https://www.prothomalony.com/
18008
north-america
সোনালী স্বপ্নকে মুঠোবন্দি করতে প্রায় তিন বছর পূর্বে একদিন পাড়ি জমিয়েছিলেন আটলান্টিকের পাড়ের স্বপ্নের নিউইয়র্কে। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে রেখে এসেছিলেন, কথা ছিল কাগজপত্র হলে ফিরবেন। একদিন স্ত্রী-সন্তানদেরও নিয়ে আসবেন তার কাছে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি মো. ইউসুফ রাজুর (৪৪)।

শনিবার দিবাগত রাতে পৌনে ১২টার দিকে নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্কের ৮৪২ রকওয়ে অ্যাভিনিউস্থ কর্মস্থল পিজা-ফ্রায়েড চিকেনের আমেরিকান বেস্টউইং রেস্টুরেন্টে দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারান রাজু। এ সময় আহত হন তার অপর সহকর্মী মো. রাসেল।
নিহত রাজুর গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর গ্রামে। আহত রাসেলের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিপুলাশারের বড়কাছি গ্রামে। তিনি ব্রুকডেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিহত রাজুর মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণ করা হবে। সেখানে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হবে। ক্ষেত্রে বৃহত্তর নোয়াখালী সোসাইটি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলে জানা গেছে।

রেস্টুরেন্টের মালিক, সহকর্মী, রুমমেট ও পরিচিতজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, শনিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে রেস্টুরেন্টে কাজ করছিলেন মো. ইউসুফ রাজু ও মো. রাসেল। এ সময় রেস্টুরেন্টে অতর্কিতে গুলিবর্ষণ করে অজ্ঞাতনামা এক দুর্বৃত্ত। প্রথমে রাসেল পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। পরে রাজুকে গুলি করে চলে যায় সেই সন্ত্রাসী।
খবর পেয়ে এনওয়াইপিডির সেভেন্টি থার্ড প্রিসিংকট পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুইজনকে উদ্ধার করে নিকটবর্তী ব্রুকডেল হসপিটালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন। বর্তমানে রাসেল সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এদিকে রেস্টুরেন্টে গুলিবর্ষণ এবং রাজুর নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই সেখানে ছুটে যান বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনেরা। রোববার সকাল থেকেও পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও শোকার্ত মানুষের ভিড় ছিল রেস্টুরেন্ট ঘিরে। বর্তমানে রেস্টুরেন্টটি বন্ধ রয়েছে।
সহকর্মীরা আরও জানান, রাজু ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। আইন অনুযায়ী তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং কাজ করার জন্য তার সকল বৈধ কাগজপত্র ছিল। তিনি ১২ বছর এবং আড়াই বছর বয়সী দুই কন্যাসন্তানের জনক। বাংলাদেশ থেকে আসার সময় তার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর ছোট মেয়ের জন্ম হয়।

রেস্টুরেন্টের মালিকদের একজন এবং নিহত রাজুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু একই গ্রামের আবদুল জলিল শিপন জানান, খবর পেয়ে সাথে সাথেই তিনি রেস্টুরেন্টে ছুটে আসেন এবং হাসপাতালে যান। পূর্ব থেকে কারো সাথে রাজু কিংবা অন্য কোনো স্টাফের সাথে কোনো বিরোধ ছিল না। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত করেছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ এবং রাজুর ব্যবহৃত ফোন নিয়ে গেছে পুলিশ। রোববার রাত পর্যন্ত কাউকে আটকের খবর তিনি পাননি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে রাজুর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হবে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. রাসেল জানান, তিনি ফ্রায়েড চিকেনের ট্রে নিয়ে সবেমাত্র কিচেন থেকে সামনে আসেন, এ সময় একজন তাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে গুলি তার ডান পায়ে লাগে। যতটুকু চেহারা মনে আছে এতে মনে হয়েছে মিশ্রবর্ণের কালো যুবক। এরপর রাজুকে গুলি করে।
নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সের ওজন পার্কে ব্যাচেলর বাসায় থাকতেন নিহত মো. ইউসুফ রাজু। বাসার সবার সাথে সদ্ভাব ছিল তার। রাজু নিজে রান্না করে খেতে পছন্দ করতেন জানিয়ে তার রুমমেট মো. ফয়সাল জানান, গভীর রাতে বাসায় ফিরে রান্না বসাতেন। আমি (ফয়সাল) অপেক্ষায় থাকতাম উনি বাসায় এলে রান্না করব, একসাথে খাব। দাবা খেলতেও পছন্দ করতেন রাজু ভাই।
ফয়সাল আরও জানান, ছোট মেয়েটির জন্ম হয় রাজু যুক্তরাষ্ট্রে আসার ৫-৬ মাস পর। এখনো সরাসরি মেয়ের মুখ দেখেননি। অবসর সময় পেলেই তিনি স্ত্রী ও মেয়েদের সাথে ভিডিও কলে কথা বলতেন। ২০২৭ সালে তার মামলার চূড়ান্ত শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কাগজপত্র হলেও দেশে যাবেন এমন পরিকল্পনা ছিল তার। ঘাতকের বুলেটে প্রাণ কেড়ে নেয়ায় অবুঝ দুটি শিশু তাদের বাবাকে কিংবা রাজুর স্ত্রী তার স্বামীকে দেখবেন না কখনো।
দ্য গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ ইনকের সভাপতি জাহিদ মিন্টু জানান, নিহত রাজু নোয়াখালী সোসাইটির সদস্য ছিলেন না। তারপরও মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য চেষ্টা করা হবে।
উত্তর আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন