https://www.prothomalony.com/

18000

bangladesh

বাংলাদেশ

হত্যার কারণ খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০২:২১

বাংলাদেশে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিনের সংবাদে অস্বাভাবিক মৃত্যু, হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক সহিংসতা, ছিনতাই কিংবা পূর্বশত্রুতার ঘটনায় প্রাণহানির খবর আসছে। এর সবটিকে একই কারণে ব্যাখ্যা করা যাবে না, আবার প্রতিটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলেও দায় এড়ানো যায় না। পুলিশের পরিসংখ্যানেও হত্যার মামলা বৃদ্ধির একটি প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে সারা দেশে ৩,৭৮৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়, যা আগের বছরের ৩,৪৩২টির চেয়ে বেশি। তবে পুলিশ কর্মকর্তারাও সতর্ক করে বলেছেন, এসব মামলার একটি অংশ আগের বছরের ঘটনাকে ঘিরে পরে দায়ের হয়েছে; ফলে শুধু মামলা সংখ্যাকে দিয়ে অপরাধের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।

তবু পরিসংখ্যানের বিতর্কের বাইরে একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই—মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যখন কোনো পরিবারে একসঙ্গে একাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়, তখন সেই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না।সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তাবোধকেও আঘাত করে।

সাম্প্রতিক সিলেট ও রংপুরের ঘটনা তারই ভয়াবহ উদাহরণ।

সিলেটে ব্যবসায়ী দম্পতি ও তাঁদের গৃহকর্মীর হত্যাকাণ্ডে তদন্তের শুরু থেকেই একাধিক সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। সম্পত্তি বিরোধ, ডাকাতি বা পূর্বপরিকল্পিত অপরাধ—কোনটি প্রকৃত কারণ, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়ার কথা।

আর রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনা তো আরও মর্মান্তিক। প্রথম দিকে ঘটনাস্থলের আলামত দেখে পুলিশ ডাকাতির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল, ঘরের বিভিন্ন স্থান তছনছ করা হয়েছিল এবং মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার স্থান ভাঙা হয়েছিল।

কিন্তু একই ঘটনার তদন্তে পরে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে এবং দুজনকে আটক করা হয়েছে।

এই দুই ধরনের ব্যাখ্যার পার্থক্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ দ্রুত অনুমান করে ফেলা উচিত নয়।

তদন্তের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এখানেই। ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত, ফরেনসিক প্রমাণ, মোবাইল ফোনের তথ্য, আর্থিক লেনদেন, পারিবারিক সম্পর্ক, পূর্ববিরোধ, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য—সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করতে হবে। একজন সন্দেহভাজনকে আটক করা তদন্তের শেষ নয় বরং সেখান থেকেই প্রকৃত তদন্ত শুরু।

মানুষ এখন শুধু জানতে চায় না—কে খুন করেছে? মানুষ জানতে চায়—কেন খুন করেছে?

এই ‘কেন’-এর উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হত্যার কারণ জানা গেলে ভবিষ্যৎ অপরাধ প্রতিরোধের পথও কিছুটা স্পষ্ট হয়। যদি কারণ হয় মাদক, তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় অপরাধচক্রের দিকে নজর দিতে হবে। যদি সম্পত্তি বা পারিবারিক বিরোধ হয়, তাহলে সেই বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে সহিংসতায় রূপ নিল, তা দেখতে হবে। যদি ডাকাতি হয়, তাহলে অপরাধী চক্র, অস্ত্র, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং স্থানীয় অপরাধপ্রবণতা খতিয়ে দেখতে হবে।

শুধু আসামি গ্রেপ্তার করে সংবাদ সম্মেলন করা এবং এরপর কয়েক দিন পর ঘটনাটি জনস্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়।

জনগণের আস্থার প্রশ্নটি এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আইনের শাসন শুধু আইনের বইয়ে থাকা কোনো ধারণা নয়। একজন সাধারণ মানুষ যখন থানায় যান, তিনি বিশ্বাস করতে চান তাঁর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হবে। যখন তদন্ত শুরু হয়, তিনি বিশ্বাস করতে চান তদন্তকারী কোনো পূর্বধারণা নিয়ে এগোচ্ছেন না। যখন মামলা আদালতে যায়, তিনি বিশ্বাস করতে চান প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হবে। আর যখন রায় হবে, তখন তাঁর মনে যেন প্রশ্ন না থাকে—প্রভাবশালী কেউ তদন্তকে প্রভাবিত করেছে কি না, কোনো নিরপরাধ মানুষকে আসামি করা হয়েছে কি না, অথবা প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থেকে গেছে কি না।
এই আস্থা একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন।

বাংলাদেশে অপরাধের পরিসংখ্যান নিয়ে যেমন সতর্ক বিশ্লেষণ প্রয়োজন, তেমনি মানুষের নিরাপত্তাবোধের সংকেতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পুলিশের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের মাসভিত্তিক অপরাধ পরিসংখ্যান প্রকাশিত হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের কাছেই অপরাধের একটি ধারাবাহিক তথ্যভান্ডার রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই তথ্য শুধু প্রকাশ নয়—বিশ্লেষণ করা। কোথায় হত্যাকাণ্ড বাড়ছে, কী ধরনের হত্যাকাণ্ড বাড়ছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি জড়িত, কী কারণে অপরাধ ঘটছে, তদন্ত ও বিচার কোথায় আটকে যাচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে আসা দরকার।

আমাদের সমাজে সহিংসতার একটি বিপজ্জনক স্বাভাবিকীকরণও দেখা যাচ্ছে। কারও সঙ্গে বিরোধ হলো, মারামারি হলো; জমি নিয়ে বিরোধ হলো, খুন হলো; মাদকের প্রতিবাদ করল, প্রাণ গেল; টাকা-পয়সার বিরোধ হলো, প্রতিশোধ নেওয়া হলো। যেন মানুষের জীবনের মূল্য ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

এই জায়গায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় নেতৃত্ব—সবারই দায়িত্ব আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের। নাগরিকের জীবন রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। সেই দায়িত্ব পালনে পুলিশের সক্ষমতা, তদন্তের মান, প্রসিকিউশনের দক্ষতা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা—সবকিছুকে একসঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে।

আমরা দ্রুত বিচার চাই—কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই সঠিক বিচার। কারণ ভুল মানুষকে শাস্তি দেওয়া যেমন বিচার নয়, তেমনি প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল রেখে মামলা শেষ করাও বিচার নয়। তদন্তের গতি দরকার, কিন্তু তার সঙ্গে দরকার নির্ভুলতা। আসামি গ্রেপ্তারের সাফল্য দরকার, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করে অপরাধ প্রমাণ করা।

সিলেটের দম্পতি হত্যা হোক কিংবা রংপুরের পুরো পরিবার হত্যার ঘটনা—প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। অনুমান নয়, প্রমাণ কথা বলুক। গুজব নয়, তদন্তের ফল সামনে আসুক। রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক কোনো প্রভাব যেন তদন্তের ওপর ছায়া ফেলতে না পারে।

জনগণ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের হিসাব চায় না শুধু; জনগণ চায় রাষ্ট্র তার পাশে আছে—এই বিশ্বাস।

একটি নিরাপদ সমাজে মানুষ জানবে, অন্যায় করলে শাস্তি হবে। আর একটি ভীত সমাজে মানুষ মনে করবে, অপরাধী শক্তিশালী হলে পার পেয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, তার একটি বড় পরীক্ষা হচ্ছে এই মুহূর্তে।

তাই এখন সবচেয়ে জরুরি শুধু হত্যাকারী ধরার ঘোষণা নয়—হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি। কারণ একজন মানুষের জীবন ফিরে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটন করে রাষ্ট্র অন্তত অন্য মানুষের জীবন রক্ষার পথ তৈরি করতে পারে। সেই সত্য ও ন্যায়বিচারের ওপর জনগণের আস্থাই শেষ পর্যন্ত একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাবর্ম।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন