https://www.prothomalony.com/

18317

opinion

অভিমত

রক্তাক্ত ককপিটে ক্যাপ্টেন স্মিতের লড়াই

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৪২

৩০ অক্টোবর বুধবারের আকাশে দুবাই থেকে তেল আবিবের পথে উড়ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট এফজেড ১০৭৩। সবকিছুই স্বাভাবিক থাকার কথা ছিল। ককপিটে ছিলেন ক্যাপ্টেন ও সহকারী পাইলট। দুজনের ওপরই ছিল বিমানের ১০০-এর বেশি যাত্রীর জীবন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।

কিন্তু হঠাৎ সেই ককপিটই হয়ে উঠল মৃত্যুর মঞ্চ। সহকারী পাইলটই ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর হামলা চালান। উদ্দেশ্য ছিল বিমানটি যাত্রীসহ ভূপাতিত করা। রক্তাক্ত অবস্থায় ককপিটের মেঝেতে পড়ে গিয়েও ক্যাপ্টেন মাচ্ছার হাল ছাড়েননি। বরং শেষ শক্তিটুকু দিয়ে তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা হয়তো বিমানের শতাধিক মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে।

শুক্রবার হাসপাতালের বিছানা থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে গিয়ে প্রথমবার ঘটনার কথা বলেন মাচ্ছার। তাঁর বর্ণনায়, গুরুতর আঘাতে তিনি মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন। শরীর তখন আর সাড়া দিতে চাইছিল না। কিন্তু হঠাৎ বুঝতে পারেন, বিমানটি নিচের দিকে নামছে। তখন নিজেকেই বলেছিলেন—আরেকবার শক্তি দাও, স্মিত। দরজা তো কাছেই।

আক্রমণকারী তখনও তাঁকে মারছিল। তারপরও কোনোভাবে ককপিটের দরজা খুলে দেন তিনি। কয়েকজন সাহসী যাত্রী সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটকানোর চেষ্টা করেন। অন্য পাইলটরা আবার বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেন। একজন মানুষের নিজের জীবন বাঁচানোর স্বাভাবিক প্রবৃত্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তখন অন্যদের জীবন।

মাচ্ছারের কথায়, তিনি জানতেন—তাঁকে মরতে দেওয়া যায়, কিন্তু বাকিদের মরতে দেওয়া যায় না। বিমানটি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর গুরুতর আহত ক্যাপ্টেনকে আবুধাবির হাসপাতালে নেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মাচ্ছার। কণ্ঠ ভেঙে আসে, কেঁদে ফেলেন তিনি। মোদি তাঁর সাহস, ধৈর্য ও দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। পরে দুজন গুজরাটি ভাষায়ও কথা বলেন। দুই সন্তানের বাবা মাচ্ছার জানান, তাঁর মেয়ে হাসপাতালে এসে বাবার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেছে। দুই বছরের ছোট ছেলের সঙ্গে তখনও তাঁর দেখা হয়নি।

আরও একটি বিষয় এই গল্পটিকে অন্য মাত্রা দেয়। পাইলট হওয়া মাচ্ছারের শৈশবের স্বপ্ন ছিল না। ২০২৫ সালের একটি পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, স্কুলের পর তিনি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। টেক্সটাইল ব্যবসায়ী পরিবারে বেড়ে ওঠা সেই মানুষটিই আজ আকাশের একটি ককপিটে নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হলেন।

তাঁর স্ত্রী সোনাল মাচ্ছার সিএনএন-নিউজ১৮কে বলেছেন, পরিবার এখনও তাঁকে ঘটনার বিস্তারিত কিছু জিজ্ঞেস করছে না। তাঁরা চান না, সেই ভয়াবহ স্মৃতি আবার তাঁকে কষ্ট দিক। ক্যাপ্টেনের শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল—ফ্লাইটের এক যাত্রী, দন্তচিকিৎসক শোতা মুসায়েভের বর্ণনায় ঘটনাটির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এই সাহসিকতা ৯/১১-এর মতো একটি বিপর্যয় ঠেকিয়েছে।

কিন্তু এই গল্পের আরেকটি অন্ধকার দিক আছে। সহকারী পাইলটটির নাম কর্তৃপক্ষ এখনও প্রকাশ করেনি। নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, সে ওমানের নাগরিক। সিএনএনের একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সে সংযুক্ত আরব আমিরাতে জন্মেছে। বাবা ওমানি, মা সিরীয়। জীবনের একটি বড় সময় কেটেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতেই। এখন সে সৌদি আরব থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত তদন্তের মুখে রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে তার আগের চাকরি ও প্রশিক্ষণ নিয়ে। সিএনএনের একাধিক সূত্র বলছে, গত বছর ওমানের জাতীয় বিমান সংস্থা ওমান এয়ারে প্রশিক্ষণ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল চরমপন্থী চিন্তাভাবনা নিয়ে উদ্বেগের কারণে। এবিসি নিউজের সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালে প্রশিক্ষণার্থী কো-পাইলট থাকাকালে তার কাছে চরমপন্থী সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল। এরপর তাকে এক বছরের জন্য উড়ান থেকে বিরত রাখা হয় এবং প্রশাসনিক কাজে রাখা হয়েছিল।

যদি এই তথ্যগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিমান সংস্থা যার মধ্যে ঝুঁকির সংকেত দেখেছিল, সেই তথ্য কীভাবে অন্য একটি বিমান সংস্থার কাছে পৌঁছাল না? আর যদি পৌঁছে থাকে, তাহলে তা কীভাবে উপেক্ষিত হলো?

ইসরায়েলি এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্লাইদুবাইয়ে ওই ব্যক্তি কাজ করছিলেন মাত্র আট মাস। অন্য একটি সূত্র বলছে, এর আগে তিনি রয়্যাল এয়ার মারোকেও কাজ করেছেন। আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। ওমান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না। তাহলে একজন ওমানি নাগরিক কীভাবে তেল আবিবগামী একটি ফ্লাইটের ক্রুতে এলেন—এ বিষয়টিও ইসরায়েলি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে।

নেতানিয়াহুর দাবি, হামলাকারী ইসলামপন্থী উগ্রবাদে দীক্ষিত হয়েছিল এবং বিমানটি যাত্রীসহ ভূপাতিত করাই ছিল তার লক্ষ্য। কেউ তাকে এ কাজে পাঠিয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন, যাত্রীরা তাকে আটক করার পর সে নাকি চিৎকার করে বলছিল, “আমাকে মেরে ফেলো।”

ইরানের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। নেতানিয়াহু বলেছেন, এখনই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, সন্দেহভাজনের ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে পারে, যদিও তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেননি।  তদন্ত এখনও চলছে। অনেক প্রশ্নের উত্তরও এখনো পাওয়া যায়নি। তাই কোনো দাবি বা সন্দেহকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সময় আসেনি।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। রক্তাক্ত ককপিটের মেঝেতে পড়ে থাকা একজন মানুষ তখন নিজের জীবনের হিসাব করেননি। তিনি হাত বাড়িয়েছিলেন একটি দরজার দিকে। সেই দরজা দিয়ে কয়েকজন যাত্রী ঢুকেছিলেন। তারপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে এসেছিল বিমানের।
একজন পাইলট, যিনি একসময় পাইলট হওয়াকেই জীবনের স্বপ্ন মনে করেননি, সেই রাতে নিজের পেশার সবচেয়ে কঠিন অর্থটি যেন নতুন করে লিখে দিলেন।

একদিকে একজন মানুষ, যিনি অভিযোগ অনুযায়ী শতাধিক মানুষের জীবন নিয়ে মৃত্যুর পথে যেতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে আরেকজন মানুষ, যিনি নিজের শরীর থেকে রক্ত ঝরতে ঝরতেও জানতেন—তিনি একা মরতে পারেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে এতগুলো মানুষকে মরতে দেওয়া যায় না।

একটি মানুষের উগ্রতার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়তো এখন নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে—এক জায়গায় দেখা দেওয়া বিপদের সংকেত অন্য জায়গায় পৌঁছায় কি না, পৌঁছালে তা কে দেখে, আর কে সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ আকাশে ভুলের দ্বিতীয় সুযোগ খুব কমই থাকে।
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন