https://www.prothomalony.com/

17948

literature

সাহিত্য

কবিতার একপাতা— আগস্ট সংখ‍্যা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ ০১:৫৭

আগস্টে আমাদের বুকের বাতাস ভারী হয়ে আসে। এই মাসেই ঘটেছিল ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ ঘটনা। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রূপকার, মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত‍্যা করেছিল স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি।
কিন্তু অর্বাচীনরা জানেনা— ব‍্যক্তি মানুষকে হত‍্যা করা যায়, ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না।
আমরা শোকসন্তপ্ত হৃদয়ে, শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও সেই বেদনাঘন দিনে নিহত তাঁর পরিবারের অন‍্যান‍্যদের।

কবিদের কবিতায়, কবিয়ালদের কবিগানে, ভাটি অঞ্চলে মাঝিদের গানে মেঘ-বৃষ্টি, বর্ষার ভরা যৌবনের নদীর জয়-জয়কার। সেই বর্ষা নেই। ভরা নদীর বাঁকে বাঁকের গল্পকথা আজ অতীত স্মৃতি। বাংলাদেশের আজকের প্রজন্ম এ বাংলাকে চেনেই না! বাংলার ঋতুবৈচিত্র‍্যে বিশেষ করে বাংলার বর্ষার রুপ তুলে ধরার প্রয়াসে জুলাই সংখ‍্যার পরে আগস্টে আরো কিছু বৃষ্টি দিনের কবিতা। সকলের প্রতি ভালোবাসা এবং কবিতাগুলি পড়ার আমন্ত্রণ!
ফারুক ফয়সল

বর্ষা নষ্টালজিক
তমিজ উদ্‌দীন লোদী

বৃষ্টি নামে না, বৃষ্টি ফিরে আসে—জলের আঙুলে । পুরোনো জানালারগ্লাস ছুঁয়ে
দেখে কবে ভাঙা সেই চশমাটি রাখা ছিল খাতার পাতায়।  আজ বৃষ্টিনয়, আজ
স্মৃতির ঘাম ঝরে পড়ে শহরের বুকে, নর্দমায় ভাসে বিগত সময়েরএকটি ভিজে বিকেল,
যে বিকেলে মেঘ ছিল না, ছিল শুধু তোমার অদেখা হাতের ছায়া।

শহর ভিজে গেলে মনে হয় সব রাস্তাই ফিরে যায় শিশুকালের মাঠে, যেখানে কাদার গন্ধে মেশা ছিল
মায়ের রান্নার ধোঁয়া, আর বৃষ্টি ছিল শুধুই জল—নস্টালজিয়া নয়, গভীর এক উদাসীনতা।
এখন বৃষ্টি আসে মাথার ভেতরকার আকাশ থেকে, বাইরের জল নয়, ভেতরের কুয়াশা—যা ঝরে পড়ে
চোখের কোনায়, আর তুমি বুঝতে পারো না এটা বৃষ্টি, না চোখেরজল।

এখন বৃষ্টি মানে ফিরে দেখা—পথের শেষে দাঁড়ানো এক ছাতা, যে ছাতা কখনো মেলা হয়নি, কিন্তু তার
ছায়ায় বৃষ্টি ভিজেছে বহুবার। নষ্টালজিয়া আসে জলের এই স্পর্শে—নির্জীব, অথচ চেনা; দূরের, অথচ
কাছে; বাস্তব, অথচ স্বপ্নের মতো ভাস্বর।


ত্রাণ
মাসুদ খান
 
তোমাদের গ্রহে ফিরোজা আকাশ
আমাদেরটায় হালকা-হালকা নীল
আমাদের গ্রহ দুর্যোগে ভরা
তোমাদের গ্রহে সবকিছু সাবলীল।
 
তোমাদের গ্রহে তুমুল বর্ষা
অথচ এখানে জীবনবিনাশী খরা।
আমাদের গ্রহে সবই চৌচির
তোমাদের গ্রহ সুফলা, স্বয়ম্ভরা।
 
তোমাদের গ্রহে বৃষ্টি বাজত
বহু নূপুরের একটানা নিক্কণে।
আমাদের গ্রহে মেঘেরা জমত
তোমাদের সেই বৃষ্টির স্পন্দনে।
 
স্পন্দনগুলি এই বছরেও
পাঠিয়ে দিয়ো তো আমাদের নীল গ্রহে।
এই গ্রহ বাঁচে তোমাদের ওই
দয়ামায়াময় গ্রহেরই অনুগ্রহে।
 
আবার জাগবে দাদুর-দাদুরি--
মকমকি আর অবিরাম জলকেলি।
ঝাঁক ঝাঁক কই বিল থেকে উঠে
আসবে পেরিয়ে ধানখেত বেলাবেলি।
 
ইলশেগুঁড়ির সঙ্গে আবার
ঝরবে প্রচুর প্রিয় ইলিশের পোনা
জীব জড় সব উদ্বাহু হয়ে
গাইতে থাকবে বৃষ্টির বন্দনা।

অর্গানিক বৃষ্টির দোকানে
হেনরী স্বপন

বরিষণে ভিজছে
কাননে কনকচাপা কান্না;
ঝড়ে বাঁশঝাড় নুয়ে পড়া
মেরুদণ্ডের সমাহার-
অমেরুদণ্ডী কদম ফুলে ফুলে
বাহারি মাজার প্রাঙ্গনের-
তবারকে-
বৈষম্যের খিচুরি খিচুরি ঘ্রাণ।
আষাঢ়ে শুটকিপল্লির
অনাহারে মানুষের কৌমার্যও
কমে গেছে-
আর্য-পাঠান-মোগলের
লড়াকু মোগলাই রেলস্টেশনে;
ঘানিযন্ত্রে ভাঙ্গা
মালিশের মাখামাখি চলে
খাঁটি অর্গানিক বৃষ্টির দোকানে।


বৃষ্টি বনপথে
তুষার গায়েন

মন নিরীক্ষণ করি যেন চিন্তাস্রোত হ্রাস পেয়ে বোধোদয় হয়
শান্ত হয়ে আসে মন, আবার অশান্ত হয়ে যায় প্রতিদিনের আঘাত
অপমান, ভয়ে—বুঝেছি যা অন্তরে, আয়ত্তে নিয়ে আসার প্রয়াস
প্রায়শই ব্যর্থ হয়ে যায়। আকাশে গুমোট মেঘ, যে কোনো মুহূর্তে
বিজলী ও বৃষ্টি সম্ভাবনা জেনে নেমেছি বনের পথে, ঘন বৃক্ষ, পাতা
পল্লবের মধ্য দিয়ে উঁচু-নিচু অজানিত বাঁক, হারাতে হারাতে হাঁফ
ছেড়ে ফিরে পাওয়া নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, নিশ্চয়ই পৌঁছে যাব বনোচ্ছেদ
করা উন্মুক্ত প্রান্তরে—সেখানে সহস্র নারী পুরুষ গ্রীষ্মের বিকেলে
জড়ো হবে বলে কত আয়োজন—উচ্চকিত যন্ত্রানুসঙ্গে সঙ্গীত, বাদ্য
তালে তালে হবে নাচ, সমস্বরে দূরগামী সুর অভিলাষ, স্বাদু কোমল পানীয়
বারবিকিউয়ের ঘন ধোঁয়া, ঘ্রাণ—অকুস্থলে পৌঁছাবার আগে ফুঁপিয়ে কান্নার মতো
বাষ্পরুদ্ধ বৃষ্টি নামে, দেহ ঘেমে ওঠে যেন, চুঁয়ে চুঁয়ে নামে জল চুলের গভীরে
ধীরে ধীরে প্রগলভ হতে থাকে বৃষ্টি, ফোঁটা ফোঁটা, মাটিভেজা সোঁদা ঘ্রাণ  
দ্রুত হেঁটে দেখি নেই প্রান্তরে জনমনিষ্যি কোনো—ভণ্ডুল হয়েছে সব আয়োজন !
এবার সজোরে নামে ধারা—ভিজে সপসপ হবার আগেই দৌড়ে যাই
বনপ্রান্তে নির্জন ক্যাফেতে, ধোঁয়াওঠা কফি নিয়ে বসি কাঠের টেবিলে  
সন্ধ্যাঘন পড়ন্ত বিকেলে কেউ নেই দু'একটি ঝড়ে পড়া কপোত-কপোতী ছাড়া
মেঝে থেকে কার্নিশ অবধি টানা স্বচ্ছ কাচের জানালা—বৃষ্টি এঁকে চলে তার 'পর  
নিরবধি জলের নকশা—অপলক চেয়ে থাকি যেনবা বিস্মৃত হয়ে গেছি সব
বাইরে বাতাস, দৃশ্যপটে আন্দোলিত গাছপালা বিঘ্নিত করেনা তুরীয় আমার
কাচের জানালা বেয়ে যেখানে হয়েছে শেষ বহুরেখ জলধারা—  
বিন্দু বিন্দু স্থির জলে সেখানে বিম্বিত হয় অনন্তর বোধোদয়!


ফুলপাখি লতাপাতা প্রেমের কবিতা
মুজিব ইরম

লিখিতেছি
ফুলপাখি লতাপাতা প্রেমের কবিতা…
অপ্রচল লেখাজোকা অনেক হয়েছে
তারে আমি দূরে ঠেলে
প্রচলেরে কাছে ডাকিয়াছি…

হাসিঠাট্টা করে লোকে
আফসোস নাই
ফুটুক প্রচল ফুল
গন্ধ নিয়ে
নামহীনা
পাখিডাকা
কোনো এক বর্ষাদিনে
লতাপাতাফুল ঘেরা তোমার বাগানে…


বৃষ্টি
স্বপ্ন কুমার

কার হু হু কান্নার সুরে
প্রায় প্রতি রাতে
আমার ঘুম ভেঙে যায়

আমি তারে পারি না চিনিতে
তবু কেনো জানি মনে হয়
সে আমার চেনা
অতি চেনা কেউ
তাই বুঝি তার কান্নার সুরে
আমার ভিতরেও
উথলে উঠে ঢেউ
আমি যা পারি না থামাতে

যার কান্নার সুরে প্রতি রাতে
আমার ভিতরেও ঢেউ উঠে—
উঠে ঢেউ
কেনো জানি মনে হয়
সে আমার অতি চেনা কেউ

কে কাঁদে এমন আকুল সুরে
মাঝরাতে— প্রতিরাতে
এমন কালে— অকালে?
কি এমন দুঃখ তার! কি এমন ব্যথা?

কার কান্নার সুর ঝরে পড়ে—
ঢলে পড়ে
আমার ঘরের মলিন চালে?
কান্নার সুরে কি কথা কয় সে!
আমি যা পারি না বুঝিতে
পারি না?
না না না

প্রতি রাতে কাঁদে সে আর আমারে কাঁদায়
আমি তারে চিনি না তবু চেনা মনে হয়...


কৃপা করো, মেঘরাত্রি
 সেঁজুতি বড়ুয়া
 
একদিন সমস্ত স্তব্ধতা ঢেকে
তোমার অশ্রুসমান কাঁথায় গেঁথে যাবো
মেঘে মেঘে গর্জে উঠবে ধার করা সমুদ্র
সন্ধ্যার ডানায় লোপাট হবে সুনসান মাঝরাত!
 
যা কিছু শান্ত, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু উদার
যা কিছু যুক্তিহীন – আমাদের হিমশূন্য ঋণ
               সূঁই-সুতোয় এপিঠ ওপিঠে
            বৃষ্টির অভিসম্পাত যেন দুটো দেহে
 
আমরা তখন চিরনির্বাসনে, তলিয়ে যাবো রাত্রিমঙ্গলে
অন্ধজিভে জল টলমল, আঙুলের অবাধ স্বাধীনতায়
যেন ব্রহ্মপুত্র আর যমুনা হাঁফায় মেঘের গোঙানিতে!
 
অথচ আমার এই মিশে যাওয়াতে ভয়, সাঁতার জানি না যে!
মেঘলা ধূসর দিন তবুও ঝুঁকে থাকে, ভয়ে আমি সেদিকে তাকাই না…

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন