https://www.prothomalony.com/

18217

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:১৪

শেষ উচ্চারিত শব্দে

আহসান জামান 

শেষ উচ্চারিত শব্দরা ক্রমশ অস্পষ্ট

হয়ে যায়, তলিয়ে যায় অন্ধকারে

গড়িয়ে পড়া সন্ধ্যার মতো একা।

 

শেষ উচ্চারিত শব্দে মিনতির স্বর

হারিয়ে যায় হাওয়ার বুদবুদে।

 

শেষ উচ্চারিত শব্দে লেখা থাকে

নিজস্ব নিঃসঙ্গতার গল্পগুলো

বেদনাগ্রস্ত আর্তনাদ। অসংখ্য

হাহাকার ভীষণ কষ্টে আলাদা

হয়ে যায় নিতান্ত একেলা।

 

 

 

স্নানরত রাতগুলো

ফজলুল হক সৈকত


ক'গোছা পাতা পড়ে আছে ফ্লোরে শাকের মতো

তোমার শাড়ির পাড়ের মতো- কী সবুজ!

 

তুমি কি শাড়ি পরেছিলে সেদিন

না-কি ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলে

দু-দুটো বিপুল বিস্ময়?

 

তোমার আঙুলের ব্যথা কেমন এখন

খেতে বসলে মোটা হচ্ছো বলে খোঁটা দেয় কেউ এখনো?

এখনো কি তুমি রাতের আঁধারে মুখ লুকিয়ে কান্না করো?

এখনো কি তুমি ভেসে বেড়াও কোনো কবির

কল্পনার নবীন নায়ে?

 

সামার পেরিয়ে আরেক সামার আসে

গরমের রাতে ঝড় নামে প্রবল

তোমার নামে বাদল নামে

জানালার ভারী পর্দাগুলো নেচে নেচে স্থির হয়

পোষা বেড়াল চুপিচুপি অভিসারে যায়

শীতল হয়ে গোপনে ফিরেও আসে

কেবল তোমার জন্য প্রতীক্ষা শেষ হয় না!

 

তুমি চিবুকে হাত রাখলে 

তোমার চোখের পাশ বেয়ে মাতাল চুল নিচের দিকে 

নেমে এলে ভেতর থেকে নিজেকে হারিয়ে ফেলি;

তোমার বাসন্তী ব্লাউজে মোড়া নরম বাহুতে

ডুবে থাকি আমি গোপনে!

 

চিকচিক পানিতে স্নান করি

একবার। আরেকবার। বারবার!

 

 

 

আমি এখন- কবিতার

শাখাওয়াত তানভীর 

 

গোলাপ নিয়ে খেলছ কী অপার!

কার গলায় পরাবে ফুলহার?

সে তোমার, তুমিও তার

গোলাপ তো আমার;

বলো, আমি কার?

নিঃসঙ্গতার?

 

অতঃপর একা পেয়ে গোলাপবনে

শব্দেরা নিয়ে গেল সঙ্গোপনে

আমি এখন—তমসার

কবিতার!

 

 

নানার দেয়া দড়িটা

দ্বীপ সরকার


মা'র বয়স বাড়ছে—এটা মানতে পারি না

মা যেন চিরকাল লকলকে কাঁচা থাকে।

 

আমি ভয় পাই, বৃক্ষটি এত দীর্ঘ হচ্ছে কেন

কী কাজ এত দীর্ঘকায়? 

পিলপিল পিলপিল করে এভাবে বড় হচ্ছ,

বয়স কি সে রকম বড় হচ্ছে?

আমি চাই তুমি দীর্ঘ হও—কিন্তু বয়স নয়।

 

মা, তুমি জানো? নানা একখান শক্ত দড়ি দিয়েছিল

দড়ি খেলার জন্য,

কিন্তু গোপনে তোমার বয়স বেঁধে রেখেছি সেই দড়িতে।

 

একদিন হঠাৎ অ্যাজমার টান বেড়ে গেলে

মাকে ডাক্তারের কাছে নিই।

ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, বয়স কত?

আমি মা'র দিকে দু-তিনবার তাকিয়ে বললাম,

'এই বড়জোর পঞ্চান্ন।' 

ডাক্তার মেজাজ বিগড়ালেন,

'এই বৃদ্ধ মহিলার বয়স খালি পঞ্চান্ন বছর হয়?

আপনি বয়স লুকোচ্ছেন কেন?' 

'না স্যার, আপনার মন যা চায় লেখেন।' 

 

সেদিন বুঝেছি, সত্যি আমার মা'র বয়স বেড়েছে—

নানার দেওয়া দড়িটায় বয়স আটকাতে পারিনি।

 

 

শূন্য কোলাহল 

মোস্তফা হক


শুকনো মর্মরিত পাতা সবুজ স্বপ্নে ঋদ্ধ হলে

কার কী আসে যায়? যখন আঁধার কেঁদে ওঠে,

মায়ের কোটর থেকে অংশের ব্যবচ্ছেদ হলে,

তবুও মাংসল পাখিদের ডানায় জাগে লোভ।

 

অবক্ষয়ে একদিন খসে যাবে মুখোশের রং,

তারপর? তারপর কে দাঁড়াবে উত্তাল আয়নায়?

পলাতক বোধ শ্বেতপত্র লেখে ভুল ঠিকানায়,

যেখানে আমরা ছিলাম, সেখানে শূন্য কোলাহল।

 

 

 

প্রিয় নবী মুহাম্মদ (স.)

মুহা. জিহাদুল ইসলাম 

 

যখন তমসাচ্ছন্ন ছিল পুরো বসুধা,

জ্যোতিরেণুর পদাঙ্কও ছিল না কোথাও।

অসভ্যতা-বর্বরতা-অমানবিকতার স্বর্গরাজ্য

হয়ে উঠেছিল প্রতিটি অঞ্চল।

মানব ছিল মানবের দাস; মানবী—দাসী।

মানবীর ছিল না কোনো মানবীয় মান,

হয়েছিল ভোগ্যপণ্য। তনয়া ছিল জনকের

পাওয়া এক অসহ্য অভিসম্পাত।

তখন আরবের বুক চিরে, জ্যোতির প্রদীপ নিয়ে

আমেনা মায়ের গৃহে এসেছিলেন এক মহামানব।

যাঁর আগমনে বসুধা সেজেছিল নতুন সাজে,

গেয়েছিল পুলকের গান, পেয়েছিল জ্যোতি,

কেটেছিল সকল অমানিশা-তমসা-আঁধার।

তিনি মানবতার কাণ্ডারী, জ্যোতির দিশারী,

স্রষ্টার মহান দূত, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)।

 

 

 

ক্ষুধা, ক্ষমতা ও অন্ধকার

জহিরুল হক বিদ্যুৎ

 

নেমে আসে বিপ্লবের রক্তমাখা ক্লান্ত দুপুর,

গ্যাসহীন চুলা আর বিদ্যুৎহীন তারগুলো

স্বপ্নভাঙা চোখে আঁকে হাভাতের করুণ চিত্র।

মানুষের দীর্ঘশ্বাস বিক্রি হয় বাজারদরে,

নৈরাজ্য যেন পথহারা নদী, কখনো বাঁধ ভাঙে;

কখনো মানুষের বুকে ঢুকে ভাঙন তোলে।

দুর্নীতি এক অদৃশ্য অক্টোপাস—

তার শুঁড় জড়িয়ে থাকে দপ্তর, ক্ষমতা, উন্নয়ন,

এমনকি ক্ষুধার্ত মানুষের শেষ ভাতের থালায়।

বাজার এখন এক নিষ্ঠুর জাদুঘর,

যেখানে চাল-ডাল-তেল কাচের ভেতর বন্দী।

আর সাধারণ মানুষের মজুরি

নিচে পড়ে থাকে ছেঁড়া স্যান্ডেলের মতো।

মবের উন্মত্ততা কিছু মানুষের চোখে-মুখে

সভ্যতার সব প্রদীপ নেভানোর কালো নেশা।

যেদিন সততার হাত ধরবে সাহস,

যেদিন মানুষের চেয়ে ক্ষমতা ছোট হবে,

সেদিনই দেশ শিখবে মানুষের মতো বাঁচতে।

 

 

 

কালো অধ্যায়

শ্যামল বণিক অঞ্জন 

 

রংগুলো ক্রমশই ফিকে হয়ে যাচ্ছে;

শতবর্ষী স্থাপনার মতো খসে পড়ছে সবকিছু,

সুনশান নীরবতার আঁধারে ডুবে যাচ্ছে চারপাশ,

অযাচিত আবর্জনায় ঢেকে গেছে মায়াময় উঠোন।

উৎকট পূতিগন্ধময় পরিবেশ—

নিরাপদ আবাস খুঁজে নিয়েছে বিষাক্ত কীটপতঙ্গ,

শিকারি প্রাণীর সক্রিয়তায় আতঙ্ক বাড়ছে ক্রমশ,

ধূর্ত শেয়ালের বৈঠকখানায় কাঁদছে বিচারের বাণী।

অতঃপর—

একটি কালো অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে—

চিৎকার করছে নতুন প্রজন্মের ইতিহাস।

 

 

 

বিবিধ মুরাকামিতা কিংবা এলিজাবেথ সংক্রান্ত প্রতিবেদন

কায়সার হেলাল

 

তোমরা মনুষ্য, আমরা বিড়াল, প্রভেদ কি? 

(বিড়াল/বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

 

এলিজাবেথ যেদিন পিটার ক্যাট বারটা খুঁজে পেল হেমন্তের এক অদ্ভুত বিকেলে, জাফরান রঙের সূর্য তখন ঢাকা শহরের পুরনো দোতলা বাড়িগুলোর ছাদে এমনভাবে রোদ ছিটিয়ে দিচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল কেউ যেন নরম ক্ষীরের বিছানা পেতেছে। আমি তখন সবেমাত্র চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। কী করব, কোথায় যাব জানি না। শুধু জানি এলিজাবেথ তিন মাস আগে চলে গেছে। নোটিশটা রেখে গিয়েছিল ফ্রিজের দরজায়, চুম্বক দিয়ে আটকানো। 'আমি নিজেকে খুঁজতে যাচ্ছি,' লিখেছিল সে। আর কিছু না।

 

সেদিন হাঁটছিলাম পুরান ঢাকার এক গলিতে, যেখানে আগে কখনো আসিনি। কীভাবে এ গলিতে পৌঁছালাম মনে নেই। পিটার ক্যাট লেখা সাইনবোর্ড পেরোতে গিয়ে মনে পড়ল এলিজাবেথ বোধহয় এই জ্যাজ বারটির কথা বলেছিল। ১৯৭৮ সাল থেকে খোলা। আমি থমকে দাঁড়ালাম। এলিজাবেথকে বিশ্বাস করিনি সেদিন। মুরাকামির আত্মজীবনী পড়েছিলাম সেই কবে। মনে পড়ে গেল, তিনিও তো একটা জ্যাজ বার চালাতেন এই নামে, টোকিওতে-প্রিয় বিড়ালের নামে। এলিই বইটি দিয়েছিল। আর তারও অনেক পরে সেই স্বতন্ত্র গোধূলির বর্ণনা করতে করতে দাবি করেছিল সে পিটার ক্যাট বারটি আবিষ্কার করেছে। 

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। অন্ধকার, তবে আরামদায়ক আলোর মতো অনুভূতি। কোণায় একটা পুরনো রেকর্ড প্লেয়ারে ৯০ দশকের শিল্পী আদনান বাবুর গান বাজছে। 'চেয়ে থাকো কী বা নাই থাকো তুমি আধো খোলা জানালায়...'।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন