https://www.prothomalony.com/
18316
bangladesh
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৩:৩২
বাংলাদেশের বিমানবন্দর নিয়ে আবারও আলোচনা। এবার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একজন রাজনীতিবিদের আচরণও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, মন্তব্য আর প্রতিক্রিয়ায় সরগরম নেট দুনিয়া।একদিকে বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ। অন্যদিকে একজন রাজনীতিবিদ সরকারি একজন কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার। দুটি ঘটনার ভেতর দিয়ে একই প্রশ্ন যেন বারবার ফিরে আসে—নিয়ন্ত্রণ কোথায়?
বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা রাষ্ট্রের। আর রাজনীতিতে থাকা একজন মানুষের নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখার দায় তাঁর নিজের।
কিন্তু বাংলাদেশে আজকাল মনে হয়, নিয়ন্ত্রণহীনতাও যেন আমাদের স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
বিমানবন্দর নিয়ে আমি গত চার দশক ধরে লিখে আসছি। সময় বদলেছে, সরকার বদলেছে, বিমানবন্দরের নাম ও অবকাঠামো বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে। কিন্তু অভিযোগের অনেকগুলো যেন বদলায়নি। যাত্রী হয়রানি। অব্যবস্থাপনা। দীর্ঘ অপেক্ষা।
সেবার ঘাটতি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ। অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন।
আর প্রতিবারই আসে নতুন প্রতিশ্রুতি—ব্যবস্থা নেওয়া হবে, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে, যাত্রীসেবা উন্নত করা হবে।
কিছুদিন তৎপরতা দেখা যায়। তারপর সব শান্ত। আমরাও শান্ত। শেষ পর্যন্ত আমরাই গা সওয়া করে ফেলি।
এটাই হয়তো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। অনেক কিছু আমাদের কাছে এতবার ঘটেছে যে, নতুন করে ঘটলেও আর নতুন লাগে না। অনিয়ম দেখে অবাক হই না। ক্ষমতার দাপট দেখে অবাক হই না। সরকারি দপ্তরে ভোগান্তি দেখে অবাক হই না। প্রভাবশালী কেউ নিয়মের বাইরে যেতে চাইলে সেটিও খুব একটা বিস্মিত করে না। আমরা প্রতিবাদ করি। লিখি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করি। তারপর পরবর্তী ঘটনায় চলে যাই। এভাবেই একসময় অস্বাভাবিক জিনিস স্বাভাবিক হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক ঘটনায় একজন রাজনীতিবিদকে সরকারি কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর তাঁর জামিন বা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া আদালতের বিষয়। অভিযোগের সত্যতা, অপরাধের ধরন এবং আইনি পরিণতি নির্ধারণ করবে আইন ও আদালত। কিন্তু ঘটনাটি যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে, সেগুলো শুধু আদালতের জন্য নয়।
রাজনীতি ও প্রশাসনের সম্পর্ক কী হবে? একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি কি সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে মতবিরোধে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি অনুসরণ করবেন, নাকি ব্যক্তিগত প্রভাব ও উত্তেজনার আশ্রয় নেবেন? একজন সরকারি কর্মকর্তা কি রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই অভিযোগের তদন্ত ও প্রতিকারের জন্য কি যথেষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আছে?
এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে মূল সমস্যাটি থেকেই যাবে। এখানেই বিমানবন্দরের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের অভিযোগ আছে। তাহলে অভিযোগকারীর রাজনৈতিক পরিচয় কী, সেটি বড় কথা নয়। অভিযোগ সত্য কি না, সেটিই প্রশ্ন। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ সত্য না হলে সেটিও পরিষ্কার করতে হবে।
কিন্তু কোনো অভিযোগকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে বা উপেক্ষা করা হবে—এমন ব্যবস্থা কোনো প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে না।
একইভাবে কোনো রাজনীতিবিদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠলে তাঁর পরিচয় দিয়ে বিষয়টি মাপার সুযোগ নেই। তিনি সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, বর্তমান রাজনীতিবিদ, সাবেক নেতা কিংবা অন্য কিছু—আইনের দৃষ্টিতে এসব পরিচয় আলাদা কোনো নিয়ম তৈরি করার কথা নয়।
সামরিক জীবনের প্রশিক্ষণ নিয়ে নানা কথা বলা যেতে পারে। শৃঙ্খলা, আত্মসংযম, কমান্ড—এসবও আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের বর্তমান আচরণ বিচার হবে বর্তমান ঘটনার তথ্য ও আইনের ভিত্তিতে। এটাই স্বাভাবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে—ব্যক্তি বড় হয়ে যায়, প্রতিষ্ঠান ছোট হয়ে যায়। কেউ ক্ষমতাবান হলে তাঁর সঙ্গে কথা বলার ধরন বদলে যায়। কেউ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলে তাঁর অভিযোগ দ্রুত গুরুত্ব পায়। কেউ প্রভাবশালী হলে নিয়মের প্রয়োগ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। এই সংস্কৃতি শুধু রাজনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। প্রশাসনকেও দুর্বল করে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি মনে করেন, তাঁর সিদ্ধান্তের চেয়ে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বেশি শক্তিশালী, তাহলে তিনি কীভাবে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করবেন? আবার একজন নাগরিক যদি মনে করেন, অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার হবে না, তাহলে তিনি কেন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখবেন?
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু পুলিশ, আইন বা গ্রেপ্তারের মধ্যে নয়। রাষ্ট্রের শক্তি হলো—মানুষ যেন বিশ্বাস করে, নিয়ম আছে এবং সেই নিয়ম কার্যকর হবে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইন তার নিজস্ব পথে চলবে। কিন্তু আমি বরং অন্য একটি প্রশ্ন করতে চাই।
বিমানবন্দরের যে সমস্যাগুলো নিয়ে এতদিন ধরে অভিযোগ উঠছে, সেগুলোর কী হবে? সেগুলো কি তদন্ত হবে?
কর্তৃপক্ষ কি নিজেদের ব্যবস্থাপনার দিকে তাকাবে? কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা হবে?
যাত্রীদের হয়রানি বা অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তার জবাবদিহি হবে? নাকি একজনকে গ্রেপ্তার করার পর আমরা ধরে নেব—সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে?
সমস্যা কিন্তু সেখানে শেষ হয় না। একজন মানুষকে আইনের আওতায় আনা একটি ঘটনা। একটি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি সংবাদ হয়। দ্বিতীয়টি সংস্কার। বাংলাদেশে আমাদের দরকার দ্বিতীয়টি।
বিমানবন্দর শুধু বিমানে ওঠানামার জায়গা নয়। এটি একটি দেশের দরজা। বিদেশ থেকে কেউ বাংলাদেশে এসে প্রথম যে রাষ্ট্রকে দেখেন, তার একটি বড় অংশ এই বিমানবন্দর। একজন বাংলাদেশি বিদেশে যাওয়ার আগে রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর শেষ অভিজ্ঞতাও অনেক সময় এই বিমানবন্দরেই। সেখানে যদি বিশৃঙ্খলা থাকে, তার প্রভাব শুধু একজন যাত্রীর ওপর পড়ে না। দেশের ভাবমূর্তির ওপরও পড়ে।
একইভাবে রাজনীতিবিদদের আচরণও শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জনপরিসরে একটি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের আচরণ সমাজে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও ভিন্নমতের সঙ্গে আচরণের একটি বার্তা তৈরি করে। তাই প্রশ্নটা শুধু—কে গ্রেপ্তার হলেন?
প্রশ্নটা হওয়া উচিত—কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো? কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা থাকলে সেটি কি ঠিক করা হলো?
কোনো ব্যক্তির আচরণ নিয়ে অভিযোগ থাকলে আইন কি যথাযথভাবে প্রয়োগ হলো? সবচেয়ে বড় কথা—পরেরবার যেন একই ঘটনা আবার না ঘটে, তার জন্য কী করা হলো?
চার দশক ধরে লিখতে লিখতে একটি বিষয় বুঝেছি। বাংলাদেশে সমস্যা খুব কমই কমে যায়। আমরা বরং সমস্যার সঙ্গে বসবাস করতে শিখে যাই। একসময় যেটিকে অন্যায় মনে হয়, পরে সেটি বিরক্তিকর মনে হয়। তারপর সেটিও আর বিরক্ত করে না। শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে যায়—গা সওয়া। একটি রাষ্ট্রের জন্য গা সওয়া হয়ে যাওয়া সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা। মানুষ যখন অন্যায়কে অন্যায় বলার শক্তি হারায়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোও জবাবদিহির প্রয়োজন অনুভব করে না।
আমরা কি সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ চাই? যেখানে বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, কিন্তু কিছুদিন পর সবাই ভুলে যাবে? যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে বা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেউ উত্তেজিত হলে সেটিকে রাজনৈতিক নাটক বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হবে?
যেখানে গ্রেপ্তারই হবে শেষ কথা, কিন্তু সমস্যার মূল কারণ নিয়ে কেউ প্রশ্ন করবে না?
নাকি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে আইন ব্যক্তিকে দেখবে, প্রতিষ্ঠানকে দেখবে, এবং ক্ষমতাকেও দেখবে একই চোখে?
মানুষকে গ্রেপ্তার করা যায়। একজনকে মামলা দেওয়া যায়। একজনকে জামিনেও ছাড়া যায়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির মধ্যে আনা অনেক কঠিন।
সেই কঠিন কাজটিই করতে হবে। প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত একজন রাজনীতিবিদকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা শুধু একটি বিমানবন্দর নিয়েও নয়।
প্রশ্নটা হলো—আমরা কোন ধরনের রাষ্ট্রে বাস করতে চাই? নিয়ন্ত্রণহীনতার সঙ্গে আপস করা একটি রাষ্ট্রে?
নাকি নিয়ম, শৃঙ্খলা, নাগরিক মর্যাদা এবং জবাবদিহির রাষ্ট্রে?
চার দশক ধরে একই প্রশ্ন লিখতে লিখতে এখন মনে হয়—আর কত লিখব? এবার উত্তর দেওয়ার পালা প্রতিষ্ঠানগুলোর।
আর আমাদেরও। আমরা কি সবকিছুতেই গা সওয়া করে যাব? নাকি কোথাও দাঁড়িয়ে বলব—এবার যথেষ্ট?
#
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন