https://www.prothomalony.com/

17875

literature

সাহিত্য

উত্তরের স্বাস্থ‍্য-সচেতনতা

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ ০৩:১৩


(১) ৯০ সেকেন্ডে স্বাস্থ‍্যকর মাইক্রোওয়েভ ডেসার্ট

মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করা বা ‘সুইট ক্রেভিং’ আধুনিক ব্যস্ত জীবনে খুব স্বাভাবিক বিষয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষেরা যখন মেদ কমানো বা ফিটনেস বজায় রাখার চেষ্টা করেন, তখন মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু স্বাস্থ্যকর উপাদানে তৈরি ডেজার্ট যদি মাত্র ৯০ সেকেন্ডে বানিয়ে নেওয়া যায়, তবে স্বাদের সাথে স্বাস্থ্যের কোনো আপস করতে হয় না। ওটস, দুধ, ডিম, মধু এবং পিনাট বাটার দিয়ে তৈরি এই ‘মগ কেক’ বা মাইক্রোওয়েভ ডেজার্টটি ঠিক তেমনই একটি স্বাস্থ‍্যকর খাবার।

প্রয়োজনীয় উপাদান ও পুষ্টিগুণ: এই রেসিপিটিতে ব্যবহৃত প্রতিটি উপাদান পুষ্টিগুণে ভরপুর: 

ওটস (৩ টেবিল চামচ): জটিল শর্করা বা কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট এবং দ্রবণীয় ফাইবারের দুর্দান্ত উৎস।

দুধ (২ টেবিল চামচ): ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের জোগান দেয়।

ডিম (১টি): সম্পূর্ণ প্রোটিন এবং অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিডের প্রধান উৎস।

মধু (১ চা চামচ): রিফাইন করা চিনির স্বাস্থ্যকর বিকল্প ও প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

পিনাট বাটার (১ টেবিল চামচ): সুস্থ ফ্যাট (মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট) এবং অতিরিক্ত প্রোটিনের উৎস।

স্বাস্থ্যকর দিক ও শারীরিক উপকারিতা: সাধারণ দোকানে কেনা পেস্ট্রি বা কেক রিফাইন্ড ময়দা ও চিনি দিয়ে তৈরি হয়, যা খাওয়ার সাথে সাথে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই ডেজার্টে ব্যবহৃত ওটসের ফাইবার এবং পিনাট বাটারের ফ্যাট ও প্রোটিন হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়; ফলে সাধারণ মিষ্টির তুলনায় এটি রক্তে শর্করা বা ইনসুলিনের মাত্রা অতটা হুট করে বাড়ায় না। তবে এতে ব্যবহৃত মধুও এক ধরনের চিনি এবং এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স মাঝারি মানের—তাই একে সম্পূর্ণ “ডায়াবেটিস-নিরাপদ” বলা ঠিক নয়। ডায়াবেটিস রোগীরা চাইলে মধুর পরিমাণ কমিয়ে বা বাদ দিয়ে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে এই ডেজার্টটি খেতে পারেন।

ডিম ও পিনাট বাটার থেকে প্রাপ্ত প্রোটিন এবং ওটসের ডায়েটারি ফাইবার আপনাকে দীর্ঘ সময় তৃপ্ত রাখে। ফলে ঘন ঘন ক্ষুধা লাগা বা উল্টোপাল্টা স্ন্যাক্স খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী।

এছাড়া, পিনাট বাটারে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রক্তের ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়াতে এবং খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সাহায্য করে। ওটসের ফাইবার (বিশেষত বিটা-গ্লুকান) ধমনীতে চর্বি জমতে বাধা দেয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়কের ভূমিকা পালন করে।

আমরা জানি, একটি ডিমে প্রায় ৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে, আর পিনাট বাটারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন বিদ্যমান। এটি শরীরচর্চা বা ওয়ার্কআউটের পর পেশি মেরামতের জন্য একটি চমৎকার পোস্ট-ওয়ার্কআউট স্ন্যাকস হিসেবে কাজ করতে পারে।

তাছাড়া, ওটসের ধীরগতির কার্বোহাইড্রেট শরীরকে তুলনামূলক দীর্ঘস্থায়ী শক্তি জোগায়, আর সামান্য মধু দ্রুত এনার্জি বুস্ট দিতে সাহায্য করে। বিকেলের ক্লান্তি দূর করতে বা কাজের ফাঁকে তাৎক্ষণিক রিফ্রেশমেন্টের জন্য এটি একটি ভালো বিকল্প হতে পারে।

প্রস্তুত প্রণালী:  ৩ টেবিল চামচ ওটস গুঁড়ো করে বা আধাভাঙ্গা অবস্থায় একটি ছড়ানো সেইফ মগে নিন। এতে ২ টেবিল চামচ দুধ, ১টি ডিম, ১ চা চামচ মধু এবং ১ টেবিল চামচ পিনাট বাটার দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি সমসত্ত্ব হলে মাইক্রোওয়েভে উচ্চ তাপে মাত্র ৯০ সেকেন্ড বেক করুন। তৈরি হয়ে যাবে ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর ডেজার্ট।

জিভের স্বাদ মেটাতে গিয়ে স্বাস্থ্যের ক্ষতি না করে এই ৯০ সেকেন্ডের ডেজার্টটি পরখ করে দেখতে পারেন। তাছাড়া হুটহাট মেহমান এসে পড়লেও রেসিপিটি ঝটপট বানিয়ে চমকে দেওয়া সম্ভব।


(২) প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস যত্নে চিকিৎসাসম্মত পরামর্শ

প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস হলো পায়ের পাতায় থাকা প্ল্যান্টার ফ্যাসা নামক টিস্যুর প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন। এটি গোড়ালি ব্যথার সবচেয়ে সাধারণ কারণ। প্ল‍্যাল্যান্টার ফ্যাসা হলো একটি শক্ত ও তন্তুময় টিস্যু (যা লিগামেন্টের মতো), যা গোড়ালি থেকে শুরু হয়ে পায়ের আঙুল ও বল পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি একটি মোটা রাবার ব্যান্ডের মতো প্রসারিত হতে পারে। প্ল্যান্টার ফ্যাসা পায়ের হাড়গুলোকে একসাথে সংযুক্ত রাখে এবং পায়ের তলার বাঁকা অংশ গঠন করে।

যখন প্ল্যান্টার ফ্যাসার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে বা এটি বেশি প্রসারিত হয়, তখন প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস হয়। এই প্রদাহের কারণে হাঁটাচলা করা বা পায়ের ব্যবহার করা কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে একবারে একটি পায়েই প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস দেখা দেয়, তবে এটি একই সাথে দুই পায়েই হওয়া সম্ভব।

তবে চিকিৎসক ও অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক জীবনযাপন ও ব্যায়ামের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

লক্ষণ ও কারণসমূহ: 

ক্লিভল‍্যান্ড ক্লিনিকের তথ‍্যমতে, প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে: গোড়ালি ব্যথা, পায়ের পাতার বাঁকা অংশে ব্যথা, পা শক্ত বা আড়ষ্ট হয়ে থাকা, গোড়ালির চারপাশে ফোলাভাব ও পায়ের পেছনের পেশি বা একিলিস টেন্ডন শক্ত হয়ে যাওয়া।

যেকোনো বিষয় যা আপনার প্ল্যান্টার ফ্যাসা টিস্যুতে ইরিটেশন বা আঘাত তৈরি করে, তা থেকেই প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস হতে পারে। যেমন: কাজের প্রয়োজনে সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকা, খেলাধুলা করা, শক্ত সমতলে ব্যায়াম করা বা কাজ করা,  স্ট্রেচিং বা ওয়ার্ম-আপ ছাড়া ব্যায়াম করা, পায়ে পর্যাপ্ত সাপোর্ট দেয় না এমন জুতো পরা (যেমন ফ্লিপ-ফ্লপ বা সস্তা, পাতলা ও ফ্লেক্সিবল স্নিকার্স) এবং বাড়িতে খালি পায়ে হাঁটাচলা বা দাঁড়িয়ে থাকা।

কিছু শারীরিক স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণেও প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস হতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে: পায়ের পাতা অতিরিক্ত উঁচু হওয়া,  ফ্ল্যাট ফুট বা সমতল পা থাকা, 

 স্থূলতা বা অল্প কয়েক মাসের মধ্যে ১৫ পাউন্ডের (প্রায় ৭ কেজি) বেশি ওজন বৃদ্ধি পাওয়া।

প্ল‍্যাল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের যত্ন ও চিকিৎসা

এই সমস্যার চিকিৎসা সাধারণত প্রাইমারি কেয়ার ফিজিশিয়ান, অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং পোডিয়াট্রিস্ট করে থাকেন। অতি বিরল বা জটিল ক্ষেত্র ছাড়া সাধারণত সার্জারির প্রয়োজন পড়ে না। 

প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকরা কিছু ব্যথানাশক ওষুধ, থেরাপি এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।

যেমন: 

•পায়ের বিশ্রাম: প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস যে শারীরিক কর্মকাণ্ড বা খেলাধুলার কারণে হয়েছে, অন্তত এক সপ্তাহের জন্য (যদি সম্ভব হয়) তা থেকে বিরতি নিন।

•বরফের শেক: দিনে দুইবার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের জন্য পায়ে বরফ দিন। ত্বকের সুরক্ষায় একটি ঠান্ডা বা বরফ জমা পানির বোতল পাতলা তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে নিন; তারপর তা পায়ের পাতার নিচে রেখে এপাশ-ওপাশ গড়িয়ে হালকা মেসেজ করুন।

•সাপোর্টযুক্ত জুতো ও ইনসোল: শক্ত সোলে হাঁটা বা খালি পায়ে হাঁটাচলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখুন। সবসময় মজবুত এবং নরম কুশনযুক্ত জুতো ব্যবহার করুন। জুতোতে বিল্ট-ইন আর্চ সাপোর্ট না থাকলে চটি, ফ্লিপ-ফ্লপ বা অন্য কোনো সমতল জুতো পরবেন না। চিকিৎসকরা এই ব্যথার চিকিৎসায় হুকা (Hoka) এবং ব্রুকস (Brooks) ব্র্যান্ডের বিশেষ রানিং/ওয়াকিং জুতো ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ফার্মেসিতে পাওয়া যায় এমন প্রস্তুতকৃত ইনসোল অথবা পায়ের পাতার সঠিক মাপে তৈরি ‘কাস্টম-মেড অর্থোটিকস’ জুতোর ভেতরে ব্যবহার করতে পারেন।

এছাড়াও স্ট্রেচিং ও ফিজিওথেরাপি ব্যায়ামের পরামর্শ দেন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু স্ট্রেচিং ব্যায়াম করলে প্ল্যান্টার ফ্যাসার ওপর চাপ কমে এবং পেশি শিথিল হয়: 

•কাফ স্ট্রেচ: দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে এক পা পেছনে দিয়ে গোড়ালি মাটিতে ঠেকিয়ে রাখুন এবং সামনের হাঁটু সামান্য ভাঙুন। এতে পায়ের পেছনের কাফ শিথিল হয়।

•টাওয়েল স্ট্রেচ: সকালে বিছানা থেকে ওঠার আগে একটি তোয়ালে বা গামছা পায়ের পাতায় পেঁচিয়ে নিজের দিকে টেনে ধরুন এবং ৩০ সেকেন্ড ধরে রাখুন।

•মার্বেল বা কাপড় কুড়ানো: পায়ের আঙুল দিয়ে মেঝে থেকে মার্বেল বা ছোট কাপড় তোলার চেষ্টা করুন। এতে পায়ের নিচের পেশি শক্তিশালী হয়।

পেশি মেসেজ: ফিজিওথেরাপিস্টের নির্দেশিত টেকনিক অনুযায়ী নিয়মিত পায়ের পাতা ও কাফ পেশিতে মেসেজ করুন।

যদি প্রাথমিক যত্ন ও ব্যায়ামে ব্যথা পুরোপুরি না কমে, তবে চিকিৎসকরা নিচের চিকিৎসাপদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করেন:

•পা নিশ্চল রাখা: কয়েক সপ্তাহের জন্য বিশেষ ‘ওয়াকিং বুট’ (যাকে ওয়াকিং কাস্ট বা নিউমেটিক ক্যাম ওয়াকারও বলা হয়) ব্যবহার করা হয়। এটি পা-কে এক জায়গায় স্থির রাখে এবং টিস্যুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়া রোধ করে।

•কর্টিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন: প্রদাহ ও তীব্র ব্যথা কমানোর জন্য চিকিৎসক প্ল্যান্টার ফ্যাসা টিস্যুতে সরাসরি কর্টিকোস্টেরয়েড (যেমন প্রেডনিসোন) ইনজেকশন প্রদান করেন।

•প্লেটলেট রিচ প্লাজমা: ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু দ্রুত নিরাময় ও স্বতঃস্ফূর্ত মেরামতের জন্য পিআরপি (PRP) ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়।

•এক্সট্রাকোরপোরিয়াল পালস অ্যাক্টিভেশন টেকনোলজি (EPAT): এটি এক ধরনের শকওয়েব থেরাপি। এই প্রক্রিয়ায় উচ্চ ঘনীভূত শব্দ তরঙ্গ প্রয়োগ করে টিস্যুতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো হয়, যা নিরাময় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে।

•পারকিউটেনিয়াস নিডল টেনোটমি: এই প্রক্রিয়ায় চিকিৎসক ত্বকের ওপর দিয়ে একটি সুই ঢুকিয়ে প্ল্যান্টার ফ্যাসা টিস্যুতে সূক্ষ্ম ছিদ্র করেন। এর ফলে শরীর ওই স্থানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রক্ত পাঠায়, যা টিস্যুটির নিজস্ব নিরাময় ক্ষমতাকে উদ্দীপিত করে।
 

(৩) মুড সুইং: কারণ ও তা মোকাবিলার উপায়

মুড সুইং হলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ করে আপনার অনুভূতির পরিবর্তন বা মেজাজের ওঠানামা। কখনো কখনো আপনি হয়তো জানেন যে ঠিক কী কারণে আপনার মন ভালো বা খারাপ লাগছে। আবার কখনো আপনি হয়তো অনুধাবনই করতে পারেন না যে কেন আপনি এমন বোধ করছেন। অর্থাৎ, হুট করেই খুব আনন্দ লাগা, আবার পর মুহূর্তেই বিনা কারণে বিষণ্ণতা, রাগ বা হতাশায় ডুবে যাওয়া—এই মানসিক অবস্থাকে বলা হয় ‘মুড সুইং’। 

মুড সুইং কারণ কী?

ক্লিভল‍্যান্ড ক্লিনিকের গবেষণা অনুযায়ী, মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রার পরিবর্তনের কারণে মুড সুইং বা মেজাজের হঠাৎ পরিবর্তন হয়। আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি ঘটনারই এই রাসায়নিক উপাদানগুলোর ওপর কিছু না কিছু প্রভাব রয়েছে। তবে জীবনের কিছু নির্দিষ্ট পর্যায় এবং কিছু শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মুড সুইং হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এছাড়া অ্যালকোহল ও বিভিন্ন ওষুধের ভূমিকাও এতে থাকতে পারে। 

মুড সুইংয়ের সম্ভাব্য কারণগুলো সম্পর্কে জানলে আপনি আগে থেকেই বুঝতে পারবেন কখন আপনার মেজাজ পরিবর্তিত হতে পারে—অথবা অন্তত এটি কেন ঘটছে তা অনুধাবন করতে পারবেন।

১. জীবনের বিভিন্ন পর্যায় 

জীবনের কিছু পর্যায় অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। বিশেষ করে কৈশোরকাল, গর্ভাবস্থা এবং রজোনিবৃত্তির সময়ে মুড সুইং হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।

বয়ঃসন্ধিকালের এই সময়ে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রচুর পরিবর্তন ঘটে। এই হরমোনজনিত ও মানসিক পরিবর্তনের কারণে কৈশোরে মেজাজের ওঠানামা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। আবার গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান জন্মদানের পর হরমোনের তারতম্য, ঘুমহীন রাত, নতুন অভিভাবক হওয়ার সাথে যুক্ত জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নবজাতকের চাহিদার ভাষা বোঝার মানসিক চাপের কারণেও মুড সুইং হতে পারে। একইভাবে, নারীদের  মেনোপজের সময়ে শরীরে এস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রার মারাত্মক ওঠানামা মেজাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।

২. শারীরিক নানা ব্যাধি: 

মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে থাইরয়েড—দেহের নানা শারীরিক সমস্যা মেজাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ডিমেনশিয়া,  আলঝেইমারস, ব্রেন টিউমার কিংবা মস্তিষ্কে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়া সমস্যাগুলো সরাসরি ব্যক্তিত্ব ও মেজাজের পরিবর্তন ঘটায়। ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার তারতম্যের কারণে সহজেই মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে। 

শরীরের নানা হরমোন ও স্নায়বিক পরিবর্তনের কারণেও এমনটা ঘটে। যেমন, মাইগ্রেন শুরু হওয়ার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে থেকেই এর প্রথম ধাপ বা প্রোড্রোম হিসেবে রোগীদের মধ্যে মুড সুইং দেখা দিতে পারে। অন‍্যদিকে, গ্রেইভস ডিজিজ, অতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড (হাইপারথাইরয়েডিজম) এবং নারীদের ক্ষেত্রে প্রাক-ঋতুস্রাবকালীন লক্ষণ যেমন পিএমএস বা পিএমডিডি-র একটি অত্যন্ত প্রধান উপসর্গ হলো মুড সুইং। এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব খিটখিটে ভাব তৈরি করে এবং মাথায় আকস্মিক গুরুতর আঘাতের ফলেও মানুষের আচরণ ও মেজাজে চরম পরিবর্তন আসতে পারে।

৩. মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা 

কখনো কখনো মুড সুইং মানসিক স্বাস্থ্যের নানা জটিলতার স্পষ্ট লক্ষণ হতে পারে। বিষণ্নতা কিংবা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো মুড ডিসঅর্ডারগুলোতে আবেগের চরম ওঠানামা খুব স্বাভাবিক। এছাড়া অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা এনজাইটি, এডিএইচডি, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার এবং সাইক্লোথাইমিয়া এই ধরনের মুড সুইংয়ের জন্য দায়ী। আবার পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার কিংবা ইটিং ডিসঅর্ডারে ভোগা ব্যক্তিদের মধ্যেও অনুভূতির আকস্মিক পরিবর্তন বেশি লক্ষ্য করা যায়।

৪. বিভিন্ন পদার্থ ও ওষুধের প্রভাব

আমাদের গৃহীত বিভিন্ন ওষুধ এবং রাসায়নিক উপাদান—যেমন গর্ভনিরোধক বড়ি, হরমোন থেরাপি, অ্যানাবলিক স্টেরয়েড, কর্টিকোস্টেরয়েড এবং অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট-এর অন্যতম প্রধান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে মুড সুইং দেখা দেয়। পাশাপাশি অ্যালকোহল, গাঁজা বা তামাকজাতীয় নেশাজাত দ্রব্য ব্যবহারে শরীরের হরমোন ও স্বাভাবিক ঘুমের চক্র বিঘ্নিত হয়, যা দুশ্চিন্তা ও মেজাজের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এমনকি এসব অভ্যস্ত উপাদান বা নেশাজাত দ্রব্য হঠাৎ ত্যাগ করলেও কিছুদিন তীব্র মুড সুইং বা মেজাজের ওঠানামা তৈরি হতে পারে।

মুড সুইং বা মেজাজ পরিবর্তন রোধে করণীয়

জীবনের নানাবিধ উত্থান-পতনের সাথে মেজাজের কিছুটা ওঠানামা হওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। তাই মুড সুইং পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো উপায় নেই। তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে এর ঘনঘটা এবং তীব্রতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটালে মানসিক চাপ কমে এবং মনের মেজাজ দ্রুত উন্নত হয়। এছাড়া কর্মব্যস্ত জীবনে প্রতিদিনের রুটিনে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম বা হাঁটাচলা যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ব্যায়াম মস্তিষ্কে মেজাজ ভালো রাখার উপাদান নিঃসৃত করে এবং ভালো ঘুমে সাহায্য করে।

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে চর্বিহীন প্রোটিন ও রঙিন শাকসবজি বেশি খাওয়া এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন মানসিক চাপ কমিয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে চিন্তাভাবনার সুযোগ তৈরি করে দেয়। শরৎ ও শীতকালে মন ভালো রাখতে এবং মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়াতে লাইট থেরাপি বা লাইট বক্সের ব্যবহারও বেশ কার্যকর।

মাঝে মাঝে মেজাজ পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক হলেও, যদি মুড সুইং আগের চেয়ে খুব ঘনঘন হতে থাকে, প্রচণ্ড তীব্র আবেগের সৃষ্টি করে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি দেয় কিংবা আপনার পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—তবে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।

মুড সুইং জীবনের অংশ মনে হলেও এটি যেন আপনার জীবনকে ব্যাহত না করে বা আপনাকে অসহায় বোধ না করায়। জীবনযাত্রার সামান্য পরিবর্তন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা—সবকিছুর মাধ্যমেই একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।  তাই প্রয়োজনে একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন