https://www.prothomalony.com/

18004

literature

সাহিত্য

শহীদ কাদরী; অন্য আলোয়

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ ০৬:২২

সম্প্রতি একটি বই পড়ছিলাম।  Six American Poets, An Anthology by Joel Conarroe।  বইটিতে Walt Whitman, Emily Dickinson, Wallace Stevens, William Carlos Williams, Robert Frost, এবং Langston Hughes - ছয়জন সুপরিচিত কবির কবিতা সংকলিত হয়েছে। নিয়মিত কবিতাপাঠ কেন গুরুত্বপূর্ণ তা আলোচনার পাশাপাশি লেখক লিখেছেন কেন আমেরিকান কবির কবিতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন জাগলো, তিনি কেন তাদের 'আমেরিকান কবি' বলেছেন? কেন বলেননি 'কবি'? যেহেতু তাঁরা ইংরেজি ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন, লেখক তাদের 'ইংরেজি ভাষার কবি' বা 'ইংরেজি সাহিত্যের কবি' - এমনটিও তো বলতে পারতেন - যেভাবে আমরা বলি 'বাঙালি কবি'। আমাদের দেশে ইয়োরোপীয়দের নকল করে দশক ধরে ধরে কবি পরিচিতির চল আছে, যেমন, তিরিশের কবি, পঞ্চাশের কবি, ইত্যাদি। লেখক সেটিও করেননি।

এই ছ'জন কবিকে ইংরেজী সাহিত্যের কবি না বলার পেছনে লেখকের মনে কি কোনো হীনমন্যতাবোধ কাজ করেছে? ব্রিটেনের বিশিষ্ট কবি বা ইংরেজি ভাষায় বিশ্বজুড়ে কবিতা লিখছেন এমন নামজাদা কবিদের স্তরে কি তাঁরা পড়েন না? না-কি 'আমেরিকান কবি' আসলেই একটি বিশেষ গ্রুপ? ভেবে দেখলাম, তাই তো! যুক্তরাষ্ট্রের সিভিল ওয়ার, দাসপ্রথা, গ্রেট ডিপ্রেশন, দু'টি বিশ্বযুদ্ধ, সিভিল রাইটস মুভমেন্টের মতো ইতিহাসের বাঁকবদলকারী বা history defining নানান ঘটনার ব্যপ্তি, বিশালত্ব, পূর্বাপর কার্যকারণ, গতিপথ, সামগ্রিক ইতিহাস, তাৎপর্য, এই ভূখন্ডের জীবন, এই দেশ, এই সমাজ ও বিশ্বের ওপর এইসব ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিক প্রভাব, স্বতন্ত্র্যবৈশিষ্ট্য, অভিজ্ঞতা ও অভিঘাত - পৃথিবীর অন্য কোনো ইংরেজিভাষী কবিই সেভাবে ধারণ ও প্রকাশ করতে পারবেন না - হোক তিনি ভাষার বড় কারিগর অথবা তাঁর জানা থাকুক কবিতার নানান কসরত। সেটি পারবেন শুধু একজন এমেরিকান কবি। প্রথম অধ্যায়ে লেখক লিখেছেন, The music that invites your concentration (and collaboration) in this anthology is composed exclusively in the American idiom. Describing familiar landscape (or cityscapes) and those who inhabit them, portraying local flora and fauna, and drawing on a shared storehouse of historical and cultural moments. American writers are uniquely equipped to provide us, their compatriots, with especially intense moments of recognition and revelation....

Walt Whitman লিখেছিলেন,

The runaway slave came to my house and stopt outside

I heard his motions crackling the twigs of the woodpile...

মুক্তির আশায় ক্রীতদাস পালাচ্ছে। সন্তর্পণে চলার অসতর্ক ধাক্কায় স্তুপিকৃত জমানো জ্বালানী কাঠ যখন কর্কশ শব্দে গড়িয়ে পড়লো, তাতে কেমন আতঙ্ক ভর করেছিল? সেই ঐতিহাসিক পটভূমির উত্তরাধিকার আমেরিকান পাঠকের মনে Whitman এর এই কবিতা কেমন অনুভূতির সঞ্চার করে? সেই যুগে ধরা পড়লেই গাছে ঝুলিয়ে দিতো। এইসব শংকা ছাপিয়েও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন ও বৈশ্বিক। কেউ কেউ সাহায্যের ও ভালোবাসার হাতও বাড়াতো বৈকী, যেভাবে কবি কৌশলে দেখিয়ে গেছেন দিগন্তে মুক্তির আলোর চিকন রেখাটি। কবির কাজ সময়টিকে ধরে রাখা, কাব্যিক সাক্ষ্য দেয়া যে সত্যটি যেভাবে তিনি দেখেছেন, জেনেছেন, বুঝেছেন, হৃদয়ে ধারণ করেছেন, রক্তক্ষরণ অনুভব করেছেন। একটু ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে দেখি, পুলিৎজার পুরস্কার পাবার পর চিত্রগ্রাহক কেভিন কার্টার সমালোচনায় বিদ্ধ হচ্ছেন, ওৎপাতা শকুনের কবল থেকে মৃত্যুপথযাত্রী শিশুটিকে কেন তিনি নিজেই রক্ষা করেননি। এটি কি ফটোগ্রাফারের নৈতিকতার অভাব, পুরস্কারের লোভ, নিষ্ঠুরতা প্রকাশ? কেউ বলেনি, তিনি সেখানে ছিলেন বলেই একটি বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের চিত্রটি ধারণ করে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপণ করেছিলেন। সভ্য মানুষেরা কার্টারের সমালোচনা করেছে কারণ, ঝাঁঝালো আলোতে ঝলসে যাই বলে আমরা উৎকট সত্যের মুখোমুখি হতে চাই না। কেভিন কার্টার ৩৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন! তিনি সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন, "...killings & corpses & anger & pain... of starving or wounded children..." এর স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। শাস্ত্রে আছে, আত্মহত্যা মহাপাপ! একজন আধুনিক কবির alienation, বা exile বা নির্বাসন হলো তাঁর আত্মহত্যা। একেকটি কবিতা তাঁর সুইসাইড নোট। যা এই লেখায় পরে আলোচনা করবো।

ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যাই যে বিষয়ে আগে বলছিলাম। সেই রূদ্ধশ্বাস সময় আর অনুভূতি একজন এমেরিকান কবি হিসেবে Whitman এর পংক্তিতে যেভাবে প্রতিভাত হয়েছিল তা একজন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ কবির লেখায় সফলভাবে ফুটে ওঠবে না সেই সম্ভাবনাই বেশি। চেষ্টা করলেও তিনি হয়তো খুব ওপর থেকে দেখবেন। ভাষা এখানে মূখ্য নয়, হৃদয়টি মূখ্য, প্রত্যক্ষ করা মূখ্য, স্বীকারোক্তির জন্য ইতিহাসের সঠিক সাইডে থাকতে চাওয়ার সততাটি মূখ্য। ঠিক যেভাবে 'আসাদের শার্ট' সাত কোটি মানুষের প্রাণের পতাকা, মুক্তির নিশান হয়ে ওড়েছিল।

Whitman অন্যত্র লিখছেন,

Open the envelope quickly,

O this is not our son's writing, yet his name is sign'd

O strange hand writes for our dear son, O stricken mother's soul!

All swims before her eyes, flashes with black, she catches the main words only,

Sentences broken, 'gunshot wound in the breast, cavalry skirmish, taken to hospital'....

সিভিল ওয়ারের রক্তক্ষয়ী দিনগুলিতে উৎকন্ঠিত এক আমেরিকান মায়ের কাছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চিঠি আসে - ছেলের বুকে গুলি লেগেছে! এই কবিতা পড়ে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে,

...চিঠিটা তার পকেটে ছিল,

ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা

'মাগো, ওরা বলে, সবার কথা কেড়ে নেবে...  ['মাগো ওরা বলে', আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ]

অথবা,

"...রেস্তোরাঁ থেকে যে ছেলেটা রোজ প্রাতঃরাশ সাজিয়ে দিতো আমার টেবিলে

তে-রাস্তার মোড়ে তাকে দেখলাম শুয়ে আছে রক্তাপ্লুত শার্ট প'রে...

তবে কি এই নিয়তি আমাদের, এই হিরণ্ময় ধ্বংসাবশেষ,

এই রক্তাপ্লুত শার্ট আজীবন, এই বাঁকাচোরা ভাঙা ভায়োলিন..." ['নিষিদ্ধ জর্নাল থেকে', শহীদ কাদরী]

দীর্ঘ সিভিল ওয়ারে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের দৃঢ় রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকার মাধ্যমে ভগ্নপ্রায় যুক্তরাষ্ট্রের অখন্ডতা, সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। লিঙ্কনের দেখানো পথে দাসপ্রথাও বিলোপ হয়। লিঙ্কন আততায়ীর গুলিতে নিহত হবার দুঃসংবাদে Whitman একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন। কবির তখন ৪৫ বছর বয়স, লিখেছিলেন হৃদয়স্পর্শী লাইনগুলো,

My Captain does not answer, his lips are pale and still,

My father does not feel my arm, he has no pulse no will

The ship is anchor'd safe and sound, its voyage closed and done

From fearful trip the victor ship comes in with object won

জাতিকে নিরাপদে কাঙ্খিত বন্দরে পৌঁছে দেওয়া এই ক্যাপ্টেন, এই পিতা আর কখনো সাড়া দেননি।  ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত বই 'কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই' এর 'কে যেন বলছে' কবিতায় কবি শহীদ কাদরী লিখেছেন,

ক্যাপ্টেন, টূপটাপ করে ঝ'রে পড়ছে তোমার চারদিকে

শিশির, জোৎস্না, টগর, চাঁপা, আর বকুল

একটা দুর্যোগ পেরিয়েছো, সামনে আরেকটা

ক্যাপ্টেন, এবার তুমি চিৎকার করে বলে ওঠো 'হ্যান্ডস আপ'

টলে-পড়া গোলাপ দাঁড়িয়ে পড়ুক তার ঝাড়ে,

হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাক ছুরি,

পলায়নপটু ঋতুরাজ দাঁড়াক দু'হাত তুলে

পুষ্পের সম্ভার নিয়ে পার্কে, পুকুর পাড়ে

গরীবের পাড়াগাঁয়ে...

আজ শহীদ ভাইয়ের ৮৪ তম জন্মবার্ষিকীর পরদিন অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট কুইন্স লাইব্রেরিতে বসে আমার এই লেখাটি যখন পড়ছি তখন স্মরণ করছি বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে যিনি সপরিবারে নিহত হন ১৯৭৫ সালের এই দিনে। শহীদ কাদরী লিখেছিলেন,

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিল,

তারা ব্যবহার করেছিল

এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো বাঙলা ভাষা...

উল্লেখিত বইটির লেখক আরও লিখেছেন, *When I say that American poets speak with special force and resonance to their compatriots, I don't mean to imply that only homegrown writers are able to move American readers deeply; poetry is, after all, like music, a universal language. I do submit, however, that it is to the literature of his or her own country that even a cosmopolitan reader is likely to respond with the most "wonder and delight" and with the surest intuitive understanding. This has nothing at all to do with parochial flag-waving but is, rather, a question of the heightened capacity for response that is part one's emotional and intellectual birthright.*অর্থাৎ,কবি একটি দেশ ও জনগোষ্ঠীর 'হয়ে ওঠা'র জটিল চলমান ইতিহাসের মুখপাত্র ও প্রতিনিধি। কাব্যে প্রকাশ পায় এই আবেগিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জন্মগত অধিকারের ছাপ। সে কারণে লেখক এই ছয় কবিকে 'ইংরেজি ভাষার কবি' বলে ব্রডব্রাশিং বা অতিসরলীকরণ না করে 'আমেরিকান কবি' হিসাবে তাদের বিশিষ্টতাকে তুলে ধরেছেন। তাঁরা অনুসঙ্গ বৈচিত্র্য আর অনুভূতির গভীরতায় অন্যদের থেকে আলাদা।

শহীদ কাদরী কেন 'একটি কবিতা সন্ধ্যা' অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের কবিদের কবিতা তুলে ধরতেন সেই আত্মবিশ্বাসের পক্ষে যৌক্তিক ব্যাখ্যা পেয়েছি উল্লেখিত বইটির আমেরিকান কবিদের বিষয়ে পড়ে। ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে অস্থিরতার পাশাপাশি পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, দ্বিতীয় দফা স্বাধীনতা, '৭৪ এর দূর্ভিক্ষ, তৎপরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদল, হত্যাকান্ড, সর্বোপরি স্বপ্ন, সংগ্রাম, সংকট, ও স্বপ্নভঙ্গ। এ কারণে এই ভূখন্ডের কবিরা তাই সমসাময়িক পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষী প্রাদেশিক কবিদের চেয়ে স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, উত্তরাধিকারসূত্রে অনন্য, জীবনদৃষ্টিতে যোজন যোজন এগিয়ে ছিলেন। বিষ্ণূ দে, সুধীন দত্ত, বুদ্ধদেব এমন কবিতা লিখেননি কেননা তাদের journey টা-ই আলাদা। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের কবি ও কবিতাকে কেবল ভাষার কারণে একটি প্রদেশের লেন্স দিয়ে দেখার, প্রাদেশিক মানদন্ডে বিচার করার হীনমন্যতাবোধ ও অবিমৃশ্যকারিতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়েছিলেন শহীদ কাদরী। এটি অহংবোধ নয় বরং 'emotional and intellectual birthright' থেকে উদ্ভূত বিশেষত্ব। বাংলাদেশের কবিতাকে বাংলাদেশের মানদন্ডেই বিচার করতে হবে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে 'একটি কবিতা সন্ধ্যা'র মতো বাংলা কবিতার অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, সংকলন ও পরিচালনা করছেন দীর্ঘদিন, আমৃত্যু। এই কর্মবীর শহীদ কাদরী আমার চোখে অন্য আলোর শহীদ কাদরী - যেই পরিচয়টি সহসা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। সাহস করে বলতেই পারি, শুধু কবিতাকে ভালোবেসে ও কবিতাকে তুলে ধরতে বুদ্ধদেব বসুর পর শহীদ কাদরীর মতো এভাবে সংগ্রাম করেননি খুব বেশি কবি।

তিনি নিজেও বাংলাদেশের কবি - যিনি দেখেছেন দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শোষণের শেষে আরাধ্য রাজনৈতিক স্বাধীনতা কী রূপ বিষাদময় অন্তসারশুন্যতা নিয়ে নেমে এসেছিল। একটি স্বাধীন দেশকে দেখি কেমন করে জন্মেই কুঁকড়ে যায়! শহীদ কাদরী লিখেছেন,

জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে -

সোনালী পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিলো যেন

দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নীচে সন্ত্রস্ত শহরে

নিমজ্জিত সবকিছু, রূদ্ধচক্ষু সেই ব্ল্যাক-আউটে আঁধারে।

ল্যাম্পপোস্ট আছে আলো নেই, দেশ আছে ঘর নেই। শহীদ কাদরীর বাংলা কবিতায় মূর্ত হয়েছে কোটি ভারতবাসীর রক্তক্ষরণ। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেমন বলেছিলেন, তোমরা স্বাধীন হয়েছো, এখন এ দেশ থেকে চলে যাও - এ ধরণের রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোনো মানে হয় না! কখনো কখনো স্বাধীনতার নামে ইচ্ছার বিরূদ্ধে অভিনব কোনো রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে মানুষকে বন্দী হতে হয়। যে 'নরক'র কথা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর কবিতায় লিখেছেন, শহীদ কাদরী সেই জীবনটি যাপন করেছেন; করতে বাধ্য হয়েছেন। শক্তি, সুনীল, সুধীন দত্ত, বা অমিয় চক্রবর্তীরা হয়তো কবিতার কলা কৌশল জানতেন, কিন্তু কাদরীর মতো তাদের অভিজ্ঞতায় নেই বিশ্বযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, উন্মূল হয়ে অনিশ্চিত নিরূদ্দেশ যাত্রা, মুক্তিযুদ্ধ, এবং সর্বোপরি সব হারানোর ক্ষত। তাই অমিয় চক্রবর্তীর মেলাবেন তিনি ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটার ঐ ভাঙা দরজাটা শুনে মনে হয়েছে এ যেন আরেক রবীন্দ্রনাথ! কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না বলে নিহিলিজমের ডোজ দিয়ে শহীদ কাদরী পাঠককে বাস্তবে ফিরিয়ে এনেছেন। যেন কোনো কিছুরই আসলে কোনো মানে নেই। কবি লিখেছিলেন, এই নশ্বর গ্রহ থেকে একদিন, সব স্বাক্ষরই মুছে যাবে, মনে রেখো। বাংলা কবিতায় লাবন্য, পেলবতাকে বিসর্জন না দিয়েই তিনি objectively জীবনকে দেখেছেন কিন্তু পাঠকের মনে তা আজো আবেগ ও বোধের ঢেউ দুলিয়ে যায়। বারবার পাঠে সংবাদের মতো পুরোনো হয় না এটাই কবিতার শক্তি। বিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে পৃথিবী, ভারতবর্ষ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, এবং সর্বোপরি নিজের জীবন যেসব রোলার কোস্টার রাইডে পেরিয়ে গেছে যুগের পর যুগ, যেসব মানবিক বোধ, অনুভূতি, প্রশ্ন, প্রেম, অভিমান, দ্রোহ, নৈরাশ্য, শূন্যতাবোধ খেলা করেছে অনবরত, তার নির্জাস তিনি রেখে গেছে শ'দেড়েক কবিতায়। সে কারণে তাঁর কবিতাগুলোর স্থিতিস্থাপকতা ব্যাপক।

বিনায়ক সেনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শহীদ কাদরী বলেছেন, "আজকের মানুষ মাত্রই exiled"। পরাধীনতা থেকে মুক্তি আছে কিন্তু মানসিক exile এর যাবজ্জীবন কারাদন্ড থেকে একজন আধুনিক মানুষের মুক্তি নেই। যারা মনে করেন তাঁর নির্বাসনের আসল কারণ তিনি কবিতায় লিখেননি, তারা মূলতঃ কবিতার দুর্বল পাঠক, আধুনিক কবিতার যাত্রার পথটিই তাদের কাছে অচেনা। ২০০৯ সালে, যখন তিনি দীর্ঘ নির্বাসিত, প্রকাশিত বইতে যা বলেছেন, তার ৪২ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে গ্রন্থিত কবিতায় নির্বাসন নিয়ে একই স্বীকারোক্তি করেছেন। তাঁর চিরনির্বাসন, বিচ্ছিন্নতাবোধের পূর্বাভাস প্রথম দিকের কবিতাতেই পুরোপুরি সুষ্পষ্ট - যার সাথে শারীরিক নির্বাসনের সম্পর্ক নেই। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত প্রথম কবিতার বই 'উত্তরাধিকার' এর প্রথম কবিতাটির নাম 'বৃষ্টি, বৃষ্টি'। তার পরের অর্থাৎ প্রথম বইয়ের দ্বিতীয় কবিতাতেই তিনি লিখেছেন,

সুপ্রচুর বিমুক্ত হাওয়ায় কেন তবে কষ্টশ্বাস?

কেন এই স্বদেশ-সংলগ্ন আমি নিঃসঙ্গ, উদ্বাস্তু,

জনতার আলিঙ্গনে অপ্রতিভ, অপ্রস্তুত, অনাত্মীয় একা,

আঁধার টানেলে যেন ভূ-তলবাসীর মতো... [নপুংসক সন্তের উক্তি]

এর সাথে জীবনানন্দ দাশের বিষন্নতা, হতাশা, আশাভঙ্গের সুরের মিল পেলেও শহীদ কাদরী আরো তীক্ষ্ণ! তাঁর মনোজগতে এই অনাত্মীয় একা বোধের বসবাস একেবারেই গোড়া থেকে, যা শক্তিশালী আধুনিক কবি হয়ে ওঠার প্রধানতম বৈশিষ্ট্যের একটি। পরবর্তীতে শহীদ কাদরী আক্ষরিক অর্থেই দীর্ঘ স্বেচ্ছা নির্বাসনে দেশ থেকে অনেক দূরে না ফেরার জগতে চলে যান। শহীদ কাদরী বাংলা সাহিত্যে অনন্য কিছু কবিতা আমাদের উপহার দিয়েছেন যেখানে পরিপূর্ণ নির্বাসনের শুন্যতার করুণ সুরটি আমাদের স্পর্শ করে। সেখানে কবি যেন আলবেয়ার কামুর মতো উপন্যাসের চরিত্রের মতো 'আধুনিকতা জর্জরিত মানুষ'। এটি ছিল বলেই তিনি নিজেকে অনন্য করে তুলতে পেরেছেন তাঁর কবিতা, লেখালেখি আর আড্ডার মাধ্যমে। তাঁর লেখার নাগরিক ক্লেদ ও আধুনিক মনস্কতা, দেশে বিদেশে চলমান ঘটনাবলীর প্রক্ষেপ, টুইস্ট, গভীর অনুভূতি ও বোধের প্রকাশ পাঠকের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়, কখনো হাহাকার আর আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করায়। তাই বাংলা আধুনিক কবিতা বুঝতে শহীদ কাদরীর জীবন ও কর্মকে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। কেউ কেউ সমালোচনা করে বলেন, "তিনি ঢাকায় বসে নিজেকে ফরাসী স্ট্যান্ডার্ডের কবি ভাবতেন, কিন্তু লন্ডন, নিউ ইয়র্কে এসে বুঝলেন এ বিষয়ে কিছুই জানেন না, তাই আর কবিতা লিখেননি। তাই নিউ ইয়র্কে এসে তিনি ঢাকাকে বাড়ি বলতেন"। এইসব তীর্যক, এলোমেলো কথার মাঝে সমালোচকেরা আদপে স্বীকার করে নেন কাদরীর অষ্পস্টতা, মানসিক দ্বন্দ্ব - যা মূলত আধুনিক কবিতারই মূল অনুসঙ্গ। কেননা আধুনিক কবি মাত্রেই অনিকেত, উন্মূল - নৈরাশ্য, নির্বাসন, একাকীত্ব, নাগরিক ক্লেদ, ক্লান্তি, নিরাশা থেকে তাঁর নিস্তার নেই। কিভাবে একটি সদ্যোজাত দেশ জন্মেই কুঁকড়ে গেছে, কবিতায় সেই ট্রমার কথা বলেছেন কিন্তু ভাষায় ছিল পরিমিতিবোধ, শক্তিশালী উপমা ও চিত্রকল্প। তিনি সাংবাদিক সুল্ভ নন, অধ্যাপক সুলভ নন, তিনি প্রশ্ন করেন না, উত্তর দেন না, সমস্যার বয়ান বা সমাধানের প্রেসক্রিপশন বা শ্লোগান দেন না, পক্ষ নেন না। কেবলই মানবিক বোধের কাব্যিক প্রকাশ।

এক সাক্ষাৎকারে ১৯৭৪ সালের দূর্ভিক্ষের একটি অভিজ্ঞতা বয়ান করেছিলেন। সকালে অফিসে যাবার পথে যে সম্ভ্রান্তদর্শন গ্রামীণ গৃহস্তকে দেখেছেন উদ্বাস্তু হয়ে সপরিবারে রাজধানী শহরে এসে রাজপথের ধারে সাহায্যের আশায় বসে আছে, বিকেলে ফেরার পথে দেখতে পেয়েছেন তাদের মরদেহ রাস্তার পাশে পড়ে। ওরা খাবারের অভাবে মরেনি, বরং ওরা শিখেই ওঠতে পারেনি কি করে ভিক্ষার জন্য হাত পাততে হয়। সবকিছু এতটাই অকস্মাৎ! রাষ্ট্র, সভ্যতা তাদের আলিঙ্গণ করেনি,

... দেখেছি আমি অকাল জরায় নুয়ে পড়া

সম্ভ্রান্ত কৃষকের হাত প্রসারিত

সভ্যতার শুন্যতার দিকে...

বাংলার বিষন্ন মানচিত্র দেখেছি বন্ধুর মুখে

স্বাধীনতার সৈনিক ছিল যারা

আমি দেখেছি তাদের নিঃশব্দে নিহত হতে

তাই এই দীর্ঘ পরবাস

চিরকাল পরবাসী আমি স্বদেশে-বিদেশে ['তাই এই দীর্ঘ পরবাস']

কবি লিখেছেন,

এই স্বাস্থ্য আমার, এবং এর ধার, ঠিক সেই

ডাক্তারের মতো নিজের ব্যধিগ্রস্ত আত্মীয়ের

সুচিকিৎসা জানা নেই যার ... ["মানুষ, মানুষ"]

এ যেন অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের প্রশ্ন পেড়িয়ে অন্তঃসারশুন্য স্বাধীনতার রূপক। এ যেন দিকভ্রান্ত স্বদেশ।

কেউ কেউ তাঁকে বামপন্থী পরিচয়ের একটা ছোট কৌটার ভেতরে ঢোকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। কবিতায় তিনি বরাবর নরনারীর চিরায়ত মানবিক সম্পর্ক, ভালোবাসা, প্রেম, নৈকট্যের শক্তিকে যে কোনো ইয়োটোপিয়ান মতাদর্শের ওপরে স্থান দিয়েছেন। এক জায়গায় বলেছেন, "দিনের বেলায় বুখারিনের এবিসি অফ কমিউনিজম হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়াই আর রাত্তিরে গোপনে জোগাড় করা বুদ্ধদেবের গল্প-কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ পড়ছি। ... কোলকাতার মার্ক্সবাদী পত্র-পত্রিকার পর 'কবিতা' পত্রিকা যেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আচ্ছন্ন আমার অর্বাচীন মস্তিষ্কে বসন্তের হাওয়া বইয়ে দিল"। সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের হাতে পড়ে মার্ক্সবাদের কী হাল হয় মানবমনের সেই চিরন্তন দ্বন্দ্ব, যাকে বলেছেন 'আধা-পুঁজিবাদ', তাকে কবিতায় দেখিয়েছেন এভাবে,

মার্ক্সবাদী বিপ্লব অর্থাৎ অনবরত

গণ-অভ্যুদয় ছাড়া

আমাদের এই বিব্রত তৃতীয় বিশ্বে

অন্যকিছু কবিতার বিষয় অথবা বস্তু হতে পারে না কিছুতেই।

এই টূকু লিখে আমাকে থামতে হলো..."

কবিতার পরবর্তী অংশে এই থেমে যাবার কারণ বলছেন,

"তারপর তুমি এলে এলোচুলের

সোনালী বিস্তার নিয়ে আমার কামরায়...

তুমি জানতে চাইলে কার উদ্দেশে কবিতাটি লিখছি?

বললুম, তোমার উদ্দেশে... ['তুমি']

যদিও আমার মনে হয়েছে উপরের কবিতাটি কাদরী লিখেছেন মূলতঃ শামসুর রাহমান দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে। শামসুর রাহমান লিখেছিলেন,

... শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ

অথবা প্রখর ধু-ধু পিপাসার আঁজলা ভরানো পানীয়ের খোঁজ

শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্নের কাছে এসে রোজ

চাইনি তো আমি। দৈনন্দিন পৃথিবীর পথে চাইনি শুধুই

শুকনো রুটির টক স্বাদ আর তৃষ্ণার জল

এখনো যে শুই ভীরু খরগোশ ব্যবহৃত ঘাসে ...[রূপালি স্নান, শামসুর রাহমান]

'প্রজ্ঞা' কবিতায় কাদরী লিখেছেন,

শুনুন সাহেব, মার্ক্স অথবা হেগেল নয়

... জীবনের মূল

স্তন, উরু, যোনি এবং উদ্দাম ঘণ কালো চুল

'শূন্যতা' কবিতায় লিখেছেন,

এখন যখন সকলি শূন্য কোথাও কিচ্ছু নেই

এক্ষুনি আমি চাই

চক্ষে-বক্ষে মহিলা তোমার সোনালী চুলের ঝাপটা

কেটে যাক এই হতাশাদীর্ণ মৃত ও শীর্ণ কৃশকায় কালো রাতটা।

কবির কবিতায় আমরা কাফকায়েস্ক টানাপোড়েন দেখি,

... বেদনার অবসান চেয়ে তোমাকে হয়তো কিছু বর্বরের কাছে

অনায়াসে বিক্রি করে দিতে পারি - অবশ্যই পারি।

কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, এই স্বীকারোক্তির পর মনে হলো;

হয়তো বা আমি তা পারি না - হয়তো আমি তা পারব না।

আমার মনে হয়েছে এই কবিতায় পাশ্চাত্য এসে প্রাচ্যের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে। এটাই কবিতার শক্তি। এটাই কবির শক্তি। এটাই শহীদ কাদরীর শক্তি।

কাদরীর 'একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল' কবিতাটির বেশ অনেকগুলো পর্ব আছে। ১৮ নভেম্বর ১৯৭০ অংশে যে কবিতাটি লিখেছেন তাতে একটি জাতির জন্মপূর্ব ঘটনা, ইতিহাসের বাঁকবদলকারী প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে একটি শব্দও ব্যবহার না করেই ভয়ালরূপে প্রকাশ করেছেন। সাথে ব্যক্ত করেছেন আত্মগ্লানি, দেখিয়েছেন তৎকালীন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শহুরে অবস্থাপন্ন সমাজের ভন্ডামি ও জনবিচ্ছিন্নতাঃ

আমি তো শোকগ্রস্ত নই, সকালের প্রথম প্রস্থ চা

প্রথামতো ভিজিয়েছে রুক্ষ গলা; গতকালের জলোচ্ছ্বাস বিধৃত

পত্রিকা দলা দলা হয়ে পড়ে আছে। হাতে আজকের কাগজ

ঠোঁটে চায়ের পেয়ালা, চোখে মৃত্যুর টাটকা ফটোগ্রাফ,

মনেঃ উপকূলবাসী নই বলে আশ্চর্য নিরাপত্তা...

এখানেই কাদরী আমাদের কবি। এখানেই তিনি বাংলাদেশের কবি হিসেবে বিশিষ্ট।

সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, কান্ট, হেগেল, বুদ্ধ, দেকার্তে, বের্গস, রাসেল, ফুকো, দেরিদা - কাদরীর কবিতায় এসেছে। কিন্তু অন্যভাবে। টেলিফোন ডিরেক্টরির মতো নাম মুখস্ত রাখেন এমন ব্যক্তিরা আমাদের ঔপনিবেশিক মন মানসিকতায় চরম শিক্ষিত ও জ্ঞানী বলে গণ্য হন। তথ্যসমৃদ্ধ মানুষকে আমরা প্রজ্ঞাবান বুদ্ধিজীবী বলে গুলিয়ে ফেলি, যাদের কাছে সমাজ পরিবর্তনের ইশারা খুঁজি তারা অনেক কিছু বলেও কিছুই বলেন না। কাদরী তাদের উদ্দেশে বলেছেন, জলে পড়ে যাওয়া পিঁপড়েটাকে ডাঙায় তুলে দিন।

শহীদ কাদরীর কিছু কবিতা আমাকে অন্যভাবে আকর্ষণ করে, সম্ভবত নিজের প্রবাস জীবন আর আত্মপরিচয় ক্ষয়ের অনুভূতি থেকে। এই বোধগুলো চিরন্তন ও বৈশ্বিক, যেমন আমার রাশিয়া থেকে পালিয়ে আসা বা কিউবা থেকে পালিয়ে আসা বন্ধুর কথায়ও একইরকম অনুভূতি টের পেয়েছি। কবি লিখছেন,

আজ আবার আমার ইচ্ছে হলো যাই

বর্ধমানে, সেই একটূখানি ইস্টিশনে,

হাই তুলতে তুলতে যাই বটগ্রামে শিউলিতলায়

যেখানে দাঁড়িয়ে আমি কোনোদিন ফটোগ্রাফ তুলি নাই...

কপিকলে উঠে-আসা মধ্যাহ্নে কুয়োর ঠান্ডা পানি

আমাকে আবার তুলে দ্যায় নতুন শরীর ধ'রে

সেই সুপ্রাচীন সাঁওতাল! তার ছবি নেই কেন এলবামে?...

কবির কন্ঠে ছিলে ফিরে যাবার আকুতি,

... একা-একা একলা অন্ধকারে

ক্ষান্তিবিহীন চলছে নৌকো বাওয়া,

তবুও আজ তিন পুরুষের

বসতবাটির দাওয়া...

মাঝে মাঝে বলছে হেঁকে

এ তোমার কেমন চলে যাওয়া,

এ তোমার কেমন চলে যাওয়া।

কবির একটি কবিতাকে আমি জীবনানন্দ দাশের 'ক্যাম্পে' কবিতার সমমানের বা সাহস করে তার চেয়েও শক্তিশালী কবিতা বলতে পারি। কবিতাটির নাম, 'গাধা টূপি প'রে',

... আমার মতো ভীরু সাঁতার-না-জানা লোক

পার হলো নদী--

এটাই  নিয়তি।

অন্যরকম পরিণামও যে দেখিনি এমন নয়

-সাঁতারু জাঁদরেল ক্যাপ্টেন এক জাহাজসুদ্ধ ডুবে গেল

-উর্ধ্বাকাশ থেকে বোয়িং-৭০৭ অজগ্রামে পুকুরে তলালো

কিন্তু নদী পার হয়ে আমি কি গন্তব্যে পৌঁছুলাম?

কেউ বলছে, এই তো কয়েক ফার্লং

কেউ বলছে, আরো পাঁচ ক্রোশ সোজা যেতে হবে

কেউ বললো, মাইল-মাইল ব্যবধানে তুমি আছো।

কেউ বলছে, তিতিরের মতো তোমাকে শিকার করা কখনো যাবে না...

কবির কাছে,

... দিবস-রজনী পাগল বাতাস অন্য গল্প বলে

আঁস্তাকুড়ের শুকনো কাগজে, জাহাজের মাস্তুলে

হরিন যেমন স্থবির জলের কাছে

তেমনি আমার চকিত দাঁড়িয়ে থাকা...  [আমি নই]

 

একটি বিষয় উল্লেখ্য। যেই American Poets দের anthology'র কথা উল্লেখ করেছি সেখানে লেখক বলেছেন, What the artists in this book have in common is a familiarity with certain physical phenomena, an awareness of some pervasive myths and legends, and an innate understanding of our national character. These poets speak our language, literally and figuratively, though they clearly do so in different ways, তখন মনে পড়লো, যেভাবে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকদের কাজ একে অপরের থেকে আলাদা, যেভাবে সুধীন দত্তের কবিতা বিষ্ণু দের কবিতা থেকে আলাদা, তেমনি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদদের কবিতারও ভাষা, স্কোপ, শৈলী আলাদা।  বাংলাদেশী কবিদের মধ্যে এভাবে তুলনা হতে পারে।  কাদরী স্মরণীয় পংক্তি রচনার কথা বলতেন। অন্য কবিদের কবিতার প্রতি তাঁর প্রশংসা আর মুগ্ধতা প্রকাশ পেতো যখন বারবার কিছু প্রিয় পংক্তি আওড়াতেন, যেমন,

যে কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ঈঙ্গিতে...

অথবা,

...দৈনন্দিন পৃথিবীর পথে চাইনি শুধুই

শুকনো রুটির টক স্বাদ আর তৃষ্ণার জল

এখনো শুই ভীরু-খরগোশ-ব্যবহৃত ঘাসে..."

অথবা,

বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল

গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল...

কবিতাগুলোকে তিনি বইতে যে ধারাক্রম অনুসরণ করে উপস্থাপন করতেন সেটিও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। 'মৃত্যুর প্রাঞ্জল শিল্প' তাঁর 'সংগতি' কবিতার মতোই একটি শক্তিশালী কবিতা, যেখানে লিখেছেন,

ঘোর লাগা অন্ধকারে মানুষ মৃত্যুর দিকে যাবে,

হরিণের মাংস যায় মানুষের উদরে অমোঘ

মাথার ওপরে ঠিক একহাত নেমে এসে, নারী

স্তন খুলে যোনিমুলে মুখ রেখে তোমাকেও খাবে

সভ্যতা, সোনালী সূর্য, সুসময় - ছুরিকা শানানো

লাল গোলাপের মতো মৃদু খুদ খুঁটে-খাওয়া ওই

মোরগের দিকে ছুরি হাতে, বিকেলে এগিয়ে গেলে তুমি

 - এই দৃশ্যঃ মৃত্যুর প্রাঞ্জল শিল্প, প্রকাশ্যে বানানো।

ঠিক তার পরের কবিতাটির নামই, 'কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না', যেটি বিপুল পাঠক সমাদৃত। দু'টো কবিতা পাশাপাশি পাঠ করলেই ধরা পড়ে কবির চিন্তার সুশৃঙ্খল ভাবটি।

শহীদ কাদরী যখন সশরীরে আমাদের মাঝে বিরাজমান, তখন মূগ্ধতা, সমীহ আর আনন্দ উদযাপনের হুল্লোড়ে দিন রাত মাস আর বছরগুলো কেটে গেছে আমার। আড্ডার রাজপুত্র শহীদ কাদরীকে কাছে পেয়ে মাতোয়ারা থাকতাম কবিতা, সঙ্গীত, সাহিত্য, রাজনীতি, বিজ্ঞান, দর্শন, নৃ-তত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি থেকে শুরু করে নানান ভারী ও হালকা-চটুল আড্ডায়। কাদরী প্রশ্রয় দিয়ে বন্ধু বলতেন, কিন্তু তাঁর প্রতি অগাধ সমীহ অটূট ছিল আমার মনে। সেই সমীহের কিছুটা এসেছিল তাঁর পান্ডিত্য ও ব্যক্তিত্বের আলো যতটুকু আলো আমার ওপর যতটূকু পড়েছিল সে কারণে। তখনো, কিছু তার দেখি আভা, কিছু পাই অনুমানে, কিছু তার বুঝিনা বা...। সমীহের বাকি অংশ আসে তাঁর কিংবদন্তীগুলো থেকে যার কথা মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। বিউটি বোর্ডিং, 'এতনা ছোটা কাবিকা এতনা বড়া মাকান', 'ফোক সিঙ্গার গাড়িতে আর মডার্ন পোয়েট পায়ে হেঁটে যাচ্ছে', স্বেচ্ছা নির্বাসন, বোহেমিয়ান ইত্যাদি কিংবদন্তী - যেসব তাঁকে ঘিরে থাকতো। কোনটা আসল শহীদ কাদরী তা আমার পক্ষে ধরা মুশকিল ছিল। কেননা তাঁকে একাধারে পেতাম নানা রূপে - কবি, পন্ডিত, প্র্যাকটিক্যাল, বিজ্ঞানমনস্ক, চটুল, রুচিস্নিগ্ধ অভিজাত, আড্ডাবাজ ... অত্যন্ত শক্তিশালী ও পরষ্পরবিরোধী গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর মধ্যে - যা তাঁকে ঘিরে একটা প্রবল আকর্ষক ও কৌতূহলউদ্দীপক aura তৈরী করতো। অনন্য ব্যক্তিত্বের কারণে শহীদ কাদরী অসংখ্য গুণমুগ্ধ ভক্ত, পাঠক তৈরি করেছেন যাদের ভেতর প্রবিষ্ট করতে চেয়েছেন জ্ঞানসাধনার সততা, আধুনিক মনস্কতা, কিন্তু ভক্তিবিশ্বাসের অন্ধত্ব নয়। সবচেয়ে বোকা প্রশ্নটিরও সবচেয়ে সদয় ও বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দিতে তিনি কার্পণ্য করতেন না। এমন মানবীয় গুণগুলো সবাইকে তাঁর কাছে টেনেছে। যেমন, "তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা" বললেই অনেকে গানটির কথা উল্লেখ করেন, কবির কাছে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি উচ্চারণ করেন নরেশ গুহ'র সেই কবিতার লাইন,

এক বর্ষার বৃষ্টিতে যদি ভেসে যায় নাম

এত পথ হেঁটে এত জল ঘেঁটে তবে কী পেলাম

কী তবে পেলাম...

সমীহের তৃতীয় ও সর্ববৃহৎ কিস্তি আমার ভেতর জমা হয় তাঁর প্রয়ানের পর যখন কথা বলার পথ চিরতরে রূদ্ধ হলো, যখন কোলাহল বারণ হলো। কবিপত্নী নীরা কাদরীর নিরলস প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে 'একটি কবিতা সন্ধ্যা'র কবিতা থেকে আরম্ভ করে কাদরীর 'কবিতা সমগ্র', 'গদ্য সংগ্রহ' ও 'সাক্ষাৎকার সংগ্রহ' প্রকাশিত হয়েছে। এই বইগুলো গভীর অভিনিবেশের সাথে বারবার পড়ে এবং রেকর্ডেড সাক্ষাৎকারগুলো শুনে আমি অন্য এক কাদরীকে আবিস্কার করেছি যিনি সাহিত্যের একজন পন্ডিত বিশ্লেষক এবং আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবক। অন্য কোনো কবিকে সেই ভূমিকায় পাবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কাদরীর এই শক্তিশালী পরিচয়টিও অন্য আলোয়, অনেকের অগোচরে থেকে গেছে। তিনি একদিকে যাদুঘরের কিউরেটরের মতো পাঠক শ্রোতার সামনে বর্তমান আর অতীতের যোগসূত্র স্থাপন করছেন আবার নিজেও লিখে গেছেন শক্তিশালী নির্মেদ আধুনিক কবিতা। তিনি লিখেছেন জমাট শক্তিশালী গদ্য, তথ্য, বিশ্লেষণ ও পান্ডিত্যপূর্ণ সাক্ষাৎকার - যা জ্ঞানপিপাসু সাহিত্যরসিক ও সাহিত্যের ছাত্রের কাছে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যকে জানার ও চেনার বিশাল দরোজা।

নিজের দুর্বলতা বা সমালোচনা প্রসঙ্গে শহীদ কাদরীর বক্তব্য ছিল, তিনি লেখালেখির বিষয়ে সিরিয়াস ছিলেন না। আমি দ্বিমত পোষণ করি কেননা তিনি কোনো অ-সিরিয়াস লেখা লিখেননি। Diction ও এর connotation ওপর দখল থাকায় তিনি বেশ সাবলীলভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দটি বাচাই করতেন যা সিরিয়াস লেখকেরই বৈশিষ্ট্য। তাঁর গায়ে লেগেছে 'বিরলপ্রজ' কবির তকমা। তিনি নিজেও স্বীকার করতেন যে, শামসুর রাহমানের মতো তিনি জীবনের এত বিচিত্র দিককে স্পর্শ করেননি। এর কারণ হতে পারে দেশ ও কবিতা লেখা থেকে দীর্ঘকাল দূরে থাকা। লেখালেখিতে গ্রামীন জীবন ও প্রকৃতি ধরা পড়েনি, এমন একটি সমালোচনাও বাজারে চালু আছে। প্রথমত, কাদরী নিজেকে জসীমউদ্‌দীন বা আল-মাহমুদ দাবি করেননি। দ্বিতীয়ত, একজন প্রকৃত কবি চাইলে যে কোনো জীবনধারা, অনুসঙ্গ, রূপপ্রকৃতিকে নিজের কবিতার বিষয়বস্তু, উপমা হিসেবে আনতে পারেন, যে কোনো জায়গায় থেকে সার্থক কবিতা রচনা করতে পারেন, সে গ্রাম হোক বা শহর। হ্যাঁ, তাতে কবিতায় পরিবর্তনের ছাপ পড়বে, যেমন রবীন্দ্রনাথের কোলকাতা শহরে বসে লেখা কবিতা আর পূর্ববঙ্গে অবস্থানকালীন লেখা কবিতার পার্থক্য। এখানে মূখ্য বিষয়, কবিতার জন্য অনুসঙ্গটি, উপমাটি কতখানি প্রাসঙ্গিক বা প্রয়োজনীয়। সেই সিদ্ধান্ত একান্তই কবির নিজস্ব। যেমন কাদরী কিছু উপমা আর বিষয়বস্তুর অতিব্যবহারে ক্লান্ত ছিলেন। একজন নাগরিক, বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক কবি যেই বোধের জগতে বাঁশ করেন সেখান থেকে তিনি দ্রুত পাঠকের কাছে যাওয়া, সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া, তরল রোমান্টিকতায় ভাসিয়ে নেওয়ার তাড়না অনুভব করবেন না এটাই স্বাভাবিক। কবিতা আদপে কবিতা হয়ে উঠছে কি-না সেটাই মুখ্য। কবিতা কোনো বাণিজ্যিক সিনেমা নয় যে diluted করে লিখতে হবে। আমপাঠকের কানে আধুনিক কবিতা দূর্বোধ্য মনে হয়, আধুনিক কবিতার music ধরা পড়ে না বলে অনেক সময় মরিয়া কবি কিছু পরিচিত অনুসঙ্গ ব্যবহার করতে পারেন। দেখতে হবে তা যেন কবিতাকে ছাপিয়ে না যায়, কবিতাটি যেন দৃষ্টির আড়ালে না চলে যায়। একজন বড় কবি সংবেদনশীল ও স্থিতিস্থাপক। যে কবি লিখেছেন,

... সারাদিন কেটে যাবে কলমির গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে

আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে... ['আবার আসিব ফিরে', জীবনানন্দ দাশ]

আবার তিনিই লিখেছেন,

হাইড্র্যাণ্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল;

অথবা সে-হাইড্র্যাণ্ট হয়তো বা গিয়েছিলো ফেঁসে

এখন দুপুর রাত নগরীতে দল বেঁধে নামে।

একটি মোটরকার গাড়লের মতো গেল কেশে... ['রাত্রি', জীবনানন্দ দাশ]

বরাবর উজ্জ্বল আলোয় শহীদ কাদরীকে যেভাবে দেখে আমরা অভ্যস্ত, আমার এই লেখায় অপেক্ষাকৃত কম পঠিত বা আলোচিত লেখা ও বিশেষ করে কবিতাগুলো ধারাবাহিকভাবে পড়ে আমি তাঁকে অন্যভাবে আবিষ্কার করেছি। আমার ইচ্ছা ছিল তাঁর একটা বই রিভিও করবো। কিন্তু কাদরীকে পেতে হলে পাঠককে তাঁর সবগুলো সুপাঠ্য বইয়েই একনাগারে বিচরণ করতে হবে। হবেই। এসব পাশাপাশি রেখে আমি কাদরীর চিন্তার জগৎটাকে পাজল পিসের মতো সাজিয়ে "একটি শহীদ কাদরী এবস্ট্রাক্ট বা ম্যুরাল" গড়ার চেষ্টা করেছি। আমার এই এলোমেলো ব্রাশস্ট্রোকে ক্যানভাসে যে অবয়ব তৈরী হয়েছে তার সাথে চিরচেনা শহীদ কাদরীকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়নি।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন