https://www.prothomalony.com/

18313

literature

সাহিত্য

নজরুল সাহিত্যে রোমান্টিক বিদ্রোহ

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:১৬

আমাদের আজ একটি প্রশ্ন নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে— কেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমগ্র সাহিত্যজীবনে ‘বিদ্রোহী’ শব্দটি এত ভারী... এত একমাত্রিক... এতটা প্রাধান্যশীল হয়ে উঠল?

কেন তাঁকে আমরা বারবার শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ বলেই চিনতে চাই?

তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রারম্ভে রচিত মাত্র কয়েকটি তেজোদীপ্ত, উদ্দীপনাময় বিদ্রোহী কবিতার আলোয় আমরা তাঁর বিশাল সাহিত্যভুবনের অন্যান্য দিককে সম্পূর্ণ আড়াল করে ফেলেছি।   যেখানে রয়েছে অসংখ্য প্রেমের কবিতা, অগণিত রোমান্টিক গান, সুরময় গজল, কবিতা, গদ্য ও নাটক। আমাদের জানা উচিত দ্রোহ রোমান্টিসিজমের একটি অংশ।
আমার বক্তব্য, কবি নজরুল আদ্যোপান্ত একজন রোমান্টিক কবি। রোমান্টিসিজমের সজ্ঞায়  নজরুলকে বুঝতে হলে তাঁর বিদ্রোহকে তাঁর রোমান্টিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবে না।
নজরুলের রোমান্টিক কবিতাগুলোকে যদি তাঁর সমগ্র কাব্যজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমরা অনুসরণ করি, তাহলে সেখানে যেন দেখতে পাই— একটি সমুদ্র-তরঙ্গ।
কখনো তার উত্থান...
কখনো তার পতন...
কখনো প্রেম ও আবেগের উত্তাল তরঙ্গ...
আবার কখনো বেদনা ও বিষণ্ণতার গভীর অতল। এই ওঠা-নামার মধ্যেই তো জীবনের স্পন্দন। আর সেই জীবনস্পন্দনই নজরুলের রোমান্টিকতার প্রাণ।
 অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের মধ্যভাগে যে রোমান্টিসিজম আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে সেখানের শ্রমিক ও শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়ে , তার ফলশ্রুতিতে সাহিত্য, আর্ট ও সঙ্গীতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। সেই সাথে ভঙ্গুর অর্থনীতির করাল গ্রাসে বিধ্বস্ত সমাজ আত্মসমর্পণ করে।
ঐ সময় ইংলিশ ও ফরাসি সাহিত্যেও বিপ্লবের জোয়ার উঠে। ইংরেজি সাহিত্যকে তখন ঢালাওভাবে সাজিয়েছিলেন  শ্রেষ্ঠ দুজন কবি  উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং পার্সি বিশি শেলি।
তাঁরা লিখেছিলেন সাধারণ মানুষের দুঃখ, সামাজিক বৈষম্য এবং নিপীড়নের কথা।
তাঁরা রাজতন্ত্রের অন্যায়, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সামাজিক অবিচার, নিপীড়ন এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদেরকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে ইংলিশ, ফরাসি কিংবা বিশ্বসাহিত্য  আখ্যায়িত করেনি এবং কখনও তাদেরকে বিদ্রোহী প্রেফিক্স দিয়ে ব্র্যাম্ডেড করা হয়নি।
 তাঁরা আজও ইংরেজি সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কবি হিসাবে পরিচিত এবং স্বীকৃত।
তাহলে নজরুলের ক্ষেত্রেই কেন তাঁর বিদ্রোহকে তাঁর রোমান্টিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু বিদ্রোহকে বড় করে দেখতে হবে?


নজরুলের বিদ্রোহ—মানবতার জন্য । তাঁর ‘বিদ্রোহী’, ‘গাহি সাম্যের গান’, ‘মানুষ’, ‘কুলি-মজুর’ এই কবিতাগুলোর মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেয়েছিল—মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সাম্যের জয়গান এবং  অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
ঠিক যেমন শেলির Prometheus Unbound- নামক গীতি নাট্যে বিদ্রোহ কেবল বিদ্রোহের জন্য নয়—তার গভীরে ছিল মানবতার মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।  গ্রিক পুরাণের প্রমিথিউস ছিলেন মানবতার প্রতীক।  অত্যাচারিত হয়েছেন, শৃঙ্খলিত হয়েছেন, অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছেন জুপিটারের হাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুপিটারের পতন ঘটেছে। প্রমিথিউস শৃঙ্খল মুক্ত হয়েছেন। অত্যাচারের অবসান ঘটেছে, মানবতার  জয় হয়েছে।  কবি শেলী তার এই গীতি নাট্যের প্রতিটি পংতিতে অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছেন, সাধারণ মানুষের  জয়গান গেয়েছেন। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ অভিজাত শ্রেনীর জন্য সৃষ্ট রঙীন কবিতা এবং কবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।   তিনি বলেছিলেন , কবিতা হবে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে। তার ভাষা হবে সাধারণ মানুষের কথিত ভাষা।
তাঁদের এই বিদ্রোহকে  বিশ্বের পাঠকবর্গ এবং ইংরেজি সাহিত্য আলাদাভাবে বিদ্রোহী বলে তাঁদেরকে আখ্যায়িত করেনি। তাঁরা ইংরেজি সাহিত্যে ও বিশ্বসাহিত্যে শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কবি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
নজরুলের কাব্যবিপ্লব শুধু বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ভাষাকেও দিয়েছিলেন এক নতুন প্রাণ।
আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষার সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার তিনি গ্রহণ করেছিলেন তাঁর কবিতা, গদ্য, নাটক এবং বিশেষত তাঁর সুমধুর গজল ও গীতিকবিতায়।  এই শব্দগুলো তাঁর কবিতায় শুধু নতুন শব্দ যোগ করেনি, তারা তাঁর কাব্যভাষাকে দিয়েছে নতুন সুর, নতুন ব্যঞ্জনা, নতুন সৌন্দর্য।
তাঁর সাহিত্য যেন এক বিশাল কাব্যলোক। যেখানে পাশাপাশি অবস্থান করছে—প্রকৃতির সৌন্দর্য,  আধ্যাত্মিকতা, মানবতা, ন্যায়, আত্মত্যাগ, আত্মমর্যাদা, দারিদ্র্য, সাম্য, নিপীড়ন এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। এই ছিল নজরুলের নিজস্ব কাব্যজগৎ। একটি সুসমন্বিত জগৎ—যেখানে প্রেম এবং বিদ্রোহ, সৌন্দর্য এবং বেদনা, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবতা—সবকিছু একসঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে।
দারিদ্র্যের কাছে কবির কৃতজ্ঞতা—“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান!” তুমি মোরে দিয়েছ খ্রীষ্টের সম্মান,”

কী অসাধারণ উচ্চারণ! যে দারিদ্র্য তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল— নজরুল সেই দারিদ্র্যের মধ্যেও খুঁজে পেয়েছেন মহত্ত্বের দীক্ষা।
নজরুলের রোমান্টিকতা একমুখী নয়। তার মধ্যে আছে কোমলতা, ক্রোধ, প্রেম, প্রতিবাদ, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং মানুষের দুঃখ ও যন্ত্রণা।
কবি নজরুলের হাতে বাঁশি যেমন প্রেমের সুর তোলে, তেমনি তাঁর তূর্যধ্বনি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের আহ্বান জানায়। একই কবির হাতে বাঁশি,  আছে তূর্য। এই দ্বৈততাই তাঁর কাব্যপ্রতিভার অন্যতম বিস্ময়। আনন্দের পাশে বেদনা
‘আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ কবিতায় কবি একদিকে দেখেছেন—
একটি নবজাত শিশুকে, আর অন্যদিকে—একজন জরাগ্রস্ত  মৃত বৃদ্ধকে। জীবনের এক প্রান্তে জন্মের আনন্দ...
অন্য প্রান্তে মৃত্যুর বেদনা।
“মোর ডাইনে শিশু সদ্যোজাত জরায়-মরা বাম পাশে”
আর এই দুই বিপরীত অনুভূতি একই সঙ্গে কবির হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এটাই নজরুলের রোমান্টিকতা—
জীবনকে তার সম্পূর্ণতা নিয়ে অনুভব করা। শুধু আনন্দ নয়। শুধু বেদনা নয়।
আনন্দের মধ্যে বেদনা,
বেদনার মধ্যে আনন্দ—
এই দ্বন্দ্বময় জীবনবোধই তাঁর কবিতাকে গভীর করেছে।
প্রকৃতির সঙ্গে কবির একাত্মতা।
‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতায় কবির হৃদয় যেন প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে যায়।
তিনি সুপারি গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে শুধু তাদের সৌন্দর্য দেখেননি—
তিনি অনুভব করেছেন তাদের কষ্ট।
উপর থেকে প্রখর সূর্যের তাপ...
নিচে মাটির সঙ্গে বাঁধা তাদের পা...
আর কবির মনে হয়েছে—
এই গাছগুলো যেন এক প্রেমিকার  সত্বা নিয়ে তারসাথে  নীরবে কথা বলে যাচ্ছে। তার আছে জীবন, প্রেম..
আছে অনুভূতি...
আছে বিচ্ছেদের বেদনা।
রাত্রি শেষ হবে।
ভোর আসবে।
আর সেই ভোরের সঙ্গে যেন আসবে তাদের বিচ্ছেদের মুহূর্ত।

প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র দৃশ্যকেও নজরুল তাঁর নিজের হৃদয়ের অনুভূতিতে রূপ দিয়েছেন।
এখানেই তাঁর রোমান্টিকতার সৌন্দর্য।
নজরুল—এক ঘূর্ণিবায়ু।
‘পূজারিণী’ কবিতায় কবি বলেছেন—
“জীবনের ফোটো-ফোটো রাঙা নিশি-ভোর,
বাধা বন্ধ-হারা
অহেতুক নেচে চলা ঘুর্ণিবায়ু-পারা,
দুরন্ত গানের বেগ, অফুরন্ত হাসি
নিয়ে এনু পথ-ভোলা আমি অতি দূর পরবাসী”।
কী অসাধারণ আত্মপ্রকাশ!
ঘূর্ণিবায়ুর মতো!
হ্যাঁ—
নজরুল ছিলেন যেন সেই ঘূর্ণিবায়ু—
যার প্রেমিক অসীম।
সসীম মানুষের হৃদয়...
আর অসীমের আকাঙ্ক্ষা...
এই দুইয়ের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান—
সেই ব্যবধান পেরিয়ে কবি যেন তাঁর নিঃস্বার্থ প্রেমিকের সন্ধানে এগিয়ে চলেছেন।
তিনি আকুল হয়ে প্রশ্ন করেছেন—
“তোমার নিঃস্বার্থ প্রদীপ এখনও জ্বলেনি
আমার আলোকহীন ঘরে!
হে অসীম!
তুমি কি আসবে না আমার সসীম প্রান্তে?”

তাহলে আমরা কী দেখতে পেলাম?
নজরুলের বিদ্রোহ কি রোমান্টিকতার বিপরীত?
না।
বরং বিদ্রোহ  রোমান্টিকতারই একটি শক্তিশালী প্রকাশ।
রোমান্টিকতার অন্তরে রয়েছে—
প্রেম।
বেদনা।
আনন্দ।
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
মানবতার প্রতি গভীর মমতা।
আর আছে—
প্রচলিত অন্যায় ও জীর্ণতার বিরুদ্ধে সাহসী প্রত্যাখ্যান।
তাঁর প্রকৃতি-প্রতীক, তাঁর চিত্রকল্প, তাঁর সুর, তাঁর প্রেম, তাঁর বেদনা, তাঁর আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা এবং তাঁর বিদ্রোহ—
সব মিলিয়ে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য কাব্যবিশ্ব।
আর সেই কাব্যবিশ্ব আমাদের একটি সত্যের সামনে দাঁড় করায়। তিনি—
প্রেমের কবি।
সৌন্দর্যের কবি।
মানবতার কবি।
বেদনার কবি।
ভক্তির কবি।
এবং সর্বোপরি—
তিনি হৃদয়ে ও আত্মায় একজন রোমান্টিক কবি।
তাঁর প্রেম,
তাঁর ভক্তি,
তাঁর আবেগ,
তাঁর আকাঙ্ক্ষা,
এবং তাঁর বিদ্রোহ—
সবকিছুই রোমান্টিক সাহিত্যের অন্তঃস্থলে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

কবি নজরুলের হৃদয়ের অতল গভীরে রয়েছে প্রেমের আলো।
তার কণ্ঠে শুধু তূর্যের ধ্বনি নয়—
তার অন্তরে বেজে চলে বাঁশির সুর।
আর সেই সুর ও সেই ধ্বনির মিলনেই—
নজরুল হয়ে ওঠেন এক অনন্য রোমান্টিক কবি।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন