https://www.prothomalony.com/

17888

bangladesh

বাংলাদেশ

পদ্মার পাড়ের ইস্কুল

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ ০৬:২৯

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই দেশের অসংখ্য নদ-নদীর মধ্যে পদ্মা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা, সংগ্রাম ও স্বপ্নের প্রতীক। পদ্মার বুক চিরে যেমন নৌকা চলে, তেমনি তীরের ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের এমনই একটি সবুজ-শ্যামল গ্রাম সাহা ব্যাপারীপাড়া। গ্রামের এক পাশে বিশাল পদ্মা, অন্য পাশে সবুজ ধানের মাঠ, পাটক্ষেত, সবজিখেত আর গাছপালায় ঘেরা প্রকৃতি। ভোর হলে পাখির ডাক, সন্ধ্যায় নদীর বাতাস আর মানুষের আন্তরিকতায় ভরে ওঠে পুরো গ্রাম।

এই গ্রামের সবচেয়ে বড় গর্ব একটি বিদ্যালয় 'দৌলতদিয়া মডেল হাইস্কুল'। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল গ্রামের মানুষের আশা, বিশ্বাস ও ভবিষ্যতের প্রতীক। গ্রামের অসংখ্য বাবা-মা বিশ্বাস করতেন, তাদের সন্তানদের ভাগ্য বদলাবে এই বিদ্যালয়ের হাত ধরেই। এখান থেকেই শুরু হবে নতুন জীবনের পথচলা।

সাহা ব্যাপারীপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে প্রতিদিন এই বিদ্যালয়ে পড়তে আসত। কারও বাড়ি নদীর ওপারে, কারও বাড়ি চরাঞ্চলে, কারও বাড়ি কাঁচা রাস্তার শেষে। তবুও শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা তাদের থামাতে পারত না। কেউ হেঁটে, কেউ সাইকেলে, কেউ আবার নৌকায় চড়ে বিদ্যালয়ে আসত। সকালবেলা বই-খাতা বগলে নিয়ে তাদের হাসিমুখে বিদ্যালয়ের পথে ছুটে যাওয়া যেন পুরো গ্রামের প্রাণ জাগিয়ে তুলত।

বর্ষাকাল এলে পদ্মা নদী যেন নতুন রূপ ধারণ করত। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। গ্রামের রাস্তাঘাট তলিয়ে যেত। হাঁটু পানি, কখনো কোমর পানি পেরিয়ে, কখনো ছোট নৌকায় চেপে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে পৌঁছাত। অনেক সময় বৃষ্টিতে ভিজে বই-খাতা নষ্ট হয়ে যেত। তবুও তারা ফিরে যেত না। কারণ তারা জানত, শিক্ষা ছাড়া জীবনের অন্ধকার দূর হবে না।

একটি ছোট্ট ছেলে ভেজা কাপড়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছে যখন শ্রেণিকক্ষে বসত, তখন তার চোখে ফুটে উঠত এক বিশাল স্বপ্ন। সে ভাবত একদিন সে ডাক্তার হবে, গ্রামের মানুষের চিকিৎসা করবে। আরেকজন ভাবত সে হবে শিক্ষক, নিজের গ্রামের শিশুদের শিক্ষিত করবে। কেউ স্বপ্ন দেখত পুলিশ কর্মকর্তা হবে, কেউ বিচারক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ আইনজীবী, কেউবা বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করবে। বিদ্যালয়ের প্রতিটি বেঞ্চে বসে জন্ম নিত শত শত স্বপ্ন।

এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ছিল দরিদ্র। কেউ দিনমজুর, কেউ জেলে, কেউ কৃষক, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। অনেক পরিবারের সংসার চলত খুব কষ্টে। অনেক দিন এমনও গেছে, ঘরে পর্যাপ্ত চাল ছিল না। নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য ছিল না। সন্তানদের বই কেনার টাকা জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হতো। তবুও তারা কখনো সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করতে চাননি।

অনেক বাবা পরীক্ষার ফি দেওয়ার জন্য নিজের প্রিয় গরুটি বিক্রি করেছেন। কেউ ধার করেছেন, কেউ জমির ধান আগেই বিক্রি করেছেন। অনেক মা নিজের গয়না বন্ধক রেখেছেন, শুধু যেন ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ না হয়। কারণ তারা জানতেন, দারিদ্র্য থেকে মুক্তির একমাত্র পথ শিক্ষা।

এই গ্রামের অনেক বাবা-মা নিজেরাই কখনো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। অভাব-অনটনের কারণে ছোটবেলায় লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হয়েছে। তারা নিজের নামটুকুও ঠিকমতো লিখতে পারতেন না। কিন্তু তাদের বুকভরা একটি স্বপ্ন ছিল, "আমি পড়তে পারিনি, কিন্তু আমার ছেলে-মেয়ে অবশ্যই পড়বে।"

তাই ভোরবেলা সন্তানকে ঘুম থেকে তুলে বিদ্যালয়ে পাঠাতেন। নিজেরা না খেয়ে থাকলেও সন্তানের জন্য বই-খাতা কিনতেন। সন্তান যেন মানুষ হয়, ভালো মানুষ হয় এই ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

দৌলতদিয়া মডেল হাইস্কুলের শিক্ষকেরা শুধু পড়াতেন না, তারা ছিলেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। তারা শিখিয়েছেন সততা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও নৈতিকতা। তারা বলতেন, "শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই মানুষ হওয়া যায় না; ভালো মানুষ হতে হলে ভালো চরিত্রও গড়তে হবে।"

বিদ্যালয়ের মাঠে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ দিবস, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান; সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের জীবনে বিদ্যালয় ছিল আনন্দের এক বিশাল ঠিকানা। এখানেই তারা বন্ধুত্ব করতে শিখেছে, দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শিখেছে, মানুষের প্রতি সম্মান দেখাতে শিখেছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, কেউ পুলিশ কর্মকর্তা, কেউ ম্যাজিস্ট্রেট, কেউ বা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আবার অনেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশের সুনাম অর্জন করছেন।

অনেক সাবেক শিক্ষার্থী আজও বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। তারা নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সহযোগিতা করেন, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই-খাতা কিনে দেন, বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। কারণ তারা জানেন, এই বিদ্যালয়ই তাদের জীবনের প্রথম স্বপ্নের ঠিকানা।

পদ্মা নদী আজও ভাঙে, আবার গড়েও। কখনো নদী মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নেয়, আবার সেই নদীই মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। কিন্তু সব পরিবর্তনের মাঝেও অটুট রয়েছে বিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা। পদ্মার ঢেউ যেমন থেমে থাকে না, তেমনি শিক্ষার আলোও থেমে থাকে না।

এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বেঞ্চ, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি মাঠ অসংখ্য স্মৃতির সাক্ষী। এখানে কত শিশুর কান্না, হাসি, আনন্দ, ব্যর্থতা আর সাফল্যের গল্প লুকিয়ে আছে। এখান থেকেই প্রথম অক্ষর শেখা, প্রথম কবিতা আবৃত্তি, প্রথম স্বপ্ন দেখা।

একটি বিদ্যালয় কখনো শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়। এটি একটি সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ার কারখানা। দৌলতদিয়া মডেল হাইস্কুলও তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্নের জন্ম হয়। এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের পরিবার, সমাজ এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সংকল্প নিয়ে বড় হয়েছে।

আজকের দিনে প্রযুক্তির যুগ এসেছে, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, কিন্তু পদ্মার পাড়ের মানুষের কাছে এই বিদ্যালয়ের মূল্য আগের মতোই অমূল্য। কারণ তারা জানে, শিক্ষা মানুষকে শুধু চাকরি দেয় না; শিক্ষা মানুষকে মানুষ হতে শেখায়।

যে গ্রামে একসময় অনেকেই নিজের নাম লিখতে পারতেন না, আজ সেই গ্রামের ছেলেমেয়েরা দেশের বড় বড় বিশ্ববিদালয়ে পড়ছে। কেউ গবেষক, কেউ বিজ্ঞানী, কেউবা প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করছেন। এসব অর্জনের পেছনে রয়েছে সেই ছোট্ট বিদ্যালয়টির অবদান।

পদ্মার পাড়ের মানুষ আজও বিশ্বাস করেন, একটি শিশুর হাতে যদি বই তুলে দেওয়া যায়, তবে একটি পরিবারের ভাগ্য বদলে যায়। একটি পরিবার বদলালে বদলে যায় একটি সমাজ, আর একটি সমাজ বদলালে বদলে যায় পুরো দেশ।

তাই দৌলতদিয়া মডেল হাইস্কুল শুধু একটি বিদ্যালয়ের নাম নয়; এটি পদ্মার পাড়ের মানুষের আশা, আত্মবিশ্বাস, সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং ভবিষ্যতের প্রতীক। এখানেই হাজারো স্বপ্ন প্রথম ডানা মেলে। এখানেই একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে শেখে। এখানেই একজন জেলের ছেলে স্বপ্ন দেখে বড় কর্মকর্তা হওয়ার। এখানেই একজন দিনমজুরের মেয়ে স্বপ্ন দেখে চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করার।

পদ্মার ঢেউ যেমন অবিরাম বয়ে চলে, তেমনি এই বিদ্যালয় থেকেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়বে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। যতদিন পদ্মা নদী প্রবাহিত হবে, ততদিন পদ্মার পাড়ের এই বিদ্যালয় মানুষের স্বপ্নের প্রথম ধাপ হয়ে বেঁচে থাকবে। এখানেই জন্ম নেবে নতুন স্বপ্ন, নতুন নেতৃত্ব, নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন