https://www.prothomalony.com/

17988

bangladesh

বাংলাদেশ

তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাস: অর্জন আছে, চ্যালেঞ্জও কম নয়

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ ০৮:৪৬

প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ছয় মাস পর সরকারের অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাজনৈতিক মহল, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রথম ছয় মাসের অধিকাংশ লক্ষ্যমাত্রাই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব অঙ্গীকার করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে। তাঁর ভাষায়, “গত ছয় মাসে সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, আমি মনে করি তার অধিকাংশই পূর্ণ হয়েছে।”

সরকারের কিছু উদ্যোগ অবশ্য ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সংসদ সদস্যদের করমুক্ত গাড়ির সুবিধা না নেওয়া, রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিকে সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষকদের ঋণের একটি অংশ মওকুফের উদ্যোগও প্রশংসা পেয়েছে।

তবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে গণপিটুনি, রাজনৈতিক সহিংসতা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মব সহিংসতায় ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি এবং কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “গত ছয় মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত জায়গায় এখনো পৌঁছায়নি।” তাঁর মতে, খুন, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ কমাতে সরকারের আরও কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগের। মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবেদনে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সংঘাত ও নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধির তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন এবং অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরানো বড় পরীক্ষা
ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই দায়িত্ব নেয় বিএনপি সরকার। উচ্চ সরকারি ঋণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিল।

অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ছয় মাস অর্থনীতির বড় পরিবর্তনের জন্য সীমিত সময় হলেও সরকারের নেওয়া কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক। তিনি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এবং সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন।

তবে তাঁর মতে, “মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের চাপটা কিন্তু রয়েই গেছে।” বাজার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমানো কঠিন বলেও মনে করেন তিনি।

সরকারের জন্য আরেকটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বন্ধ কারখানা চালু করতে সরকারের উদ্যোগ থাকলেও এর ফলাফল কতটা দৃশ্যমান হবে, তা নিয়ে অপেক্ষা রয়েছে।

জ্বালানি সংকটে বিপাকে সরকার
গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিল নিয়েও বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের অভিযোগ উঠেছে। স্বাভাবিক ব্যবহারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল আসার অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিদ্যুৎ খাতের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “ছয় মাসে অন্তত এই খাতটিকে স্থিতিশীল অবস্থায় রাখা যেতো। সেই জায়গায় এখনো আন্তরিক প্রচেষ্টা কোথায়?”

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধের প্রভাব এবং টার্মিনাল-সংক্রান্ত কারিগরি সমস্যা রয়েছে। রুহুল কবির রিজভীর ভাষ্য, “এটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে, টার্মিনাল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে।” সংকট দ্রুত নিরসনে কাজ চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, “গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন ও অর্থনীতি অচল।”

কূটনীতিতে কিছু ইতিবাচক অর্জন
অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের কিছু অর্জনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের অন্যতম কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, “জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জয়লাভকে বর্তমান সরকারের বড় কূটনৈতিক সফলতা হিসেবে ধরতে পারি আমরা।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরও কূটনৈতিক তৎপরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

হুমায়ুন কবিরের মতে, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোর, তিস্তা প্রকল্পে সম্ভাব্য সহযোগিতা এবং দুই দেশের সম্পর্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগগুলো সরকারের ইতিবাচক অর্জন।

তবে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও সফরের পরিবেশ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সংস্কার ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন
গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সরকারের প্রথম ছয় মাসে সেই জায়গায় দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা হয়েছে—এটি এখন বড় প্রশ্ন।

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির অবস্থান বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি করেছে। স্বাধীন বিচার বিভাগ, পুলিশ সংস্কার, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার মতো বিষয়েও সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, “বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি পরিবর্তন বা সংস্কারে গুরুত্ব দেবে। কিন্তু নির্বাচনের পর গত ছয় মাসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন মানুষ দেখতে পায়নি।”

নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাবের আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তাঁর বিশ্লেষণে, প্রশাসনিক ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্বের সামঞ্জস্য না থাকলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সামনে বড় পরীক্ষা
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে একেবারে ব্যর্থ কিংবা পুরোপুরি সফল—কোনোটিই বলা যাচ্ছে না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কিছু ব্যাংকিং সংস্কার, রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় সরকারের কিছু ইতিবাচক অর্জন রয়েছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের চাপ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ধীরগতি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

ছয় মাসের মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—সরকার ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবে কতটা মানুষের জীবনে স্বস্তি আনতে পেরেছে। আগামী সময়ে জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর সংস্কার করতে পারলে সরকারের প্রতি জনআস্থা আরও বাড়তে পারে। বিপরীতে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে প্রথম ছয় মাসের অর্জনও চাপা পড়ে যেতে পারে ব্যর্থতার আলোচনায়।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন