https://www.prothomalony.com/

17884

bangladesh

বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার সামনে দেশে ফেরার পথ কতটা খোলা?

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ ০৫:৫৪

ভারতের নয়াদিল্লি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ৫ আগস্ট এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান। এর আগে জুলাই মাসেও রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। 

কিন্তু রাজনৈতিক ঘোষণা আর বাস্তবে দেশে ফেরা—দুটি বিষয় এক নয়। শেখ হাসিনার সামনে এখন একই সঙ্গে রয়েছে বিচারিক প্রক্রিয়া, গ্রেপ্তারসংক্রান্ত ঝুঁকি, ভারত-বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ প্রশ্ন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা। ফলে প্রশ্ন উঠছে—তিনি চাইলে কি সরাসরি বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন, নাকি তাঁকে দেশে ফেরাতে হলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে?

‘ডিসেম্বরে ফিরব’—কেন নতুন করে আলোচনায়?
৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথাও আগে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডসহ অভিযোগগুলোকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

তবে তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি দেশে ফেরার একটি সময়সীমা হিসেবে ডিসেম্বরের কথা বলেছেন। অর্থাৎ বিষয়টি এখন কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের একটি নির্দিষ্ট সময়কে ঘিরে আলোচনায় পরিণত হয়েছে।

আইনগতভাবে দেশে প্রবেশ কি বন্ধ?
শেখ হাসিনা নিজে বাংলাদেশে ফিরতে চাইলে ‘দেশে প্রবেশের অধিকার’ এবং ‘ফিরে এসে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া’—এই দুটি বিষয় আলাদাভাবে দেখতে হবে।

তিনি দেশে প্রবেশ করলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলা, আদালতের আদেশ এবং দণ্ডসংক্রান্ত বিষয় কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন সামনে আসবে। ফলে দেশে ফিরলেই তিনি স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবেন—এমন পরিস্থিতি বর্তমান আইনি বাস্তবতায় নেই।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের মুখোমুখি এবং দেশে তাঁর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। 

অর্থাৎ তাঁর প্রত্যাবর্তন হলে প্রথম ও প্রধান প্রশ্ন হবে—তিনি কোন আইনি অবস্থার মধ্যে দেশে প্রবেশ করছেন এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশগুলো কীভাবে কার্যকর হবে।

ভারতের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ফলে তিনি যদি নিজে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে ভারত থেকে তাঁর বাংলাদেশে যাত্রার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ তাঁকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের অনুরোধটি আইনগত কাঠামোর মধ্যে পর্যালোচনা করছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর রয়েছে। চুক্তিতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর আইনি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। 

চুক্তিতে এমন অপরাধকে প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে, যা দুই দেশের আইনেই নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডনীয়। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের বিধানও রয়েছে। 

ফলে শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরানোর বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তির আইনি বিধানও জড়িত।

তিনি নিজে ফিরলে পরিস্থিতি কি আলাদা হবে?
এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

ভারতের কাছ থেকে তাঁকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে ফেরানো এবং তাঁর নিজের ইচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরে আসা একই প্রক্রিয়া নয়। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে দুই দেশের রাষ্ট্রীয় ও আইনি প্রক্রিয়া জড়িত থাকে। কিন্তু তিনি নিজেই যদি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন ও আদালতের আদেশ কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন সামনে আসবে।

তবে তিনি নিজে ফিরলেও তাঁর বিরুদ্ধে থাকা বিচারিক কার্যক্রম অকার্যকর হয়ে যাবে না। বরং দেশে প্রবেশের পর তাঁকে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে—এটাই বর্তমান পরিস্থিতির মূল বাস্তবতা।

‘ফিরলেই গ্রেপ্তার’—কতটা নিশ্চিত?
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারিক আদেশ ও দণ্ডের বিষয়টি বিবেচনায় দেশে ফিরলে তাঁর গ্রেপ্তার বা হেফাজতে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী ব্যবস্থা নেবে, তা সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ ও কার্যকর আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। 

তাই ‘দেশে ফিরবেন’ এবং ‘দেশে ফিরে মুক্তভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাবেন’—এ দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

রাজনৈতিকভাবে কী হতে পারে?
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন শুধু একটি আইনি ঘটনা হবে না; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার অবস্থায় তাঁর দেশে ফেরা দলটির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করবে। তিনি দেশে ফিরলে দলটির সমর্থকরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন, সরকার কী অবস্থান নেবে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে বিষয়টিকে দেখবে—এসবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে তাঁর প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলেও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গভীর মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে শেখ হাসিনার সরাসরি উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলতে পারে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও বড় পরীক্ষা
শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।

৫ আগস্টের অনুষ্ঠানের আগে ভারত স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংগঠনের আয়োজন। 

অন্যদিকে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকার ভারতের প্রতি কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে তাঁর অবস্থান এবং তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য এখনো দুই দেশের সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল বিষয়।

এ অবস্থায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন হলে সেটি ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ওপরও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

ডিসেম্বর কি বাস্তবসম্মত সময়সীমা?
শেখ হাসিনা নিজে ডিসেম্বরের কথা বলেছেন। কিন্তু এটি তাঁর ঘোষিত রাজনৈতিক পরিকল্পনা—কোনো সরকারি বা আইনি সময়সূচি নয়।

তাঁর দেশে ফেরার বাস্তবতা নির্ভর করবে অন্তত চারটি বিষয়ের ওপর—

প্রথমত, তিনি সত্যিই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন কি না।

দ্বিতীয়ত, ভারত থেকে তাঁর যাত্রার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক বাধা তৈরি হয় কি না।

তৃতীয়ত, দেশে প্রবেশের পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আদালতের আদেশ কীভাবে কার্যকর হয়।

চতুর্থত, সেই সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকে।

ফলে ডিসেম্বরকে এখনই নিশ্চিত প্রত্যাবর্তনের তারিখ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে শেখ হাসিনার ঘোষিত রাজনৈতিক সময়সীমা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

প্রত্যর্পণ বনাম স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

একটি হলো ভারত-বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুরোধ, ভারতের আইনি পর্যালোচনা এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা থাকবে।

অন্যটি হলো তাঁর নিজের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে ফিরে আসা।

ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর রয়েছে এবং ওই চুক্তি অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ফেরত দেওয়ার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করে। 

তবে শেখ হাসিনা যদি নিজেই দেশে ফেরেন, তখন প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক প্রক্রিয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা কোথায়?
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো—শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ঘোষণা বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হবে।

তিনি দেশে ফেরার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ সরকারও জানিয়েছে, তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার প্রস্তুতি রয়েছে। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইনগতভাবে পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। 

অর্থাৎ তিনটি পক্ষের অবস্থান এখন স্পষ্টভাবে আলাদা—

শেখ হাসিনা বলছেন, তিনি দেশে ফিরতে চান।

বাংলাদেশ বলছে, তিনি ফিরলে আইনের মুখোমুখি হবেন।

আর ভারত বলছে, বিষয়টি তাদের আইনি কাঠামোর মধ্যে বিবেচনাধীন।

এই তিন অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় না হওয়া পর্যন্ত তাঁর প্রত্যাবর্তনের পথকে পুরোপুরি খোলা বা পুরোপুরি বন্ধ—কোনোটিই বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন