https://www.prothomalony.com/

17889

literature

সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তা ও সৃষ্টির ত্রিকালদর্শী প্রভাব

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ ০৬:৫০

"মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান" এই একটি পঙ্ক্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন মৃত্যুর ভেতরেও জীবনের জয়গান শুনেছিলেন। বাংলা ১৩৪৮ সনের ২২ শ্রাবণ (১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট) কলকাতায় পৈতৃক বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবস ২২ শ্রাবণ বাঙালির হৃদয়ে শুধু শোকের দিন নয়, এটি এক অনন্ত অনুধ্যানের দিন, যেখানে মৃত্যু ও জীবনের বিভাজনরেখা মুছে গিয়ে রবীন্দ্র-সৃষ্টির আলোয় আলোকিত হয় এক সময়োত্তীর্ণ অনুভব। মৃত্যু, যা অধিকাংশের কাছে ভয়ের, অজানার ও অন্ধকারের তা রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল অস্তিত্বের উন্মোচন, আত্মার মুক্তি ও অনন্ত জীবনের দ্বার।

রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে কখনো 'শেষ' বলেননি। বরং বারবার তাকে 'নতুন যাত্রা' ও 'পূর্ণতার প্রাপ্তি' হিসেবে দেখেছেন। তার জীবন ও সাহিত্যের শেষভাগের লেখাসমূহ এক গভীর মৃত্যুবোধের প্রতিফলন, তবে তাতে ছিল না কোনো হাহাকার; বরং ছিল আত্মপ্রবঞ্চনাহীন এক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ।

গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বলেছিলেন, শেষ বলে তো কিছু নেই, শেষেরই সে কথা; এই উপলব্ধি শুধু বিশ্বাস নয়, তার বিশ্বাসকে সাহিত্যে রূপান্তরের শিল্পও বটে। তার কাছে মৃত্যু ছিল জীবনের অনিবার্য পূর্ণতা ও চেতনার বিকাশ।

মৃত্যু তার কবিতায় এসেছে কখনো প্রেমিকরূপে, কখনো বন্ধুরূপে, কখনো আবার বিশ্বসত্তার এক রহস্যময় আহ্বান হিসেবে। আত্মবিনাশে নয়, বরং আত্মস্ফূরণে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই তিনি মৃত্যুর সামনেও শ্রদ্ধাবনত হয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি যেন নিজেই মৃত্যুর এক অন্তর্জাগরণ। তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন, মৃত্যু জীবনের প্রতিপক্ষ নয়, বরং জীবনকে পরিপূরক করে তোলে মৃত্যুর স্বীকৃতি ও উপলব্ধি। মৃত্যু নিয়ে তিনি লিখেছিলেন যে মৃত্যু দিয়ে তিনি রেখেছেন তার পূজার সুধাসিক্ত আসন। এটি এক অভাবনীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে মৃত্যু কেবল পরিসমাপ্তি নয়, বরং মহাসত্যের প্রতিভাস।

সৃষ্টির সর্বশেষ পর্যায়েও, যখন তিনি শয্যাশায়ী, শরীর ক্ষয়ে যাচ্ছে, বার্ধক্য গ্রাস করছে প্রাণশক্তিকে, তখনো তিনি লিখেছেন, ভেবেছেন, সৃষ্টি করেছেন। শেষ লেখা ও জন্মদিনের মতো রচনাগুলো যেন মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে জীবনের গান।

প্রয়াণের এক বছর আগে, নিজের জন্মদিনে তিনি লিখেছিলেন কালজয়ী কবিতা 'জন্মদিনে' যেখানে এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ অথচ অপূর্ব আভিজাত্যের ছাপ লক্ষণীয়। কবি সেখানে লিখেছিলেন, আজ তাঁর জীবনের শেষের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তিনি দেহের কবাট খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান, যেন তা আলোকের আলোয় ভরে ওঠে। এখানে কোনো বিলাপ নেই, আছে এক গভীর কৃতজ্ঞতা। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও তিনি আলোককে আহ্বান জানাচ্ছেন, তার চিরন্তন নন্দনের অভিলাষ যেন জীবনের শেষ পর্বের মধ্যেও অপরিবর্তিত থাকে।

রবীন্দ্রনাথ এমন একজন স্রষ্টা, যিনি শুধু নিজের সময়ের জন্য লেখেননি, বরং ভবিষ্যতের সময়ের জন্যও লিখে গেছেন। তার সৃষ্টির ভেতর রয়েছে এক ত্রিকালদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি: যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এক অভিন্ন চেতনাবিন্দুতে মিলিত।

তিনি বলেছিলেন যে তিনি সেই দিনটি দেখতে পাচ্ছেন, যখন মানুষ গোষ্ঠীভেদে নয়, চৈতন্যে মিলবে। এই ভবিষ্যৎ দর্শন, এই বিশ্বচেতনা ও মানবতাবাদ আজকের সংকীর্ণ জাতিগত, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভাজনের যুগেও আমাদের মাঝে আশার আলো জাগায়।

তার "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে" শুধু একটি গান নয়, এটি এক যুগচেতনা। এটি আত্মবিশ্বাসের, একক সংগ্রামের ও নৈতিক দৃঢ়তার প্রতিকৃতি। শত শত এমন রচনার মাঝে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর পরেও হয়ে ওঠেন আরও জীবন্ত, আরও প্রাসঙ্গিক।

১৯৪১ সালের ২২ শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান অনন্তলোকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি কি কখনো চলে গেছেন? এ প্রশ্ন প্রতিবার ২২ শ্রাবণে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। তিনি নিজেই যেন সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গিয়েছিলেন, যাবার দিনে তিনি এই কথাটি বলে যেতে চান যে, যা দেখেছেন এবং যা পেয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের শিখিয়েছেন মৃত্যুকে ভয় নয়, বরং সাদরে বরণ করে নিতে। মৃত্যুর গভীরতম অন্ধকারেও এক ধরনের আলোর সন্ধান রেখেছেন তিনি। তাঁর চিন্তা, তার কবিতা, তার গান ও দর্শন আজও জ্বলজ্বল করে জ্বলছে মানুষের আত্মায়। যেভাবে তিনি বলে গেছেন, মরিতে জানেন বলেই তিনি মরণকে ভয় করেন না, এই আত্মবিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক সংকটে জর্জরিত বর্তমান বিশ্বের জন্য এক পরম পাঠ।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু আমাদের চোখের সামনে ঘটে গেলেও তার সৃষ্টিশীল উপস্থিতি আজও আমরা অনুভব করি প্রতিটি মানবিক আলোচনায়, প্রতিটি হৃদয়ের অন্বেষণে। মৃত্যুকে অতিক্রম করে তিনি হয়ে উঠেছেন সময় ও চেতনার বিশ্বপথিক। ২২ শ্রাবণ তাই শুধু তার মৃত্যুদিন নয়, বরং এক আত্মজাগরণ, এক স্মরণ ও অঙ্গীকার; জীবনকে তার মতো করে গভীরভাবে ভালোবাসার ও সৃষ্টির অনুশীলন করার।

প্রয়াণ দিবসে রবীন্দ্রনাথ তার '১৪০০ সাল' কবিতায় লিখেছিলেন, আজ হতে শতবর্ষ পরে কেউ যখন কৌতূহল ভরে তার কবিতাখানি পড়তে বসবে এবং নতুন জীবনের ছোঁয়ায় তাকে নবসাজে সাজাবে, সেই ভবিষ্যৎ পাঠকের কথা তিনি আগেই অনুভব করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জানতেন, তার কবিতা, তার দর্শন ও তার সৃষ্টি শত বছর পরেও কেউ না কেউ আবার পড়বে, ভাববে, ভালোবাসবে। আজ আমরা সেই 'কেউ না কেউ'।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ইমেইল: [email protected]

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন