https://www.prothomalony.com/

18009

bangladesh

বাংলাদেশ

আমার দেশটা যদি এমন হতো

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ ০৩:২১

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে, দুই-তৃতীয়াংশ সংসদীয় আসন পেয়ে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন করেছে। এই সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। মানুষের প্রত্যাশা কতটুকু তারা পূরণ করতে পারল?

আমার প্রত্যাশা খুব বেশি ছিল না! আমি এমন একটি দেশ চাই। সেটা কেমন দেশ? আমার স্বপ্নের দেশটা হবে নিচে লেখা আমার বর্ণনার মতো। এই প্রত্যাশা খুব বেশি না। পাঠক, আপনারা যারা লেখাটি পড়বেন, তারাও বলবেন; এমন একটা দেশ হলে আমরা স্বর্গে বসবাস করব। আর সরকারের ইচ্ছে থাকলে সাধারণ মানুষকে এমন দেশ উপহার দেওয়া কোনো ব্যাপারই না। প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছার। আর নেতৃত্বে যারা থাকবেন তাদের লোভ-লালসা ত্যাগ করার। আর কথা বাড়াচ্ছি না। আমার কথাগুলো অন্তত পড়ে দেখুন পাঠকবৃন্দ।

দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দোষ নেই। বরং স্বপ্নহীন জাতি কখনো সামনে এগোতে পারে না। আমি প্রায়ই ভাবি, যদি একদিন ঘুম ভেঙে দেখি আমাদের দেশটা বদলে গেছে! চারদিকে একই মানুষ, একই প্রতিষ্ঠান, একই রাস্তা। কিন্তু বদলে গেছে মন। বদলে গেছে আচরণ। বদলে গেছে দায়িত্ববোধ। আমি এমন একটি দেশের কথা ভাবি, যেখানে রাজনীতি হবে মানুষের জন্য। ক্ষমতার জন্য নয়। প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য নয়। মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য।

আমি কল্পনা করি, আমাদের জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সংসদ সদস্য একসাথে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা কেউ দুর্নীতি করবেন না। ঘুষ নেবেন না। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না। নিজের আত্মীয়স্বজনকে অযৌক্তিক সুবিধা দেবেন না। জনগণের ভোটকে সম্মান করবেন। জনগণের বিশ্বাসকে মূল্য দেবেন। তখন সংসদের চিত্রই বদলে যাবে। সেখানে ব্যক্তিগত লাভের আলোচনা হবে না। হবে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। শিক্ষা নিয়ে আলোচনা। স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা। কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী; সবাইকে নিয়ে আলোচনা।

আমি আরও ভাবি, আমাদের মন্ত্রীরা নিজেদের দায়িত্বকে ইবাদতের মতো পালন করছেন। তারা অফিসে যান সময়মতো। ফাইল পড়েন মনোযোগ দিয়ে। সিদ্ধান্ত নেন দেশের স্বার্থে। কোনো প্রভাবের কাছে মাথা নত করেন না। কোনো অনৈতিক অনুরোধ গ্রহণ করেন না। একজন ভালো মন্ত্রীর প্রভাব শুধু একটি মন্ত্রণালয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার সততা ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্রশাসনে।

আমি দেখি, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব, সহকারী সচিব; সবাই একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝে গেছেন। সরকারি চাকরি মানে জনগণের সেবা। ক্ষমতার প্রদর্শন নয়। কেউ ঘুষ চাইছেন না। কেউ ফাইল আটকে রাখছেন না। কেউ মানুষকে অকারণে ঘোরাচ্ছেন না। একটি আবেদন সময়মতো নিষ্পত্তি হচ্ছে। একজন সাধারণ মানুষ অফিস থেকে হাসিমুখে বের হচ্ছেন। ভাবতে ভালো লাগে।

অধিদপ্তরগুলোও তখন বদলে গেছে। সেখানে নিয়মই সবচেয়ে বড় পরিচয়। কোনো অনিয়ম নেই। কোনো কমিশন নেই। কোনো গোপন লেনদেন নেই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বুঝে গেছেন, জনগণের টাকায় তাদের বেতন হয়। তাই জনগণের প্রতি দায়িত্বই তাদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য। একজন কৃষক অফিসে গিয়ে সম্মান পাচ্ছেন। একজন বৃদ্ধা তার প্রাপ্য ভাতা পাচ্ছেন। একজন শিক্ষার্থী তার কাগজপত্রের জন্য দিনের পর দিন ঘুরছেন না। এটাই তো হওয়ার কথা।

আমি আরও কল্পনা করি, ট্যাক্স ও ভ্যাট আদায়ে শতভাগ স্বচ্ছতা এসেছে। কেউ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন না। আবার কোনো কর্মকর্তা নিজের পকেটও ভরছেন না। রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হচ্ছে। এই অর্থ দিয়ে আরও হাসপাতাল হচ্ছে। আরও স্কুল হচ্ছে। আরও বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। আরও গবেষণাগার তৈরি হচ্ছে। রাষ্ট্র শক্তিশালী হচ্ছে মানুষের অর্থেই। কিন্তু সেই অর্থ আবার মানুষের কাছেই ফিরে যাচ্ছে উন্নয়নের মাধ্যমে।

রাস্তা নির্মাণের সময় আর কেউ নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছেন না। সেতু নির্মাণে কোনো কারচুপি নেই। কালভার্ট নির্মাণের আগেই ভেঙে পড়ছে না। প্রকৌশলীরা বিবেকের সঙ্গে আপস করছেন না। যে সিমেন্ট লাগার কথা, সেটাই লাগছে। যে রড ব্যবহার হওয়ার কথা, সেটাই ব্যবহার হচ্ছে। যে মানের কাজ হওয়ার কথা, সেই মানই বজায় থাকছে। ফলে একটি রাস্তা বারবার মেরামত করতে হচ্ছে না। একটি সেতু উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে না। সরকারি অর্থও বাঁচছে। মানুষের ভোগান্তিও কমছে। সব উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে। কাজের গতি আছে। জবাবদিহি আছে। পরিকল্পনা আছে। অপচয় নেই। দেশের উন্নয়ন তখন কাগজে নয়, বাস্তবেও চোখে পড়ে।

আমি আরও ভাবি, দেশের শিল্পপতিরা বিদেশে অর্থ পাচারের পথ খুঁজছেন না। তারা দেশের ভেতরেই নতুন কারখানা গড়ছেন। নতুন বিনিয়োগ করছেন। নতুন প্রযুক্তি আনছেন। একটি কারখানা মানে শুধু একটি ভবন নয়। সেখানে শত শত মানুষের চাকরি হয়। হাজারো পরিবারের মুখে হাসি ফোটে। বেকার তরুণদের আর বছরের পর বছর চাকরির পেছনে ছুটতে হয় না। যোগ্যতার মূল্যায়ন হয়। দক্ষতার সম্মান হয়। যুবসমাজ তখন হতাশ হয় না। তারা স্বপ্ন দেখে। তারা কাজ করে। তারা দেশ গড়ে।

ব্যাংকগুলোও তখন নিরাপদ। কেউ ঋণ নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন না। কেউ ভুয়া কাগজ তৈরি করছেন না। জনগণের আমানত নিরাপদ আছে। মানুষ নিশ্চিন্তে সঞ্চয় করছে। ব্যবসায়ীরা সঠিক নিয়মে ঋণ পাচ্ছেন। অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। ব্যবসায়ও সততা ফিরে এসেছে। কেউ ওজনে কম দিচ্ছেন না। কেউ ভেজাল মেশাচ্ছেন না। কেউ প্রতারণা করে ধনী হতে চাইছেন না। একজন বিক্রেতা জানেন, বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় মূলধন। একজন ক্রেতাও নিশ্চিন্তে বাজার করছেন। মানুষ মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করছে না। বরং সহযোগিতা করছে। সমাজে বিশ্বাস বাড়ছে। সন্দেহ কমছে।

আমি এমন একটি দেশের কথা ভাবি, যেখানে আইন সবার জন্য সমান। ধনী-গরিবের আলাদা বিচার নেই। ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা নিয়ম নেই। একজন অপরাধী শুধু অপরাধী হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছেন। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। পুলিশ তখন মানুষের বন্ধু। মানুষ পুলিশকে ভয় পায় না। সম্মান করে। পুলিশও কোনো নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করছে না। মিথ্যা মামলা দিচ্ছে না। অন্যায় নির্দেশ মানছে না। অপরাধীকে ধরছে। নিরীহ মানুষকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। তখন থানায় যাওয়া মানেই আতঙ্ক নয়। বরং ন্যায়বিচারের আশা। বিচার বিভাগও স্বাধীন। বিচার বিক্রি হয় না। রায় কেনাবেচা হয় না। ন্যায়বিচারই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

সশস্ত্র বাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে। তারা দেশের নিরাপত্তায় সর্বদা প্রস্তুত। তাদের কাজ দেশের সম্মান রক্ষা করা। তারা সেই কাজই করছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।

শিক্ষকরাও তখন শুধু পাঠ্যবই পড়াচ্ছেন না। তারা মানুষ গড়ছেন। শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার জন্য পড়ছে না। তারা নৈতিকতা শিখছে। সততা শিখছে। দেশপ্রেম শিখছে। একটি ভালো শিক্ষা শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি জাতিকেও বদলে দেয়।

চিকিৎসকরাও মানবিক। রোগীকে ব্যবসা হিসেবে দেখছেন না। একজন অসহায় মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেন সম্মানের সঙ্গে। হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্য নেই। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সাংবাদিকরা সত্য লিখছেন। সত্য বলার জন্য ভয় পাচ্ছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও দায়িত্বশীল। মিথ্যা খবর ছড়ানো হচ্ছে না। মানুষ যাচাই করে কথা বলছে। পরিবেশও তখন নিরাপদ। নদী দখল হচ্ছে না। বন উজাড় হচ্ছে না। খাল ভরাট হচ্ছে না। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি সুন্দর দেশ রেখে যাচ্ছি।

তখন মানুষের অভাবও কমে আসে। যখন কাজের সুযোগ বাড়ে, তখন অপরাধ কমে। যখন ন্যায়বিচার থাকে, তখন প্রতিশোধের আগুন কমে। যখন মানুষ সম্মান পায়, তখন সহিংসতা কমে। যখন দুর্নীতি কমে, তখন বৈষম্যও কমে। একটি ভালো কাজ আরেকটি ভালো কাজকে জন্ম দেয়। একটি সততা আরেকটি সততাকে অনুপ্রাণিত করে। একজন ভালো মানুষ আরও দশজনকে ভালো হতে উৎসাহিত করেন।

এভাবেই একটি দেশ বদলাতে শুরু করে। আমরা প্রায়ই বলি, দেশ বদলাবে না। আমি সেই কথায় বিশ্বাস করতে চাই না। দেশ তো নিজে নিজে বদলায় না। মানুষ বদলালে দেশ বদলায়। নেতা বদলালে পরিবর্তন আসে। প্রশাসন বদলালে গতি আসে। নাগরিক বদলালে সমাজ বদলে যায়। আমরা প্রত্যেকে যদি নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করি, তাহলে পরিবর্তনের শুরু আজই হতে পারে।

হয়তো সবকিছু একদিনে সম্ভব নয়। কিন্তু শুরু তো করা যায়। একজন দিয়ে শুরু হতে পারে। একটি পরিবার দিয়ে শুরু হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠান দিয়েও শুরু হতে পারে। আজ যে শিশু সততা শিখছে, আগামীকাল সেই দেশ চালাবে। আজ যে কর্মকর্তা ঘুষ নিলেন না, তিনি অনেককে অনুপ্রাণিত করবেন। আজ যে ব্যবসায়ী প্রতারণা করলেন না, তিনি একটি সুন্দর সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে দেবেন। একদিন হয়তো সত্যিই আমরা এমন একটি দেশের নাগরিক হব, যেখানে মানুষ মানুষকে সম্মান করবে। যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে মর্যাদা দেবে। যেখানে উন্নয়নের খবর শুধু বক্তৃতায় নয়, মানুষের জীবনেও দেখা যাবে।

কিন্তু এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, সেগুলো কোনো বাস্তব ঘটনার বর্ণনা নয়। এগুলো কোনো সরকারি প্রতিবেদনও নয়। এগুলো কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও নয়। এগুলো শুধু আমার মনের ভেতর লালন করা একটি স্বপ্ন। একটি অসম্ভব সুন্দর কল্পনা। হয়তো কেউ বলবেন, এমন দেশ পৃথিবীতে নেই। হয়তো সত্যিই নেই। তবু মানুষ তো স্বপ্ন দেখেই বেঁচে থাকে। আমি সেই স্বপ্নই দেখেছি।

আমি এমন একটি বাংলাদেশের কল্পনা করেছি, যেখানে সততা হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়, ন্যায়বিচার হবে সবচেয়ে বড় শক্তি, আর মানুষ হবে মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। জানি, এগুলো হয়তো আজও বাস্তব নয়। তবুও আমি স্বপ্ন দেখা ছাড়তে চাই না। কারণ, এই পুরো লেখাটি আসলে বাস্তবতার গল্প নয়। এটি আমার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো বাংলাদেশ। এটি শুধুই আমার কল্পনার দেশ। আর সেই কল্পনার দেশেই আমি একদিন সত্যিকারের বাংলাদেশকে দেখতে চাই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন