https://www.prothomalony.com/

17980

bangladesh

বাংলাদেশ

ওসমান:  রক্তের দাগে লেখা একটি ডকুমেন্ট

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ ০৫:৪২

"ওসমান: সার্বভৌমত্বের প্রহরী, প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি"-বইটি লিখেছেন কবি, প্রাবন্ধিক, ঔপন‍্যাসিক, শিক্ষক এইচ বি রিতা। প্রকাশ করেছ ঘাসফুল জুলাই ২০২৬। প্রচ্ছদে সাফওয়ান সিয়াম। 

বইটি আমার হাতে পৌঁছেনি এখনো। লেখকের কাছ থেকে পিডিএফ সংগ্রহ করে পাঠ করেছি। পাঠ করার পর মনে হল এ নিয়ে কিছু লেখা দরকার। 

২৫৬ পৃষ্ঠার এই বইটিকে সাধারণ জীবনী বা উপন্যাস বললে ভুল হবে; এটি একটি ডকুমেন্টারি দলিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঘটে যাওয়া শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড এবং তার পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক ভূমিকম্পকে দিন-তারিখ-ঘণ্টা ধরে লিপিবদ্ধ করার এক সাহসী প্রচেষ্টা দেখিয়েছেন এইচ বি রিতা।

ওসমান হাদি-যাকে হত‍্যা করা হয়েছে ফ‍্যাসিবাদ ও আধিপত‍্যবাদবিরোধী সোচ্চার কণ্ঠের জন‍্য- বইটি তাকে নিয়েই লেখা। বইটির মূল কাঠামো কালানুক্রমিক। লেখক ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে(যেদিন তার উপর হামলা হল) শুরু করে ১৮ ডিসেম্বর(তার মৃত‍্যু) এবং সর্বশেষ ৮ জুলাই, ২০২৬- পর্যন্ত প্রতিটি দিনকে আলাদা অধ্যায় করেছেন।

বইটিতে আছে, হাদির ওপর বর্বরোচিত হামলা, ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিক্রিয়া, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক মহলের শোকবার্তা।  আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ সব দলের প্রতিক্রিয়া, শাহবাগ অবরোধ, ভারতীয় হাইকমিশন বন্ধের আল্টিমেটাম।

তাৎক্ষণিক সহিংসতা ও ভাঙচুর অধ্যায়ে লেখক খুব সৎ ভাবে দেখিয়েছেন কিভাবে হাদি হত্যার পর প্রতিবাদ শুধু শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার অফিসে হামলা, আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাঙচুর, বীর বাহাদুরের বাড়িতে আগুন, হরিগঞ্জ ও কুড়িগ্রামে ব্লকেড - এই অপ্রিয় সত্যগুলো তিনি এড়িয়ে যাননি।

চলমান উত্তাল পরিস্থিতিতে ইনকিলাব মঞ্চের শাহবাগে রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা, ৩০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার দাবি, সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরদের অনশন - সবকিছু পত্রিকার রেফারেন্স সহ তুলে ধরা হয়েছে।

এই বইটি পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবার কিছু কারণ রয়েছে। 

১. প্রাথমিক ইতিহাসের উৎস: এটি কোনো বিশ্লেষকের মনগড়া মতামত নয়। প্রতিটি দাবির পেছনে লেখক পত্রিকার নাম, তারিখ, বিবৃতির সরাসরি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ভবিষ্যতে ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় নিয়ে যারা গবেষণা করবেন, তাদের জন্য এটি একটি ফার্স্টহ্যান্ড আর্কাইভ।

২. রাজনৈতিক ও নৈতিক দর্শনের দার্শনিক পাঠ: ওসমান হাদিকে কেবল সমকালীন আন্দোলনকর্মী হিসেবে নয়, বইটিতে তাকে উপস্থাপন করা হয়েছে এক ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রতিরোধের অংশ হিসেবে—যেখানে প্রতিশোধ নয়, কেন্দ্রবিন্দু ছিল ন্যায্যতা ও বিচার। চিফ জোসেফ, রোজা পার্কস কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো আপসহীন নৈতিক অবস্থানের সাথে তুলনা করে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে হাদি ক্ষমতার বিপরীতে সত্যকে বেছে নিয়েছিলেন। একই সাথে থমাস হবসের মানবস্বভাব-তত্ত্বের তুলনামূলক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে হাদির বাস্তববাদী দর্শন: যিনি জানতেন সমাজ বদলাতে স্রেফ আবেগ যথেষ্ট নয়, দরকার নৈতিক দায় ও কর্তৃত্বকে জনগণের ন্যায়ের অধীন করার এক সুস্পষ্ট রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।

৩. সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব ও আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণ: হাদির আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান কেবল রাজনৈতিক বিরোধে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল মূলত একমুখী সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ ও বৌদ্ধিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদার লড়াই। বইটিতে লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে ওসমান হাদি  ভাষা, গণমাধ্যম ও রুচির ওপর বহিরাগত 'সফট পাওয়ার'-এর প্রভুত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলার নিজস্ব লোকজ ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মাটি-সংলগ্ন বহুমাত্রিক পরিচয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। কিভাবে তিনি ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদাপূর্ণ প্রতিবেশীর সম্পর্কের দাবি তুলে প্রতিষ্ঠিত কৃত্রিম সাংস্কৃতিক মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। লেখক স্পষ্ট করেছেন—হাদির কাছে আধিপত্যবাদের বিরোধিতা মানে অন্ধ বিদ্বেষ নয়, বরং আত্মপরিচয় বিসর্জন না দিয়ে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদাবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

৪.ভারত প্রশ্নের ডকুমেন্টেশন: বইটির সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশ হলো ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী বয়ান এবং হাদি হত্যার পেছনে 'ভারতীয় পরিকল্পনা' - এই জন-অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ। হাইকমিশন বন্ধ, ভিসা বন্ধ, নাহিদ, হাসনাত ও সারজিস এর বক্তব‍্য, হাদি হত‍্যার বিচারে স্লোগানগুলোর উত্থান কিভাবে হলো, তার একটি জীবন্ত চিত্র পাওয়া যায় বইটিতে। 

৫.পারিবারিক শোক ও নাগরিক সংহতির দলিল: ওসমান হাদির পরিবারে তার ভাই-বোনের শোক ও চলমান প্রতিবাদ, হাদির স্ত্রীর মনোজগতের আনুমানিক শোক ও লড়াই, একই সাথে হাদিকে নিয়ে বিভিন্ন শিল্পী, কবি, কলামিস্টদের আর্তনাদ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এতে। 

৬.ডিজিটাল আর্কাইভ ও রাজনৈতিক দর্শনের বয়ান: দুর্দান্ত যে কাজটি এইচ বি রিতা করেছেন, তা হল হাদির রাজনৈতিক দর্শন ও আধিপতবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক দর্শনকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে তিনি হাদির টাইমলাইনের স্ক্রিনশট সহ তার বিস্তারিত ব‍্যাখ‍্যা করেছেন।

৭.বিচারহীনতার জট ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন: হাদি হত্যার বিচারে তদন্ত প্রতিবেদনের তারিখ বারবার কেন পেছানো হচ্ছে, আইনি জটিলতা কোথায় আটকে আছে এবং বাংলাদেশ-ভারত বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না—তার পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ বইটিতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

৮.ভাষার রাজনীতি ও প্রতিবাদের নান্দনিকতা: হাদির ব্যবহৃত 'গালি' নিয়ে বিতর্ক ও বিরোধিতা থাকলেও, কখন একজন নিরস্ত্র ও নিপীড়িত মজলুমের মুখের তীব্র ভাষাই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের ধারালো অস্ত্র—তার এক ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিয়েছেন লেখক। এই তাৎপর্য ফুটিয়ে তুলতে তিনি টেনে এনেছেন বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন গণবিপ্লব ও সাহিত্যের সমৃদ্ধ রেফারেন্স; যেমন: ফরাসি বিপ্লবের 'ল্য পের দ্যুশেন', চতুর্থ সুলতানকে লেখা জাপোরোজিয়ান কসাক যোদ্ধাদের ঐতিহাসিক চিঠির ভাষা, রুশ বিপ্লব ও আরব বসন্ত। পাশাপাশি বিশ্ব ও বাংলা সাহিত্যের গতিপথ থেকে তুলে ধরেছেন শেক্সপিয়র ও এলিজাবেথান যুগের তীক্ষ্ণ ভাষা, চার্লস বুকোস্কির 'ডার্টি রিয়ালিজম', অ্যালেন গিন্সবার্গের 'বিট মুভমেন্ট', উইলিয়াম কেরির 'কথোপকথন', দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' এবং শামসুর রাহমান ও রফিক আজাদের ক্ষোভমিশ্রিত পঙক্তিমালা। ফলে আক্রমণাত্মক ভাষা কীভাবে ঐতিহাসিক প্রতিরোধে রূপান্তরিত হয়, তার এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মোহ পাঠ হাজির করে এই বই।

৯.নির্মোহ ভাবে 'দুই পক্ষ' দেখানো: লেখক ওসমান হাদিকে স্পষ্টতই 'জুলাইয়ের প্রতীক' হিসেবে সম্মান করেন, কিন্তু তার মৃত‍্যুর পর আন্দোলনের নামে হওয়া সহিংসতা, ভাঙচুরকেও তিনি 'প্রতিহিংসামূলক প্রতিক্রিয়া' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন - "একটি ন্যায্য বিচারের দাবির আন্দোলন যখন ভাঙচুর বা জনভোগান্তির দিকে মোড় নেয়, তখন তা মূল দাবির নৈতিক শক্তিকেও আঘাত করে।" এই আত্মসমালোচনা বইটিকে দলীয় প্রচারপত্র হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে।

সব মিলিয়ে, 'ওসমান: সার্বভৌমত্বের প্রহরী, প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি' - বইটি নিছক একটি শোকগাথা বা প্রথাগত পর্যালোচনা নয়; এটি উত্তাল সময়ের এক প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল। লেখক এইচ বি রিতা আবেগ আর বস্তুনিষ্ঠতার সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে একটি জটিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সন্ধিক্ষণকে নিখুঁতভাবে ফ্রেমবন্দি করেছেন। 

একদিকে রক্তের দাগে লেখা একটি রক্তাক্ত ট্র্যাজেডির আখ্যান, অন্যদিকে আধিপত্যবাদবিরোধী এক প্রজন্মের আত্মমর্যাদার জাগরণ—উভয়কেই তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে একই মলাটে তুলে ধরেছেন।

ইতিহাস অনেক সময় ক্ষমতাবানদের ভাষ্যে লেখা হয়, কিন্তু এই গ্রন্থটি রচিত হয়েছে রাজপথের স্পন্দন, নথিপত্র এবং জনগণের অনুভূতির মেলবন্ধনে। এটি পড়ার পর আপনার মনে হবে, ওসমান হাদি শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ কোন পথে যাবে - সেই প্রশ্নের এক রক্তাক্ত উত্তর।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন