https://www.prothomalony.com/
18427
opinion
আতাউর রহমান আতা। সিলেটের কিংবদন্তি ফটোসাংবাদিক। তিনি ছিলেন সবার আতা ভাই। সিলেটে সেই আশি-নব্বই দশকে যাঁরা সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি বা সমাজকর্মে জড়িত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যিনি তাঁকে চিনতেন না। আতাউর রহমান সিলেট ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছাড়াও সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি।
খুবই অমায়িক, মৃদুভাষী আতা ভাই সারাদিন কাঁধে ক্যামেরা আর ব্যাগ নিয়ে সেই সময়ের মফস্বল শহর চষে বেড়াতেন। কখনো আবার মঞ্জু ভাইয়ের মোটরবাইকের পেছনে। খায়রুল আমীন লস্কর মঞ্জু। একসময়ের দৈনিক খবর-এর সিলেট ব্যুরোপ্রধান, আরেক কিংবদন্তি সাংবাদিক ও রাজনীতিক। তিনি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জুতা নিক্ষেপ মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। একসময় আতা ভাই ছিলেন দৈনিক খবর-এর স্টাফ ফটোগ্রাফার। খায়রুল আমীন লস্কর মঞ্জু ভাইকে নিয়ে অন্য সময় লেখার ইচ্ছা আছে।
আতাউর রহমান আতা তাঁর সারাটি জীবন কাটিয়েছেন ফটোসাংবাদিকতার মতো এক মহান পেশায়। শত অভাব-অনটন তাঁকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কখনো অর্থবিত্তের পেছনে ছোটেননি তিনি। জিন্দাবাজারের ইদ্রিস মার্কেটের দোতলায় অথবা কিন ব্রিজের গোড়ায় ঐতিহাসিক সুরমা ম্যানশনের তিনতলার সুমি ফটো স্টুডিও ছিল তাঁর ঠিকানা। প্রিয় ফটোগ্রাফার দুলাল আহমদ ছিলেন তাঁর শিষ্য ও সহযোগী।
সেই সময়ে ফটোসাংবাদিক হিসেবে সিলেটে আতা ভাই ছিলেন আমাদের একমাত্র ভরসা। বাইরে বসিয়ে রেখে ডার্করুমে ঢুকে ছবি প্রিন্ট করে কিংবা নেগেটিভ ডেভেলপ করে তাৎক্ষণিকভাবে দিয়ে দিতেন।
পারিশ্রমিক নামমাত্র! সিলেটে যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পড়ত আতাউর রহমান আতার। তাঁকে নিয়ে গিয়ে কত জায়গায় ছবি তুলিয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। যখনই বলেছি, হাতের কাজ ফেলে বিনা বাক্যব্যয়ে মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে বসেছেন। কখনো টাকা-পয়সা দাবি করেননি। তিনি একজন সত্যিকারের নির্মোহ ও নির্ভীক মানুষ। ফটোগ্রাফি যাঁর নেশা ও পেশা।
অনেকের মতো নিজেও আতা ভাইকে সঙ্গে নিয়ে কত ঘটনা-দুর্ঘটনা ও অ্যাসাইনমেন্ট কভার করেছি।
তখন ১৯৮৭ সাল। স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতায়। আন্দোলনে-উত্তাপে, নানা দাবি-দাওয়ায় সিলেট উত্তাল! জৈন্তাপুরের হরিপুরে দেশের প্রথম তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। সরকার হঠাৎ বিদেশি কোম্পানি কানাডার সিমিটারকে তেলক্ষেত্রটি লিজ দিয়ে দিল। ক্ষোভে ফুঁসে উঠল সমগ্র সিলেট। ৫ এপ্রিল সর্বদলীয় উদ্যোগে সিলেটে হরতাল ডাকা হলো!
ভাবলাম, হরতালের খবরের সঙ্গে একটি ছবি দিতে পারলে সংবাদটি অধিক গুরুত্ব পাবে। কিন্তু সেই সময়ে ঢাকার কাগজে ছবি পাঠানো বা ছাপানো এত সহজ ছিল না। আগের দিন সকালে আতা ভাইকে নিয়ে মোটরসাইকেলে হরিপুর গেলাম। ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আতা ভাই সিলেটে ফিরেই ডার্করুমে ঢুকে গেলেন। ফিল্ম ডেভেলপ করে প্রিন্ট করে দিলেন। খাম হাতে নিয়ে ছুটলাম বিমানবন্দরে।
ডিপারচার লাউঞ্জে এক সজ্জন ভদ্রলোক খামটি ঢাকায় বয়ে নিতে রাজি হলেন। তাঁর ফোন নম্বর নিয়ে ফিরলাম। তাঁকে বললাম, আমার লোকজন খামটি তাঁর বাসা থেকে পিকআপ করবে। পরদিন আমার নামে প্রথম পাতায় ডাবল কলামে গুরুত্ব দিয়ে নিউজটি ছাপা হলো।
এখানে আমার চেয়ে আতা ভাইয়ের কৃতিত্ব বেশি। তিনি কোথায় যাচ্ছেন, সেই প্রশ্ন না করেই মোটরবাইকে চেপে বসেন। এই হচ্ছেন আতা ভাই। পেশাগত জীবনে সব সময় তাঁর উদার সহানুভূতি ও সহযোগিতা পেয়েছি। আজ প্রিয় আতা ভাইকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি।
গতকাল জানতে পারলাম, আতাউর রহমান আতা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে সিলেটের ইবনে সিনা ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছেন! দোয়া করি, প্রিয় আতা ভাই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন। আপনার ক্যামেরার ক্লিকে উঠে আসুক জীবন ও সমাজের অসংগতির চিত্র। আপনার জন্য শুভকামনা।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন