https://www.prothomalony.com/

17983

bangladesh

বাংলাদেশ

গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, শিল্প-বিদ্যুৎ-জনজীবনে বাড়ছে ভোগান্তি

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ ০১:৩২

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও বাসাবাড়িতে। কোথাও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে, কোথাও কম গ্যাসের চাপে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও শিল্পখাতে সংকট এখনো কাটেনি। 

বর্তমান সংকটের বড় কারণ হিসেবে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাকে সামনে আনা হচ্ছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর আগে একটি টার্মিনালের সমস্যায় দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। 

তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও দীর্ঘদিন ধরে সেই পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। একটি এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি ও সিএনজি স্টেশন—সব ক্ষেত্রেই পড়েছে।

তিনি বলেন, গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ কিংবা সীমিতভাবে চলছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয় গ্রিডের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ব্যয়বহুল ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রেখেছে। তবুও কিছু এলাকায় লোডশেডিং এড়ানো যাচ্ছে না। 

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দৃশ্যমান। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বাসাবাড়ির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। 

শিল্পখাতেই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা যাচ্ছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানার উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। নরসিংদীতেই ৩০০টির বেশি ছোট-বড় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। 

গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পরও শিল্পকারখানাগুলো স্বস্তিতে ফিরতে পারেনি। সীমিত সরবরাহের বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেওয়া হচ্ছে বলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় চাপ পাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। 

সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। এতে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহন মালিকদের অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে কম চাপের কারণে অনেক এলাকায় রান্নার কাজেও সমস্যা হচ্ছে। 

জ্বালানি সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চলমান জ্বালানি সংকট সমাধানে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটও দ্রুত কয়েক মাসের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। 

সরকার অবশ্য বলছে, বর্তমান সংকট শুধু তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলা নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদনে যেতে সময় প্রয়োজন। 

তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও এর সঙ্গে যুক্ত। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন রুটে কোনো সংকট তৈরি হলে সরবরাহ ও দামের ওপর তার প্রভাব পড়ে, যার বাইরে বাংলাদেশও থাকতে পারে না। 

সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, এলএনজি টার্মিনালগুলোর কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়বে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটও কমে আসবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় শুধু আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর না করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন