতিবাদকারীদের বক্তব্যের যথার্থতা এবং তাদের প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত, নথি, তথ্য ও প্রমাণ সামনে আনা উচিত। সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা সহজ, কিন্তু জনসমক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হলে যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলেও তার অর্থ এই নয় যে যেকোনো আচরণ সব পরিস্থিতিতে আইনসম্মত। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকারও বিবেচ্য। নির্দিষ্ট ঘটনায় কোনো আইন ভঙ্গ হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে প্রাসঙ্গিক তথ্য ও আইন অনুসারে। প্রমাণ ছাড়া একে বীরত্বপূর্ণ প্রতিবাদ কিংবা নিশ্চিত অপরাধ, কোনোটিই বলা সমীচীন নয়। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়ে যথাযথ তদন্তের দাবি তোলাই দায়িত্বশীল পথ।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ড. ইউনূসের সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক সম্মাননার খবরও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাকে মর্যাদাপূর্ণ হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তাঁর হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও গবেষকসহ প্রায় চার শ অতিথির উপস্থিতির কথা জানানো হয়েছে। এই সম্মাননা আন্তর্জাতিক পরিসরে তার কাজের স্বীকৃতির আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অনুষ্ঠানে হিলারি ক্লিনটন গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম এবং নারীর ক্ষমতায়নে এর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা, নিরাপত্তা এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ড. ইউনূসও তাঁর কাজের ৫০ বছরের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করেছেন। এসব অর্জন নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণের কার্যকারিতা, ঋণগ্রহীতাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা ও সমালোচনার সুযোগও থাকা উচিত। স্বীকৃতি ও সমালোচনা পরস্পরের বিরোধী নয়।
পুরস্কার গ্রহণের বক্তব্যে ড. ইউনূস সামাজিক ব্যবসার ধারণা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে এর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন বলে জানা গেছে। এই ধারণার মূল লক্ষ্য ব্যক্তিগত মুনাফার পরিবর্তে সামাজিক সমস্যা সমাধানকে গুরুত্ব দেওয়া। স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নির্ভর করবে বাস্তব ফলাফল, সেবার মান এবং মানুষের জীবনে সৃষ্ট পরিবর্তনের ওপর। একইভাবে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তার বক্তব্যও আলোচনার দাবি রাখে। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়; সৃজনশীল ও উদ্যোগী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে।
গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও তিনি ওই অনুষ্ঠানে তুলে ধরেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তার প্রত্যাশা, এই প্রতিষ্ঠান তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে এবং ব্যবসা শুরু করার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পথ তৈরি করবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এর পাঠ্যক্রম, অর্থায়নব্যবস্থা, শিক্ষার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সৃষ্ট বাস্তব সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কোনো উদ্যোগের মূল্য শুধু ঘোষণায় নির্ধারিত হয় না; তার সফলতা নির্ভর করে বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সক্ষমতার ওপর।
আমার কাছে এই পুরো ঘটনার শিক্ষা হলো, ব্যক্তির আন্তর্জাতিক পরিচিতি যেমন তাকে সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখে না, তেমনি তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ স্লোগানও কোনো অভিযোগকে সত্যে পরিণত করে না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি—কারও জন্য আলাদা নৈতিক মানদণ্ড থাকা উচিত নয়। যে-ই অন্যায় করুক, তার বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। যে-ই সিদ্ধান্ত নিক, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত না করে নীতির প্রশ্নে বিতর্ক করাই গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয়।
বাংলাদেশ আজ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপেক্ষায় আছে, যেখানে কাউকে অপমান করে নয়; কাজের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করা হবে। অতীতের অন্যায়ের বিচার হবে, কিন্তু প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়। ক্ষমতাবানদের জবাবদিহি থাকবে, আবার সমালোচকেরাও নিজেদের আচরণের দায় নেবেন। ড. ইউনূসকে ঘিরে বিমানবন্দরের ঘটনায় কার মর্যাদা কতটা ক্ষুণ্ন হয়েছে, তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তবে অপমানজনক স্লোগান দিয়ে কোনো ব্যক্তির ইতিহাস মুছে ফেলা যায়—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। শেষ পর্যন্ত মানুষের মূল্যায়ন নির্ভর করবে তার কাজ, সিদ্ধান্ত ও অবদানের ওপর। চিৎকার ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইতিহাসের বিচার দীর্ঘস্থায়ী।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন