https://www.prothomalony.com/

17945

bangladesh

বাংলাদেশ

বিপথগামী যুবসমাজ: হুমকির মুখে মানবসভ্যতা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ ০১:৪৮

যুগে যুগে সব ধর্ম, বর্ণ, মতবাদ বা জাতি সর্বাবস্থায় যুবসমাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। কারণ, যুবসমাজ একটি জাতির মূল চালিকাশক্তি। যুবসমাজের মেরুদণ্ডের ওপর ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় একটি আদর্শ সমাজ। একটি সমাজ, সভ্যতা বা রাষ্ট্রের পরিবর্তন-পরিবর্ধন এবং ভাঙাগড়ার কারিগর যুবসমাজ। যুবক মানে অদম্য শক্তি, অপ্রতিরোধ্য ঝড়। যুবক মানে একটি দৃপ্ত শপথ, এগিয়ে যাওয়ার দুরন্ত বাসনা। অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর সৃষ্টির উন্মাদনাই তাদের গৌরব। চেতনাদৃপ্ত যুবকেরা যখন জেগে ওঠে, তখন প্রতিবন্ধকতার সব বন্ধ দুয়ার চূর্ণ করে বিজয়কে ছিনিয়ে আনে। বিজয়ের পুষ্পমালা তাদের পদচুম্বন করে। আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে যুবসমাজের ভূমিকা অতুলনীয়। যে জাতির যুবসমাজ যতটা সচেতন, সে জাতি ততটা উন্নত। এরাই পারে জাতিকে একটি সোনালী সমাজ উপহার দিতে। যুবসমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতির ললাটে নেমে আসবে ঘোর অমানিশা, পরাভূত হবে স্বাধীনতা, বিনষ্ট হবে সার্বভৌমত্ব।  

আগামী বিশ্ব ভয়ানক এক প্রজন্মের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। তাদের অনেকেরই হিতাহিত জ্ঞান বলতে কিছুই নেই। অধিকাংশই মাতাল, নেশাগ্রস্ত, বিকারগ্রস্ত ও উন্মাদ। যাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই, সমাজ তো অনেক দূরের কথা। নাচ-গান, খেলাধুলা, সিনেমা, বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা আর বিজাতীয় সংস্কৃতির স্রোতধারায় শরীর এলিয়ে দেওয়াই যাদের নিত্যদিনের কাজ। 

বর্তমান যুবসমাজের অবস্থা কতটা ভয়াবহ, তার কিছুটা নমুনা নিচে উল্লেখ করা হলো: বিশ্বব্যাপী মাদকের দিকে মানুষ যেভাবে ঝুঁকছে, তা চিন্তাতীত। ফলে সামাজিকতা নষ্ট হচ্ছে, ফাটল ধরছে পারিবারিক বন্ধনে। ভারত ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বন্যার পানির মতো এসব নেশাজাতীয় দ্রব্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে এক ডজনের বেশি মাদক ও ফেনসিডিলের কারখানা রয়েছে। এর উৎপাদিত প্রায় সবটুকুই বাংলাদেশে প্রবেশ করে। উদ্দেশ্য হলো এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিকারগ্রস্ত করে দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। ইংল্যান্ডের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী গ্লাডস্টোন মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেছেন, 'যুদ্ধ, মহামারি ও দুর্ভিক্ষে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয় মাদকতায়।' 

বাংলাদেশ সরকারের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ দেশে মাদকাসক্তের ৯০ ভাগই হলো কিশোর, যুবক ও শিক্ষার্থী; যাদের ৫৮ ভাগ ধূমপায়ী এবং ৪৪ ভাগ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মাদকাসক্তদের গড় বয়স এখন ১৩ বছরে এসে ঠেকেছে। আসক্তদের ৫০ শতাংশের বয়স ২৬ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। অবাক করা তথ্য হলো, মাদকসেবীদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষিত। মাদকসেবীরা সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ; কারণ মাদকাসক্তি এবং সন্ত্রাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বর্তমান বিশ্বে মাদকসেবীদের শতকরা ২০ ভাগই নারী।

সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনা বাঁধভাঙা বন্যার পানির ন্যায় বেড়েই চলেছে। রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ—সর্বত্রই নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। দেশে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন পাস করা হয়। ২০১৩ সালে এ আইন সংশোধন করে শাস্তি আরও কঠিন করা হয়। এরপরও নারী নির্যাতনের গতি বিন্দুমাত্র স্তিমিত করা সম্ভব হয়নি। গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি মাসে অন্তত ১৫ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেন। প্রতিনিয়ত পত্রিকাগুলোতে এমন কোনো না কোনো সহিংসতার ঘটনা লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১৮ সালে সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত ১৭ হাজার ২৮৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ভিকটিমের সংখ্যা ১৭ হাজার ৩৮৯ জন; যাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জন নারী ও ৩ হাজার ৫২৮ জন শিশু।  

দেশজুড়ে নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ৫১.৬২ ভাগই ধর্ষণের দখলে। ধর্ষণ মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি মাসে ৫৯৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। মামলার হিসাবে মাসে শুধু গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৪১টি। তবে ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মান-সম্মানের ভয়ে মামলা করেন না। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাধর অভিযুক্ত অপরাধীরা চাপ সৃষ্টি করে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেয়। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তদের সাজার হারও অনেক কম। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ১১.২৬ শতাংশ ঘটনায় সাজা পেয়েছে অপরাধীরা।

পরিসংখ্যানমতে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৯৯টি। একই সময়ে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে ১২৫টি। ধর্ষণের ঘটনায় ছেলেশিশুর সংখ্যা ছিল ৩৮, কন্যাশিশু ৫৫৮ ও প্রাপ্তবয়স্ক নারী ১ হাজার ৩১৮ জন। মামলায় এজাহারনামীয় অভিযুক্তের মধ্যে ছেলেশিশু ৮৫ জন এবং প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ২ হাজার ১৯৮ জন। পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ধর্ষণের ঘটনায় ১.৯৯ শতাংশ ছেলেশিশু, মেয়েশিশু ২৯.১৫ শতাংশ ও প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৬৮.৮৬ শতাংশ।
ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টসের এক জরিপে দেখা যায়, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শতকরা ৬০ জন পর্নো ভিডিও দেখছে। 

বাংলাদেশে ২০১৭ সালে অষ্টম শ্রেণির কিছু ছাত্র-ছাত্রীর ওপর চালানো একটি জরিপে দেখা যায়, শতকরা ৭৬ জন শিক্ষার্থীর ফোন আছে; বাকিরা বাবা-মার ফোন ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থী সুযোগ পেলে মোবাইলে পর্নো দেখে। শুধু ক্লাসে বসেই পর্নো দেখে ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী। এটা ছিল ২০১৭ সালের কথা; আর এখন ২০২৬ সাল। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় দিন দিন পরিস্থিতি যে কত ভয়াবহ হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
২০২৩ সালে শিশু সহিংসতা নিয়ে একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে বেসরকারি সংস্থা ইনসিডিন বাংলাদেশ ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। এতে বলা হয়েছে, দেশের ৩৪ শতাংশ শিশু পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি দেখে। আসক্ত ২৬ শতাংশ মেয়েশিশু তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে এসব দেখে এবং ১৪.৪ শতাংশ আত্মীয় বা পরিবারের বাইরের লোকজনের সঙ্গে দেখে। 

পর্নোগ্রাফি দেখা শিশুদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৯.৪ শতাংশ শিশু পর্নোগ্রাফি দেখে বন্ধু অথবা আত্মীয়স্বজনের বাসায় এবং ৩২.৩ শতাংশ দেখে নিজেদের বাসায়। ৫৯.২ শতাংশ শিশু তাদের বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে পর্নো ভিডিও দেখে। বাকিরা আত্মীয়স্বজন, অপরিচিত ব্যক্তি ও নিজ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে পর্নোগ্রাফি দেখে।

সাইবার ক্রাইমবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রতিষ্ঠান সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের গবেষণা বলছে, গত ছয় বছর ধরে শিশুদের সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার হার ব্যাপক হারে বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালের জরিপে ভুক্তভোগীদের ১৪.৮২ শতাংশের বয়সই ১৮ বছরের নিচে, যা ২০১৮ সালের জরিপের তুলনায় ১৪০.৮৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
অপরাজনীতি বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা, যা ক্রমশ ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। অপরাজনীতির আগ্রাসী থাবার শিকারে পরিণত হচ্ছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এবং স্কুল-কলেজের স্বপ্নচারী মেধাবী শিক্ষার্থীরা। শত শত পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে আজ পথের ভিখারি। শিশুরা এখনো তাদের বাবার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে।

অপরাজনীতির বলি হয়ে বাবা মারা গেছেন বা জেলে বন্দি আছেন, আর এদিকে শিশুরা বাবাকে ছাড়া খাবার খেতে চায় না। কী দোষ এই অবুঝ শিশুদের? কেন নেতাদের অপরাজনীতিতে বলির পাঠা হবে সাধারণ মানুষ? পরিবারের সযত্নে বেড়ে ওঠা সন্তানটি কেন পাইক-পেয়াদাদের হাতে গুলি খেয়ে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে মর্গে পচবে? জীবিকার উদ্দেশে বের হওয়া নিরপরাধ ব্যক্তিটি কেন পঙ্গুত্ব বরণ করবে? এটাই যদি রাজনীতি হয়, তবে এমন রাজনীতি জনসাধারণ মোটেই চায় না।
এ ছাড়া বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অশ্লীল বিনোদন যুবসমাজের চরিত্র ধ্বংস করে জাতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। যুবসমাজ যেমন তাদের নিজেদের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তেমনি জাতির ভবিষ্যৎও নষ্ট করছে। বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজবিধ্বংসী অপশক্তির এসব নীল নকশা আমরা বুঝতে যতটা দেরি করব, পরিণাম ততটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

তাই আসুন, আমাদের সন্তানদের প্রতি আমরা আরও যত্নবান হই। এ ক্ষেত্রে ইসলামের সুমহান ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া বিকল্প পথ নেই। কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত চরিত্র গঠনের সব গুণ যেমন—তাকওয়া, শালীনতা, সত্যবাদিতা, ওয়াদা পালন, আমানতদারিতা, সবর, এহসান, বিনয়, উদারতা ও দানশীলতা ইত্যাদি আমাদের সন্তানদের শিক্ষা দিই, তাহলে কখনোই তারা বিপথগামী হবে না। ফলে সুন্দর হবে আমাদের সমাজ, সমৃদ্ধ হবে আমাদের দেশ। পরম সুখ-শান্তির মৃদু হাওয়ায় আন্দোলিত হবে আমাদের জীবন। আমরা পাব একটি আল্লাহভীরু, মেধাবী ও সত্যবাদী প্রজন্ম। আল্লাহ আমাদের যুবসমাজকে সঠিক পথে কবুল করুন এবং তার রহমতের ছায়া দিয়ে আগলে রাখুন, আমিন!

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন