https://www.prothomalony.com/

17765

literature

সাহিত্য

একজন কবি এবং কবিতায় জুড়ে থাকা কন্ট্রাস্ট

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ ২৩:০৮

কবি মোহন রায়হান সর্বসময়ের আয়নাবাজ। বিপ্লবী আলাপটা তার ভড়ং এবং সেটা প্রথম থেকেই। তাকে যদি একটু খেয়াল করেন, তাহলে দেখবেন, তার সত্তার পুরোটাই স্টান্টবাজি। তার জুলাইয়ের কবিতাটি খেয়াল করলেও দেখবেন, তিনি জুলাইকে ব্যবহার করেছেন জুলাইকেই বদনাম করার জন্য। চাণক্যনীতি আর কী। যুদ্ধে না জিতলেও ধোকাবাজিতে জেতা। 

একসময় তিনি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন। এখন বিএনপি সাজতে চান। এই সাজার পেছনেও কারণ রয়েছে। যেমন রয়েছে তার জুলাই নিয়ে কবিতায়। তিনি মুক্তচিন্তা ও মানবিক হৃদয়বৃত্তির কথা বলেছেন সে কবিতায়। অথচ মুক্তচিন্তা কাকে বলে তার সে ধারণাই নেই। কারণ সে পরিমাণ পড়াশোনা তার নেই। তার ধারণা মুক্তচিন্তা মানে পরচিন্তার দাসত্ববাদ। অন্যদেশের সাংস্কৃতিক অনুকরণ। ‘ছাপান্ন ইঞ্চকা ছোটা বান্দর’ সাজা। কবিতা তার মতে পশ্চিমবঙ্গের বামদের কথিত বিপ্লবী আলাপ। গান মানে গলায় হারমনিয়াম বেঁধে ভিক্ষাবৃত্তি। নাটক মানে শুধু নূরুলদীনের সারাজীবন। এর বাইরে কিছু নেই। রক নেই, জ্যাজ নেই, র‌্যাপ নেই। যে ‘আওয়াজ ওডা’ জুলাই বিপ্লবের একটা গতিপথ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই গতিপথকে অস্বীকার করা। মানবিকতা মানে কপালের মাঝে লাল টিপের অধিকার, হিজাবের অধিকার নয়। ঈদ মিছিল, ঘুড়ি উৎসব, মহরমের তাজিয়া মিছিল, হামদ-নাত, গজল, মিলাদ এসব সংস্কৃতির বাইরে। অর্থাৎ মোহন রায়হানরা আজীবনইআমাদের মধ্যে থেকেই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে অস্বীকার করা লোক। 

কবিতায় বলা হলো, ‘জুলাই এখন ধর্মব্যবসায়ী, ধর্ষক, খুনি আর লুণ্ঠনকারীদের’। এদের ধারণায় জামায়াত না হয় ধর্মব্যবসায়ী, তাদের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু ধর্ষক, খুনি আর লুণ্ঠনকারী কারা? বিএনপি, আন্দোলনে থাকা জেন-জি’রা, এনসিপি? কারা? এর বাইরে তো কেউ নেই। তবে কি মোহন রায়হান মনে করেন, ‘আসে দিন খারাপ, যায় দিন ভালো’, অর্থাৎ পুরানোরাই ভালো। এটাই চাণক্যনীতি। যুদ্ধে না জিততে পারলে বন্ধুত্ব করো, তারপর নেমন্তন্ন দাও এবং খাবারে বিষ মেশাও, শত্রুর বিনাশ করো। মোহন রায়হানের জুলাইয়ের কবিতা হলো সুস্বাদু খাবারে মেশানো বিষ। আর মোহনরা কলিযুগের ‘ছোটা চাণক্য’।

জুলাই আমাদের সাংস্কৃতিক দাসত্ব থেকে মুক্তির একটা সুযোগ করে দিয়েছে। এতদিন আমাদের শেখানো হয়েছে, আমাদের সংস্কৃতি হলো চৈত্র-সংক্রান্তি, হোলি। বৈশাখের প্রথম দিনে ধুতি-পাঞ্জাবি, লালপেড়ে শাড়ি, কপলে বড় করে লালটিপ। পূজার বেদি। রবীন্দ্রসঙ্গীত। এর বাইরে আমাদের কোনো সংস্কৃতি নেই। আর যা আছে তা হলো মরু-সংস্কৃতি। মুসলিম সংস্কৃতি, যা মূলত বাংলাদেশের নয়। এগুলো যে সব মিথ্যা, চৈত্র-সংক্রান্তির সেই সংস্কৃতির সাথে যে আমাদের যাপিত জীবনের ন্যুনতম সম্পর্ক নেই, জুলাই আমাদের তা ভাবতে শিখিয়েছে। আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সন্ধান যখন পেতে যাচ্ছি, তখনই মোহন রায়হানের মতন স্লিপার সেল আমাদের বিভ্রান্ত করছে। বিভক্ত করছে। 

শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাদের প্রথম পথ দেখিয়েছিলেন। যেপথে গেলে আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি-স্বকীয়তার সন্ধান পাবো। কিন্তু সেই পথকে প্রথমেই রুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন ‘র’ এর প্ল্যা বি-এর কুশিলবরা। কর্নেল তাহের সেই প্ল্যান বি’রই অংশ। সেসময় কর্নেল তাহের ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। অবশেষে জিয়াউর রহমানের শাহাদতের মধ্যে দিয়ে সেইষড়যন্ত্র যা আমাদের স্বাতন্ত্র্যবিরোধী তা সফল হয়। আমরা আবার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখে পড়ি। সেই কর্নেল তাহেররই অনুসারী হলেন মোহন রায়হান। সুতরাং, তাকে বিশ্বাস করা আর চাণক্যের বন্ধুনীতিকে বিশ্বাস করে বিষ খাওয়া একই কথা। 

নির্মলেন্দু গুণ। আমাদের প্রধানতম কবিদের একজন। বিপরীতে তিনি ফ্যাসিজমের স্বীকৃত তাবেদার। তার কবিতাকে আমরা স্বীকার করি, পাঠ করি। কিন্তু নির্মলেন্দু গুণ যিনি ব্যক্তি, তাকে দেখি ঘৃণায়। নির্মলেন্দু গুণ তার ‘আমরা রাজপথে কেন’ শিরোনামের কবিতায় মোহন রায়হানের মুক্তির আলাপ তুলেছিলেন। সুতরাং এই মোহন রায়হানকে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি ভাবা সত্যিই কষ্টকর এবং একই সাথে পরস্পরবিরোধী। 

মোহন রায়হান অন্যদের লোভাতুর জিভ ছিঁড়ে নিতে চান তার কবিতায়। বলেন, ‘তোমাদের লোভাতুর জিভ টেনে ছিঁড়ে নেবো আমি’, অথচ নিজেই লোভাতুর হন পুরস্কারের লোভে। অপমানিত হয়েও তিনি গ্রহন করেন পুরস্কারের মেডেল ও অর্থ। তার লেখা ও চরিত্রে এমন অসংখ্য কন্ট্রাস্ট রয়েছে। যে কন্ট্রাস্ট তাকে শুধু সন্দেহভাজনই করেনি, অবিশ্বস্তও করেছে এবং তা দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন