https://www.prothomalony.com/
17840
literature
বাঘ
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
হ্যাঁ, মাংস খাই তো
দেখলেই জিভে জল ঝরে
আমার রাজ্যে আমি নাচি গাই
চিনতে পারলেই বাঘ
বাপের বাড়ি ছেড়ে
তিনি এখন মামার বাড়িতেই বেশি
ওঠাবসা করেন
এখন ঘাসের মতোই সহজ মাংস
বাঘ একটি গৃহপালিত পশু।
রাজপথ বিমুখ অক্ষরগুলো
অনন্য কাওছার
যা চেয়েছি নিজস্ব আঙিনায়
তার পুরোভাগ এখন জলশূন্য, অন্যত্র
পুরোপুরি উধাও তন্দ্রার রাজশয্যা;
শান্তির জলপাই শিকড়সমেত
উপড়ে ফেলেছে নির্লজ্জ বর্বর সমাজ
এমনকি রোদ-বিকেলে ঘাতকের পিস্তল
দিনেদুপুরে নিহত শীতল আশ্রয়;
একটি স্বপ্নের জগতে এত জল
এত রক্তক্ষরণ, এত কুয়াশা
এত দীর্ঘশ্বাস আদতে জানা ছিল না
এতদিন নদীর ভেতর একবিন্দু জল
কারো রুহে একটুখানি শীতল আলিঙ্গন;
শান্তির জলপাই গাছ চেয়েছি জীবনে
অথচ আমার হাতে বারবার ধরিয়ে দেওয়া হয়
রাজপথ বিমুখ অক্ষরগুলো
বুকের ভেতর ক্যাকটাস
জহিরুল হক বিদ্যুৎ
নিরর্থক খুঁজতে যাই নদী,
দেখি হাতের তালু জুড়ে শুধু ধূ-ধূ মরুভূমি।
ভালোবাসা দান করতে গিয়ে
বারবার ভুল মন্ত্র উচ্চারণ করি।
প্রতিদান? সে তো ক্যাকটাসের কাঁটার মতো
রক্তক্ষরণ ছাড়া কিছুই পাই না।
কেউ হিসাব রাখে না এই পৃথিবীতে
কতবার মেঘ হয়ে ঝরেছি কারও উঠোনে,
কার তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে জল হয়ে ছুঁয়ে দিয়েছি।
সবাই হিসাব রাখে শুধুই রিক্ততার
আর কারও ভাতের থালা জুড়ে
কেবলই খুঁজে পাই দীর্ঘশ্বাস।
ভালোবাসা নদীর পাড় ভাঙার মতো
এক নিঃশব্দ বিপর্যয়,
সবটুকু মাটি হারিয়ে ফেলার পর বুঝি
কার জন্য কতটুকু করতে পারিনি।
অবতীর্ণ বার্তা
তোফায়েল তফাজ্জল
অনিবার একই চর্চা? অনুরাগে নামে ধস, পানসে
পানসে লাগে।
ব্যতিক্রম, ঊর্ধ্ব থেকে নেমে আসা প্রত্যেকটি বাক্যে,
এক চিমটি ঘাটতি নেই স্বাদে ;
বরং যে যত পড়ে বা আবৃত্তি করে
তার কাছে এর পেয়ালা জবাব ছাড়া।
মধু বা অমৃত আকাশবাণীর বাঁদীরূপ প্রশ্নে
ঢালু থেকে কিনারায় উঠতে আক্কেলের মাটি খায়।
সাফল্যের পথ পেতে দেখে সর্ষেফুল।
আছে এতে রকমারি মজা
তারাই তা বোঝে, যাদের মন অলি বা হাজারো
মৌমাছি প্রবণ।
আছে শব্দে শব্দে খেলা, বহুরূপী বল –
যার তরঙ্গের সামনে সবকিছু শিশু, পুতুল বা ক্রীড়নক।
এইসব অবতীর্ণ বার্তা কাঁপন ধরাতে পটু
চলতে থাকা অন্যায়ের বুকের পাটায়।
বৃষ্টি দেখা ছাগলদৌড়ানি দেয় সকল প্রকার অন্ধকার
কিংবা অসামঞ্জস্যকে।
এভাবেই চলতে থাকবে যদ্দিন আপন কক্ষে সূর্য ক্রিয়াশীল।
অন্ত্যমিল
আনন্দ পাল
বৃষ্টির শরীর ছুঁয়ে নেমে এলে তুমি,
উত্তপ্ত রাস্তায় পড়ে হলে ছারখার।
ধুলোমাখা পথে মিশে হলে একাকার,
ভুল করে দেখলে না চুমি অন্তর্ভূমি!
মাঠের কিনারে বসে শুষ্ক পাতা আমি,
আগন্তুক বসন্তের প্রহরপ্রত্যাশী—
ধীরে ধীরে হয়ে যাচ্ছি মহাকালের দাসী,
মর্মর আওয়াজ সহি মৃত্যুপথগামী।
অন্ধকার মেঘে ঘেরা আমার আকাশ,
নিস্তব্ধ রাতের বুকে তোলে হাহাকার।
জলবিহীন হৃদয় তোলে দীর্ঘশ্বাস,
দীর্ঘপথজুড়ে শুধু শূন্যতার ভার—
সহ্য করে আমি আজ পিপাসার্ত চিল,
হন্যে হয়ে খুঁজি প্রণয়ের অন্ত্যমিল।
চোখের বয়স বাড়ে না
আরিয়ান আহমেদ
দেহের ক্যালেন্ডারে
প্রতিদিন একটি করে বয়স জমা হয়,
শুধু চোখ
সময়কে কোনোদিন স্বীকার করে না।
তাই আজও
একটি মুখ নীরবে ভেসে ওঠে দৃষ্টির গভীরে,
একটি স্মৃতি
জলের ওপর চাঁদের আলোর মতো কাঁপে।
মানুষ বুড়িয়ে যায়,
পৃথিবী বদলে যায়—
কিন্তু চোখের ভেতর
প্রিয়জনেরা থেকে যায়
চিরকাল একই বয়সে।
কাক ডাকা বিকেল
জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
গ্রীষ্মের লাজুক রোদ্দুর গায়ে মেখে
হেঁটে হেঁটে পাড়ি দিই
খাঁ-খাঁ নির্জন মরুভূমি।
পাতাহীন অশোক গাছের শূন্য ডাল ছুঁয়ে
ভেসে আসে সঙ্গীহারা কাকের করুণ কান্না;
বিষণ্ন বিকেলের নিস্তব্ধ বুকজুড়ে
জেগে ওঠে ঘুমিয়ে থাকা স্মৃতিরা।
হঠাৎ মনে পড়ে যায়,
আমারও তো একজন ছিল—
যার কোমল হাত ধরে
একদিন পাড়ি দিয়েছিলাম সুদীর্ঘ পথ,
কোনো এক কাকডাকা বিকেলে...
মাথা ভর্তি ট্রাক
সিয়ামুল হায়াত সৈকত
মাথাব্যথা হয়ে আছে মগজের মাঝখানে,
দাঁড়িপাল্লাতে ধরে শোকের শ্লোকবাক্য;
বিস্তৃত খোলা মাঠ, আজব উসকানিতে—
পেট থেকে গলে গলে বেরিয়ে যায় শখের নাম।
কলাগাছ-পাতা বকুলের মালা হয়ে
গলায় পরে আছে ট্রাকের নষ্ট কাচ,
আর চাকাগুলো হৃদয়ের বেগার খেটে খেটে
তোমার শিউলিতে নিজের সংগ্রহ সাজায়।
প্রেম যেন জীবন্ত উইপোকার দল—
নিষিদ্ধকরণ করে রাস্তার সোডিয়ামে!
কায়াবিহীন ছায়া
খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন
''হলুদ গোলাপ তোমার আরোগ্যের আর লাল গোলাপ তোমার আকাঙ্ক্ষার জন্য। কার্ডটি আমার পছন্দের তাই পাঠালাম। আশা করি তোমারও পছন্দ হবে...!'
বাদামি রঙের মাঝারি আকারের প্যাকেটে ডাকে আসা জিনিসগুলো বিছানায় ছড়িয়ে আছে। হলুদ কাগজে ছোট্ট নোটটা বারবার পড়ে দীপন। মনে হচ্ছে মাথার যন্ত্রণাটা দ্রুত কমে আসছে।
তার আগে, সকালে ক্লিনিকে যেতে হলো তাকে; আজ মাথার ব্যান্ডেজ পরিষ্কার করার তারিখ। ওখানে লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হল। আজও আগের দিনের নাইজেরিয়ান সেই মোটা মহিলা ক্লারা। দরজা খুলে মুচকি হেসে দীপনকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে যান। ক্লারার পরামর্শ মোতাবেক টুপি, জ্যাকেট খুলে রোগীদের জন্য পাতা খালি বিছানায় গা ছেড়ে দেয় দীপন। ক্লারা কাঁচি দিয়ে মাথার ব্যান্ডেজ আস্তে আস্তে খুলে নেন
-কী অবস্থা এখন মিস্টার দীপন? ভাঙ্গা ইংরেজিতে প্রশ্ন করেন।
-হ্যাঁ। ব্যথা আগের চেয়ে কম মনে হচ্ছে।
-ঠিক তাই। যতই ক্ষত শুকাবে, ব্যথা ততই কমবে।
-আরও কি আসতে হবে আমাকে?
-হবে। নির্ভর করছে তোমার মাথার ক্ষত শুকানোর অগ্রগতির উপর।
ক্লারা ততক্ষণে মাথায় ক্লিনিং-লিকুইড ঢেলে ক্ষত ধুয়ে নেন। তারপর সযত্নে মাথায় হাত রেখে বলেন,
-এই লিকুইডটা আগামীবার কিনে নিয়ে আসতে হবে, আমাদের স্টকে শেষ। আর শোনো, সাথে ঠিক এ ধরণের এক প্যাকেড 'গজ' নিয়ে এসো কেমন?
ক্ষতে মলম লাগিয়ে আগের মতোই গজ পেঁচিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন ক্লারা।
-শাওয়ার করা যাবে। কিন্তু আপাতত মাথা ভিজাবে না কেমন?
-অবশ্যই।
-এন্টিবায়টিক ঔষধটা খেয়ো ঠিক মত। আর বেশি ব্যথা হলে পেইন-কিলার ট্যাবলেট। এই যথেষ্ট।
ক্লারাকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসে দীপন।
বাইরের আবহাওয়া মন্দ না, ঝলমলে রোদ আছে। পিছনে সাবওয়ে-ব্রিজের উপর দিয়ে সা' সা' শব্দে একটা ট্রেন চলে গেল। বাসে যাবে কিনা ভাবছে সে! কোনো তারা না থাকায় অবশেষে বাসের চিন্তা ছেড়ে পুরো পথ হেঁটে ঘরে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয় নিল।
সাঙ্গিতিক মূর্চ্ছনায় জ্যাকেটের পকেটে ফোনটা বেজে ওঠে।
-হ্যালো! দীপন ভাই। আমি রওশন।
বাংলাদেশ থেকে কলেজবন্ধু এবং কবি রওশনের ফোন। ঢাকার একটি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য-বিভাগে আছে।
-রওশন ভাই, আপনি কি আমার লেখাটা পেয়েছেন?
-পেয়েছি। অনেক ধন্যবাদ। আপনার একটা ছবি পাঠাতে হবে, ওখানকার বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় তোলা। এ জন্যই ফোন দিলাম। প্লিজ!
-কিন্তু ভাই, পত্রিকায় ছাপানোর মত আমার কোনো ছবি নেই! একটি দুর্ঘটনার পর বেশ ক'দিন হল ঘরে পড়ে রয়েছি- এই অবসরেই একটা লেখা তৈরি করে পাঠালাম।
-দুর্ঘটনা! কী ভাবে?
-হ্যাঁ ভাই। এ দুর্ভাগা যেখানে যায়, সেখানেই অঘটন ঘটে যায়। (হা! হা! হা) রাতে কাজ থেকে মোটরবাইকে বাড়ি ফেরার পথে নির্জন ট্রাফিক সিগনালে হেলমেট পরা চার জন দুর্বৃত্ত আমার পথ আটকায়। মোটর-বাইক থেকে দু'জন নেমে এসে আমাকে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তায় ফেলে দেয়, পরে আমার সখের বাইক ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়।
কী ভেবে মোবাইলটা নেয়নি। একজন লাঠি দিয়ে মাথায় ও পিঠে সজোরে আঘাত করে। আমি অচেতন হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করি। পর দিন মাথায় অপারেশন ও সেলাই লাগে। তার পরের দিন রিলিজ হয়। ব্যথা নিয়ে এক মাস ধরে বিশ্রামে আছি, পুরোপুরি সুস্থ হতে আরও কিছু দিন লাগবে। ভাই, সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়েছেন!
- বিলাতেও ছিনতাইকারী? বলেন কী!
-এরা কোথায় নেই?
-যা হোক ভাই। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। প্লিজ আপনার ছবিটা আগামী দু' দিনের মধ্যে আমার ই মেইলে পাঠিয়ে দেবেন। আপনার লেখাটি আগামী সংখ্যায় ছাপা হচ্ছে। যতই বিদেশ করেন, আসল ঠিকানা তো বাংলাদেশ!
-ঠিকই বলেছেন রওশন ভাই।
-হ্যাঁ দীপন ভাই। আমি বুঝি। প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয়ে থাকে লাল-সবুজের ঠিকানা। মননে থাকে একটি মানচিত্র, বাংলাদেশ! আর দেশের মানুষ। তো, ভালো থাকুন ভাই!
দীপনের মনে হচ্ছে এক্ষণে তার মাথায় একটা ভারী বোঝা চেপে বসেছে। লেখা ছাপা হবে, ভালো কথা। তার সাথে আবার ছবি কেন? মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা লেখকের ছবি! পাঠকদের চোখ যে কপালে উঠে যাবে!
মোবাইলের রিং-টোন আবার! 'হ্যালো' বলতেই ওপাশ থেকে সেই মোলায়েম নারীকণ্ঠ-হ্যালো! এখন কেমন? আজ ব্যান্ডেজ চেঞ্জ করতে গিয়েছিলে?
-জী ম্যাডাম। ওখান থেকেই অধম আমি এখন পদব্রজে ঘরে ফিরছি।
-ডক্টর কী বললো?
-তাড়াতাড়ি সেরে যাবে।
-এখনও কি ব্যথা ... ...
-আছে। মনে হয় ওটা সহজে আমাকে ছাড়বে না।
-কেন ছাড়বে না?
-কেন ছাড়বে না তাও কি জানেন না? আমার এ ব্যথা যে হৃদয় টু হৃদয় সংযুক্ত! তাই।
-তাই বুঝি? তা হলে তো সেরেছে!
-না। সারছেই না। যতক্ষণ না একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত হচ্ছে ...।
- তা হচ্ছেই না। এবার সাস্কাচুয়ানে অনেক স্নো পড়েছে। তোমার চেস্টারে কী অবস্থা?
-হ্যাঁ পড়েছে। আপনার দেশের চেয়েও অনেক বেশি। তো ওই যে কী যেন বললেন, হচ্ছেই না...!
- বলেছি, আজ আমার গলা ভালো নেই...। গলা বসে আছে।
-কেন? গলায় কী আপনার কোনো ব্যথা?
দীপন সুর ক'রে গায়, 'আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী ...!'
-বাহ্! ভালোই তো গেয়েছো! আমি আজ গাইতে পারছি না! ঠান্ডা লেগেছে। খুসখুসে কাশি।
-তা হোক। তার পরও আপনার কন্ঠের গান শুনতে ভালোবাসি! তার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। 'কায়াবিহীন ছায়া' হয়ে আর কত খেলে যাবেন আমার সাথে?
মোবাইলের ওপাশ থেকে 'এই করেছো ভালো, নিঠুর হে এই করেছো ভালো...' ভরাটকণ্ঠ দীঘল আবহে দীপনের দেহ-মনে শিহরণ জাগায়।
-আচ্ছা! আজ এ পর্যন্তই। সাবধানে পথ চলো। দ্রুত সুস্থ হও এই কামনা রইল।
দীপন কিছু বলার আগেই মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নাহ্ তার প্রশ্নের উত্তর আজো পায়নি সে!
অনেকটা পথ পায়ে হেঁটে বাসায় আসে দীপন। দরজার কাছে পোস্ট-বক্সটা খুলতেই বাদামি প্যাকেটটা পায় সে। ঘরে ঢুকেই প্যাকেটটা খোলে। এবার অবাক হওয়ার পালা!'কী দুষ্টুরে বাবা! সে একটা মেইল পাঠাল। অথচ একবারও বলল না!'
তাই দীপনের এবার রিং করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইলে ওর নাম্বারটিতে সংযোগ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ওপাশ থেকে কোন সাড়া নেই! বার বারই ভয়েস-মেইলে চলে যাচ্ছে। মোবাইল চালু রেখে দীপন বলে যায়, 'তোমার পাঠানো মেইলটি এই মাত্র পেয়ে আমি সারপ্রাইজড! এখন মনে হচ্ছে; পুরোপুরি সুস্থ হয়েই উঠেছি। থ্যাংকস!
'তুমি রবে নীরবে, অন্তরে মম......' গাইতে গাইতে অন্য জগতে চলে যায় দীপন।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন